ক্যাটেগরিঃ মুক্তমঞ্চ

ঐক্য, মিলন, সম্পর্ক, সম্বন্ধ, সংস্রব, সংসর্গ, অবলম্বন, মাধ্যম, জীবাত্মা ও পরমাত্মার মিলন, তপস্যা, ধ্যান, সাধনা, সাধনার পথ, কর্মকৌশল, প্রয়োগ, নিবেশ, শুভকাল, সুবিধা, ঔষধ, সময়, সংকলন, সমষ্টি, পর্ব, উৎসব যোগের চিহ্ন–যোগ; বেদনা, বিরহ, বিচ্ছেদ, অভাব, মৃত্যু, মরণ, ব্যবকলন–বিয়োগ; সম্যক যোগ, মিলন, যোগাযোগ, সম্পর্ক–সংযোগ। যোগ বিয়োগ সংযোগ সম্পর্ক–এ-চারেই অনিত্য পরম ও আত্মযোগ মুক্তি, যেখানে পরম লক্ষ্য উত্তীর্ণ। এর সঙ্গে শূন্যপদ যুক্ত হলেই ঘটে আত্মার মিলন ও দুঃখনাশ। মানুষ পরম সুখ প্রত্যাশা করে, দুঃখকে ভয় পায়। কষ্টকে বিতাড়ন করতে চায়, আনন্দকে যোগ করে। শূন্য যোগ, রিপু বিয়োগ, আত্মা সংযোগ, দেহ-মনের সম্পর্ক, তবেই ঘটবে জগৎমুক্তি। মুক্তি অর্থান্তে নির্বাণ, জগৎ অর্থান্তে ইহলৌকিক জীবৎকাল। শূন্যমন মুক্তির দিশা খুঁজে পায়, জগৎ পাপ-পঙ্কিলতা মুক্ত হয়।


দেখার-শোনার-জানার ও বোঝার যে জগৎ, সে জগতের ভেতর-বাইর, বিশেষ করে বস্তু, জীব ও প্রাণের চারপাশ-দশদিকে যে জায়গা–সেই বিশালত্বজুড়েই শূন্যের অবস্থান। অবস্থানের বাইর আপাতদৃষ্টিতে ফাঁকা, অথচ কত কিছুতেই না ভরপুর–যা ভিন্ন ভিন্ন অবস্থান চিহ্নিত করে; আর সেখান থেকেই শূন্যের স্থিতি ও বিকাশ যাত্রা শুরু–যা আরেক অবস্থানকে চিহ্নিত করে। এভাবে অবস্থান পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে অথবা চক্র ভেঙে চক্রে অথবা সীমা ভেঙে অসীমে যাত্রাই শূন্যযাত্রা বা শূন্যদর্শনের সমগ্রাংশ। এই যাত্রা বা দর্শন বস্তু থেকে প্রাণে, ব্যক্তি থেকে সামষ্টিক ব্যাপ্তিতে বর্তমান, এর মধ্য দিয়ে সর্বদর্শনের পথে এগিয়ে যাওয়া–যা সর্বশূন্যতাবাদের ধারণাকে অবমুক্ত করে এবং সর্বমুক্তির পথ খোলাসা করার মধ্য দিয়ে নতুন একটি অবস্থান বা আসনকে চিহ্নিত করে, যেখানে প্রাণ ও বস্তুর অবস্থান একত্রে এসে দাঁড়িয়ে যায়। যখন জীব ও জড়র আর কোনো পার্থক্যই থাকে না, তখন কামনা ও বাসনার সঙ্গে স্বার্থপরতাও নিরর্থকে পরিণত হয়, আর এইখানে প্রবেশের মধ্য দিয়ে প্রাণশক্তির মুক্তি ও নির্বাণ ঘটে। যে-কারণে নির্বাণ শূন্যযাত্রার অন্যতম কথা বা অবস্থান। আবার এই অবস্থান থেকেই আরো উন্নততর অর্থে প্রতিনিয়ত অতিক্রমের যাত্রাই শূন্যদর্শন বা মানসদর্শন। এখানে ধর্ম, সামাজিকতা ও রাষ্ট্রীয় কাঠামো অবমুক্ত হয়ে যায়, যেখানে ‘মানুষ’ মুখ্য হয়ে ওঠে। এই মানুষে ‘সর্ব সাধন সিদ্ধ হয় তার, মানুষ গুরু নিষ্ঠা যার’। এই সহজযাত্রাই Know thyself-এর মূলকথা। আর নিজেকে জানার মধ্য দিয়েই বিশ্বজ্ঞান অর্জন, অন্যকে জানার সুযোগ করে দেয়া। এই অন্য কে? লোকচক্ষুর অন্তরালে অন্যকে খুঁজে বের করা বা আবিষ্কার করা তখন জরুরি হয়ে পড়ে এবং লোকচক্ষুর পর্দাজুড়ে যে অন্য–তা চেনা-জানা ও বোঝার পরিবেশ নিশ্চিত হয়। এই চক্রাকার বা বৃত্ত ভাঙা এবং বারবার শিকড়ে বা মূলে ফিরে আসাও একধরনের জটিল প্রক্রিয়া ও সাধনার সঙ্গে ধ্যানের ক্রিয়াকে দাবি করে, এই জটিল থেকে কঠিনেরে সত্য করে চেনা এবং বের হওয়ার পথে শূন্যের স্থিতি খুঁজে পাওয়া যাবে–যা আবারও শুরুর দিকচিহ্ন খুঁজে পায় এবং নতুনভাবে শুরুর যাত্রাকে চিহ্নিত করে, সেখানে শূন্যের অবকাশ ও অবস্থান। এ-পর্যায় থেকে মুক্ত হওয়া যায় না–যা সর্বমুক্তির পথকে নিশ্চিত করে। এ-পথও পুন পুনশ্চ শূন্যযাত্রাকে নির্দিষ্ট করে অনির্দিষ্টতার পথ বৈশ্বয়িক-অবৈশ্বয়িকের মধ্য দিয়ে আধ্যাত্মিকতার চরম রূপকে চিহ্নিত করে, যেখানে মানুষ যেতে পারে না; আবার দেখা যাবে, সেখানেও পরম মানুষের জন্য প্রবেশদ্বার রয়েছে খোলা। এই জটিল-কুটিল মানুষযাত্রাই শূন্যদর্শনের অন্তপ্রাণ ও বহির্প্রাণ। এই প্রাণসত্তা আবিষ্কার ও অনুসরণ-অনুকরণ ও পালনে পুনশ্চ শূন্যযাত্রাকে নিশ্চিতের মধ্য দিয়ে সর্বমুক্তির পথ উন্মুক্ত করে–যা পুন পুনশ্চ শূন্যে প্রবেশ ও বহির্গমনের গতি বাড়িয়ে দেয়। এই বহুমুখী যাত্রাপথ শূন্যধামের পর্যায়েও, অনাবিল শান্তি ও চিরন্তনী প্রশান্তির সর্বদর্শন–যা শূন্যদর্শনে সম্পন্ন বা ক্রিয়মাণ। এর শুরু আছে, শেষ নেই।