ক্যাটেগরিঃ মুক্তমঞ্চ

 

যাপিত আয়ুষ্কাল : ভাঙা-গড়া খেলা এবং সবকিছু ভেঙে পড়ে; পড়ে কি?
আধুনিক বিজ্ঞান প্রমাণ করেছে, মানুষের ব্রেন কম্পিউটারের চেয়েও দ্রুতগতিতে পরিবর্ধমান ও পরিবর্তনশীল। পরিবর্তিত হচ্ছে প্রতিটি সূক্ষ্ম মুহূর্তে–অণু-পরমাণু সময়ে ও ক্ষণে। দেখা গেছে, মানুষের ব্রেন এক সেকেন্ডের এক হাজার ভাগের এক ভাগ সময়ান্তরে পরিবর্তিত হচ্ছে। সে-প্রেক্ষিতে আমরা দীর্ঘসময়, দীর্ঘদিন ধরে একে অপরকে বিশ্বাস করি, ভালোবাসি, ঘর বাঁধি–তার সবটাই অবাস্তব এবং অসত্য। সত্য এই–প্রতিটি মুহূর্তে মানুষ তার প্রিয়জনকে ভুলে যাবে বা পরিচিত জগৎ থেকে আরেকটি জগতে প্রবেশ করবে এবং নতুন করে ভালোবাসা জাগিয়ে তুলবে, গড়ে তুলবে ভিন্ন এক গ্রহান্তর ধারণা। অথচ তা যখন হচ্ছে না, তখন ধরে নেয়া ভুল হবে না–আমরা অবাস্তব এবং অসম্ভবের কারুচিত ভিতের ওপর আমাদের বিশ্বাস ও ধর্মকে দাঁড় করিয়ে দিয়েছি। তবে যা হচ্ছে–তা আমাদের সংযম, ধারাবাহিকতা এবং ইন্দ্রিয়-শক্তিগ্রাহ্যতার ভিত্তিতেই সম্ভবপর হয়ে ধরা দিয়েছে নতুন সৃষ্টিজগৎ। এখানেই তৃপ্তি এবং আনন্দ যে, আমরা এখনো পাগল (প্রচলিতার্থে) হয়ে যাইনি; কেননা আমরা–মানুষেরা অতি ধৈর্যশীল এবং সংগ্রামমুখর হয়েই জন্মগ্রহণ করেছি। প্রকৃতি এবং সমাজ আমাদের সময়োপযোগী সাহসী করে তুলেছে, এখানে আমাদের ঋণ স্বীকার–পূর্ব-পুরুষদের কাছে, তাদের বীর্যের জন্য–মায়ের দুধের মাধুর্যতার ক্রম-প্রস্রবণতায়।
একটি মেয়ে যখন এক মুহূর্তের জন্যেও–মায়াভরা চোখে তাকায়, প্রেমার্ত-তৃষ্ণাভরা মুখে হেসে ফেলে কিছু জানতে চায় অথবা দূরত্ব রেখে সময়কে পার করে দেয়, তাকে আমি স্বাগত জানাই এবং একটি মেয়ে যখন সর্বোচ্চ পাঁচ মিনিট আমাকে বিশ্বাস করে এবং ভালোবাসে, আমি তাকেও জন্মের পুণ্যতা জানিয়ে শুভেচ্ছা পাঠাই। এখানে আমার কোনো পাপ নেই, বরং ঔদার্যই বেড়ে যায়। আমি আশা করি, আজকের বন্ধুটি আপাতভাবে গড়ে ওঠা সম্পর্ক ভুলে গিয়ে নতুন সম্পর্কে নিজেকে তুলে ধরবে অথবা চক্রাকারে ফিরে যাবে ফেলে আসা দিনগুলোতে। এতে বিশেষ কোনো উদাসীনতা বা কৃপণতা দেখি না। আমি মনে করি, এখানেই মহত্ত এবং আদর্শের সর্বোচ্চ পরিচয় কখনো স্ফুট কখনো অস্ফুটভাবে ধরা দিয়েছে। এই পরিপ্রেক্ষিতে সদ্য-পরিচিত বন্ধুটি বা আপাতভাবে গড়ে ওঠা বন্ধু সম্পর্কীয় ব্যক্তিজন–কাছের অথবা দূরের–আগামীতে দেখা হলে হেসে কথা বলবে না, রূঢ় এবং কঠিন হবে, এমনকি আমিও। সে-ক্ষেত্রে বিস্ময়ের কিছু দেখি না বা হতবাক হই না, কেননা এটিই স্বাভাবিক এবং সুন্দর। এর ব্যতিক্রম এবং শুভ-রূপায়ণ প্রতিনিয়তই যা ঘটছে, তাকে স্বাগত জানাই এবং পূর্ব-পুরুষদের আশীর্বাদ হিসেবে গ্রহণ করি–প্রকৃতিরও। এই যে ভাঙা-গড়ার খেলা–তা সবই ঘটছে কিছু সুনির্দিষ্ট কারণে, বিশেষ করে ভিত্তিপ্রস্তরগত দুর্বলতা অর্থাৎ বিশ্বাস এবং একে-অপরকে আন্তরিক বোঝাপড়ার ঘাটতি-প্রসূত সংক্রমণে–যা প্রতিনিয়ত মানুষকে তাড়িত করছে এবং তাড়িত করছে বলেই মানুষ সংগ্রামমুখর হয়ে উঠছে প্রতিবন্ধকতার পাশে। তার পরও ভাঙা-গড়ার ক্ষেত্রে যে ব্যাপারগুলো ঘটছে–তার কারণগুলোই-বা কী? অথবা উৎস-সংক্রান্ত শেকড়ে কী ক্রিয়াটি সচল রয়েছে, সেই ভাবান্তর প্রক্রিয়াটিও একটি উৎসমুখের দিকে ধাবমান–যা হয়তো প্রক্রিয়াধীন বা প্রক্রিয়াজাত–ক্রমজ্ঞানচর্চা বিচ্ছুরণে দ্রুতালো বিস্ফোরণে প্রাণিকুলকে জাগিয়ে দেবে একদিন, সেই দিনের ভাবান্তর-পর্বের এ-চলমান ক্রিয়া এগিয়ে চলছে বা পূর্ব থেকেই চলে আসছে।


শিরোনামগত কারণে শুরুতে কিছু কথা বলে নিতে চাই। ‘সব কিছু ভেঙে পড়ে’ নামে হুমায়ুন আজাদ-এর একটি উপন্যাস বই-বাজারে রয়েছে। আমি শ্রদ্ধার সঙ্গে তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি এ-কারণে যে, তিনিই প্রথম আমাকে এই ভাবনা থেকে সরে না-গিয়ে আরো প্রগাঢ়রূপে সংযুক্ত করেছেন। দুই. তার বইটির কিছু লেখা, কিছু উদাহরণ আমার মনে ভীষণভাবে দাগ কেটেছে। আজও তার ত অস্পষ্ট নয়। বইটি ভালো কী মন্দ, উপন্যাস কিনা, সাহিত্যমূল্য আছে কিনা, শিল্পমূল্যই-বা কী–এ-পর্বে তার আলোচনা মুখ্য নয়। বরং বইটির শুরু থেকে পরবর্তী কিছু অংশ আমাকে দারুণভাবে ভাবিয়েছে, যে-ভাবনা এখনো আমাকে পীড়িত করে, স্বপ্ন দেখায়–স্বপ্ন ভেঙে দেয়–খেলা শেখায়–খেলাঘর ভেঙে দেয় এবং সবকিছু ভেঙে পড়ে–ধারণা বা কালবিস্তারের আধুনিকতা।
সবকিছু ভেঙে পড়ে, পড়ে কি? অথবা ভেঙে পড়ে কেন? কেনই-বা সবকিছু ভেঙে পড়ে? পাঠ থেকে লিখছি, উপন্যাসের নায়ক শিশু-কিশোর বয়স থেকেই প্রতিপার্শ্বকে দেখেছে, জীবনকে অনুভব করেছে–অন্য আলোয়, অন্য প্রতিভাসকরণে। ছেলেবেলাতেই সে দেখেছে–পাশের বাড়ির নতুন বউ কেন প্রতিদিন পুকুরঘাটে কুয়াশাঢাকা ভোরে স্নান সারে, তার প্রশ্ন জেগেছে। প্রশ্ন হয়ে উঠেছে রক্তস্নাত তলোয়ারের ন্যায়।
মামাবাড়ি যাওয়ার পথে বড় লোহার পুলটি দেখে তার মনে হয়েছে, ওটা কখনো ভেঙে পড়বে না। সে তার বাবাকে দেখেছে; পুরুষপ্রতিম জোয়ান-সাহসী আর দীপ্ত। তার বাবা যখন গ্রামের পথ ধরে হাঁটে, চলে–সে তার বাবাকে পুলটির মতোই বিরাট আর শক্ত ভেবেছে আর এই বিশ্বাস ছিল–এ-ও বুঝি ভাঙবার নয়, লোহার পুলটির মতোই অবিনশ্বর। বাবা এবং ব্রিজ তার কাছে চিরন্তন একটি প্রতিমা হয়ে আসে। কিন্তু তার বয়োবৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে বাবারও বয়স বাড়ে, চুলে ধরে পাক এবং একসময় দুর্বল হয়ে পড়ে। লোহার পুলটিও একদিন ভেঙে পড়ে। শিশু মানসপটে গড়া প্রতিমা-ঐশ্বর্য ভেঙে খান খান হয়ে যায়।
সে দেখেছে–ছেলেবেলায় পাশের ফ্যাটের নববিবাহিত দম্পতি-যুগল প্রতিদিন বিকালে হেলান দেয়া চেয়ারে মুখোমুখি বসে গল্পে মেতে উঠতো। অথচ সামান্য আট-দশ বছরের ব্যবধানে পরিবর্তন ঘটেছে অনেক। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে চেয়ার ঘুরে গেছে। বসেন তারা ঠিকই, তবে আগের মতো মুখোমুখি নয়–বিপরীতমুখী। সে দেখে আর ভাবে–ভাবে আর ভাবনাগুলোও একসময় ভেঙে যায়। যেমন সে ভেঙে যেতে দেখেছে ঈশ্বর-প্রতিম বাবাকে, লোহার পুল; আর ভেঙে যেতে দেখেছে টোলপড়া গালের ভাঁজ, কিশোরীর বেড়ে ওঠা ডালিম; আর পাড়াতো ফুফু, ভাবিদের ফোলা যৌবন কী করে দিনে দিনে ক্রমে ক্রমে সবুজ পেঁপেতে পরিণত হয়, কখনো-বা চুপসে যায় বেলুনের মতো। সে বিস্ময়াল্পুত হয় আর ভেঙে পড়ে, ভেঙে পড়ার শব্দ শুনতে পায়। ভেঙে যেতে দেখেছে–খালার আলতা-রং শরীর, মায়ের বিশ্বাস, আর পাশের বাড়ির বউয়ের স্নান-পর্ব নীরবতা। নিজের মধ্যে যে বিষনাগিনীরূপ কালসাপ খেলা করে–গোপনাঞ্চলে জ্বলে ওঠে, পুড়ে যায়–সাহসী রক্তস্নাত দুর্বলতা। আর দেখেছে বয়সের সঙ্গে সঙ্গে ভেঙে পড়ার শব্দ আরো সশব্দ হয়ে ওঠে, বিশ্বাসের দেয়ালে ধরে চির–ফাটলে বাড়ে প্রসারতা, গভীরত্ব–এমনিভাবে ভেঙে যায় প্রেম-ভালোবাসা-প্রিয় নারী-সম্পর্ক এবং সম্পর্কের বিনা সুতার বাঁধন।


সদ্য বিবাহিত একটি দম্পতির কথা বলি। বিয়ে করার প্রথম দিকে স্বামী বাজারে যাচ্ছেন, যাবার সময় কী-কী আনতে হবে–প্রয়োজনীয় সবকিছুই জেনে নেন পরিবারে সদস্যদের কাছ থেকে এবং শেষ মুহূর্তে বউয়ের কাছে গিয়ে বা বউকে কাছে ডেকে নিচুস্বরে নাম উচ্চারণ করে অথবা নামের আগে-পিছে লক্ষ্মীটি বা এরূপ কোনো বিশেষণ যুক্ত করে জেনে নেন কিছু লাগবে কিনা?
অথচ বাচ্চা-কাচ্চা হওয়ার দু’চার বছরের মধ্যেই অথবা বিয়ের আট-দশ বছরের মাথায় স্বামীটি বাজারে যাচ্ছেন, গলার কণ্ঠ বাড়িয়ে বলেন, অমুকের মা বাজারে যাচ্ছি ব্যাগ দাও, ব্যাগের কোথায় যে ধরল তাও লক্ষ্য করে না, বউয়ের মুখও পড়ে থাকে আঁধারে-আড়ালে–নিত্যপ্রয়োজনীয় চাহিদার কথাই তার জানা হয়ে ওঠে না অথবা জানতে চান না। সেখানে বউয়েরও যে কিছু বলার ছিল, তা আর জানা হয় না। প্রথম দিকের স্মৃতি বা সেই সময়ের প্রীতিমাধুরতা শুধু চোখে কান্না ভরে আনে আর কিছু নয়। আগে কিছু না-বললেও ভাজা-পোড়া, স্নো-পাউডার, কাপড়-চোপড়সহ নিত্যপ্রয়োজনীয় নয় এমন অনেক কিছুই অনাহূতভাবে এসে যেত। আজ সেই হাসিও নেই, মধুর কণ্ঠও নেই, আদর-ভরা ডাকও নেই বরং তার উল্টো ঘটছে। যা ব্যতিক্রম, তা-ও ব্যতিক্রম হয়েই থাকছে।
কেন স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে এই টানাপড়েন, পুরুষই-বা কতটুকু দায়ী, নারীর ভূমিকা কী? দেখা গেছে, প্রতিদিনের প্রাপ্তি এবং প্রাপ্ত দৈহিক মিলন–যা চাইলেই পাওয়া যায়; আবার অনেকটা উত্তরাধিকারের মতো প্রাপ্ত হয়ে যায়। তার ফলে মানসিকতায় নতুনত্ব ফুরিয়ে ফেলে অলস মানুষরা, নারী-পুরুষ উভয়ের ক্ষেত্রেই এরূপ ঘটে থাকে। অথচ আবিষ্কার-প্রিয় মানুষ প্রতিটি দিনকে নতুন দিন হিসেবে ঘোষণা করেন, ‘ভালো আছি’ বলে নিত্যনবরূপে স্বপ্নডানায় জেগে ওঠেন এবং আনন্দোপভোগ করেন ভোগ-কামুকতা পরিত্যাজ্য করে। পার্থক্য মানসিকতায় এবং বেড়ে ওঠা জ্ঞান ও মানসিক বিকাশে।


সবকিছুই ভেঙে পড়ে। কিছুই চিরস্থায়ী অথবা টেকসই নয়। জন্ম হলে মৃত্যু আছে, শুরু হলে শেষ আছে, সৃষ্টি হলে ধ্বংস আছে। সভ্যতা-ভাষা-রাষ্ট্র-ধর্ম ভেঙে যাচ্ছে। আর মানুষে-মানুষে যে সম্পর্ক তারো একটা শেষ আছে। কখনো নির্মম, কখনো স্বাভাবিক, কখনো-বা অবাঞ্ছিত। এলাকায় ব্রিজ বা সেতু তৈরি হতে দেখেছি। এর কিছু তৈরি শেষ হবার আগেই ভেঙে পড়েছে–এমনও ঘটেছে। এলজিইডির নিয়মানুসারে কাজ শেষ করার আগেই অর্থাৎ বিল তুলার পূর্বাহ্নে অনেক সেতু ভেঙে পড়েছে; এমন অনেক নিদর্শনও আমাদের দেশেই রয়েছে। এর কারণ কী? দুই নম্বর, তিন নম্বর–বাজে ইট-সুরকি-সিমেন্ট-বালির ব্যবহার, সর্বোপরি ভিত্তিপ্রস্তরগত দুর্বলতার কারণেই শেষ পর্যন্ত ভেঙে পড়েছে। কিন্তু এমনও তো অনেক উদাহরণ আছে, যুগ যুগ ধরে সেতু বা ব্রিজটি টিকে আছে। তার মূল কারণ–ভিত্তিপ্রস্তরগত গঠনশৈলীর নিপুণতা, যাতে কোনো গলদ অথবা তৈরিতে দুই নম্বর, তিন নম্বর মালামালের সংমিশ্রণ ছিল না। দেখা যাচ্ছে, ভিত্তিপ্রস্তর যার যত শক্ত–তার বুনিয়াদ বা অবস্থানও তত বেশি দীর্ঘস্থায়ী।
মানুষের সম্পর্কও এইরূপ সেতুর মতোই। যার গড়নে অর্থাৎ সম্পর্ক সৃষ্টিতে ভিত্তিপ্রস্তর, বিশেষ করে বিশ্বাস এবং বোঝাপড়া বেশি থাকে, তার সম্পর্ক তত বেশি দীর্ঘস্থায়ী হয় এবং দুই নম্বর, তিন নম্বর ইটের মতোই যার গড়ন বা সৃষ্টি মিথ্যা-বানোয়াট সম্পদ বা সম্পর্ক অথবা ব্যক্তিত্ব বা মর্যাদার পরিচয়ে গড়ে ওঠে তার ধ্বংসও হয় তত বেশি। বাবা-মা, ভাই-বোন, বিশেষ করে কাছের রক্তের আত্মীয়ের বাইরে উল্লিখিত বিষয়গুলো বিশেষভাবে প্রভাব ফেলে। তা ছাড়া বাবা-মা, ভাই-বোনদের মধ্যেও স্বার্থ-স্বাতন্ত্র্যের কারণে সম্পর্কের অবনতি ঘটে বা ভেঙে যায়–যা উল্লিখিত দুর্বল ভিত্তিপ্রস্তর বা ইট-বালির মতোই ঘটে থাকে। সে ক্ষেত্রে মা এবং মাতৃত্বের সম্পর্ক ও সম্পর্কের মাধুর্যতা অনেকটা এর আওতামুক্ত। তা ছাড়া সময় ও বয়স, যৌবন ও চাহিদা এবং অর্থ ও স্বার্থের কারণে এই ভাঙা-গড়ার খেলা আরো দ্রুত হয়। যতটা আশা করা হয় না বা যায় না–তারো অধিক। এ ক্ষেত্রে দেখা গেছে, মানুষ মিথ্যা এবং অসততার জায়গায় বেশি ভুল করে এবং করেছে। ফলে প্রকৃত জ্ঞানীদের পাশে শিতি মূর্খদের প্রভাব-প্রতিপত্তি বেড়ে গেছে–যা সুস্থ, সুশীল এবং কল্যাণকর সমাজের জন্য ভয়াবহ, আশাপ্রদ নয়।
তা ছাড়া দেখা যায়–যা প্রতিনিয়ত কামনা করছি বা চাইছি, তা কি সত্যিকারার্থেই চাইছি বা কামনা করছি? আবার স্বপ্ন ও ইচ্ছার ক্ষেত্রেও এরূপ ঘটছে। ফলে সত্য হলো–যা ঘটবেই এবং বাস্তব। অথচ মানুষ আগুনের উত্তাপকে ভয় পায়, বাঘের থাবাকে হিংস্র বলে, সম্পর্কের অবনতিতে কেঁদে ফেলে বা দুঃখ-ভারাক্রান্ত হয়; যার সবই ছিল সত্য এবং চিরন্তন বাস্তবের মতোই কঠিন। এর ব্যতিক্রম হলে তা ব্যতিক্রম হিসেবেই সত্য এবং বাস্তব। তাহলে আমরা কোন সত্য এবং বাস্তবের দিকে যাচ্ছি? যে সত্য নির্মম এবং নির্দয়, যে বাস্তব রণ এবং দহনের মতো পোড়ায়–তা কি আমরা চাই না? তাহলে কী চাই? মিথ্যা সত্য, মিথ্যা বাস্তব অথবা ব্যতিক্রম? এ-সকল কারণে দেখা যায়, অনেক ক্ষেত্রেই সাহসীরা হয় ভীরু আর কর্মঠ সংগ্রামী মানুষগুলো হয়ে পড়ে অলস। অথচ তা হবার নয় বা হবার কথাও ছিল না।
চেনা মানুষগুলোই একদিন চিনতে পারবে না, ভুলে যাবে, কষ্ট দেবে–এই তো আধুনিক বিজ্ঞানসম্মত সত্য ও বাস্তব। এ জন্য দুঃখ বা কষ্ট পাবার কিছু দেখি না, এমনকি বেদনাবোধও। সুখ-দুঃখ, কষ্ট-আর্তি, আনন্দ-বেদনা শেষ পর্যন্ত মনে হয়েছে ব্যাকরণবিদদের তৈরি দুর্মর পদার্থের মতোই জড়, অসাড় আর অপ্রয়োজনীয়। কেননা জীবন থেকে উল্লিখিত প্রত্যাশা ও হতাশাগুলো কম্পিউটারের ভাষায় কার্সার দিয়ে ধরে ডিলিট করে দিলেই তো সব শেষ হয়ে যায়। তারপর যা থাকবে–তা হলো নির্মম সত্য এবং ধ্রুব। এর অনেক কাউন্টার-আলোচনা হয়তো অনেকের থাকতে পারে কিন্তু আমার বলা হলো–ইচ্ছা এবং সাধনার (শ্রম ও অধ্যবসায়) যোগফলেই সবকিছু সম্ভব এবং সম্ভব করাও সম্ভব। সে ক্ষেত্রে মিথ্যা বা ভণ্ডামি কিংবা আঁতলামির কোনো সুযোগ নেই।
এ ছাড়া ব্যক্তি উন্নয়ন ও অনুন্নয়নের জন্য যে তিনটি শক্তি প্রধানত দায়ী : ইচ্ছাশক্তি, শ্রমশক্তি, চিন্তাশক্তি–সেখানেও অনুশীলনের গুরুত্ব সর্বাধিক।


এই পরিপ্রেক্ষিতে যাপিত জীবনায়ুষ্কালকে একটি সেতু বা ব্রিজ, অনেক ক্ষেত্রে একটি মঞ্চ অথবা নাট্যমঞ্চের মতোই মনে হয়েছে। কেননা বারবার আমার এই মনে হয়েছে, আমরা যেন চরম-নিয়তিতে পড়ে পৃথিবী নামক নাট্যমঞ্চে জন্মমাত্র একজন দক্ষ মঞ্চাভিনেতায় পরিণত হয়েছি। অভিনয় করছি জীবন-মঞ্চের পাঠশালায়–পাকা অভিনেতার মতোই। কিন্তু শেষ পর্যন্ত এ-ও মনে হয়েছে–ভালো অভিনেতাও হয়তো হতে পারছি না বা হতে চাই না অথবা হবার প্রক্রিয়াটিই অজ্ঞাত রয়ে গেছে। কিন্তু ভালো মঞ্চাভিনেতাও যদি হতে পারতাম, তাহলে প্রতিনিয়ত জীবনের অনেক কিছুই আমাদের কাছে সহজ এবং সাবলীল হয়ে উঠতো। কিন্তু তা-ও কি হচ্ছে? হচ্ছে না!
পুরো যাপিত সময়কে যদি মঞ্চে নিয়ে গিয়ে দাঁড় করাই এবং অভিনেতা হিসেবে দাঁড়িয়ে যাই, তাহলে অনেক শুদ্ধতা এবং পবিত্রতা সবুজে-শ্যামলে ছেঁয়ে ফেলে–সুন্দর ও স্বপ্নের মাঝে এক বাস্তব-সত্যকে প্রতিষ্ঠা করে। কীভাবে? যখন মঞ্চে দাঁড়িয়ে যাই অর্থাৎ পুরো সময়টাতে অথবা দিন-রাতের প্রতিটি মুহূর্তে, তখন জীবন আরো নতুন ও মনোরম হয়ে উপস্থিত হয়। কেননা তখন দেখতে পাই অনেক চোখ মঞ্চের সামনে বসে আছে–নিষ্পলক তাকিয়ে। ফলে যা ইচ্ছা তাই করতে পারি না। এখানে স্বাধীনতা থাকে, তবে স্বৈরাচারী হয়ে ওঠার কোনো সুযোগ থাকে না। ফলে নিজেকে সুন্দর করে যোগ্য করে উপস্থাপন করি। নায়ক থেকে শুরু করে যে-কোনো চরিত্রেই–অভিনয়-দক্ষতা অনুযায়ী। প্রশ্ন উঠতে পারে, কেউ যদি খলনায়ক হিসেবে উপস্থাপিত হয়, সেও তো সুন্দর এবং নিপুণভাবেই উপস্থাপিত হবার চেষ্টা করে বা উপস্থাপিত হয়। সে ক্ষেত্রে বলা যায়, সমাজে অনেকেই তো কূটকৌশলের আশ্রয় নিয়ে প্রকাশ্যে-অপ্রকাশ্যে খলনায়ক হিসেবে উপস্থাপিত হচ্ছে। তবে এটি কোনো আদর্শ হতে পারে না, সুন্দর এবং কল্যাণের পক্ষে। তা ছাড়া নাট্যমঞ্চে নাট্যকারের একটা সূক্ষ্ম এবং কারুচিত হাত থেকেই যায়–চরিত্র বিন্যাসের পাশাপাশি। সেখানে বাস্তব জীবনে এসে যখন অভিনয়ে অগ্রসর হই, তখন তো আমার ডিরেক্টর আমি। এখানে অন্য কোনো হাত বা নিয়ন্ত্রণরেখা থাকে না। তখন আমি নিজেই নিজের রাজা ও প্রজা; নিজেই নিজের ডিরেক্টর ও চিত্র-নাট্যকার। ব্যবহার নিয়ে এ ক্ষেত্রেও বিচার-বিশ্লেষণের দাবি রাখে। অতএব, বিশেষ কোনো সৃষ্টি মন্ত্রণালয়ে কোনো ভিন্নতা তো দেখি না। আর গ্রিনরুম হলো জন্মের পূর্বাবস্থা এবং মৃত্যুর পরের অবস্থা অর্থাৎ আমরা জীবন-নাট্যমঞ্চে জন্মের মধ্য দিয়ে অভিনয়াভিষ্ট হই এবং মৃত্যুর মধ্য দিয়ে নাটকের বা চরিত্রের সমাপ্তি অর্থাৎ গ্রিনরুমে ফিরে যাই। এ ছাড়া সমাজ, আঞ্চলিকতা, ধর্ম, সংস্কৃতির প্রভাব তো থাকবেই–আমরা সে-পর্যায়কে যেভাবে গ্রহণ করি।
আমরা যখন নাটক, থিয়েটার, সিনেমা দেখি–সবাই একসঙ্গে বসে দেখার মানসিকতায় গিয়ে বসি–কেউ বিনোদনের জন্য, কেউ জ্ঞানের জন্য, কেউ মেকিং পারিপাট্য উপলব্ধি করার জন্য। কিন্তু তার পরও অবশ্যম্ভাবী যে ঘটনাটি ঘটে–বিস্ময়কর রকমভাবে, তা হলো–একই নাটক, থিয়েটার, সিনেমা দেখে–কেউ নায়ক, পার্শ্বচরিত্র অর্থাৎ বলতে চাইছি–কেউ ভালো চরিত্রগুলো গ্রহণ করে, আবার কেউ মন্দ চরিত্রগুলো–ছোট-বড়, স্থান-কাল-পাত্র মিলিয়েই। সে ক্ষেত্রে কী হচ্ছে? প্রত্যেকে নিজস্ব অধিকার এবং পছন্দের ভিত্তিতে চরিত্রগুলো গ্রহণ করছে অথবা করছে না। এখানে ব্যক্তির আপন-বৈশিষ্ট্যের পরিস্ফুটন ঘটে। এখানে বলার বিশেষ কিছু নেই। কেননা তাহলে হয়তো ব্যক্তির বাক-স্বাধীনতাকেই খর্ব বা হরণ করা হবে। তবে ব্যাপার-বিষয় এই নয় যে, মন্দকে ঘৃণা করবো না এবং ভালোকে সাধুবাদ জানাবো না।
যা-হোক, মঞ্চে দাঁড়িয়ে আমরা যেমন স্বাধীন থাকা সত্ত্বেও স্বেচ্ছাচারী হয়ে উঠতে পারি না বা উঠি না এবং দর্শক সামনে থাকায় নিজেকে নিপুণভাবে উপস্থাপন করি স্ব-স্ব চরিত্রে; সে ভাবনাবিস্তার ও ঘটনা-পরম্পরায় প্রতিটি মুহূর্তে যদি দর্শকের সামনে আমি আমার চরিত্র-বিন্যাস করি, তাহলে জীবনের অনেক অপছন্দ ও অপ্রিয়কে ঝেড়ে ফেলতে পারি। আর এই দর্শক যদি হয়ে পড়েন দেশ-কাল-পৃথিবীর সমস্ত জীব ও প্রাণিকুল–তাহলে কী হয়? ছোট কিছু নিত্যতার উদাহরণ দিচ্ছি–
১. অনেক সময় বাসায় লুঙ্গি হাঁটুর ওপরে তুলে বসে থাকি, অথচ অন্য কারো সামনে কখনোই করি না অথবা লজ্জা পাই বা বোধ করি–বিশেষ বন্ধুজন ছাড়া। তাহলে কী ঘটবে?
২. বাথরুমে অনেক সময় কাপড়-চোপড় খুলে গোসলপর্ব সারতে হয়, অথচ যা অন্যের সামনে কখনোই সম্ভব নয়। তাহলে কী ঘটবে?
৩. অনেক সময় কারণে-অকারণে নানাজনকে দোষে-বিনা দোষে বকাবকি করি, অথচ সবার সামনে তা করতে কুণ্ঠাবোধ করি। তাহলে কী ঘটবে?
৪. সিগারেট খাই বা খাই না। অথচ কারো-কারো সামনে এ-কাজটি করায় আপত্তি রয়েছে। যে-কোনো কারণে তা হতে পারে। তাহলে কী ঘটবে?
৫. মদ খাই অথবা বেশ্যা বাড়ি যাই অথবা কোনোদিন কোনো কিশোরী অথবা যুবতীকে জোর করে নির্যাতন করেছি; কিংবা রাস্তায়, মার্কেটের সকল সুন্দরী সোমত্ত নারীই–আমার স্বপ্নে বা রাত্রিকালীন বিছানায় সঙ্গমযুদ্ধে মেতে ওঠে বা নেচে ওঠে বা কেঁপে ওঠে; অথচ কখনই আমি চাই না–এগুলো প্রকাশ পাক বা কেউ জেনে যাক। তাহলে কী ঘটবে?
এরূপ অনেক ছোট ছোট–যা দিনে দিনে বড় আকার ধারণ করে, সেসব অপ্রত্যাশিত ঘটনা বা কর্ম হতে আমরা বিরত থাকতে পারি; যখন আমার সামনে দেশ-কাল-পৃথিবীর মানুষ দর্শক বা শ্রোতা হিসেবে সমুপস্থিত থাকে। এখানে ব্যক্তি লেখক বা কর্তা আলোচ্য নয়, পৃথিবীর সব মানুষ এবং মানুষ হিসেবে দাবিদার প্রত্যেকের জন্য শিক্ষণীয় ও অনিবার্যরূপ প্রাধান্য পায়। এই শিক্ষাই বিবেক নামক আত্মশক্তি আমাদের দেয়, কিন্তু আমরা মানুষমাত্র তাকে বোবা ও অন্ধ করে রাখতেই চাই। এটা দুটো কারণে ঘটে, জ্ঞান ও বিজ্ঞানের অজ্ঞানতা ও চর্চার অভাবে। অন্যটি ভুল বোঝাবুঝির ধর্ম ও সংবিধানের ব্যাখ্যায় অথবা শয়তান আরাধনায়। মুক্তির পথ সজ্ঞানতায় ও আত্মোপলব্ধিতে বিচ্ছুরিত। ভালো রাঁধুনি তা সংগ্রহ করেন, উপস্থাপন করেন এবং নিজেও খান বা পান করেন। এখানেও জগৎজ্ঞান এবং সৃষ্টিতত্ত্ব জানা অত্যাবশ্যক। কেননা দেহ-মনের ভেতরেই আত্মার অবস্থান। তাকে চিনতে হয়, আরাধনায় জয় করতে হয় এবং জীবনে প্রয়োগ করার মধ্যে সার্থকতা প্রকাশ পায়। সফলতা ও বিজয় এ-পথেই। এ জন্য ‘ভবে মানুষ গুরু নিষ্ঠা যার, সর্বসাধন সিদ্ধ হয় তার’–এই সর্বসাধন সত্যানুসন্ধান ও আত্মক্রিয়া আবিষ্কার। আবিষ্কারপ্রবণতাই একজন মানুষকে মুক্তির পথে এগিয়ে দেয়, মুক্তি অর্থই নির্বাণ, নির্মিতি ও শূন্যতাপ্রাপ্তি; যেখানে সবকিছুর শুরু এবং শেষ। এ-জ্ঞান স্রষ্টা প্রদত্ত, সৃষ্টি সমর্থ–যা মানুষে মানুষে কল্যাণের পথ নিশ্চিত করে। এ পথেই চিরন্তন মুক্তি ও মোক্ষ লাভ–যা ধ্যানমগ্নতায় ও কর্মে উৎস-পথ তৈরি করে। পথ–পথিকের, সৃষ্টি আনন্দের। এখানে জন্ম-মৃত্যু একাকার হয়ে যায় মানবকরণে। এই মানব হওয়াই নিজেকে চেনা, জানা, বোঝা। যে তাকে চিনেছে, সেই পূর্ণ মানুষ; অর্ধ মানুষ বা বিকলাঙ্গ নয়। স্রষ্টা পূর্ণ মানুষ–সম্পন্ন বিকাশে। মানুষ স্রষ্টা কিনা, সম্পন্ন কিনা–তা তার সৃষ্টি আনন্দের কর্মধারায় প্রকৃতিস্থ, অলৌকিক নয়।
এখানে নৈতিকতা-অনৈতিকতার প্রশ্ন থাকে না, সেখানে যা আমি পছন্দ করি না অথবা অপ্রিয়, তার কিছু পর্বের সঙ্গে কোনো-না-কোনোভাবে যোগাযোগ থাকছেই; অথচ একবার যদি ভেবে নিই, আমার সামনে মঞ্চের মতোই হাজার হাজার মানুষ বসে আছেন, অর্থাৎ তারা আমাকে দেখছে বা দেখে ফেলবে, তাহলে কী করবো, কোন পথে যাবো? সত্যানুসন্ধানে সুন্দর ও কল্যাণের পথে। প্রশ্নের পাশে কথা–কী মানি আর কী মানি না–সেটা অন্য ব্যাপার, কিন্তু যা মানি তা-ও কি সঠিকভাবে পালন করছি? নাকি তাও হয় না? তবে একবার যদি ভেবে নিই মঞ্চে দাঁড়িয়ে আছি–বুকিং-সিটিং, যেখানে হাজার হাজার দর্শক থাকছে, দেখছে; তাহলে অনেক অপ্রিয় এবং অপছন্দনীয় কাজ থেকেই আমরা বিরত থাকতে পারি।


সেতু সম্পর্কিত আরেকটি ভাবনা হলো–আমার কাছে মানবজীবনকে একটি সেতু বা ব্রিজের মতোই মনে হয় বা হয়েছে। আমরা যেমন সেতু পারাপার হই, তেমনি জীবন-সেতু পারাপারে অর্থাৎ জন্ম থেকে যে সেতুর উদ্ভব এবং মৃত্যু দিয়ে যার পরিসমাপ্তি, সেই সেতু আরোহণে আমরা কেউ কেউ সফলতর হই, কেউ-বা অসফল-ব্যর্থ হই, কেউ আনন্দে, কেউ বেদনায়–সুখে-দুঃখে, কষ্টে-স্ফূর্তিতে–আমরা কেউ কেউ পার হয়ে যাই আবার কেউ কেউ পারাপারে ব্যর্থ হই। যে শিশুটি জন্মেই মারা যায় অর্থাৎ সেতু আরোহণের সুযোগ যাদের থাকে না এবং অনেক সাহসী মানুষই আত্মহত্যা* করেন–কারণে-অকারণে–ব্যর্থতা-সাফল্যে; তারা পুরোপুরি সেতু পারাপারে সম্পন্ন বা পরিপূর্ণ না-হলেও এই সেতুরই একজন এবং সমস্যা-সমাধানে মুখোমুখি হন। সে ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, আমরা এই সেতু দিয়েই অগ্রগামী হচ্ছি। বাস্তবে সাঁকো, ব্রিজ, সেতু, কালভার্ট বা পুল পারাপারে যেমন অনেকের সঙ্গেই দেখা হয়, কথা হয়–কারো আবার হয় না, আবার আলাপ করলে অনেক সময় হৃদ্যতাও সৃষ্টি হয়। সে রকমই জীবন-সেতু পারাপারে অর্থাৎ আমাদের এই প্রতিদিনকার কার্যাদি এবং সময়ের সঙ্গে যে মানুষগুলোর সঙ্গে দেখা হচ্ছে, কথা হচ্ছে, ভাব হচ্ছে–এই মানুষগুলো আমরা প্রত্যেকেই তার নিজস্ব সেতু পারাপারে ব্যস্ত আছি। এর মধ্যে কারো সঙ্গে ঝগড়া হচ্ছে, কারো সঙ্গে বন্ধুত্ব, আবার কারো সঙ্গে প্রেম-ভাব, কারো সঙ্গে বিপরীত সখ্য। আর এইসব দিনরাত্রি নিয়ে আমরা আমাদের প্রত্যেকের জীবন-সেতু পারাপার হচ্ছি।
জীবনে একে-অন্যের সঙ্গে যে সম্পর্ক, ভাব বা হৃদ্যতা–এও একপ্রকার সেতুর মতোই। সেতু ভেঙে গেলে যেমন পারাপারে বিঘ্ন বা জটিলতা সৃষ্টি হয়। তেমনি জীবনে যারা সেতু গড়েছেন, কোনো কারণে তা ভেঙে গেলে বিপর্যয় নেমে আসে বা ধ্বংস, কখনো কালো অন্ধকারে ঢেকে দেয়। সেতু ভেঙে গেলেও দুর্গম পথে সাহসী মানুষগুলো পার হয়ে যান, তবে অনেক কষ্ট এবং শ্রম দিয়ে, যেমন–পানি থাকলে পানি-সাঁতার, শুষ্ক হলে বন্ধুর পথ, আবার কাঁটা-বেড়া হলে উপযোগী পথ তৈরি করে পারাপার; তেমনি জীবন-সেতু ভেঙে গেলে মূর্খতার পরিচয় দিয়ে দু-একজন আত্মহত্যার (এমন কম-জনই আছেন, যারা সাহসের সঙ্গে আত্মহত্যাকে বরণ করেন বা মেনে নিতে পারেন) পথ বেছে নিলেও, অনেকেই অসীম সাহস এবং ধৈর্যের পরিচয় দেন। কেউ-বা আবার মুষড়ে পড়েন বা পথ খুঁজে পান না–সে ক্ষেত্রে অনেকে যে সাহস হারিয়ে ফেলেন অথবা ভাঙা থেকে সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েন–তাও নয়; অনেকেই উল্লিখিত উপায়ে পারাপারে এগিয়ে যান। সাহসীরাই এটা সম্ভব করেছেন এবং পেরিয়ে গেছেন। তার পরও ভেঙে পড়ার শব্দ শুনতে পাই–দশদিকে। ভেঙে পড়ছে মন, যৌবন আর ভেঙে পড়ছে তথাকথিত বিশ্বাস।

একে একে দু’য়ে নয়–দু’য়ে দু’য়ে চার
একে একে (১+১) দু’য়ে (২) নয়, দু’য়ে দু’য়ে (২+২) চার (৪) হলো না কেন? অথবা–একে একে দু’য়ে নয়, দু’য়ে দু’য়ে চারই-বা কেন? একসময় আমাকেও ভীষণরকম ভাবাত : লোকে যখন বলে, ‘একে একে দুই–দু’য়েই মিলন’। অনেকপর ষড়রিপুর তাপে শরীর ও মনের কাছে এসে এই ভাবান্তর যুক্তিযুক্ত ও টেকসই হয়ে গেল একে একে দু’য়ে নয়, দু’য়ে দু’য়ে চার, চারেই মিলন।
আমি যখন একজন মানুষকে দেখি, তখন একজনকে দেখি না–একসঙ্গে দু’জন মানুষকে দেখে ফেলি এবং উপলব্ধি করি। তার ফলে নিজের মধ্যে আর-একজনের খেলা খেলি–দেখি–ভাবি আর মিলিয়ে নিই। আমার দেখা আমি, যে আমি বাইরের আমি–বহির্জগতের; তারই পাশে আরেকজনকে উপলব্ধি করি, দেখি এবং তার সঙ্গেই বসবাস করি। ‘একে একে দুই–দু’য়েই মিলন’ যদি হয়–সেখানে দাঁড়িয়ে আমি এই সত্তাকে মেলাতে চেষ্টা করি–প্রাণান্ত। প্রচলিত মিলনের জন্যে–প্রচলিত কায়দায় আমি আর অন্যের শরণাপন্ন হই না। কেননা নিজের মধ্যেই যে বিরহ-মিলন এবং আনন্দের খেলা খেলি–দেখি এবং তাড়িত হই–সেখানেই আমার স্বাতন্ত্র্য এবং স্বাজাত্য খুঁজে পাই।
তাহলে দু’য়ে দু’য়ে চার কেন? যখনই প্রাণিকুলের মিলন অথবা মানুষে মানুষে মিলন অথবা একে অন্যে মিলন অথবা আমি যখন ভালোবেসে, ক্রোধে, প্রেমে, করুণায় কাউকে কাছে পেতে যাই অথবা চাই অথবা আশা করি–তখনই দু’য়ে দু’য়ে চারে মিলন খোঁজার চেষ্টা করি বা খুঁজি। এই খোঁজার মধ্য দিয়েই আমি আমার প্রেমকে জাগিয়ে তুলি–ভালোবাসা অথবা কামনা। একটি কথা বারবার আমার মনে হয়েছে–আমি যে নারী, যে পুরুষ অথবা যে মানুষটিকে ভালোবাসি–তার দুই এবং আমার দু’য়ের যখন সম্পর্ক হয়, তখনই পাশাপাশি এসে দাঁড়িয়ে যাই এবং সম্পর্ক টেকসই হবার বা টিকে থাকবার পর্যায়ে একটা সচেতন সংযোগ রা করতে অথবা হতে দেখি। কীভাবে সম্ভব হচ্ছে? ধরুন আমার সঙ্গে যে মানুষটির সম্পর্ক হচ্ছে, তার এবং আমার মিলনের (তথাকথিতার্থে নয়) ক্ষেত্রে একটি অবৈজ্ঞানিক সংযোগ-তারের স্ফুরণ দেখছি। এ অনেকটা বিদ্যুতের তারের মতোই, একটি বাল্ব যেমন বিদ্যুৎ সংযোগ পেলে তার এবং প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশের সম্বন্ধ গ্রন্থনে জ্বলে উঠছে–আলো দিচ্ছে–বিকশিত হচ্ছে; তেমনি আমার এবং অপরজনের সম্পর্কে এই অদৃশ্য বিদ্যুৎশক্তি, তার এবং প্রয়োজনীয় প্রেসার ও অন্য সব স্নায়ুতন্ত্রানুতাপের সমন্বয়ে আলোকিত হয়ে উঠছে। যখনই হচ্ছে না, তখনই সম্পর্ক বিচ্যুতি ঘটছে এবং ফিউজ বাল্বের মতোই উল্লিখিত মানুষটি আমি অথবা তিনি একে অপরের কাছে অথবা একজনের কাছে অপরজন অকেজো, অপ্রয়োজনীয় অথবা গুরুত্ব হারিয়ে ফেলছে বা ফেলছি–যাকে সোজা বাংলায় সম্পর্কহীনতা বা অনাত্মীয়তা বলতে পারি। কী সেই সংযোগ?

আমরা দেখতে পাবো, আমি যে দুই–এক. বাইরের আমি–যাকে লোকে চেনে এবং জানে (এবং এই জানাকেই অনেকে সম্পূর্ণ জানা ভেবে নিয়ে অনেক সময় ভুল করে–এরূপ আমি অথবা অন্যে) এবং দুই. ভেতরের আমি–যে আমি অন্তর্জগতের–কাজ করে–খেলা করে–কবিতা লেখে অথবা মনোজগতের সবকিছু। অন্যের মধ্যেও তা বর্তমান। এই আমার আমি দুই–এরই সোমত্ত সংযোগে মিলন সম্ভব হয়–সঙ্গম অথবা প্রেম। কিছু মুহূর্তে পরিচিতজনদের মধ্যে অথবা বন্ধু-বান্ধবের মধ্যে অথবা অতি আপনজনদের মধ্যে–প্রেমিক-প্রেমিকা অথবা স্বামী-স্ত্রী অথবা মানসিক ও দৈহিক সম্পর্কের যে যুগল অথবা আত্মীয়তা–নানা কারণে হোক না–সে রাগ-অনুরাগ, অভিমান-অভিজ্ঞান, চাওয়া-পাওয়া, চাহিদা-অন্বয়, অর্থকড়ি ইত্যাদি পরিপ্রেক্ষিতে আন্ত-সম্পর্কে মাঝে মাঝে ঘাটতি ঘটে–সে ক্ষেত্রে সম্পর্ক একেবারে ছিন্ন হয়ে যায় না বরং থাকে; একটু কম–সাময়িক অথবা স্বল্প সময়ের জন্য। তখন তাহলে কী ঘটে? তখন দেখেছি দু’য়ে দু’য়ে চারের সম্পর্কে কোনো তার বা সংযোগ কেটে যায় অর্থাৎ ভেতরের সঙ্গে বাইরের অথবা বাইরের সঙ্গে ভেতরের অথবা ভেতরে ভেতরে কিংবা বাইরে বাইরে–একেবারে পুরোপুরি সংযোগ বিচ্যুত ঘটে না বা কেটে যায় না। এ-পর্যায়ে এসে দু’য়ে দু’য়ে চারের খেলা দেখে বিমোহিত ও স্পর্শকাতর হই। এই-ই একে একে দু’য়ে নয়, দু’য়ে দু’য়ে চার।* দু’য়ে দু’য়ে চারেই–মিলন, সঙ্গম এবং প্রেম।

* এখন দেখি দু’য়ে দু’য়ে চারেও নয়, তিনে তিনে ছয়েও নয়, চারে চারে আটে পূর্ণতা বা সম্পূর্ণতা লাভ, অন্যার্থে নবুয়ত? প্রাপ্তি। এই আটের অবস্থান কোথায়? এক তো বাইরের, দুই ভেতরের, তিন থাকে এক ও দুইয়ের মাঝামাঝি অর্থাৎ অভিজ্ঞতা ও উপলব্ধির মর্মস্থলে অর্থাৎ এক ও দুই যখন সিদ্ধান্ত দিতে পারে না তখন যে তৃতীয় শক্তির আবির্ভাব ঘটে–যা দ্রুত সিদ্ধান্ত দিয়ে দেয়–তার অবস্থান তিনে। বাকি রইল চার, এই চারই হলো আধ্যাত্মিকতার চরমরূপ, অনেকটা মারফতিতন্ত্রের দিলকোরানের কাছাকাছি–যেখানে পৌঁছে সহজ মানুষের সন্ধান মেলে। চার সদাসর্বদা সত্যপ এবং উত্তম সিদ্ধান্ত দিয়ে থাকে। তিন যেমন এক ও দু’য়ের ওপর নির্ভর করে যে-কোনো সিদ্ধান্ত দিয়ে দেয়, অনেক সময় বিচার-বিবেচনা না করেই–দ্রুত করতে গিয়ে এমনটা ঘটে অধিকাংশ ক্ষেত্রে। কিন্তু চার ধীর-স্থির এবং প্রজ্ঞাবান। সে কখনো ভুল বা অসত্য সিদ্ধান্ত দিতে পারে না। এ জন্য বলা হচ্ছে, নবুয়তপ্রাপ্তি অর্থাৎ সংজ্ঞাপ্রাপ্তি বা নির্বাণপ্রাপ্তি। এখানে উত্তরণে মুক্তি মেলে, শূন্যাত্মায় সঙ্গ ধরে স্রষ্টা-মানুষ–সাধারণে-অসাধারণে পরম জ্ঞান ও ধ্যানে। এ অবস্থায় উত্তরণের সঙ্গে সঙ্গে জগতের সকল পাপ-তাপ-কামের ঊর্ধ্বে উঠে মানুষ পরিপূর্ণ মানুষ হয়ে ওঠে। এটা আধ্যাত্মিকতার চরম পর্যায়। এ-অর্জনই জীবনের পূর্ণতা বা পুণ্যপ্রাপ্তি এবং সর্বশূন্যতাবাদের দিকে নির্বাণ বা মুক্তিলাভ করে এবং এখানেই জগতের সমস্ত কল্যাণ এবং শান্তির অনাবিল প্রশস্ততায় প্রশান্তি লুকিয়ে–যা পরম পাওয়াকে নিশ্চিত করে। ব্যক্তি এ পর্যায়েই পরমত্ব লাভ করেন।

তারের খেলা
একজন মেয়ে অথবা স্কুল বা কলেজ পড়ুয়া বালিকা শেষ পর্যন্ত একজন মাস্তান বা বখাটে অথবা অপ্রিয় ছেলেকে ভালোবেসে ফেলে কীভাবে? প্রশ্নটি বিপরীতও হতে পারে একজন ছেলের ক্ষেত্রে।
দেখা-বোঝা থেকেই লিখছি, যদিও দেখা সবসময় সঠিক হয় না; কিন্তু উপলব্ধির অবস্থান তো মনস্তত্বগত। সে-কারণে ব্যতিক্রম থাকবে না–এমন নয়, আবার স্থান-কাল-পাত্রভেদে ভিন্নতাও দেখা দিতে পারে–এসবও কল্পনাচ্যুত করছি না, সেখানেও হয়তো-বা আছে, অন্য চিন্তা বা বাস্তবতা বিদ্যমান থাকে। সে-প্রেক্ষিতে এই ধারণা বা উপলব্ধি বা মনোদর্শন স্বীয় সংজ্ঞাজাত।
মেয়েটির নাম কুলসুম। কুলসুম নবম শ্রেণির ছাত্রী। ওর স্কুলে যাবার পথেই সম্ভবপর প্রতিদিন একটি ছেলে দাঁড়িয়ে থাকতো। নাম জব্বার। কুলসুম বাড়ি থেকে বের হয়ে সোজা স্কুলে যেত এবং ফিরে আসতো। জব্বারও স্কুল আব্দি পেছন পেছন (একটা দূরত্ব বজায় রেখে) যেত এবং ছুটির পর পুনশ্চ পশ্চাৎপদে ফিরতো; কিন্তু জব্বার কখনোই কিছু বলতো না। এতোটাই সে ভদ্রতার পরিচয় দিতো কুলসুমের বেলায়। একদিন কুলসুম তা ল করলো, কিন্তু কিছু বললো না। বললো না দুটো কারণে : ১. জব্বার তার পছন্দের মানুষদের মধ্যে কেউ নয়; ২. সে তো আর কিছু বলে না বা উত্ত্যক্ত করে না, সুতরাং ভয় তো নয়ই–কোনো সমস্যাও নেই অর্থাৎ জব্বার কুলসুমের জন্য রিস্কি নয়। যার ফলে জব্বার কুলসুমের কাছে কোনো বিরক্তির কারণও হলো না। এর ফলে কুলসুম এক বা একের অধিক সুবিধাও পেল। জব্বারের কারণে অন্য ছেলেরা তাকে কিছু বলতে সাহস করে না এবং তার যাতায়াত ক্রমে নিরাপদ হয়ে উঠলো। জব্বারের প্রতি একদিন তার এই সফটকর্নারই একটি ভালোত্বের লণ হয়ে আসে–যা সমাজের চোখে গ্রহণীয় ছিল না। কুলসুম বাসায় গিয়ে জব্বারের এই পশ্চাদানুসরণ অর্থাৎ তার উদ্দেশ্য ও ভূগোল নিয়ে ভাবতে থাকে এবং জব্বারের আসা-যাওয়ার কারণগুলো অনুসন্ধান করতে থাকে। শেষ পর্যন্ত একদিন জব্বারই সাহসী হয়ে ওঠে, কুলসুমও তাতে সায় দেয়। এটা কীভাবে ঘটলো?

কুলসুম বাইরে থেকে জব্বারের যা দেখতে পেল বা উপলব্ধি করলো, তা হলো এক। আর জব্বার কুলসুমকে বাইরে থেকে যা দেখলো বা বুঝলো তা এক। এখানে তাহলে দু’য়ের খেলাটা কোথায়? জব্বার কুলসুমের জন্য পাগল-প্রায়–সে যখন কথা বলতো, হাসতো, আড্ডা দিতো, ভাবতো–এমনকি খাবারের সময়েও কুলসুমের কথাই শুধু মনে আসতো এবং স্বপ্ন দেখতে দেখতে দিবাস্বপ্ন-রাত্রিস্বপ্ন এক করে ফেলতো। এর ফলে তার ভেতরে একটি সেন্টার অর্থাৎ দুই নম্বর ‘তার’ সবসময় খোলা থাকতোই। কুলসুম যতদিন তার ভেতরের সেন্টার বা তার খুলছিল না–ততদিন কিছুই হচ্ছিল না। হলো সফটকর্নার থেকে। কুলসুম যখন তাকে নিয়ে একটু একটু করে ভাবতে শুরু করলো–তা যখনই হোক–তা যদি হয় দিনে এক সেকেন্ড, এক মিনিট অথবা দুই দিনে বা এক সপ্তাহে এক সেকেন্ড, এক মিনিট বা তদূর্ধ্ব কোনো সময়ও হয়। ঠিক সেই মুহূর্তেই ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র হয়ে তারে তারে সংযোগ ঘটার উপক্রম হয়ে যেত এবং বাড়ি (ধাক্কা) খেত। কারণ জব্বারের পক্ষ থেকে সেন্টার বা তার তো সবসময়ের জন্যই খোলা থাকতো। সে কারণে কুলসুম–যদি দিনের অন্য সময় না হোক–ঘুমাবার আগেও বা রাত গভীরে এক চিলতেও ভাবতো–তা জব্বারের অদৃশ্য তারে পর্দাভুক্ত হয়ে ভেসে উঠতো এবং এই দূর-দেখা সংযোগে ভেসে উঠতে উঠতে একসময় তা গাঢ় রূপ ধারণ করে এবং কুলসুমের পেছনে ফিরে তাকানো বা ল করা বা দুর্বল চোখের চাহনির ফলাফল জব্বারকে আরো সাহসী করে তোলে। যার পরিণাম ঘটে একচিলতে ভাবের উন্মেষ-স্ফুরণে–যা সর্ম্পক অথবা বন্ধুত্ব অথবা পরিচিত করে তোলে উভয়কে উভয়ের কাছে। এটা ঘটে এক অদৃশ্য ‘দুই’-এর মেলবন্ধনে। তা ছাড়া জব্বারের ক্ষেত্রে আরো প্লাস পয়েন্ট ছিল এই যে, তার বাইরের তার অর্থাৎ বহির্জগতের এবং ভেতরের তার অর্থাৎ অন্তর্জগৎ–দুটোই সবসময়ের জন্য থাকতো উন্মুক্ত, ফলে দুইয়ের সংযোগ তার আন্তসংযোগ শক্তিধারণ করে বেশি এবং একটি তড়িৎ তারের মতোই দ্রুত গতিতে অগ্রগামী হতো। কারণ জব্বারের শুধু দুটো তারই নয়–তার সমস্ত মনোসংযোগ তখন ওখানেই স্থির থাকতো বা থেকে যেত। সে-কারণে এটা সহজে সম্ভবপর হয়ে ওঠে। এ-কারণে প্রায়ই দেখা যায়, রাস্তার বখাটে, মাস্তান বা অপ্রিয় ছেলেও শেষ পর্যন্ত একটি মেয়ের প্রিয় হয়ে ওঠে–যা কোনোদিনই কিংবা কোনো কারণেই উল্লিখিতদের মধ্যে সম্ভব হয়ে ওঠার কথা নয়। এটা ঘটতো না তখনই, যখন কুলসুম তার সফটকর্নারকে জাগাতো না বা ভাবাতো না অর্থাৎ নিজ তার খুলে বসতো না।
এই সম্পর্ক সন্ধানকর্মটি ঘটতে পারে কলেজ পড়ুয়া কোনো মেয়ে থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া, বেকার অথবা চাকরিজীবী মহিলার ক্ষেত্রে–সে বা তিনি বিবাহিতও হতে পারে বা পারেন অথবা যে-কোনো বয়সের–শেষ পর্যন্ত যা গ্রহণযোগ্য সম্পর্কের দিকে নিয়ে যেতে পারে বা যায়।
এ-পর্যায়ে তারের অন্য-একটি খেলা আলোচনা উল্লেখ করছি : বিশেষ আইন, আদর্শ, ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান ও রাষ্ট্র কিংবা সংবিধানের প্রতি বিশ্বাস থাকুক বা না থাকুক; চিন্তা করার স্বাধীনতা, গবেষণা করার যৌক্তিকতা, লেখক সত্তার বহিঃপ্রকাশ–যা অবশ্য রক্ষিত–বাক-স্বাধীনতা এবং উপলব্ধিগত মানসদর্শন উদ্ভূত, যেমন শরিয়তপন্থিদের ভাষায় মহম্মদের প্রতি দরুদ শরিফ পড়া বা অন্য যে-কোনো কারণে বলা হয়–আল্লাহর পরেই মহম্মদ অর্থাৎ বোঝানো হয় আল্লাহকে পেতে হলে অর্থাৎ আল্লাহর নৈকট্য লাভের জন্য অবশ্যই মহম্মদের প্রতি দরুদ বা উপাসনা করতে হবে বা হৃদয়ে ধারণ করতে হবে। তা ছাড়া আল্লাহ তো সর্বতো বিরাজমান এবং ডাকার মতো ডাকতে পারলে তিনি সবার কথা শোনেন, বোঝেন এবং রাখেন। তার কাছে ভাষা প্রধান নয়, ডাকা প্রধান। এসব ব্যাখ্যা বা বর্ণনা থেকে একটি খেলা লক্ষ করি। তা হলো, ঐ তারের খেলা। এখানে আল্লাহর সঙ্গে প্রতিটি রুহ বা কলব্ বা আত্মা–প্রতিটি মানুষ এবং জীব ও প্রাণিকুলের মধ্যে একটা তারের সংযোগ রক্ষা হতে দেখি। তিনি যেহেতু সর্বতো বিরাজমান এবং সর্বশক্তিমান, সে কারণে তিনি সকল তারের সঙ্গেই যোগাযোগ রা করতে পারেন বা করেন। [আল্লাহর জায়গায় স্রষ্টা, স্রষ্টার জায়গায় ঈশ্বর, গড, ভগবান বা ঐ জাতীয় অন্য সব দেবতা বা নাম কল্পনা যুক্ত হতে পারে।]

এভাবে প্রত্যেক মানুষের মাথার সঙ্গে একটি তারের সংযোগ লক্ষ করি। তার সৃষ্টিকর্তার সঙ্গে এবং মানুষে মানুষেও এই তারের সংযোগ দেখি। এই তারের সংযোগের ফলেই সম্পর্কের উৎপত্তি ও বিকাশ। তবে মানুষকে তারের সংযোগ বাড়াতে হয়। এ্যামনি এ্যামনি হয় না–এটি ইচ্ছা, স্বপ্ন ও কল্পনাশক্তির ওপর নির্ভর করে এবং শেষ পর্যন্ত তা সাধনার পর্যায়ে উপনীত হয়। এর মধ্যে যদি মহম্মদকে এনে ফেলা হয়, তবে আমরা অনেক তারের মধ্যস্থলে একটি যৌথরূপ কল্পনা করি–যেখানে মহম্মদের অবস্থান।
যদিও রূপকথারূপ ধর্মে বা বিশ্বাসে আমার আস্থা অন্ধ নয়। আবার স্বর্গ-নরকে যাবার ইচ্ছা তো নেই-ই, বিশ্বাস তো আরো নেই। সে-কারণে আমার পৃথিবী আমার বয়সী, প্রতিদিনের শেষে তার রোজকিয়ামত ঘটে এবং আমার জীবনাবসানের মধ্য দিয়ে যার ফাইনাল কিয়ামত ঘটে যাবে এবং আমার পৃথিবী ধ্বংসপ্রাপ্ত হবে। মানুষের পরম্পরা বা ঐতিহাসিক বেড়ে ওঠা প্রকৃতির অংশ। এই পরিপ্রেক্ষিতে আমি নিজেও নিজেকে প্রকৃতির সন্তান মনে করি। এখানে প্রকৃতির সঙ্গে আমার, আমার সঙ্গে প্রকৃতির এবং প্রকৃতি-আমি ও আমি-প্রকৃতি মিলেমিশে যে তারের যৌথরূপ বা খেলা; সেখানেও চারের খেলা দোদুল্যমান ও বর্তমান। সংশয়, বর্তমান, আমি ও প্রকৃতি–এখানেই একজন আহমেদ ফিরোজ ও তার বেড়ে ওঠা এবং সৃষ্টিজগৎ।

নতুন ভাবনা
তাহলে কি কিছু টিকবে না, টিকছে না? এর কারণ অনুসন্ধানে দেখা গেছে, আমাদের যে জীবনাচরণ–সেখানে আমরা সম্পর্ককে বিকশিত হতে না-দিয়ে সময়ে-অসময়ে নানাভাবে বিঘ্ন সৃষ্টি করছি এবং যখনই সম্পর্কের ঘাটতি ঘটছে, তখনই তার ওপর করমর্দন করে যাচ্ছি বা প্রলেপ লাগানোর কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ছি। অর্থাৎ মিনিমাইজ করার ক্ষেত্রে সবাই সিদ্ধহস্তের স্বার রাখছি এবং স্বাভাবিক গতিকে থামিয়ে দিয়ে মিথ্যার ফানুসে ভরিয়ে তুলছি যাবতীয় কার্যকলাপ ও কর্মপরিধি। এর ফলে থমকে পড়া সম্পর্কের চিড় বা ফাটলে প্রতিনিয়ত লেপামোছা করে লাটিমের মতো ক্রমান্বয়ে মোটা করে তুলছি, আর যখনই প্রতিকূল পরিস্থিতি দেখা দিচ্ছে, তখনই পুনশ্চ লেপার কাজটি সুসম্পন্ন করে সম্পর্ক টিকিয়ে রাখছি। যার ফলে মূলের চিড় বা ফাটল লেপামোছার সঙ্গে সঙ্গে ক্রমশ প্রশস্ততার প্রণোদনা নিয়ে চিড় বা ফাটলের অংশবিশেষও বেড়ে চলছে বা প্রশস্ত হচ্ছে, ফলে তা একসময় প্রকাণ্ডরূপে ভেঙে পড়ছে–যা অনিবার্য ছিল এবং কোনোভাবেই ঠেকানো সম্ভব নয়। অথচ শুরুতে লেপা বা পুটিং প্রয়োগ অথবা ত রেখে তা মেরামতের কাজ না-করে যদি এর মৌলানুসন্ধানে ব্রত হওয়া যেত অর্থাৎ গোঁজ না-দিয়ে স্বাভাবিক গতিতে ছেড়ে দেয়া যেত এবং সুষম বিকাশের পথকে ত্বরান্বিত করা সম্ভব হতো, তার ফলে যে সম্পর্ক ডেভেলপ করতো অর্থাৎ বিকশিত হতোÑআপাতভাবে তা একটি স্থায়ী সম্পর্কের দিকে এগিয়ে যেত–এটা নিঃসন্দেহে বলা যায়।
অন্যার্থে বোঝাপড়ার সম্পর্ক গড়ে উঠতো, তোষামোদি বা তেলানো সম্পর্কের বাইরে–যা একটি স্বপ্ন ও সম্পর্ককে ধারণ করতো। এ-অঞ্চলের মানুষ, বিশেষ করে বাঙালি মুসলমানেরা কোনো কাজেই লেগে থাকতে পারে না; অথচ লেগে থাকা একটা মস্ত বড় গুণ। লেপার কাজটি সবসময় নিজেকে করতে হয় এমন নয়, অন্যেরা–প্রতিপার্শ্বের বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয়-স্বজন থেকে শুরু করে অনাকাক্সিতভাবে অনেকেই তা করে দিয়ে থাকেন বা করেন। সে ক্ষেত্রে অনেক সময় নিজের কর্তৃত্ব বা হাত থাকে না এবং এর ফলে ভিন্ন ভিন্ন সময়ে নিজের অজান্তেই লেপার কাজটি হয়ে যায়। যার ভোগান্তি শেষ পর্যন্ত ভোগকারীর পাল্লায় এসে পড়ে। ব্যক্তিই এখানে প্রধান, বহু মানুষ বা সমাজ ধরতে গেলে সেটাও আরেকটি ইউনিট বা সত্তা হিসেবে গণ্য করতে হবে। দেখা যায়, মানুষ তার নিজের অজান্তেই এ-কাজটি করছে এবং চোখ-কান-মস্তিষ্ক খোলা রাখলেই, এই অবধারিত পতন থেকে কিছুটা হলেও উঠে আসা সম্ভবপর ছিল। যেমন–করছেন অনেকেই তাদের যাপিত আয়ুষ্কালের অনুকূলে। কিন্তু সম্পর্ককে অবাঞ্ছিতভাবে বারে বারে লেপার ফলে একসময় তা ভেঙে পড়ছেই, অথচ টিকে থাকতো তখনই যখন বিন্দুর পাশে আরেকটি বিন্দুকে সমুপস্থিত করা যেত অর্থাৎ বসতো। যার ফলে বিন্দু বা সম্পর্কের মৌলসূচক একটির ওপর আরেকটি না-বসে পাশাপাশি অবস্থান করে আয়তনগত দিক থেকে বেড়ে যাবে এবং নিজস্ব ক্রিয়া গঠন করবে স্বাতন্ত্র্য অবস্থান থেকেই।

–যা ১-এর সঙ্গে ১ যুক্ত বা যোগ হয়ে ২ না-হয়ে–১-এর পাশে ১ বসে সিনার্জেস্টিক পদ্ধতিতে ১১-এর মাত্রা বা মান ধারণ করে। যেমনটি স্নায়ুকোষের গঠনপ্রক্রিয়াকে সমর্থন করে এবং স্নায়ুকোষের (যদিও স্নায়ুকোষ একটা মরে গেলে অন্যগুলো সাপোর্ট দেয়) মতো একে-অপরকে আঁকড়ে ধরে টিকে থাকবে বা থাকছে। এরও হয়তো শেষ আছে এবং থাকবেই, সেটা মৃত্যুর মতোই অনিবার্য এবং যা আমরা প্রতিরোধ করতে পারি না। এর মাঝেই বেঁচে থাকা। যতটুকু ভালো ও সুন্দরভাবে এবং টিকে থাকা মৃত্যুর আগ পর্যন্ত। এই বেঁচে থাকার নামই জীবন এবং স্বপ্ন দেখা আগামীর…
অনন্ত বাসনার অনির্দিষ্ট মায়াজালে আশায় বুক বাঁধা।

তারিখ : ১৭ জানুয়ারি ২০১২