ক্যাটেগরিঃ পাঠাগার

 

নতুন দিনের স্বপ্ন-সম্ভব সম্ভাবনার বিকাশপর্বের উৎস-ধ্বনি
‘না-গল্প না-কবিতা’ অথবা না-কবিতা না-গল্প শাদা চোখে অনেকটা গল্প ও কবিতার মাঝামাঝি একটি রূপ। কিন্তু এর শিল্পরূপ দেখতে গেলে দেখা যাবে–কবিতার স্বাদটি যেমন অক্ষুণ্ন রয়েছে, তেমন গল্পের আবহটাও জমে উঠেছে। তার অর্থ কি এই যে, এর সমস্ত লেখাতেই তা ধরে রাখা সম্ভব হবে? যেমন সংজ্ঞা দিয়ে রাখা যায়নি গল্প ও কবিতাকে–বিস্তারপর্বকালের ওঙ্কার ধ্বনিসৌন্দর্যে। রস ও অলঙ্কারগুণে শিল্পঘর সৌন্দর্যমণ্ডিত হলেও, এর নিচেই কীট লুকিয়ে থাকে–কলমের খোঁচায়, মগজের আড়ালে; যেখানে কালি, নিব ও ব্যবহারকারীর সম্ভ্রমতায় রয়ে গেছে আলো-আঁধারির করুণ-কঠিন খেলা। তেমনিভাবে বিশ্বসাহিত্যও তার শিল্পমাত্রার নানা দিক দিয়ে দিনে দিনে এগিয়েছে, আবার এর শিল্পচাতুর্যও বেড়েছে। স্রষ্টারা দলে দলে বিভক্ত হয়েছেন, আবার গোত্রভুক্ত থেকেও শিল্পের সাধনা করে গেছেন। কেউ প্রাতিষ্ঠানিকতার মধ্যে, কেউ-বা প্রাতিষ্ঠানিকতার বাইরে অন্য-এক আবহ তৈরির মাধ্যমে। এই রূপটিই হচ্ছে সৃষ্টির শুরুর কথা। মঙ্গললোকের কল্পনা ও বাস্তবতা এবং পৃথিবী সৃষ্টির ইতিহাস, তথ্যবিচ্যুতি ও বিভ্রান্তি–সব মিলিয়েই আমরা এবং আমাদের ইতিহাস। ‘না-গল্প না-কবিতা’ও শিল্পের এক নতুন ও আবিষ্কারপ্রবণ অঙ্গন–যেখান থেকে আগামী প্রজন্ম নতুন স্বাদ ও অনুভূতি সঞ্চার করবে, গ্রহণ করবে দৃশ্যাদৃশ্যের ঊর্ধ্বে অন্য-এক দেখা-অদেখায় স্বপ্ন-সম্ভব বাস্তবতা। গ্রহণ-বর্জনের মধ্যে তারতম্য এবং রুচি ও অরুচির নানা বিষয় থাকবে, কিন্তু নতুন একটি সৃষ্টি তার আপন গুণেই বিকশিত হবে, যুগে যুগে হয়েছেও এমনি। বলা হচ্ছে, নতুনের নাম আবিষ্কার, পরিবর্তন বা ব্যতিক্রম নয়। অজ্ঞাত বা অপ্রকাশিত বিষয় বা বস্তুর সন্ধান বা প্রকাশ অথবা উদ্ভাবনই শুধু নয়, সাহিত্যের আবিষ্কার নতুনের নবপ্রাণ বা আরেকটি ইনডিভিজ্যুয়াল প্রাণশক্তি বা প্রাণসন্ধান–যা শিল্পের যাত্রাপথকে বিকশিত করে এবং শিল্পমাধ্যমকে করে সমৃদ্ধ। ‘না-গল্প না-কবিতা’ও এমনি একটা টার্ম বা বিষয়–যা গল্পের ফরম্যাট বা সংজ্ঞায়িত বিষয়াদিকে ভেঙে দিয়ে কবিতার শাঁস বা রসাস্বাদনকে ছেঁকে তুলে একটি ব্লেনডারকৃত নতুন স্বাদ বা টেস্টের অনুসন্ধান করে বা পৌঁছে দেয় নির্দিষ্ট গন্তব্যে, যেখানে শিল্পের উৎকর্ষের বিষয় উতরে যায়–যা বিশ্বসাহিত্যের গণ্ডি পেরিয়ে বাংলা সাহিত্যকে নতুন প্রাণে উজ্জীবিত করবে এবং পাঠককুলের পাঠ-অভ্যাসকে আগ্রহী করে তুলবে। এর মধ্যে মেসেজ যেমন থাকবে, তেমনি তথ্য ও তত্ত্বের অনুপুঙ্খের বাইরে জীবনের সূক্ষ্ম-সূক্ষ্মাতি নানা বিষয়ের সমন্বিত রূপও থাকবে, থাকবে বিজ্ঞান ও দর্শনের উদার দিক এবং ধর্মের রূপকথারূপ কল্পনাবিস্তার। আদিম যুগের ন্যাংটো জীবন এবং আধুনিকতার উচ্চ-নিম্ন মার্গীয় ফ্যাশন ও রূপচর্চা। এখানে ধর্মগ্রন্থ প্রণেতা থেকে হিজড়া-হুর সমাবেশকেও অস্বীকার করা হবে না। মানুষ একেশ্বরবাদিতার মধ্য দিয়ে বহুশ্বরবাদিতার দিকে আরো ঝুঁকে পড়বে এবং নিরীশ্বরবাদিতার কনসেপ্ট শূন্যতত্ত্ব বা শূন্যদর্শনে গিয়ে সর্বশূন্যতাবাদের দিকে এগিয়ে যাবে। মানুষ একাধারে সন্ন্যাসযাপন এবং কুমার-কুমারী সঙ্গ গড়া থেকে শুরু করে হোমোঘর, হোমোমেঘ, হোমোময় হয়ে উঠবে। আমাদের জীবন ও সাহিত্য-সাংস্কৃতিক মূল্যবোধ নানা দিক থেকে পৃথক ও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বে–মাটি-পাতা-গাছপালা থেকে শুরু করে ইট-বালু-কাঠ থেকে, জীবন থেকে। সেখানের যে নতুন জীবন, সে জীবনকেই ধারণ করবে ‘না-গল্প না-কবিতা’।

আমাদের যাত্রাপথও সেদিকেই ধাবমান। সন্ত্রাসবাদ ও ধর্মীয় জঙ্গিবাদ, যে-কোনো বাদই একসময় মানুষের জন্য উচ্ছিষ্ট ও অতিরিক্ত বোঝা হিসেবে পরিগণিত হবে। পাশাপাশি মৌলবাদের সুপ্তোত্থিত বিষ ও বুর্জোয়ার লাল জিহ্বা ভস্ম হয়ে যাবে মানুষের মুক্তিসংগ্রামের মানবতাপুষ্ট কোরাসে। আর টাইম পাসের জন্য এইসব মানুষই স্যাটেলাইট চ্যানেল ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে ন্যুড কালচার ও পুরনো দিনের গানের মতো নিঃসঙ্গতা-প্রিয় হয়ে উঠবে। কখনো একাকিত্ব গ্রাস করবে–ঘাস-ফুল-নদীনালার অতি প্রাকৃতিকতায়, আবার কখনো-বা নিজের সঙ্গেই নিজের বোঝাপড়া চলবে–ইতিহাসের করুণ-কঠিনকালের সত্যমাধব নিষ্ঠুরতায়, তখন হস্তমৈথুনের মতো বিষয়াদিকেও সমাজ স্বীকৃতি দেবে। সেদিন আর খুব বেশি দূরে নয়, যেদিন মানুষ সববাদ ভুলে গিয়ে স্ববাদে লুকিয়ে পড়বে–বিশ্বায়নের চাতুর্যতা ছেড়ে মাতৃক্রোড়ে–নিজ গ্রামে, একান্ত একার ভেতর। সেদিনের যে সংগ্রাম ও বাক-স্বাধীনতার প্রকাণ্ড-প্রলয়ঙ্করী রূপ–তা আর মানুষ লুকিয়ে রাখতে পারবে না। বেরিয়ে পড়বে প্রতিটি ঘর থেকে জনপদে, প্রতি জনে জনে, দেশে দেশে, ভাষায় ভাষায়। সেই মুক্তিমন্ত্রের পাশে থাকবেন কবি, শিল্পী ও সংস্কৃতিকর্মী। তাদের ভাষা–মাতৃভাষাকেই খুঁজে নেবে এবং একটি নতুন উপস্থাপনা বা গঠনশৈলীকে স্বীকৃতি দেবে। সেদিন ‘না-গল্প না-কবিতা’র কনসেপ্ট প্রধান সারিতে এসে দাঁড়িয়ে যাবে। মানুষ বিজ্ঞানের অতি-উন্নয়নকে যেমন মেনে নিয়েছে, তেমনি বিজ্ঞানের বীভংস-কুৎসিত দিককেও মেনে নেবে এবং ঈশ্বর ভাবনা ও কল্পনা–পুঁথিপাঠের মতো করে আসরে আসরে গীত হবে, আর মানুষ জড়ো হবে বড় বড় হলঘরে, যেখানে উদ্দাম নৃত্যের সঙ্গে পঠিত হবে কবিতা, গান এবং ‘না-গল্প না-কবিতা’র মতো বিষয়াদি; তা ছাড়া বিশেষ বিশেষ ইস্যুকেন্দ্রিক নির্ভরতায় সংবাদ আকারে ফলাও করে প্রকাশ পাবে। এভাবে ‘না-গল্প না-কবিতা’র উত্তরযাত্রা মানুষ ঘরে বয়ে নিয়ে গিয়ে পড়বে এবং সংগ্রহে রাখবে। কারণ ধীরে ধীরে এর মধ্য দিয়ে একটি সমগ্র জীবনের ফর্ম ভেঙে-গড়ে দাঁড়িয়ে যাবে–যা মানুষকে মুক্তিমন্ত্রের মতোই পেয়ে বসবে। সেদিনই প্রকৃতার্থে সাহিত্যের মুক্তিঘণ্টা অন্দরমহল থেকে অন্তরের নিকট গভীরে বেজে উঠবে–ধ্যান ও সাধনার নানা বিষয়-মাত্রিকতায়। মানুষ ভালোর জন্য, কল্যাণের জন্য প্রার্থনা করবে; আর নারীরা তা উপভোগ করবে বিনোদন হিসেবে। কারণ জীবনের পুরোটাই একটা নিরবচ্ছিন্ন বিনোদনে পরিণত হবে, ফান বিষয়গুলো নৈমিত্তিক চাহিদার বিষয় হয়ে দাঁড়াবে, আর ছেলেমেয়েরা প্রকাশ্যে চুমু খাবে এবং পছন্দমতো বন্ধুর সঙ্গে শয্যাসঙ্গিনী হবে। ধর্ম-রাষ্ট্র-রাজনীতি একমুখী পদচারণায় অব্যবহার্য হয়ে পড়বে। ভোট দেয়ার মতো উপঢৌকনে একবার বারে বসে দুই পেগ-তিন পেগ মারার মতোই মানুষ মেরে এসে নিজস্ব কায়দায় ও জীবনদর্শনে পরিচালিত হবে। তখন ধর্ম, রাষ্ট্র ও রাজনীতি একটি সাবসিডিয়ারি বিষয়ে পরিণত হয়ে পড়বে। অনেকে গ্রহণ করবে, অনেকে করবে না। আবার যারা গ্রহণ করবে, তারাও পাসমার্ক তোলার মতো করেই গ্রহণ ও বর্জন করবে। এ-সত্যই বাস্তব। কেননা সত্য হলো সেইসব বিষয়ের সমষ্টি : যেখানে ঘটন-অঘটন দুই-ই থাকে এবং সাধু-শয়তানে সমান অধিকার সংরণ করে। সাহিত্যের চলমান পথ-পরিক্রমা বদলে না-গেলেও ভেতর ভেতর যে বিপ্লব ঘটে যাবে বিশ্বজুড়ে, ‘না-গল্প না-কবিতা’ তার বীজমন্ত্র বা উন্মেষকালের শিকড়প্রোথিত উৎস ও বল–যা নিজে নিয়ন্ত্রিত হয় না, কিন্তু অন্যকে আন্দোলিত করে।


মুহূর্তের ভাবনাগুলোই এক এক সময় বিশেষ মর্যাদা দাবি করে। আর মানবজীবনে কোনটি প্রয়োজনীয় আর কোনটি প্রয়োজনীয় নয়, তা কি সবসময় ঠিকঠাক বলা যায়? যেমন ধরা যাক–খাবারের ব্যাপারেই, সেরেফ জ্বরের আগের ও পরের খাবার তালিকা দেখলেই বোঝা যাবে–একই খাদ্য কখনো খুবই প্রয়োজনীয় বা আবশ্যক বা নিকট চাহিদা দাবি করে; ঠিক সেই খাবারই বিশেষ মুহূর্তে বা অবস্থায় অথবা স্বাভাবিকতায়–অপ্রয়োজনীয়, অখাদ্য বা বিন্দুমাত্র চাহিদা দাবি করে না। যুগবিস্তৃতির সঙ্গে পৃথিবীর বয়স বাড়ছে, আর বাড়ছে বিজ্ঞানের রোজনামচার হালখাতা। একদিন যা মূল্যহীন, অন্যদিন তা মহামূল্যবান। এটম বোমা ধ্বংসের প্রতীক হলেও, আবিষ্কারের মুহূর্তটি যেমন আনন্দের ছিল, তেমনই পারমাণবিক নানামুখী আবিষ্কার এবং বিদ্যুৎ ও রোগ নির্ণয়ে বিশেষ ভূমিকা রেখেছে; আধুনিকতার চাহিদামাফিক বহুবিস্তৃত উন্নয়নে এর কূলপ্লাবী অবদান অনস্বীকার্য। উল্টো দিকে ব্যক্তি অথবা কোনো গোষ্ঠী বা দল এটাকে ব্যবহার করছে–নিজেদের স্বার্থসিদ্ধি ও যুদ্ধজয়ের মুখোশে।

না-গল্প না-কবিতার ভাবনাগুলোও এমনতর নয় যে, কিছুই যখন হচ্ছে না, তখন কিছু একটা হোক; এরূপ কল্পনা থেকে এর যাত্রাকাল বিস্তৃত নয় বা সত্য নয়। আবার এও সত্য নয়, নতুন কিছু করতে গিয়ে একটা অদ্ভুত বা কাল্পনিক বিষয়কে বেছে নেয়া হয়েছে। দুটো বিষয়ই এখানে অগণ্য এবং অগ্রহণীয়। বরং লিখতে গিয়ে কবিতাও হচ্ছে, আবার গল্পও হচ্ছে। পাশাপাশি কিছু লেখা বেরিয়ে যাচ্ছে লেখা থেকে (উপচে পড়ার্থে নয়)–দূর সীমানা ছাড়িয়ে সুদূরের খোঁজে শিকড় ছুঁয়ে ছুঁয়ে, রসসিঞ্চন ও প্রবাহমানতায়–নতুন নাম অথবা সৌন্দর্য সন্ধানে। বলার বিষয়, কিছু লেখায় কবিতার রূপ-রস-গন্ধ ও স্বাদ উঠে আসছে বা ফুটে উঠছে, আবার গল্পের নিরত সম্মোহনীর শরাবটুকুও চুইয়ে পড়ছে। দেখা যাবে সর্বক্ষেত্রে হয়তো এমনটি হচ্ছে না, আবার অনেক জায়গায় গল্প-কবিতার রূপকেও স্বীকার করে নিয়েছে। যখন অতি তুচ্ছ অতি বড়র সম্মুখীন হয়, তখন বড়-ছোট’র প্রশ্ন নয়, অস্তিত্ব রক্ষা ও ফুল ফোটানোর আনন্দই শিল্পমাত্রা পেয়ে যায়। আবার সমালোচকদের তোপের মুখে পড়ে কখনো-সখনো তোপখানাও হয়েছে। তাহলে হচ্ছেটা কী? গল্প হচ্ছে না, কবিতাও নয়; তাহলে কী প্রবন্ধ, নাকি নাটক-নাটিকা, সাধারণ একটি গদ্যরূপ? শেষ পর্যন্ত দেখা যাবে এগুলোর কিছুই হচ্ছে না; এখানে হচ্ছে না অর্থে কবিতা-গল্প-উপন্যাস-প্রবন্ধ-নিবন্ধ প্রভৃতি বিষয়কে চিহ্নিত করা হয়েছে। নতুন এই যাত্রা, নতুন কিনা–সে কথা বলার চেয়ে বরং একটা নাম দেয়া যেতে পারে। আর এই নাম দিতে গিয়েই এগুলো গল্প-কবিতার বিন্যাসকে শরীরে জড়িয়ে ধরে কেঁপে কেঁপে ওঠে, জানান দেয় সদ্যপ্রসূত শিশুর মতোই তার নিবিড় অথচ সম্পূর্ণ পৃথক অস্তিত্বকে। কুমারী মায়ের মতো বা মা মরিয়মের গর্ভে যে সন্তানটি জন্ম নেয় তার নাম এককালে যিশুখ্রিস্ট হলেও আজকাল তারও পিতা একজন থাকে, সমাজেই–লোকচুর আড়ালে। মিলনের ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার নানা পরিবেশ অথবা নির্যাতনের (অসম্মতির) কারণে পিতার নামটি মা কখনো জানে, কখনো মুখের গড়ন-বহর, আবার কখনো-বা শুধুই কণ্ঠস্বরে চিনে ফেলে। এসবের একটা গচ্ছিত নামও কখনো কখনো হয়ে যায়, আবার হয়ে যেতেও হয়। এরা পিতা নাকি লম্পট, সন্তানের কাছে আদৌ কি তা স্পষ্ট? না-গল্প না-কবিতা সীমার কল্পতরুতে না-হওয়ার মধ্যে হয়ে ওঠা আরেকটি বিষয় বা হওয়া, অবশ্যই নতুন। এমন হতে পারে কেউ এসে নতুন একটি নামও দিয়ে বসতে পারেন, নতুন অথবা চুজি কোনো এক স্বরকল্পনার বাস্তবাদিষ্ট শিল্পরূপ বা শিল্পঘর এবং দেখা গেল মূল কনসেপ্টের ভেতরে থেকে সেখানে সামান্য এদিক-সেদিক হয়েছে অথবা নতুনভাবে কোনো একটা সংজ্ঞাও দিয়ে দেয়া হলো। এতে না-গল্প না-কবিতার বহুমুখিতা সর্বজনীনতায় প্রতিষ্ঠা পাবে এবং গবেষণার বিষয়াদিকে সমৃদ্ধ করবে। কুমারী মায়ের মতোই বাবার নাম-পরিচয় নেই, অথচ সন্তানটি তার। না-গল্প না-কবিতাও সাহিত্যের একটি অঙ্গ, একটি নতুন শাখা, পৃথক একটি মৌলগান। যে অঙ্গাঙ্গন বা গানকে আজ আর অস্বীকার করার কোনো জায়গা নেই। কারণ এই বিবিধ বা বিচ্ছিন্ন চর্চাই একদিন মূলের দিকে ধাবিত করবে লেখককে–লেখার কৃৎকৌশলে। শিকড়ে তার যে জনবল দুই-ই প্রোথিত শিল্প-সঞ্চারে, স্রষ্টার সালোকসংশ্লেষণে।

মাঝে মাঝে গল্পগুলো হারিয়ে যায়, কবিতাগুলো উড়ে যায় দূর সীমানায়–মঙ্গলে অথবা সেদনায়। যেখান থেকে আমাদের জন্ম দূর-বহুদূর, হাজার বছর আগে ও পরে। এখানে বিশ্বসাহিত্যের কাণ্ডারি চলে গেছে স্রষ্টার হাতে, যেখানে প্রতিটি আত্মার ইনডিভিজ্যুয়াল অবস্থান ও বিশ্বাসকে স্বীকার করে নিয়েছে নতুন নতুন স্রষ্টার অস্তিত্ব। না-গল্প না-কবিতার যাত্রা বাংলা ভাষায় প্রথম, এমনকি ভিন্ন ভাষায়ও? তার চেয়ে বড় হলো, এর অভিন্নযাত্রার শিল্পচাল ও সাহিত্যগুণ কথা, যেখানে লেখার শিল্পোত্তীর্ণতা বা সাহিত্যগুণ বিশিষ্ট হয়ে ওঠাটাই মুখ্য। ‘না-গল্প না-কবিতা’র নামকরণও সাহিত্যের সম্ভাবনাযাত্রার বিকাশ ও প্রকাশে উজ্জ্বলরঙে প্রস্ফুটিত। আবার এটিই শেষকথা নয়, কারণ শেষকথা বলেও কিছু নেই। প্রতিটি কথারই ভিন্নরূপ বা ভিন্নার্থ বিদ্যমান। সে-কারণে কোনো সৃষ্টিশীল মানুষ বা স্রষ্টা একই আদর্শে বা বিশ্বাসে দীর্ঘদিন একমত থাকতে পারেন না, আবার গোঁড়া হয়ে ওঠেন না। কারণ সে নিজেই নতুন নতুন অস্তিত্ব-কল্পনার সঙ্গে তার স্থিতি বা সম্পৃক্তি টের পান এবং নবনিযুক্ত হন নতুন দিনের চর্চায়। চর্চায় যে অর্জন, না-গল্প না-কবিতা তারই সিঁড়িঘরে বিশ্বজয়ের স্বপ্ন দেখে। প্রতিটি মানুষ তার আশার সমান বড়, স্বপ্ন তার দিকপ্রসারী মাত্রা; আর প্রতিটি সিঁড়িঘর পৃথকভাবে প্রতিটি সমগ্রর একটি অংশ। ঘরের সঙ্গে সিঁড়ি যেমন, দেহের সঙ্গে মন তেমন। একে ভিন্ন অন্যে অস্তিত্বহীন বা অকেজো। বিশ্বজয়ের চেয়ে বিশ্বশান্তি এখানে মুখ্য। যে অর্থে অধিকার অর্জনের সার্থকতা জয়ে, সে অর্থে অধিকার বা জয় নিশ্চিত হয়ে ছেড়ে দেয়া বা মুক্ত করে দেবার মধ্যে যে আনন্দ ও মহিমা–তাও জয়কে নিশ্চিত করে এবং প্রীতিউষ্ণ অধিকারকে কোনোভাবেই খর্ব করে না। শিল্প-সাহিত্যে যেমন মুখ্য–হয়ে ওঠা বা হয়ে ওঠার প্রক্রিয়া নির্ধারণ। এরপর পরিকল্পনা ও কার্যক্রম গ্রহণ এবং বাস্তবায়ন। সকল লেখক ও সাহিত্যিক সে কঠিন কাজটিই যুগে যুগে সম্পন্ন করে চলেছেন–শ্রমের অকৃত্রিমতায়, দেখার নতুনত্বে, ভাবের বহুবিস্তৃত পথে–সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম অনুভূতির রঙতুলিতে।


শিল্প কী? এই নিয়ে নানা সংজ্ঞা বিশ্লেষণ, অনুসন্ধান ও সত্য-সৌন্দর্যের বহুবিধ ব্যবহার ও ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ায় প্রচুর কথা আছে, হয়েছে, হবে। কিন্তু ব্যক্তিমানুষ বা মানবজীবনে শিল্প কী উদ্দেশ্য সাধনের উপযোগী তা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বিবেচিত হয় না। অথচ দেখা যাবে, যখন একজন ব্যক্তি বা একাধিক ব্যক্তির দ্বারা অপরজন অথবা কোনো ব্যক্তি নিজ অনুভূতির অভিব্যক্তি অন্যের মধ্যে ফুটিয়ে তোলেন বা তুলতে পারেন এবং সঞ্চারিত করেন; তখন গতি, রেখা, রং, ধ্বনি ও রূপের বাহ্যিক প্রয়োজন থেকেই অন্তরে তার প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করে। সে-কারণে কবিতা অথবা গল্পকে সংজ্ঞা দিয়ে হয়তো বেঁধে রাখা যাবে, কিন্তু এর বিষয়বৈচিত্র্য ও গঠনশৈলীর বাইরেও নানারূপ চর্চা ও প্রকাশভঙ্গির উদ্ভাবন যুগের পর যুগ চলতে থাকবে–লেখ্যরীতির অন্তকাল পর্যন্ত। সেখানে কবিতা কীসের ওপর গিয়ে দাঁড়াবে? সে কি তার সংজ্ঞার নির্দিষ্টতায়, নাকি শিল্পীর বহুমাত্রিকতায়? প্রচলিত সংজ্ঞা বিশ্লেষণে কবিতা হচ্ছে (অভিধানবেত্তাদের মতে), কাব্য, পদ্য, শ্লোক, কল্পনামিশ্রিত ছন্দোময় রচনা। অথবা অপরিহার্য শব্দের অবশ্যম্ভাবী বাণী-বিন্যাস–যা লেখকের কল্পনা বা অনুভূতি-স্নিগ্ধ অন্তর হতে স্বতোৎসারিত; এখানে ‘অবশ্যম্ভাবী বাণী-বিন্যাস’ বলতে বোঝা যায়–অযত্মে বিন্যস্ত শব্দে কবিতা হয় না। আবার মানবমনের ভাব-কল্পনা যখন অনুভূতি-রঞ্জিত যথাবিহিত শব্দ-সম্ভারে বাস্তব সুষমামণ্ডিত চিত্রাত্মক ও ছন্দোময় রূপ লাভ করে, তখন তার নাম হয় কবিতা। সে অর্থে কবিতা নিরাভরণও নয়। নারী যেমন আকার-ইঙ্গিতে, সাজসজ্জায়, বিলাস-প্রসাধনে নিজেকে মনোরম করে তোলে; কবিতাও তেমনি শব্দে, সঙ্গীতে, উপমায়, চিত্রে ও অনুভূতির নিবিড়তায় নিজেকে প্রকাশ করে। জীবনের সুখ-দুঃখ, পাপ-পুণ্য, ধর্ম, অর্থ, কাম, মো প্রভৃতি যে-কোনো বিষয়ই কাব্যের উপাদান বা অঙ্গ হিসেবে গৃহীত হতে পারে।

মূলত গদ্য ও পদ্য উভয়ই সাহিত্য প্রকাশের মাধ্যম। সাধারণত কবিতা পদ্যেই লিখিত হয়। তাদের মধ্যে বিশেষ কোনো ভিন্নতা আছে বলে অনেকে স্বীকার করেন না। ওয়ার্ডসওয়ার্থ তার Lyrical Ballads-এর ভূমিকায় বলেছেন, গদ্য ও পদ্যের মধ্যে মূলত কোনো প্রভেদ নেই। শেলী-ও গদ্য ও পদ্যের বিভেদকে অসমীচীন মনে করতেন। অবশ্য দার্শনিক হেগেল-এর মতো আমরা বলতে চাই না, ছন্দই কবিতার অপরিহার্য অঙ্গ (Metre is first and only condition demanded of poetry)। ছন্দ না-থাকলেও শুধু তাল বা লয় (rhythm) কাব্যদেহকে সুশ্রী করে তুলতে পারে। কিন্তু সাধারণভাবে গদ্য ও পদ্যের বিভেদকে সাহিত্যে স্বীকার করা হয়েছে। ইংরেজ কবি কোলরিজ গদ্য ও পদ্যের পার্থক্য নির্ধারণ করতে গিয়ে বলেছেন, শব্দের সুনিয়ন্ত্রিত বিন্যাসই গদ্য এবং যথোপযোগী শব্দের অবশ্যম্ভাবী বিন্যাসই পদ্য। গদ্যে অর্থ ও ব্যঞ্জনা প্রধান বলে কোনো বিষয়বস্তু কাউকে বোঝাতে বা ব্যাখ্যা করতে হলে বা সেই সম্বন্ধে মানুষের জ্ঞানের পরিধি বিস্তার করতে হলে, লেখকের পক্ষে গদ্যই সমীচীন মাধ্যম। যে অর্থে গদ্যকে ‘Instrument of many stops’ বলা হয়, সেই অর্থে পদ্যের ক্ষমতা অপেক্ষাকৃত সীমিত। গদ্য বোঝায় ও জানায়, পদ্য অনুপ্রাণিত করে; গদ্যের জন্ম মস্তিষ্কে, পদ্যের জন্ম হৃদয়ে। গদ্য হাঁটে, পদ্য ওড়ে; গদ্য সাবধানী, পদ্য অসাবধানী; গদ্য জ্ঞান, পদ্য প্রজ্ঞা। এরূপ পাণ্ডিত্যপূর্ণ বা দর্শনের বিভেদ সত্ত্বেও গদ্যের ও পদ্যের সীমারেখা যে সুনির্ধারিত নেই, এ-কথাও আজ স্বীকার করতেই হয়। শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় গদ্যেই লিখেছেন, কিন্তু তার উপন্যাসে গদ্য যেন পদ্যের সুরমাধুর্যে নেচে উঠেছে; বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়-এর ‘কমলাকান্তের দপ্তরের’ গদ্য তার অপূর্ব কবিমানস-রসে সিঞ্চিত হয়ে কাব্যরূপ লাভ করেছে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর-এর গদ্য সম্বন্ধে নিশ্চিতভাবে বলা যায়, তিনি যেন ‘Other harmony of prose’ আত্মস্থ করে গদ্যকে পর্যন্ত কাব্য-মাধুর্যে অভিষিক্ত করেছেন। ভাষা যখন অনুভূতি-স্নিগ্ধ হয়ে সুর-মাধুর্যে অনির্বচনীয়তার ব্যঞ্জনা জাগায়, তখন তা গদ্যের সীমানা পার হয়ে কবিতার রাজ্যে প্রবেশ করে। ভাষার শব্দার্থময় দেহটি পর্যন্ত তখন ভাবস্পন্দে কবিতায়িত হয়ে ওঠে। গদ্য ও পদ্য উভয়েরই যে প্রকৃতিগত সৌষম্য (Harmony) আছে, তা লঙ্ঘন করলে অনেক সময় না-গদ্য না-কবিতা ধরনের যে সৃষ্টি হয়, তা আজ আর অপাঙ্ক্তেয় নয়। কারণ সাহিত্যের বা শিল্পের মূল কথা হলো–‘হয়ে ওঠা’। শিল্পগুণ ও শিল্পমানসম্পন্ন হয়ে ওঠা বা শিল্পকে অক্ষুণ্ন রাখা। গদ্য নাকি কবিতা আজ আর তা বিশেষ গুরুত্ববহ নয়, গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে সৃষ্টির রসসিঞ্চনকুশলতা ও দ্রোহের নিবিড়তা। সে না-গদ্য না-কবিতা অথবা না-গল্প না-কবিতার নানারূপে রূপ পেতে পারে। শিল্প আজ আর সংজ্ঞায়িত বা গতানুতিক কোনো বিষয় নয়, শিল্প হলো জীবন ও সত্য-সৌন্দর্যের যৌথরূপ–যা সবকিছুকে স্বীকার করে নিয়েও অস্বীকার করে এবং এই অস্বীকারের মধ্য দিয়ে যে নতুন শিল্প বা বোধ তৈরি হয়, তাই আধুনিক সাহিত্যের মোক্ষম থিম বা বিষয়– যা আবার শিল্পগুণে বিকশিত এবং তার স্বাতন্ত্র্যও ফুটিয়ে তোলে–আনন্দ-বেদনার ওপারে আরেকটি নতুন জগতের সম্ভাবনা ও সম্ভাব্যতায়। শিল্পের এই দশমুখিতা বা সুকর্ণোত্তীর্ণতাই আধুনিক সাহিত্যের প্রধান কথা ও সুর। এ ক্ষেত্রে বাহ্যিক সৌষম্য এবং কবিতার সৌষম্য The other harmony বুঝবার একটি মাত্র উপায়–লেখক ও পাঠকের পরম জ্ঞান বা Intuition। এই বোধিশিক্ষা সাধনাসাপেক্ষ তো বটেই, কিন্তু শ্রেষ্ঠ লেখক বা সাহিত্যবোধসম্পন্ন পাঠকের কাছে অনেক সময় তা পূর্বজন্মজাত বিষয়-রূপান্তরিত হয়ে আসে। যার মধ্যে এই উভয়ের মিলন ঘটেছে, তিনি অত্যন্ত ভাগ্যবান।

ওয়ার্ডসওয়ার্থ বলছেন, কবিতা ও গদ্যের ভাষায় বিশেষ কোনো পার্থক্য নেই। কিন্তু তার উৎকৃষ্ট কবিতা উল্লিখিত উক্তিকে সমর্থন করে না। দেখা যাবে, কবিতায় ছন্দ না-থাকলেও তাতে একপ্রকার ছন্দোময়তা বা Rhythm থাকবেই। ছন্দ থাকলেই কবিতা হয় এবং ছন্দ না-থাকলে কবিতা হয় না–এ-কথা অবশ্য গ্রাহ্য নয়। তবে এও সত্য, শিক্ষিতসমাজ ছন্দকে কাব্যলক্ষ্মীর অপরিহার্য অলঙ্কার রূপে গ্রহণ করেছেন। ছন্দের আপাত বন্ধনে যে মুক্তির আবেগ আছে, তা কবিতা-সৃষ্টির একান্ত সহায় মনে করেই বোধ হয় পণ্ডিতজন একে কবিতার অলঙ্কার রূপে মেনে নিয়েছেন। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় বলেছেন, কাব্য গড়ে, বিজ্ঞান ভাঙে। কথাটি কবি ও বৈজ্ঞানিকের দৃষ্টির পার্থক্য অতি নিপুণভাবে প্রকাশ করছে। কবি ও বৈজ্ঞানিক উভয়েই সত্যের উপাসক। কিন্তু বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণের সাহায্যে বাস্তব সত্যের অনুসন্ধান করেন। কবি কোনো কোনো স্থলে বিশ্লেষণাত্মক হলেও তার দৃষ্টি মূলত সংশ্লেষণাত্মক। বৈজ্ঞানিক জগৎ ও জীবনের দুর্জ্ঞেয় রহস্য বিচারে গাণিতিক পরিমাপের সাহায্যে সাধারণ সত্য প্রতিষ্ঠা করেন এবং এই সত্য বুদ্ধিগত, অমূর্ত। আবার কবি জগৎ ও জীবনের যে সত্যকে প্রতিষ্ঠা করেন, তা শুধু ব্যক্তিগত, প্রত্যয়াধীন। তার বাস্তব সত্যতা না-থাকলেও অনুভূতির প্রত্যয়গোচরে গভীর সত্যতা আছে। সত্য নিষ্ঠুর হলেও বৈজ্ঞানিক তাকে নির্বিকারভাবে গ্রহণ করেন, কিন্তু কবি সত্যকে সুন্দর করে তোলেন। সেসব কারণে দেখা যাবে, কবিতা ও দর্শন উভয়েই বিশ্বজগতের রহস্য উদ্ধার করতে চায়। কিন্তু তাদের প্রণালী সম্পূর্ণ ভিন্ন। অনুভূতি ও ভাবাবেগই কবিতার উপজীব্য, কিন্তু দর্শন বিচারমূলক বিশ্লেষণের সাহায্যে জগৎ ও জীবনের বুদ্ধিগত স্বরূপটি উদ্ধার করে। দার্শনিক জীবনকে জিজ্ঞাসা ও বিচারের দ্বারা গ্রহণ করেন। অন্যদিকে দার্শনিক ভাবেন, কবি অনুভব করে নেন। তবে এ-কথাও সত্য, কোনো কোনো কবি ভাবাত্মক হলেও ভাবকল্পনাকে অনুভূতিস্নিগ্ধ করে পরিবেশন করাই তার কাজ। সেরূপ আবার কোনো কোনো দার্শনিকও তার ভাবনাচিন্তাকে অনুভূতিস্নিগ্ধ করে যখন প্রকাশ করেন, তখন তারা আবার কবির আসনে উন্নীত হন।

কবিকৃত ব্যবহৃত বিশেষ ভাষা বা কবিতা রচনার প্রকর্ষ ভাষা, ভাষার প্রয়োগ-রীতি-কৌশল কবিতার আধুনিকীকরণের প্রথম শর্ত। কাব্যশক্তি-অধিকারীর কাব্যরচনায় কুশলতাব্যঞ্জক প্রতিবেশ ও সৃষ্টিনৈপুণ্যতা আধুনিকীকরণের আরেকটি রূপ। কাব্য রচনার মতা মহৎ কবিতার উত্তর শর্ত। আর কাব্য, পদ্য বা শ্লোক কল্পনামিশ্রিত ছন্দোময় রচনা বিশেষই কবিতা। কাব্য রচনার যোগ্য কল্পনা কবির মানসলোক বা মনোজগৎকে চিহ্নিত করে। কবিতা রচনার শক্তি বা অনুকূল ভাব বা কল্পনা অথবা কাব্যময়তা অথবা কল্পনার সৌন্দর্য কবিকে সূক্ষ্মতরভাবে কল্পনাবিলাস থেকে মুক্ত করে। সে ক্ষেত্রে বর্তমান কালের জবাব ভবিষ্যৎকে নির্মাণ করে। আধুনিক কবির কাজও এই। কাজ যখন সাধনায় পরিণত হয়, তখন কবি সফল হন, পাঠক আধুনিক কবিতা পান করেন–সুধারস, অন্নজলে। এখানেই কবিজন্মের সার্থকতা ও নিমিত্তিপূর্ণ প্রকাশ।

কবিতা কোথা থেকে আসে, এর জন্মরহস্যের রং কেমন, কবিতা কী কোনো অবতারের মাধ্যমে ওহির মতো কবির মস্তিষ্কে ভর করে, কবি কি কোনো সত্যদ্রষ্টা, নাকি শুধুই সুন্দরের সাধক? এসব প্রশ্নের উত্তরে কবিতার সংজ্ঞা বিশ্লেষণের দিকে না-গিয়ে অন্তত এটুকু বলা যায়, কবিতা হলো শিল্পের সেই উচ্চাসন–যেখানে সবাই আরোহণ করতে চায়, আর ‘হয়ে ওঠা’র মধ্য দিয়ে যার প্রকাশগত বিকাশ। কবিতা কী এবং কেন? চর্যাপদ থেকে অথবা তারও পূর্বযাত্রায় পড়ে একবিংশ শতাব্দীর এই ক্রান্তিকালে আমরা যারা কবিতাচর্চা করছি, অন্যার্থে সাহিত্যসাধনায় ব্যাপৃত আছি–তাদের সবার ক্ষেত্রেই বিশেষ কোনো তত্ত্বালোচনায় ঘুরপাক না-খেয়ে বলা যায়, অন্তত কবিতার রসাস্বাদন করতে চাওয়ার যে আকাঙ্ক্ষা–সেখান থেকেই কবিতার জন্ম এবং কবিতার উত্তরকাল–যা আমার জন্ম-মৃত্যুর সমান; বিশেষ করে আমার পৃথিবী, আমার বাংলাদেশ অথবা সৌরমণ্ডলীর সামগ্রিক-কর্ম–যা আমারই বীর্যযাত্রাকালের চেয়ে সত্য নয়, যেমন সত্য নয় ধর্ম, রাষ্ট্র ও রাজনীতি। এ আমার বিশ্বাস, আর বিশ্বাস–একই আদর্শ দীর্ঘদিন কোনো স্রষ্টার আসনকে নির্দিষ্ট করে না, নির্দিষ্ট করে না ভাব ও বিশ্বাসের ভিতভূমিকে; এখান থেকেই ঈশ্বরাসনের অস্তিত্বকে খুঁজে বের করা, তখন ব্যক্তি হয়ে ওঠে মুখ্য এবং এই ব্যক্তিই একজন আহমেদ ফিরোজ, কবিমানুষ। স্রষ্টাযাত্রাকাল এবং কবিতা বা সাহিত্যের অন্য সকল শাখার আয়ুষ্কাল বা বেড়ে ওঠা–যা আমার জন্ম-মৃত্যুর বাইরে নয়। আধুনিক বিশ্বের ভয়ঙ্কর দুটি শক্তি : যাজক এবং রাজনীতিক, তাদের ভণ্ডামির বিরুদ্ধে কলম-সম্ভাবনা গদ্য-পদ্য, খোলামত ও মতাদর্শ–যা বাক-স্বাধীনতার চরম প্রকাশ; এই প্রকাশ একজন কবিকে তথাকথিত লৌকিক সমাজ থেকে পৃথক করে। এই পথ এতোটাই প্রলম্বিত ও বন্ধুর যখন বলতেই হয়, ‘আজ আমাদের ট্র্যাজেডি একটি বিশ্বজোড়া সর্বব্যাপক এক শারীরিক আতঙ্ক–এতোদিন ধরে এই আতঙ্ক আমরা বহন করে এসেছি, কিন্তু এখন তা একেবারেই অসহনীয় হয়ে উঠেছে।
…এখন শুধু এই প্রশ্নই আছে : কখন আমাকে বিস্ফোরণে উড়িয়ে দেয়া হবে।’–কবিতা এর বাইরে নয়।

কবিতা কেমন হবে? ধারাবাহিক রচনার অংশবিশেষ নাকি নতুন সৃষ্টি? সে-কি রবীন্দ্র-নজরুল-জীবনানন্দ (রনজী)-এর অস্তিত্ব রা নাকি রাহমান-মাহমুদদের প্রতারিত ঘর-গৃহস্থালি? তা-কি কবি-অকবির ভিড়ে ধূমায়িত কাব্যালঙ্কার সম্ভার?–যা আমাদের পৃথক করে শিল্পচর্চার আনন্দ থেকে এবং মানতেই হয়, আমাদের প্রতারিত ঘর-গৃহস্থালিও নানা কায়দায়, নানা কৌশলে ভাত-কাপড় ও পোশাকে সংরক্ষিত; বিষয়টি পৃথক প্রবন্ধের দাবি করে। ডাল-ভাত নেই বলে আলু খাদ্য, নাকি খাবারের তালিকা থেকে বিষয় তুলে দিয়ে খাদ্যগ্রহণের নতুন অভ্যাস গড়ে তোলা? শ্বাস-প্রশ্বাসে নাকি আহারে-বিহারে, কোনটি? বিজ্ঞানের ‘আধুনিক মানুষ’, নাকি চিরায়ত বাংলার মরমি সন্দর্শন? আনন্দ-বেদনার ঊর্ধ্বে যে জগৎ–সত্য-মিথ্যার চেয়েও চরম বাস্তব, স্বপ্ন ও সম্ভাবনায় ভরা, কোনদিকে আমাদের যাওয়া উচিত? লেখার কৃৎকৌশলই-বা কী হবে? কবিতাচর্চার রীতি-পদ্ধতি জ্যামিতিক হবে নাকি গাণিতিক, নাকি সর্বশূন্যতাবাদমুখর? এমন ভাবনাগুলো অন্ত্যজ বা অস্পৃশ্য নয়। যেমন অস্পৃশ্য নয় কবির চিন্তা ও কবিতা। কারণ, ‘তাঁকে আবার ফিরে শিখতে হবে সব। নিজেকে তাঁকে শেখাতে হবে, সবকিছুর মধ্যে সবচেয়ে অধম হলো আতঙ্কে কুঁকড়ে-গুটিয়ে যাওয়া; আর নিজেকে তা শেখাবার পর, বরাবরের জন্য তা ভুলে যেতে হবে, তাঁর কারখানাঘরে হৃদয়েরই পুরনো সব সত্য আর বিধান ছাড়া কিছুই যেন না-থাকে। …আজ যে তরুণ-তরুণীরা লিখছেন, তাঁরা ভুলেই গিয়েছেন নিজের ভেতরকার সমস্যায় মানব-হৃদয় কীরকম জট পাকিয়ে গিয়েছে–অথচ
তাই শুধু ভালো লেখার জন্ম দিতে পারে, কেননা শুধু তাই লেখার উপযুক্ত, সব মর্মযাতনা আর স্বেদরক্তের যোগ্য।’

সাম্প্রতিক কবিতার অর্জনের প্রশ্নে এসে যায় এর ধারাক্রম এবং কবিতা বিশ্লেষণের নানাদিক। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম ও আমাদের সমালোচনাসাহিত্য-সমর্থিত ত্রিশের আলোচিত পাঁচ কবি এবং জসীমউদদীন-এর পরে বাংলা কবিতার যে কালযাত্রা, এ-যেন ধারাবাহিক উত্তরাধিকারেরই নামান্তর, ভিন্ন ভিন্ন দাবিদার–একই জায়গা-জমিন, প্রতিকাশ সংক্ষুব্ধ; অর্থাৎ বিশেষ কোনো দিক পরিবর্তন, চেতনা ও ভাষায় অথবা উপস্থাপনাগত উল্লেখযোগ্য কোনো কাজ চোখে পড়ে না–যা হয়েছে, তা কোনো-না-কোনোভাবে রবীন্দ্রনাথ থেকে জীবনানন্দ কিংবা নজরুল-এর দ্রোহ থেকে জসীমউদদীন-এর পল্লীগানের প্রভাবমুক্ত নয়। লালন-এর সর্বরাগ সর্বসুরের অন্তর্যাত্রা, প্রেমবার্তা, ভক্তিমাত্রা–নশ্বর, অবিনশ্বর, অধিনশ্বরে শতরঙে বিচ্ছুরিত ও সমর্পিত। আর রবীন্দ্রনাথ-এ জল-বারি-বরিষণ এনে দিলো ষড়ঋতু আবাহন…। তাঁদের দেখানো পথেই ঘুরে-ফিরে পথচলা–যা নতুন পথের সন্ধান দিতে না-পারলেও এবং ধারাক্রম ভেঙে অন্যদিনের আলোয় আলোকিত করতে সমর্থ না-হলেও দিনে দিনে কুয়াশাচ্ছন্নতায় গতিপথকে করেছে রুদ্ধ। তার পরেও আশাহীন দোলাচল, ভিন্নতা চারদিকে।

এই পরিপ্রেক্ষিত গতি-অন্বেষার কালে বাংলাদেশে মধ্যাশির কিছু আগে ও পরে একটি নতুন সুর বাজতে চাইলো লিটল ম্যাগাজিনের আন্দোলনের সূত্র ধরে। আবার দেখা যায়, এ-সময়েই তারুণ্যদীপ্ত মুখগুলো জ্বলে উঠতে শুরু করলো একটা পৃথকাবস্থান নির্দেশনায় স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য নিয়ে এবং এ-কালে এসেই আগের ধারাবাহিকতা ভেঙে দেবার প্রত্যয় দেখা গেল। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে ঊষালোকিত ভোরকে স্বাগত জানাতে তারা বারবার ব্যর্থ হলো।

ওপারের মৃদুমন্দ বাতাস শান্ত করেনি এপারের হাওয়াও। সবখানে আদমের উপস্থিতি গন্ধম ছেড়ে গন্ধ ছড়াতে পশ্চাতের পায়ু-মল নষ্টাভিযানে। শঙ্খ-জয়, বিনয়-উৎপল, শক্তি অথবা সুভাষ অথবা সুনীল–যেসব নতুন নামের সোনার কাঠি রুপার কাঠি নিয়ে এলো, তা ঐ ঋষিকবি রবীন্দ্র বাবুকে কোনোভাবেই ঘুম ভাঙাতে পারেনি। ঘুম ভাঙাতে পারলো না আল-শামসুর, শহীদ-ওমর অথবা হাসান-হোসেন, হক-গুণ অথবা ভিন্ন ভিন্ন শব্দ-মাত্রার নাসরিন-আজাদ অথবা সমকালের মহানায়ক ঋণে-শান্তিতে অদ্বিতীয় অর্থনীতির ঘরপোড়া নোবেলীয় ড. ম ইউনূছ।

রাজনীতির খোলসও এভাবে ঢুকে পড়ে কবিতায়। তখন কবিতার আশপাশের মানুষগুলোও অনিবার্য হয়ে ওঠে আলোচনায়। বিশ্বের ভয়ঙ্কর দুটি শক্তি বা জাতি-প্রজাতি যাজক ও রাজনীতিক–যারা আমাদের আদি থেকে আদ্যান্তরে নিয়ন্ত্রণ করছে, শোষণ করছে, প্রভাবিত করছে; এই পরিপ্রেক্ষিতে তাদের ঠক উপস্থিতিকে অস্বীকার করা যায় না। সাহিত্যে, বিশেষ করে কবিতার ভূমণ্ডল বা মানচিত্রে এই অশুভ শক্তি ও বুদ্ধির বিকাশ অনেক সময়ই আমাদের আতঙ্কিত করে তোলে। সে-কারণে রাজনীতি-সচেতনতা কবি ও কবিতার জন্য আবশ্যক-পর্যায়ের হয়ে ওঠে; যখন টুপি-পৈতা ও প্রতীক আপনাকে প্রতিনিয়ত বিবস্ত্র করে ফেলে, প্রকৃতি থেকে, সৃষ্টি উদ্ভাস থেকে।

একইভাবে উদগ্র নেশা, নীতিহীন প্রেম, ধর্মের জেল্লাই এবং রাজনীতির খড়্গ চেপে বসলো শিল্পের ওপর। যখন অবৈজ্ঞানিক নেশার কড়চায় অন্ধপ্রেম মোহমুগ্ধ হয়ে উঠলো ধর্মের জিল্লতি পসারে, তখন স্বৈরশাসন কিংবা বিক্রি হয়ে যাওয়া আশ্রয় খুঁজে ফিরলো আশির মেধা ও মনন। এভাবে মিথ্যে হয়ে গেল সাংস্কৃতিক মোল্লাদের নানা প্রকার ফতোয়া বয়ান, পাশাপাশি ধর্মীয় মৌলবাদচক্র নানা ভাব-বেশে দানা বাঁধতে শুরু করলো–রাষ্ট্রীয় কাঠামোতে, প্রশাসনিক ক্যাডারেও। নব্বইয়ে এসে আর-এক ঝাঁক নতুন যাত্রীর দেখা মিললেও তারাও মোহভঙ্গের মতোই হতাশ করেছে। কোনো সামষ্টিক উদ্যোগ–(লেখা ও কর্মে) চোখে পড়েনি, ব্যক্তিগত দ্বন্দ্ব-সংঘাত ও স্বাহঙ্কার ভেঙে দিয়েছে শিল্পগুণ কাঠামোকেও। এবার মিডিয়া কিনে ফেললো মাথা, সবাই দল বেঁধে ছুটলো মধ্যবর্তী কাল থেকে প্রিন্টিং মিডিয়ার ভাগাড়ে–দালালিতে কিংবা অন্নপ্রাসনে; কেননা প্রতিটি পত্রিকা ও চ্যানেল কোনো-না-কোনো মুখপত্র–ব্যক্তি কিংবা প্রতিষ্ঠানের। পুঁজি হাভাতে–গিলছে ছোট-বড় সব স্বপ্ন কিংবা সম্ভাবনাকে। পরবর্তী পাঁচ বছরে জেঁকে বসলো ইলেকট্রনিক মিডিয়া, ফলে পণ্য হলো ধন্য দেশের সাংস্কৃতিক পরিচয়, আর আটকে গেল অথবা বাক্যশূন্য হয়ে পড়লো এইসব উত্থিত তরুণদল। এই সময়ে দু-একটি লিটল ম্যাগাজিন, সাহিত্য পত্রিকা বেঁচে থাকলেও এবং নতুন নতুন সংকলন-পত্রিকার জন্ম হলেও–এসব ঘিরে গড়ে উঠেছে নীতিহীন দল, গোষ্ঠী; মূর্খতা ও গোপন আঁতাত।

সুসংবাদ এখনো নেই, দূরের ইশারা ভাঙছে প্রতি পলে পলে : সামুদ্রিক চোখ আঁষ্টে-গন্ধে দিক-নির্দেশনা খুঁজে ফেরে যান্ত্রিক নগরে। আমরা ধর্মীয় মৌলবাদকে গালাগাল দিয়ে পরিত্যাগ করে বুর্জোয়াকে বুকে জড়িয়ে ধরেছি। মৌলবাদ এক চোখে পতিত, বুর্জোয়া দশ চোখে জারজাত। দু’য়ের পার্থক্য কম, মিল অনেক। ফলে সর্বত্রই সত্য মিললো পশ্চাৎপদতায়, প্রমিজ এন্ড কমিটমেন্ট হলো স্বার্থনত। যখন ধর্মীয় মোল্লাকে চেনা গেলেও, সাংস্কৃতিক মোল্লাকে চেনানো গেল না; পুরোদস্তুর পর্দা/আড়াল বা মুখোশের কারণে। অধিকন্তু এ-ভয়ও তো আছেই, মুখোশোন্মোচন করতে বেলা কেটে গেলে না-আবার ধর্মীয় মোল্লার চকচকে জিহ্বা বেরিয়ে পড়ে, যেভাবে বেরিয়ে পড়ে অভ্যস্ত একাত্তরে কিংবা রগকর্তনের রাজনীতিতে। আর, আমরা এমন-এক সময় পার করছি–যখন নিজের গা থেকে রক্ত ঝরে না-পড়লে বুঝতেই পারি না কতটা পতিত আছি!

তা ছাড়া এই দুই দশকে, যখন লিটলম্যাগের আন্দোলনসূত্রে এন্টিস্টাবলিশমেন্টের কথা জোরেশোরে বলা হচ্ছে, তখন ব্যক্তিগত পর্যায়ে এস্টাবলিশমেন্টের পেছনে ঘোড়দৌড়ে অংশগ্রহণ করেছে সেইসব বয়ানকারী কবি-সম্পাদক ও লেখকেরা। পাশাপাশি বিদেশে পাড়ি দেয়ার ঘটনাও বেড়েছে। কখনো ব্যক্তিগত কারণ দেখিয়ে, কখনো অর্থোপার্জনের মাধ্যম-নির্বাচনে; আবার কখনো-বা দুর্নীতির বেড়াজাল টপকে নিজের কবি-স্বভাবকে রা করতে। এ ক্ষেত্রে আশির দু-একজন কবির বিদেশযাত্রাও বিশেষভাবে সমালোচিত। এর সঙ্গে বেড়েছে আমলা ও অধ্যাপকদের কচলানি, লিটলম্যাগের নাম ভাঙিয়ে নানা আইটেম ও সাইজে সাহিত্যপত্রিকা, অধিকাংশ ক্ষেত্রে সংকলন প্রকাশ এবং ইতিহাসে নাম লেখানোর প্রেরণায় নানামুখী চটকদার-চাটুকারী আয়োজন ও উৎসব উদ্যাপনে। আয়ের বাড়তিতে মেধা বিকিয়ে এরাই কৈশোরোত্তীর্ণ তরুণ-প্রজন্মকে নানাভাবে বিভ্রান্ত ও ভোজং-আড়ংয়ে নিজ কিংবা অন্যদের দলমুখী করার চেষ্টায় লিপ্ত–যা কখনো কখনো রহস্যজনক ও আক্রমণাত্মকও বটে। এদের রুখতে না-পারলে ভেড়ার পালে বাছুর প্রামাণিক সাহিত্যযাত্রা ও অবদমিত জীবনযাপন কখনোই মেরুদণ্ড সোজা করে উঠে দাঁড়াতে পারবে না–এ-আশঙ্কা আজ আর রূপকথারূপ (স্বর্গ-নরক ভাবনা বা কল্পনাবিলাস) গল্প নয়, আজ তারাই আবার অতি যত্ম ও সাবধানে ধর্মের বেসাতি নিয়ে দাঁড়িয়েছে। সে-কারণে সময়ের করণীয় প্রজন্মকেই গ্রহণ করতে হবে–নিজেদের ঘুরে দাঁড়ানোর প্রত্যয়ে, সাহসে। এই ঘুরে দাঁড়ানোর নামই দ্রোহ, অহংকার এবং ব্যক্তিগত প্রমিজ ও কমিটমেন্ট। এখন সিদ্ধান্ত শর্তযুক্ত : ডান নাকি বাম, সামনে নাকি পশ্চাতে, ঊর্ধ্বে নাকি অধঃ, নাকি আরো চারদিকে; নাকি দিক-পথ একটিই–কবির পক্ষে স্রষ্টার পক্ষে লালনের পক্ষে, ইচ্ছা-শ্রম ও সাধনার শৌর্যে সর্বমঙ্গলের দিকে–সর্বশূন্যতাবাদের সে পথ। যে পথে নির্বাণ ও নির্মিতি।

ভারতবর্ষীয়, বিশেষ করে জাতীয় অলস ও কর্মবিমুখ মন-মানসিকতা তিলে তিলে গিলতে শুরু করেছে আমাদের স্বতন্ত্র সত্তা ও উদ্ভাসকে। ‘শ্রম’ ও ‘সাধনা’ শব্দ দুটি আমরা যেন ভুলতে বসেছি, সৎ ‘ইচ্ছা’র জায়গাও কমে গেছে। উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত অলসতা আর জাতীয়ভাবে প্রাপ্ত কর্মবিমুখতা ক্রমে অতল-অন্ধকার-গহ্বরে তলিয়ে নিয়ে যাচ্ছে–স্বাহঙ্কার ও আপসের চরম উৎকর্ষে। কখনো কখনো তা ঔদ্ধত্যে জ্বলজ্বলে। অন্যদিকে বাঙালি সঠিক ও উপযুক্ত নেতৃত্বের অভাবে কখনোই সুসংহত জাতি হিসেবে তার রাজনৈতিক পরিচয় তৈরি করতে পারেনি। বিশ্বাসঘাতকতা, ক্ষমতালিপ্সা, ব্যক্তিপূজা, নেতৃত্বের প্রতি আস্থাহীনতা, ষড়যন্ত্রী, ভীরু অথচ উচ্চাকাঙ্ক্ষী চরিত্র বাঙালির রাজনৈতিকজীবনকেও বারবার বিঘ্নিত ও বিপর্যস্ত করেছে।

স্ববিরোধিতা প্রাতিষ্ঠানিকতা পেয়েছে লিটল ম্যাগাজিন কর্মীদের হাতেই। কেউ ফতোয়া দিয়ে বড় কাগজে গিয়েছে, কেউ বড় কাগজ থেকে ছোট কাগজে, কেউ-বা প্রকাশনা দিয়ে ফাঁদ পেতেছেন ‘মহান কারিগর’। অনাগ্রহ, উদাসীনতা, ভণ্ডামি ও আঁতলামি যেন এদের স্বভাবে জেঁকে বসেছে দিনে দিনে। কবিতা এখন তো আর গীত নয়, মূর্খ সভায় পাঠান্তরও নয়, কবিতা এখন শিতি মানুষের আরাধ্য ও সাধনায় পরিণত হয়েছে, পাঠকও এ-শ্রেণিভুক্ত। পাঠককে গেয়ো, মূর্খ, অসচেতন, বোকা ভাববার কোনো কারণ নেই। বিজ্ঞানের উন্নয়ন বা বিকাশের পাশাপাশি তার বিস্তারও ঘটে গেছে সমাজে নানাভাবে–নানা পর্যায়ে–নানা দিক দিয়ে। সে ক্ষেত্রে আঁতলামি, নোংরামি কিংবা ছেঁচড়ামি করার কোনো সুযোগ নেই। এই সবুজাভ যাত্রায় লেখক-পাঠক উভয়কেই সৎ ও মননশীল হয়ে উঠতে হয়। সৎমানুষ সাধারণ এবং অসাধারণ উভয় জ্ঞানেই সম্পন্ন হয়ে ওঠেন। মুখাপেক্ষী বা আঁতেল নয়, আলেম অথবা কবি হন; প্রকৃত কবি নবীর সমান। আলেম অর্থ জ্ঞানী, জ্ঞানীজন লালনের ভাষায়–‘সর্বসাধন সিদ্ধ হয় তার, ভবে মানুষ গুরু নিষ্ঠা যার।’ ব্যক্তিগত কমিটমেন্ট ও স্বপ্ন-সম্ভব সম্ভাবনার বিকাশ আজ সমাজে ও কবিতায় সবচেয়ে জরুরি হয়ে পড়েছে এবং তার ব্যবহার আবশ্যকতাও সমানভাবে প্রযোজ্য। আর একজন সৎ কবি বা সাহিত্যিক সে-সাধনাই করেন দ্বন্দ্বচর্চার প্রপেণে।

কবিতায় আধুনিকতা প্রসঙ্গটিকে পুনর্মূল্যায়ন করার সময় এসেছে। বাংলা কবিতার ক্ষেত্রে আধুনিকতা শব্দটি উচ্চারণের সঙ্গে সঙ্গে দীতি পাঠকের চেতনায় যে অনুষঙ্গগুলো ফুটে ওঠে, সেগুলোকে তিনটি পর্বে ভাগ করা যেতে পারে। প্রথমত, আধুনিক কবিতা রবীন্দ্রোত্তর বা রবীন্দ্র-রচনার প্রাতিষ্ঠানিকতা, দাপট ও সর্বব্যাপ্তির প্রতিক্রিয়ায় একধরনের পাল্টা কাব্যভাষা। ভাষাকেই বদলানো বা ভাষার স্বাস্থ্যোদ্ধার সেখানে খুব বড় একটা জায়গা নিয়ে আছে। ভাষাকে পাল্টানো : আঙ্গিকের দিক থেকে, কবিতার ভাষাকে মুখের ভাষার কাছাকাছি নিয়ে আসা। দ্বিতীয়ত, আধুনিক কবিতা বলতে বাঙালি পাঠক যা বোঝেন, তা মোটামুটি সজনীকান্ত দাস-এর শ্লেষার্থে ব্যবহৃত আধুনিক। অর্থাৎ রবীন্দ্রানুসারীদের প্রচারিত ত্রিশের নব্য, রবীন্দ্র-বিরোধী কবিদের ক্যাম্পের সম্বন্ধে এক নঞর্থক ধারণা–যা চলে এসেছে সাম্প্রতিক কাল-পর্যায়ে ষাট বা সত্তর পর্যন্ত। এখানে, আধুনিক কবিতা মানে দুর্বোধ্য, ধোঁয়াটে, কখনো কখনো বেপরোয়া অশ্লীলও। আধুনিক কবিতার তৃতীয় ব্যাখ্যা হলো সেই কবিতা–যা বিশের দশকের পর থেকে অর্থাৎ প্রথম বিশ্বযুদ্ধোত্তর সময়ে মূলত ইংরেজি এবং সঙ্গে সঙ্গে ফরাসি কবিতা ইত্যাদির প্রভাবে নিজেকে পাল্টে নেয়। অর্থাৎ এই ধারণায় আধুনিকতার সঙ্গে পাশ্চাত্য প্রভাবের একটি সংযোগ আছে। পাশ্চাত্যার্থ মূলত ইউরোপ। বোদলেয়ার, ইয়েটস, পাউন্ড, এলিয়ট প্রমুখ কবি আধুনিক ধারণাকে দ্রুত আত্তীকরণ করা ও বাংলা কবিতায় তার অনুপ্রবেশ ঘটানোই আধুনিক কবিতার প্রগতির সূচক, আধুনিকতার দ্যোতক–এই ধারণা বা উপপাদ্যটি মূলত কলকাতাকেন্দ্রিক বিবেচনা থেকে এসেছে। এটার সত্যতা অনেকটাই নিরূপিত হয় আর্থ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের অন্য সব ঘটনার যথার্থতা থেকে–সমাজের অবক্ষয়, প্রথম বিশ্বযুদ্ধোত্তর সংকট ইত্যাদির প্রতিফলনে।

রবীন্দ্রোত্তর কবিতায় বাংলা ভাষার স্বাস্থ্যোদ্ধারের যে উল্লেখ আছে, তার ভিতরে আরো একটু প্রবেশ করলে আমরা এই প্রশ্নগুলোর মুখোমুখি হবো। ভাষার স্বাস্থ্য সম্বন্ধে একটা বিশেষ ধারণার বশবর্তী হয়ে ভাষার স্বাস্থ্যোদ্ধারে এগোনোর কোনো বিশেষ লগ্ন কীভাবে নির্ধারিত হবে, সেই লগ্নটি কি সত্যি নির্ধারিত হয় কবিতার ভাষার দ্বারা, না-কি ভাষা-বহির্ভূত, অন্য কোনো আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ফলশ্রুতি তা? এই সিদ্ধান্তের কথাটিও কি একধরনের ভাষাবিশ্ব বা চিন্তাপ্রক্রিয়ার ফসল? নাকি বাস্তবতাকে আমি যেভাবে দেখতে চাইছি–তারই প্রতিফলন? অর্থাৎ আমি যেভাবে বাস্তবতাকে আমার ভাষাবিশ্বের প্রিজমের ভেতর দিয়ে প্রসারিত ও প্রতিফলিত এবং পরিবর্তিত অবস্থায় পাচ্ছি, সেটাই আমার আর্থ-সামাজিক বাস্তবতা হয়ে দাঁড়াচ্ছে; অর্থাৎ প্রকৃতপে আমারই সিদ্ধান্ত বলে আমি আমার বাস্তবতাকে নির্মাণ করছি এবং আমার কবিতা সেই নির্মাণেরই অন্তর্গত হয়ে যাচ্ছে।

এই সিদ্ধান্তগুলোর নির্মাণ-প্রক্রিয়া অনেকটা সচেতনকৃত, তাই যে-কোনো ধরনের ‘নির্মাণ’কেই আধুনিকতা বলা যায়। কোন সময়ে কাকে আমি ‘আধুনিক’ বলবো–তা নির্ভর করে ঐ সময়ের বুদ্ধিজীবীদের যৌথ প্রবণতা ও সম্মিলিত সিদ্ধান্তের ওপরে। তার পরেও রবীন্দ্রনাথ রবীন্দ্রনাথ-এর সময়ে, ইয়েটস ইয়েটস-এর সময়ে, বোদলেয়ার বোদলেয়ার-এর সময়ে আধুনিক। ত্রিশের দশকে বুদ্ধদেব বসু ছিলেন কবিতায় আধুনিকতাকে সংজ্ঞায়িত করা ও এর প্রতিষ্ঠা দেবার পেছনে অন্যতম এক বুদ্ধিজীবী। আধুনিকতার এক মুখপাত্রই বলা যায় তাঁকে সে অর্থে। বিষ্ণু দে, সুধীন্দ্রনাথ দত্ত, বুদ্ধদেব বসু–এঁদের আলোচিত ও সংজ্ঞায়িত ‘আধুনিকতা’ই হয়ে দাঁড়ালো এরপর থেকে সমস্ত পরবর্তী কবিতার মান-নিরূপক, যার ভিত্তিতে যে-কোনো রচনার আধুনিকতা-অনাধুনিকতা বিচার করা চলতে থাকে। দেখা গেল, আধুনিকতার নির্মাণস্থল হয়ে দাঁড়ালো কলকাতা শহর। কলকাতা শহরের বৌদ্ধিক-সামাজিক-সাংস্কৃতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা ও রুচির ধরন-ধারণ তথা তার ব্যর্থতা ও সাফল্যের নিরিখে, বলা যায় এই প্রেক্ষাপটেই বাংলা কবিতায় আধুনিকতা নির্মাণের জমি তৈরি হলো। অর্থাৎ এককথায়, বাংলা ‘আধুনিক’ কবিতা হয়ে উঠলো কলকাতার কবিতা। সত্তরের দশক অব্দিও এই ফর্মুলা অপরিবর্তিত থেকে গেল পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশে। যেহেতু কলকাতার আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষিতটিই নির্ধারণ করে দিচ্ছে ‘আধুনিকতা’ কী এবং কেমন হবে, সে-কারণে এই আধুনিকতা অন্য কোনো প্রেক্ষিতে, অন্য কোনো রাজনৈতিক ঘটনাকে, অন্যভাবেও সংজ্ঞায়িত বা নিরূপিত হতে পারতো। এটা নির্মম হলেও সত্য এবং এর কারণ অনুসন্ধানের প্রয়োজন আছে।

‘সহজ কথা যায় না বলা সহজে’–সেই রবীন্দ্রনাথ-এ এসেই কবিতা খুঁজে পেল সহজ ভাষা এবং এই ধারা অব্যাহত রইলো ত্রিশের দশক পর্যন্ত। কিন্তু চল্লিশের দশকের পর থেকে সহজ ভাষা আরো সহসা রূপ পেল মুখের ভাষায় এবং উত্তরাধিকার বয়ে চললো পঞ্চাশ ও ষাটের দশকেও। এরপর সত্তর দশকে এসে রাজনৈতিক ভাষা স্লোগান প্রধান করে কথা ক’য়ে উঠলেও, কোথাও কোথাও সহজতা হয়ে পড়লো তরলতা যোগ গদ্য-পদ্য প্রধান। যেখানে ভাবের সন্ধান মিললেও শিল্পের গান ব্যাহত হলো। আর এ-প্রসঙ্গে বলে রাখা ভালো, এ-দশকার্থে শুধু সেই দশকের যাত্রা শুরুর লেখকেরাই নন, পাশাপাশি ঐ দশকে ধারাবাহিক চর্চায় অংশগ্রহণকারী তরুণ-প্রবীণ কবির অনতিক্রম্য যাত্রাও বিবেচ্য।

আশি এবং নব্বইয়ের দশকে সেই যাত্রার ধ্বনিই হয়ে পড়লো জটিল-কুটিল, কখনো কখনো অতি তরলীকরণ, হাস্যকর ও গা-ছাড়া। ব্যতিক্রম ব্যতিক্রমই এবং ব্যতিক্রম কখনোই উদাহরণ হতে পারে না। অবোধ্য হলো না ঠিকই, কিন্তু জটিল-কুটিল অর্থে এখানে দুর্বোধ্যতার প্রচারণা মুখ্য। কেননা চর্যাপদ থেকে মধ্যযুগের উজ্জ্বলতর সৃষ্টি বৈষ্ণব পদাবলী, শেষের দিকে গদ্য ও উপন্যাসমুখর যাত্রা–সবই ছিল এ-কালের বিবেচনায় ভাষার বুঝে না-ওঠার ব্যর্থতা বা প্রচলিত ভাষার সঙ্গে এগোতে না-পারা। কিন্তু এই দুই দশকে শব্দের বাড়াবাড়ি রকম ব্যবহার চোখে পড়বার মতো–যা দুর্বোধ্যতায় পরিগণিত। সবাই রান্নার কাঠখড় নিয়েই মেতেছেন বেশি, খাবারের স্বাদ নিয়ে চিন্তা করেননি। ভেবেছেন খাবেন পাড়া-প্রতিবেশী, তার জন্য তো ফ্রিজে রবীন্দ্রনাথ, বোদলেয়ার, চেকভ, শেকসপিয়র, ওমর খৈয়াম তোলা আছে। এভাবে একদল কাঠখড় সংগ্রহ ও সাইজ কাঠামো তৈরিতে ব্যস্ত রইলেন; অন্য দল আগে তেল না পানি, পিঁয়াজ না মরিচ–এই করে সারা দুপুর; তৃতীয় দল কি রান্না হবে তার কোনো খোঁজ-খবর না-জেনেই স্বাদ-আলোচনায় উত্তরাধুনিক হয়ে উঠলেন; কিন্তু বিষয়, ভাব ও হাতজশ নিয়ে ভাবলেনই না এবং খাবার যারা গ্রহণ করলেন, তাদের জিহ্বা ও দাঁতের খোঁজ না-নিয়েই লেগে পড়লেন পাতিল-খুন্তি চর্চায়–যা অশোভন, অমানবিক ও উচ্ছৃঙ্খলতার শামিল। আবার এরাই দলবেঁধে ন্যাংটো উৎসব করে, মেয়ে-বউয়ের শরীরী মাপজোক শ্লীল শব্দে বস্তাবন্দি করে। কারণ শ্লীল-অশ্লীল শব্দের দ্বন্দ্বে এদের হাত-পা কাঁপে, সঠিক জায়গায় সঠিক উচ্চারণটি করতে দ্বিধান্বিত ও মূক হয়ে পড়ে, আবার সময়ে সময়ে তথাকথিত বিদ্রোহীর মুখে পান চিবোয়, চুন-সুপারি-খয়েরেরও যে একটা মূল্য আছে–তা তাদের চর্মজীবনে কে বিশ্বাস করাবে?

এ-পর্যায়ে আঞ্চলিক শব্দ ও ধ্বনি ব্যবহার এবং লোকজ ও ঐতিহ্যের দোহাই দিয়ে কবিতায় ঢুকে পড়লো অশুদ্ধ, অপ্রচলিত ও পুরনো সব শব্দ–যা আধুনিকতার নামে কলঙ্ক ছড়ালো। কোথাও কোথাও অশিক্ষিত গোবেচারা ভাব ফুটে উঠলো–যা কারো কারো হাতে অতি তরলীকরণের উচ্ছ্বাসে রূপ পেল এবং এই সময়েই সমাজ ও পারিবারিক জীবনে ব্যর্থ, হতাশাগ্রস্ত ও কোথাও ঠাঁয় না-পাওয়া দুর্বৃত্তেরা এসে জুটলো সাংস্কৃতিক বলয়ে : কবি, সাংবাদিক, নাট্যকর্মী, শিল্পী, সমালোচকের ভূমিকায়–এরা পথ আগলে দখল করলো প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়া এবং ছড়িয়ে পড়লো ঢাকাসহ দেশজুড়ে; নিজের ও অন্যের অঞ্চল এক করে ফেললো। তোষামোদকারী, আপসকামী কিংবা সন্ত্রাসী-চাঁদাবাজ বলা যায় এসব সংস্কৃতিকর্মীকে। যাদের লোভ ও মোহের লোল ঠোঁট গড়িয়ে বুকের সরুপথ বেয়ে নাভিমূল হয়ে নিম্নদেশমুখী হলো। ফলে কোনোকিছুই আর কমিটমেন্টের আওতায় থাকলো না, চলে গেল অতি-গণতন্ত্রায়নের ফিল্মি নায়িকার স্থূল গতরে। সংস্কৃতিসেবীর মুখোশ পরিচয়ে বেড়ে গেল আমলা, অধ্যাপক ও সাংবাদিক–যা গড়চর্চারও নিচে গিয়ে দাঁড়ালো। এর উদাহরণ প্রতিবছর একুশে বইমেলা ও অন্য সময়ে প্রকাশিত বইয়ের মধ্যে কতগুলো পাঠযোগ্য–সে বিবেচনা থেকে চিহ্নিত ও পরিষ্কার। ফলে হাস্যকর ও গা-ছাড়া হয়ে পড়লো সাহিত্যচর্চা ও সংস্কৃতিকর্মীর আসন।

মানুষের কথা, দেশপ্রেম যেন চিরকালের জন্য দেশান্তরিত হলো অতি-আধুনিকতা বা উত্তরাধুনিকতার নামে। চোর, ছেচ্চড়, বদমাশে পরিণত হলো অধিকাংশ সংস্কৃতিকর্মী। ফলে নিম্নবিত্তের মানুষের কথা স্থান পেল না, মধ্যবিত্তের কচকচানি থাকলো, পাশাপাশি উচ্চবিত্তের জৌলুস ও বেহায়াপনা স্থান পেল সাহিত্য ও মিডিয়ায়। ব্যক্তিত্ব দাঁড়ালো না, মেরুদণ্ডও না। তবে দাঁড়াবেটা কী? প্রশ্ন রয়ে গেল বিচিশূন্য তলপেটের নিচে নিরানন্দে, নিরুত্তাপে। তবুও জনসংখ্যা হ্রাস পেল না অথর্বদের কাম-কাজ থেকে। এভাবে ইতিবাচক ধ্যান-ধারণা জলাঞ্জলি দিয়ে নেতিবাচক আক্রোশ ফুটে উঠলো সর্বত্র। কবিদের স্থান এর থেকে খুব দূরে হলো না। ভূমি দখলের মতো পাতা দখল ও পতিতচরিত্র ফুটে উঠলো জীবনযাপনে। নারী খেলনা হয়ে গেল, বেড়ে গেল সমকামীর সংখ্যাও। বোকাবাক্সের লোকগুলো তার প্রমাণ দিলো প্রতি পদে পদে। ছড়িয়ে পড়লো মসজিদের ইমাম থেকে–মিডিয়া-ব্যক্তিত্ব, বুদ্ধিজীবী থেকে–না-খেয়ে থাকা শিশুর বস্তি পর্যন্ত। সংস্কৃতিকর্মীর একটা বড় অংশ মিথ্যাবাদী, কমিটমেন্টহীনতায় পতিত হয়ে পড়লো ধর্মে-কর্মে ও শরমে। দ্রোহ লুকালো ইঁদুরের গর্তে, আর জীবনের সবচেয়ে ব্যর্থ মানুষগুলো হয়ে উঠলো সাহিত্য-সংস্কৃতির কেশরবিহীন সেবক-সিংহতে। এ আমাদের একধরনের জাতিগত দুর্ভাগ্য এবং নীতিহীন বেড়ে ওঠা শরীর ও মনের দীর্ঘকালের ভীরুতার ফলাফল; দাসনীতি তাই এখনো প্রকট সমাজে ও রাষ্ট্রে।

এই পরিপ্রেক্ষিতে স্বপ্ন-সম্ভব সম্ভাবনার সাহসী বাস্তবায়ন ও কার্যকারণ যেমন জরুরি, তেমনি ব্যাপক শুদ্ধি অভিযান প্রয়োজন সাংস্কৃতিক ধ্বনি-যাত্রার অন্দরে-বাইরে। তবেই উত্তরণের গান আলোর মুখ দেখবে। ভালো মানুষ, সৎ মানুষ এখনো আছে। তাদের একত্রিত হতে হবে–ঘরে-বাইরে; ধর্ম, রাষ্ট্র ও সমাজে। এগিয়ে আসতে হবে বিপ্লবের অগ্রনায়কদের শ্রেণি-বৈষম্য ভুলে সত্যিকার সাহিত্যসেবায়, সংস্কৃতিচর্চায়। সেইদিন পরাভূত নয় নিশ্চয়?

তা ছাড়া আঠারো ও উনিশ শতকের শিক্ষা আমরা ভুলতে বসলাম বিশ শতকের শেষ ত্রিশ বছরে। আমাদের ভূখণ্ডগত স্বাধীনতা ও মুক্তিসংগ্রাম–অহংকার ও আনন্দের একই সঙ্গে; আবার আমাদের পরাজয়–ধর্মীয় মৌলবাদ, জঙ্গিবাদ ও দেশদ্রোহ এখন একান্ত একার ব্যক্তিগত ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র স্বার্থের কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছে। সাহিত্যেও এর প্রভাব পড়েছে। শিক্ষাব্যবস্থার উন্নয়ন হয়নি, সঙ্গে সঙ্গে বিকাশ লাভ করেনি দেহ, মন ও আত্মার বেড়ে ওঠা ও প্রকাশ। কী রীতিতে, কী ইঙ্গিতে? ধর্ম, রাজনীতি, নেশা ও শরীর-ভোগগত প্রেম অন্ধকারে ঢেকে ফেললো সম্ভাবনা-উত্তর স্বপ্নযাত্রা ও শিকড়ের রূপ-রস-গন্ধের অস্তিত্বকে। ব্যর্থতার কাল একুশ শতকের শুরুর দশকেও প্রযোজ্য, তবে আশার কথা : গত শতাব্দীর কেদ দূর হচ্ছে–নতুনের জয়গানে, দেশপ্রেম ও কমিটমেন্টের ডকুমেন্টারি থেকে মাটিতে, বাতাসে, প্রচ্ছন্ন ব্যক্তিত্বে। ‘অহংকার’ ব্যক্তিত্বের মূল হয়ে উঠছে ব্রিটিশদের চেতনা দ্বারা প্রভাবিত ভাব-সম্প্রসারণ ভুলে। এসব সৃষ্টিপর্বের আনন্দ-বেদনার জয়ধ্বনিই।

একজন স্রষ্টা বা শিল্পীর কাছে ভাবটিই প্রধান। কেননা ভাব-ই উদ্গত হয় মস্তিষ্কে–শিল্পের শরীরে। ভাব উপগত হলে একজন শিল্পী তা প্রকাশের মাধ্যম খোঁজেন এবং তার চেনা-জানা পথ বা সংশ্লিষ্ট গতিরেখায় উপনীত হন–প্রকাশ বা সংযুক্ত করতে। একজন সাহিত্যিক সে কাজটিই করেন সাহিত্যের বিভিন্ন ফর্মে, কখনো কবিতায়, কখনো গল্পে, কখনো উপন্যাসে কিংবা অন্য কোনো শাখায়, ভিন্ন প্রদেশে। যেখানে সাহিত্যের দেশ একটি সৌরমণ্ডলীর মধ্যে নির্দিষ্ট না-থেকে পৌঁছে যায় কল্পনারও অতীত অতীন্দ্রিয়তায়–হয়তো-বা গ্রহানুভূতির বাইরে পৃথিবী অথবা প্রকৃতিকাতর কনসেপ্টের নতুনত্বে বহু ঈশ্বরের স্বরকল্পকতায়। কবি কবিতায় আদিষ্ট হন, চিত্রশিল্পী তাঁর রঙতুলির আঁচড়ে, বাঁশি তার নিবিষ্ট স্রষ্টার কারুকার্যময় ঠোঁটযুগলে। ভাবের এই প্রকাশই আদি এবং তা কখনো দৃশ্যতর, কখনো দৃশ্যহীন স্বপ্নকল্পনায় সীমিত অথবা অসীমের দূরযাত্রায় পরিব্যাপ্তিত।

মোটা দাগে ‘না-গল্প না-কবিতা’ গল্প ও কবিতার একটি মাঝামাঝি রূপ হিসেবে পরিগণিত হলেও, এর শিল্পরূপটি বিশেষভাবে স্মর্তব্য–যা কবিতার স্বাদকে গল্পের আবহে ঢেকে ফেলেছে, কখনো কবিতাই হয়ে উঠেছে মুখ্য–গল্প একেবারেই গৌণ, কিন্তু শেষ পর্যন্ত কোনোটিই দাঁড়াতে পারেনি; দাঁড়িয়েছে শিল্পের স্বরূপ ও অরূপের একপ্রকার খেলা–যা প্রমথ চৌধুরী-র ‘সাহিত্যের খেলা’কে বিশেষভাবে স্মরণ করিয়ে দেয়। এই টেকস্টযাত্রা উত্তরাধুনিকতাকেই চিহ্নিত করে, যদিও আধুনিকের উত্তর আরেক নতুন আধুনিক–যা ‘আধুনিক’ হিসেবেই প্রতিষ্ঠা পায়, শুধু সময়টা অন্যতর–অন্য-এক আলো-অন্ধকার ও বাস্তবতা।

আমার বিশ্বাস, মানুষ শুধুই টিকে থাকবে না–সে সফলতা পাবে। সে অমর, কিন্তু সেটা এই কারণে নয়–প্রাণীদের মধ্যে শুধু তারই এক অফুরান কণ্ঠস্বর আছে; বরং এই কারণে যে, তার আত্মা আছে, সেটা এমন-এক সত্তা–যেটা মায়া-মমতা, আত্মত্যাগ ও ধৈর্যসহিষ্ণুতায় ভরপুর। কোনো কবির, কোনো লেখকের কর্তব্য শুধু এই নিয়েই লেখা। তার যে বিশেষ অধিকার আছে, মানুষের হৃদয়কে উন্নীত করে তিনি যে ধৈর্যসহিষ্ণুতায় বাঁচতে সাহায্য করতে পারেন, তাকে তিনিই মনে করিয়ে দিতে পারেন স্পর্ধা আর সাহস আর সম্মান আর আশা আর অহমিকা আর মায়া-মমতা আর আত্মত্যাগ–যা ছিল তার অতীত মহিমা। নিছক মানবস্বরের প্রতিলিপি হয়ে থাকার তো দরকার নেই কবির স্বরের, সেটা নানা কৃৎকৌশলের একটা হতে পারে, বরং আসল খুঁটিকৌশল একাই হতে পারে–যা অসীম সহিষ্ণুতায় টিকিয়ে রেখে সাফল্য অর্জন করতে তাকে সাহায্য করবে।

গল্পও ঠিক কবিতার শিল্পপথেই আরেকটি মাধ্যম বা প্রকাশভঙ্গির স্বাতন্ত্র্য, ভিন্ন শাখা, ভিন্ন প্রদেশ। এ ক্ষেত্রে সাহিত্যের দেশ একটি সৌরমণ্ডলীর মধ্যে নির্দিষ্ট না থেকে পৌঁছে গেছে কল্পনারও অতীত অতীন্দ্রিয়তায়–যেখানে হয়তো গ্রহানুভূতির বাইরে পৃথিবী অথবা সৌরমণ্ডলীর প্রকৃতিকাতর কনসেপ্ট নতুন করে লিখতে হচ্ছে বহুঈশ্বরের স্বরকল্পকতায়। সেখানে গল্পকে আমরা কীভাবে পাই? বিজ্ঞান ও ধর্মের যে দ্বন্দ্ব এবং সহাবস্থান, ঠিক একইভাবে যাজক ও রাজনীতিকের মধ্যে যে যোগসাজশ বা অভিন্নতা–তাই পুরো পৃথিবীকে নিয়ন্ত্রণ করছে নানা বেশে ভয়ঙ্কর রকমভাবে। সেখানে মানুষ এবং জীব ও প্রাণিকুলের মূল্য বা নিরাপত্তা কতটুকু গ্রাহ্য অথবা গ্রাহ্য নয়। আমাদের সাহিত্যচর্চাও এর বাইরে নয়। সে-কারণে দেখা যাবে, নতুন গল্পের প্রকরণে বা শরীরে উঠে এসেছে নানা দিক ও বৈচিত্র্য। অভিধান প্রণেতাদের চোখে গল্প বা গপ্পো–কাহিনী, উপকথা, ক্ষুদ্র বা ছোট উপন্যাস; অন্যার্থে কথাবার্তা, আলাপ অথবা গালগপ্প। লেখার ভেতরে গল্প এবং আকৃতিতে ছোট হলেই ছোটগল্প হয় না। আকৃতিগত ব্যতীত, প্রকৃতিগত এবং মর্মগত ভিন্নতা একে উপন্যাস হতে পৃথক শ্রেণিভুক্ত করেছে। হেনরি জেমস মনে করেন, ঘটনার সংস্থান বিশ্লেষণই ছোটগল্পের প্রধান করণীয় দিক। হাডসন বলছেন, ছোটগল্পের গতি ও লক্ষ্য হবে একমুখী এবং এডগার এলান পো-এর মতে, আধঘণ্টা হতে দু’ঘণ্টার মধ্যে পড়ে শেষ করা যায়, এমন একটি কাহিনী ছোটগল্পের উপযোগী। এইচ জি ওয়েলস বলেন, ছোটগল্প দশ হতে পঞ্চাশ মিনিটের মধ্যে শেষ হওয়া বাঞ্ছনীয়। আবার ছোটগল্পে সমারসেট মম পেতে চান, নাটকীয় ঐক্যসূত্রে সৃষ্ট সংহতি। আর রবীন্দ্রনাথ ‘সোনার তরী’র ‘বর্ষাযাপন’ কবিতায়–ছোট প্রাণ, ছোট ব্যথা, তত্ত্ববর্জিত পাঠ করার পরও অন্তরে অতৃপ্তি থাকবে অর্থাৎ ‘শেষ হ’য়ে হইলো না শেষ’–উপলব্ধি প্রকাশ করেন ছোটগল্পের ক্ষেত্রে। যেখানে পাওয়া যাবে বিন্দুতে সিন্ধুর প্রকাশ। মোদ্দাকথা, ছোটগল্প জীবন ও জগৎ থেকে আহরিত ভাব বা প্রতীতির শিল্পসম্মত স্বল্পায়তনিক প্রকাশ–যা গদ্যভাষায় বিন্যস্ত হয়ে কোনো-না-কোনো চিরন্তন সত্য বা জীবন সত্যের উদ্ভাস নিশ্চিত করে তোলে। অনাবশ্যক কথা, অনাবশ্যক ভাষা, অনাবশ্যক চরিত্র ও ঘটনা প্রভৃতিকে নিষ্ঠুরভাবে বর্জন করে লেখক শুধু একটি রসঘন নিবিড় মুহূর্তের–One pre-established design-এর জয়োল্লাস পরিকল্পনায় মগ্ন থাকেন এবং আত্মকেন্দ্রিক মনোনিবেশের সাহায্যে গ্রহণ করেন। কোথায় শুরু করতে হবে এবং কোথায় শেষ রেখা টানতে হবে–এই শিল্পদৃষ্টি যার নাই, তার পক্ষে ছোটগল্প লেখা বাতুলতা ছাড়া আর কিছু নয়। জীবনের খণ্ডরূপ এখানে একটি বিশেষ রূপে (form) ধরা দেয়। এই রূপ-সৃষ্টিকে সার্থক করার জন্য লেখক গল্পের উপাদান ও ভাব-বিন্যাস একটি মাত্র রসপরিণামমুখী করে তুলতে চেষ্টা করেন। অবশ্য উপন্যাসে যত বিষয়ে আলোচনা হতে পারে, এখানেও তা সম্ভব, কিন্তু ছোট পরিধির মধ্যে। উপন্যাস বিস্তৃত, ছোটগল্প সংহত; উপন্যাসে পরিতৃপ্তি, ছোটগল্পে ব্যঞ্জনার অতৃপ্তি। উপন্যাস পাঠককে সবই বুঝিয়ে দেয়, ছোটগল্প তাকে বুঝবার অবকাশ দেয়।
অন্য এক সমালোচকের অভিমত–গল্পকে গল্পই হয়ে উঠতে হয়, অনেকটা মাটি থেকে আধহাত ওপরে। অর্থাৎ বাস্তবের সঙ্গে কল্পনার সংমিশ্রণ থাকবে এবং স্বপ্ন বিস্তারিত হবে দূর সম্ভাবনায়। আবার কেউ কেউ বলছেন, গল্পের মধ্যে গল্প থাকতে হবে। অর্থটা হয়তো এরকম–একটি গল্পের মধ্যে অনেক গল্প এসে ভর করবে বা গল্পকে গল্প করে তুলবার জন্য আরো অনেক ছোট ছোট, অতি ক্ষুদ্র গল্পের প্রবেশাধিকার ঘটবে। গল্পকে শেষ পর্যন্ত গল্প হয়েই উঠতে হয়, জীবন ও জগতের উপস্থিতির বর্তমানে। তাহলে সৌরমণ্ডলীর বাইরে কি কিছু থাকবে না? গল্প হয়তো সেগুলোও ধারণ করবে বা ধারণ করছে। না-গল্প না-কবিতার যাত্রা এই অনির্দিষ্টতা থেকে, সীমার মধ্যে অসীমের বার্তা। আবার অনেকটা এরকমও যে, সহজ কথা সহজ করে বলা যায় না, এমনকি অন্য সব ক্ষেত্র ও কাজেও। সেটা হোক গল্প কিংবা কবিতায়। সে-কারণে সহজ করে বলার মধ্য দিয়ে যে সহজতা, তা না-গল্প না-কবিতায় সাবলীলভাবে উচ্চারিত ও প্রকাশিত। শিল্পের এ-এক জগৎ, যেখানে কোনো নির্দিষ্টতাই নির্দিষ্ট রূপ পায় না। আবার সব কথাই শেষ কথা নয়, যেমন শেষ কথা নয়–শিল্পের শিল্পত্ব বিচার। দৃষ্টিভঙ্গি এবং অবস্থান-অবচিতির কারণে তা প্রশ্নবিদ্ধ, কখনো-বা নতুন প্রশ্নোত্তরের জন্ম দেয়। শিল্পযাত্রার যে পথ–তা ক্রমপ্রসারমান ও আবিষ্কারঋদ্ধ। অনেকটা বিজ্ঞানের পরীক্ষাগারের গবেষণা ও ফলাফলের মতোই দর্শনের দূর দৃষ্টিভঙ্গি ও প্রয়োগ সম্ভাবনায়। তা কখনো দৃশ্য, কখনো দৃশ্যের বাইরে। চোখ থাকলেই সবাই সবকিছু দেখতে পায় না, যেমন বয়সের কারণে কাউকে তরুণ বা নবীন অথবা প্রবীণ হিসেবে নির্দিষ্ট করা যায় না; মনের ঘর-বাড়ির সমৃদ্ধতা ও ব্যবহারের ওপর তার বিচার ও বিশ্লেষণ চলে। ব্যবহারোপযোগিতা ও অভ্যাস এ ক্ষেত্রে অনেকখানি প্রভাব ফেলে, যেমন প্রভাব ফেলে স্রষ্টার জ্ঞান ও জ্ঞানান্বেষণের সাধনার ওপর। ধ্যান এখানে মুখ্য, লোকশ্রুতি অগণ্য। লোকজ দৃঢ়তা ও দেশপ্রেম একজন খাঁটি নাগরিকের জন্য যেমন অবশ্য আবশ্যক, তেমনি শিল্পের নাড়ি-নক্ষত্র বুঝবার জন্যও শিল্পবোধ ও শিল্পজ্ঞান থাকতে হয়। তা না-হলে সবাই কবিত্ব অথবা পাণ্ডিত্য লাভ করতো। কবি এখানে সর্বতোভাবে ব্যবহৃত এবং পণ্ডিতার্থে জ্ঞানসমুদ্রের অকূলপাথার যাত্রীর কমিটমেন্টকে উদ্দিষ্ট করা হয়েছে।

তা ছাড়া সাম্প্রতিক সময়ে গল্প সম্পর্কে যে অভিযোগগুলো উঠে এসেছে, তা থেকে না-গল্প না-কবিতার একটা স্থিতি ও চিত্ররূপ পাওয়া যেতে পারে। যেমন–বিভিন্ন গল্পকার ও সমালোচকের ভাষ্যানুযায়ী : গল্প হচ্ছে কাব্য আক্রান্ত; মিথ ও রিপোর্ট নিয়ে লেখা হচ্ছে; রিপোর্টিং ধাঁচের; তথ্য ও ডাটানির্ভর; গল্পের ওপর জবরদস্তি; স্টান্টবাজি; আখ্যান বর্ণনায় কবিতার ট্রিটমেন্ট; অনুগল্পের নামে এক লাইন দুই লাইন লিখে তৈরি করার চেষ্টা; সর্বোপরি গল্পহীন গল্প। সে ক্ষেত্রে কেউ এসে বলছেন, লেখা নির্ভর করে লেখকের শক্তিমত্তার ওপর। কেউ লিখলে তা ডাটা হয়, কেউ লিখলে হয় গল্প। এটা নিশ্চয়ই হয়ে ওঠার প্রক্রিয়া-মাধ্যম ও সমন্বয়যাত্রার আওতাধীন এবং একজন লেখকের সাধনা ও শ্রমের ওপর নির্ভরশীল।


পরিবর্তিত বিশ্ব-পরিস্থিতি ও এর দেশ-কাল-পরিবেশের ওপর ভিত্তি করে আধুনিক কবিতাও নতুন বাঁক খুঁজে নিয়েছে, দেখা দিয়েছে অনন্যযাত্রার ঐশ্বর্য ও ভিন্নপত্র। আর এ-পথে এসেই আবিষ্কারপ্রবণ মন সন্ধান করেছে নতুন কিছু করার প্রত্যয়ে অভিন্ন সংশ্লেষ ও দূর-যাত্রার সম্ভাবনা। এখান থেকেই পথ হয়েছে বিস্তৃত এবং এই বিস্তৃত পথই আগামীর না-দেখা–না-বলা–না-জানা অভিব্যক্তি সারাৎসার।
এই পরিপ্রেক্ষিতে দেখা যাবে, না-গল্প না-কবিতা–গল্প ও কবিতার সংজ্ঞা বা শিল্পগুণ একার্থে স্বীকার করে নিলেও, সে তার নিজস্ব বৈশিষ্ট্যগুণেই বেরিয়ে যাবে–উপস্থাপনগত গঠনশৈলী ও প্রকাশভঙ্গির স্বাতন্ত্র্যে। দেখা যাবে, একই বিষয় বা টার্ম ব্যবহার করে ভাব কিংবা অন্তর্নিহিত সত্যের কাছাকাছি থেকেও সৌন্দর্যচর্চা বা শিল্পচর্চা হবে, যেখান থেকে পৃথক হয়ে পড়বে তার দৃশ্যকল্পনায় ও এডিটিংয়ে। শুরুতে বলা হয়েছে, এটা অনেকটা ব্লেনডারকৃত গল্প-কবিতার একটা রসজুস হলেও, এখানে শিল্পগুণ ও বিশিষ্টতা পর্যাপ্তভাবে পরিলতি হয়। সমালোচকের কলমে কখনো-বা তা বৈচিত্র্যহীন শাদা শাদা, ভাসা ভাসা মেঘের মতো মনে হবে, আবার কখনো কালারফুল হয়ে উঠবে। সেটা অনেকটা নির্ভর করবে দৃষ্টিভঙ্গির ওঠা-নামা, গভীর-অগভীর, শাদা-কালো-রঙিনের সখ্যে অথবা ব্যর্থতায় এবং মেনে ও মনে নেয়ার ওপর। চাপিয়ে দিয়ে পাঠককে যেমন গেলানো যাবে না, সে-প্রকারে সমালোচকের বক্রোক্তি ও স্বদ্যোক্তি ভেদ করেই দাঁড়িয়ে যাবে স্রষ্টার অকৃত্রিমতায় নতুন নতুন সৃষ্টি ও নিপুণ-নিখুঁত বানানোর বা তৈরি করার অথবা উপস্থাপনের কুশলতায়। কারণ এটা এখন আর শিকড়বিচ্যুত বা কাণ্ডহীন কোনো বিষয় নয়, চিরকালীন সুরস্রষ্টার মতোই বিশ্ব শিল্পাঙিনায় অনাবিষ্কৃত একটি বা হাজার ফুলের মুকুল–যা ফুটবার ঈপ্সায় কলমমুখর। পলাশ ফুলের যেমন গন্ধ নেই, অথচ মুগ্ধতা আছে–দৃপ্তির অনন্যতায়, ভোগ ও উপভোগের উপযোগিতায়; তেমনিভাবে সময় এখন হয়ে ওঠা–নতুন লেখক ও পাঠকের দেখা-অদেখার সৃষ্টিযাত্রা সন্দর্শনে, মাটিজলের খেলায় সবুজগ্রাম বৃক্ষের অনিন্দ্য-চেতনায়, শিল্পের স্বরূপান্তরে যার পূর্ণপ্রকাশ।

সাধারণভাবে না-গল্প না-কবিতা গল্প ও কবিতার মধ্যবর্তী সুদৃশ্যতাকে ধারণ করছে বলে বিবেচনাদৃষ্ট বা বিবেচিত হলেও, এর একটি আলাদা ফর্ম ও প্রকাশভঙ্গি আছে–যা শিল্পের অদৃষ্টতাকে ভেঙে দিয়ে বাস্তবসম্ভব সম্ভাবনাকে স্বপ্নমুক্তির মাধ্যমে সাহিত্যের অন্য সব শাখার মতোই (গল্প-কবিতা-উপন্যাস–এ রকম আর যা যা আছে) নিজ স্বাতন্ত্র্যে বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত। কবিতা অথবা গল্পের মতোই একেও হয়ে উঠতে হয় এবং ‘হয়ে ওঠা’র মধ্য দিয়েই এর শিল্পগুণ সম্প্রসারিত বা বিকাশমান। এটাকে কেউ এসে ভিন্ননামে ডাকলেও ডাকতে পারে, কিন্তু কিছু বা সাময়িক সাদৃশ্যতার জন্য কোকিলকে তো আর কাক, কাককে কোকিল বলা যাবে না। তেমনি কোনো শিল্পই মেনে নেয়া বা মনে নেয়ার ওপর দাঁড়ায় না। দাঁড়ায় তার শিল্পগুণবোধ ও শিল্পোত্তীর্ণতার ওপর। শিল্পগুণবোধ বা শিল্পোত্তীর্ণতাই-বা কী? সেটিও মুখ্যত ‘হয়ে ওঠা’র ওপর যেমন নির্ভর করে, তেমনি সাহিত্যের অন্য সব শাখার নামকরণের সঙ্গে উদ্দিষ্ট শাখার বৈশিষ্ট্য বা গুণাগুণ বিকশিত ও প্রকাশিত; সেভাবে এর উপস্থাপনা, ব্যবহার ও হয়ে ওঠা–যা সংজ্ঞা দ্বারা নিয়ন্ত্রিত না-হলেও যুগ-যুগান্তরের শিল্পমাত্রা বা মানবিচার এবং কাল-কালান্তরের আলো-অন্ধকারে–প্রদীপের আলোদানের মতা বা আলোকিত করার গ্রহণের ওপর নির্ভরশীল।
সাধারণীকরণের বিষয়টি উদাহরণ হিসেবে এসে গেল–

সতীর্থ বন্ধু বিপত্মীক–যমজ কন্যা
একজন সতীর্থ বন্ধু ও তার বিপত্মীক ঘুণে ধরা ঘর এবং যমজ দুটি কন্যাসন্তানের খবর নিতে গিয়ে ঠিক এই রকম রাতের ঘন আঁধার পেরিয়ে যে দৃশ্যতর দৃশ্যাঙিনায় দাঁড়িয়ে হতভম্ব ও বিস্মৃত হয়েছিলাম–এক টুকরো মোমবাতির শাদা কাচে, সে রকম বাতাসের গাড়ি চড়ে সুরাসুরে একীভূত গানে হতাশ চোখে শেষ পর্যন্ত যে আঁধার-আলো দেখলাম–তা থেকে এ-রাতকে পৃথক করে ফেললে, নির্দিষ্ট সত্য থেকে বিচ্যুত হবার মিথ্যাবশে স্খলিত হয়ে ভয়ার্ত মুহূর্ত সব এসে যেতে পারে এবং উচ্ছিষ্ট খাবারের সঙ্গে রং মিশিয়ে যেভাবে অবুঝ শিশুদুটি পিতার সঙ্গে একত্রে মুখর ছিল মৃত মায়ের শব ভক্ষণে; আজও, প্রিয়তমা রোহিনী, আমার কাচের প্লেটের খাঁজে খাঁজে এঁটেসেঁটে বসেছে দারুণ–কাঁটা চামচে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্রাংশ উঠে আসছে আর জিহ্বায় মিশে যেতে দেখতে পেয়ে শেষবারের মতো ও চোখ বন্ধ করলো, অঙ্গহানি দেহ থেকে জীবন্ত প্রাণপ্রদীপ উড়ে যেতে করুণ-কঠিনকালের পার ভাঙার শব্দে হেসে উঠলো, যার স্পর্শ দাঁতে দাঁতে বাড়ি খেয়ে নিরত পতিত হচ্ছে দেখে আমার হাসিটা থামলো ঠিকই, তবে তার রেশ রয়ে গেল জিহ্বার তলায়–কাঁটা চামচের নখরে, পলকহীন চোখে–জ্যোৎস্না-তারায় জ্বলজ্বল।
কবিতারূপ–
ড্রিম
দেখলাম :
পিতার সঙ্গে যমজ শিশুদুটি
মায়ের শবদেহ খুবলে খেয়ে নিলো
গল্পরূপ–
ভূতদর্শন
এক রাতে জিহ্বার তলে পড়ে দাঁতগুলো তুষ তুষ হয়ে গেল। উদ্ভিন্ন চেহারায় দেখা গেল রোহিনীকে। যে এই গল্পের নায়িকা ছিল। একটু আগে সে এমন সব স্বপ্ন ভেঙে ঘুম থেকে জেগে উঠেছে, তাকে আর মানুষ বলে মনে হচ্ছিল না। পুরো চেহারাটা একটা পাগলপ্রায় মানুষছায়ার বটগাছে রূপান্তরিত। তার চারপাশে ভাঙা প্লেট, গ্লাস, চামচের ছড়াছড়ি। সুদৃশ্য ভাতের সাজানো ঢেলা পর পর, রাতের তিন তারার মতো পাশাপাশি। ঘরে কেউ নেই, একা।

রোহিনী যে পাড়ায় থাকতো, তা ভূতের গলি হিসেবেই পরিচিত সবার কাছে। কিন্তু একমাত্র রোগা যে ছেলেটি রোহিনীদের ছাদের কুঠুরি ঘরে আশ্রয় পেতেছে, তাকে না-দেখলে কেউই বলবে না এখানে কোনো ভূত-টুত আছে। তার নাম আবদুল মান্নান, সৈয়দ বংশের পোলা–‘হাবুল যাবে কাবুল’ অর্থান্তের বোকা বোকা চেহারা। পৈতৃক নিবাশ চব্বিশ পরগনা। ’৭১-এর পালাবদলে এসে জুটেছে নোয়াখালীতে। গল্পের নায়ক এই ছেলেটি। রোহিনী তার প্রেমে পড়েনি, বরং ছেলেটি তার ভূতদর্শন বইখানি একরাতে আগুন জ্বালানোর কাঠির খোঁজে এসে বিনিময় হিসেবে উপহার দিয়েছিল। সেই থেকে জানাশোনা এবং রোহিনী তার ভূতদর্শনে একটু একটু বিশ্বাস করতে থাকে, সঙ্গে মান্নান সৈয়দকেও। এই নামের বিশেষত্ব তৈরি করেছে রোহিনী, আপন গুণে ডেকে ডেকে।

মান্নান সৈয়দের পরম পাওয়া এই ভূতদর্শন ও রোহিনী। মান্নান রোহিনীকে পেতনি হতে বলে। রোহিনী রাজি হয় না। ভূতদর্শনে সে যা পড়েছে, তারপর থেকে আজ অবধি সুস্থিরভাবে একদিনও ঘুমাতে পারেনি। কাজের মেয়ে সখিনা, এখন তার ঘুমরাতের একমাত্র সঙ্গী। একজন নিচে তো অন্যজন ওপরে, অন্যজন নিচে তো একজন ওপরে। পালাক্রমে ঘুমানো চলে। এই পালাক্রমও মেনে নিয়েছে একরাতের দৃশ্যাদৃশ্য, দেখা-অদেখা সব আত্মাদের আনাগোনা ঠেকাতে।

রাত নয়টা বাজে তখন, ধুলো-মশার ঢাকায় এটা কোনো অধিক রাত নয়। তবু সে রাতে রাত নয়টা যেন বিশাল এক অনাগত ভবিষ্যতের রাতকে স্বাগত জানাতে থাকে। বাড়ির সবাই–বাবা-মা, ভাই-ভাবি বেড়াতে গিয়েছে নারায়ণগঞ্জে, তার এক ফুফাতো ভাইয়ের বিয়েতে। পরদিন পরীা থাকায় রোহিনী যেতে পারেনি। বিকেলেই ফোন করে রোহিনীকে নিশ্চিত করা হয়, বিয়ের পাত্র হঠাৎ করে উধাও, খোঁজ করা হচ্ছে, পাওয়া গেলে তারপরই বিয়ে। সে-কারণে তারা কেউই আজ আর বাসায় ফিরতে পারবে না। রোহিনীও সাহসের সঙ্গে জানিয়ে দেয়, কোনো অসুবিধে নেই। সে এর আগে অনেকবার এ-বাসায় একা একা থেকেছে, প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার চাপাচাপিতে পড়ে।

দিনের আলো কমে সন্ধ্যা যখন ঘনিয়ে আসছে, ঠিক তখন হঠাৎ করে বাসা থেকে সখিনা হাওয়া হয়ে যায়। রোহিনী হয়ে পড়ে সম্পূর্ণ একা। ছাদে ভূত মান্নান আছে কিনা, সে আর জানতে যেতে সাহস করে না। তার পা যেন আটকে আসছে। আটটা বাজার সঙ্গে সঙ্গে চারদিক নিস্তব্ধ হয়ে আসে। খাওয়াদাওয়ার কথাও সে ভুলে যায়। রাত নয়টার দিকে জগতের সমস্ত ঘুম এসে যেন তার চোখ কেড়ে নিয়ে যাচ্ছে। সে ঘুমিয়ে পড়ে। কিন্তু ঘুম ভেঙে যায় পাশে কাউকে অনুভব করে। চিৎকার দিতে গিয়ে স্বর আটকে যায়, পাশ থেকে সখিনা বলে–আপা ভয় ভয় করছে, কেউ বাসায় নেই তো, তাই ফোর থেকে উঠে আপনার পাশ ঘেঁষে শুয়েছি, মা করবেন আপামণি। রোহিনী কিছু বলে না। মার ভাষা সে হারিয়ে ফেলেছে। সখিনা ঘুমিয়েছে এমন নিশ্চিত হয়ে সে খাট থেকে নেমে পায়চারি করতে এগোয়, কিন্তু কোথায় যাবে? চারদিক থেকেই শন শন আওয়াজ আসছে, ভূতরজনীর মিহিকণ্ঠ সুবিল ফ্যাসফ্যাস পাঁচালি, সঙ্গে নিস্তরঙ্গ নীরবতা। ছোট্ট রুমের চার দেয়ালে তার পায়চারির শব্দ রিনঝিন নূপুরের ধ্বনিরূপ পায়, একসময় সে আহত পাখির খসে পড়া পালকের মতো ঝরে পড়ে মেঝেতে এবং সেখানেই ঘুমিয়ে যায়। সকাল হলে ফাঁকা ফোরে আর কাউকে দেখতে না-পেয়ে হাঁসফাঁস করে ওঠে রোহিনী, নিচে সে একাই শুয়ে আছে বিছানা ছেড়ে। পাশ ফিরে উঠতেই দরজায় নক করে সখিনা, আপামণি উঠুন অনেক বেলা হয়ে গেছে। এরপর থেকে মাঝেমধ্যেই সখিনাকে পাশে শুয়ে থাকতে দেখে রোহিনী, তখন সে পায়চারি করতে থাকে এবং একসময় ফোরেই ঘুমিয়ে পড়ে।

গত সাতদিন হলো মান্নান সৈয়দের চৈত্রসংক্রান্তি জ্বর, গ্রাম থেকে ভাই-ভাবি দেখতে এসেছে, সঙ্গে যমজ কন্যা দুটোও। রোহিনী মান্নানকে রাতদিন মিলে অনেকবারই দেখতে যায়। জ্বর এক পক্ষকাল পেরিয়ে গেলেও উন্নতির কোনো লক্ষণ নেই। হাড়ভাঙা শীত লেগে থাকে শরীরজুড়ে, মান্নানের বিশেষ কোনো প্রতিক্রিয়াও নেই। এর মধ্যে মান্নান সৈয়দের বড় করে দেখা দেয় একরোখা স্বভাব–ঔষধ খাবে না, হাসপাতালেও যাবে না। রোহিনীই জোর করে কিছু ঔষধ এনে খাওয়ায়, খাওয়ার পর অনর্গল বমি। ঔষধ না-খাওয়ালে বমি নেই। ঔষধ খাওয়ানো বাদ দিয়ে দেয় রোহিনী।
এর কিছুদিন পর মান্নান সৈয়দের জ্বর ভালো হয়ে যায়, কোনো দাওয়াই পুরো হজম না-করে। ভাই-ভাবিও একদিন চলে যায়।

মাঝখানে অনেকটা সময় কেটে যায় দিনপঞ্জিতে চাপা পড়ে। সখিনারও বিয়ে হয়ে গেছে। বাসায় অন্য সবাই থাকা সত্ত্বেও রোহিনী একা হয়ে যায়। কোথাও কোনো কাজের মেয়ে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। সড়ক দুর্ঘটনায় মান্নানের ভাই মারা গেলে বউটি তার বাচ্চা দুটো নিয়ে রোহিনীদের ছাদে এসে ওঠে ভূত মান্নানের আশ্রয়ে। গার্মেন্টসে চাকরির খোঁজ করে, একসময় চাকরিও হয়। কিন্তু শরীর খারাপের জন্য চাকরি চলে যায়। বউটির রোগা ও কিশকায় একহারা চেহারা। শেষ পর্যন্ত রোহিনীদের বাসায় তার কাজ জোটে।

শ্রাবণ মাসের অমাবস্যা রাত। দিনকয়েক আগে ভাবিকে বিয়ে করেছে মান্নান। শর্তপূরণ হয়েছে, পেতনি হবে সে। রাগে-অভিমানে রোহিনী যাতায়াত বন্ধ করে দেয়। বউটির বুয়ার চাকরিও চলে যায়।
মাস ছয়েক পরের কথা, রাত বারোটার দিকে হঠাৎ রোহিনীর ঘুম ভেঙে যায়। সে ভয়ঙ্কর সব অশুভ আত্মাদের কান্নাকণ্ঠজড়িত বিকট-ফুকরানোর সঙ্গে অসংখ্য চিৎকার শুনতে পায়। দিগ্বিদিক বিস্মৃত হয়ে রোহিনী সেইসব ফুকার শব্দের পিছে ছোটে। হঠাৎ ছাদে গিয়ে মান্নানের ঘরে আলো জ্বলতে দেখে। দরজা ভেজানো, টুঁ শব্দটিও নেই। বাচ্চা দুটো ক্ষুধার্ত নেকড়ে শাবকের নিবিড়াক্রোশে মায়ের শবদেহ খাবলে খাবলে খাচ্ছে, পাশে উদাস হয়ে বসে আছে আবদুল মান্নান সৈয়দ। বাচ্চা দুটো তাকে বারবার আহ্বান করছে। মান্নানের চোখ দুটো বন্ধ, তবুও আগুনের ভাপ বেরিয়ে আসছে যেন চোখের দুই কোনা দিয়ে। হঠাৎ সেও বাচ্চা দুটোর সঙ্গে হাত লাগায়। এরপর হঠাৎ করে একসময় রোহিনী টের পেল তার শরীর থেকে চামড়া-মাংস খুলে-গলে-শুকিয়ে ঝুরঝুর করে ঝরে পড়ছে এবং সেও যেন ধীরে ধীরে এক পেতনিরূপ পাচ্ছে।

একটা বিশাল আয়নার সামনে রোহিনী, পাশে মান্নান, দুটি যমজ কন্যাসন্তান এবং একটি দেশ। তারা দেশটির নাম জানে না। ভূতদেশ হবে হয়তো–রোহিনী ভাবে।


সাহিত্য বিচারে না-গল্প না-কবিতা একটি নতুন কনসেপ্ট, নতুন আইডিয়া এবং নতুন মাত্রা–ইতিহাস ও এর কালবিস্তারি দর্পণে। অনেকের কাছে বিষয়টি পরিচিত না-হলেও এটি সাহিত্যের সেইসব অনাবিষ্কৃত অধ্যায়ের পাঠটিকে স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে, যেখানে শিল্পের গূঢ় তত্ত্বার্থ ঘুমিয়ে থাকে নিজেরই অন্তরালে; যখন থেকে বাংলা ভাষার সাহিত্যযাত্রাকালারম্ভ। চর্যাপদ থেকে সতের দশক পর্যন্ত বাংলা ভাষার প্রায় সবকটি শাখার সাহিত্যকর্ম রচিত হয়েছে কাব্যাকারে বা গীতবলয়ের আবহে। না-গল্প না-কবিতা ইস্যুটি সাহিত্যের নতুন শাখা হলেও পূর্বোক্ত অনেক রচনায় এর খণ্ডচিত্র বা বিচ্ছিন্ন উপস্থিতি লক্ষণীয়। একটু চোখ-কান খোলা রাখলেই এর মিল ও অমিলটুকু খুঁজে পাওয়া যাবে।

আঙ্গিকগত উপস্থাপনার কারণে কেউ কেউ এসে এর নতুন নামকরণ করতে যেমন পারেন, তেমনি ফুটিয়ে তুলতে পারেন চিত্রকল্পের অসম্ভব-অসাধারণ সব দৃশ্যকল্প ও স্বপ্নবিস্তার। সে-প্রেক্ষিতে এগুলো নতুন সংস্করণরূপ ধারণ করলেও মূলে এর স্বাদ বা প্রবহমানতা রয়ে যাবে। যা ‘না-গল্প না-কবিতা’র বিমূর্ত যাত্রাকে মূর্ত করে তুলবে। এখানেই লেখকের সার্থকতা এবং পাঠকের লাভটাও একটু বেশি। কেননা সকল শিল্পের অনন্যোজ্জ্বলতার পাশাপাশি নতুন মুখে নতুন আহারের মতোই তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলতে পারেন লেখক-পাঠক-সমালোচক। কেউ বুঝে, কেউ-বা না-বুঝে। কারণ কম দুঃখে পড়ে তো আর রবীন্দ্রনাথ-কে ‘সবুজের গান’ লিখতে হয়নি। আবার তার অসীমের যাত্রাও এই মুক্তাঙ্গিকের ছোঁয়ায় বিশ্বময় ছড়িয়ে পড়তে পারে–একমুখিতার মুখোশে নয়, বরং দশমুখিতার গুণ ও চর্চায়। চর্চাটা প্রধান, প্রকাশটা অপ্রধান। প্রকাশটা সিদ্ধ, চর্চাটা সাধন। লেখালেখিতে এ-কথাগুলো খুবই এপ্রোপ্রিয়েট। এ-কারণে বলা হয়ে থাকে, শরীরের শেষ বিন্দু দিয়ে লড়ে যাবার যে বীরত্ব, তাই মূলত শিল্পের অঙ্গীকার বা কমিটমেন্ট। ‘না-গল্প না-কবিতা’ শিল্পের নতুন কমিটমেন্ট ও দৃপ্ত উচ্চারণ। সকল বাধা ডিঙিয়ে যা পৌঁছে যাবে গন্তব্যে, শিল্পের শীর্ষবিন্দুতে, যেখানেও একজন ঈশ্বরের বসবাস। ঈশ্বরার্থই স্রষ্টা এবং সে অবশ্যই মানুষরূপ, কখনো তা কনসেপচুয়ালি কমিটেড ভাবনা। আর শিল্পের ধারক বা বাহক, প্রকাশক ও স্রষ্টা যখন অনেক হয়ে যায়, তখন বহু ঈশ্বরের কৃপায় পড়ে শিল্প হয়ে ওঠে মহা-উজ্জ্বলমান। এখানেই নতুন সৃষ্টির আনন্দ ও ঈশ্বর-কল্পনা। ‘না-গল্প না-কবিতা’ মানুষের ঈশ্বর-কল্পনাকে রক্ত-মাটি-মাংসে–নিত্য-নব সৃষ্টির উন্মাদনায় নতুন প্রজন্মের জন্য একটি নিরাপদ ভূখণ্ডের সংগ্রামকে উস্কে দেয়। এইসব সংগ্রামের মধ্য দিয়েই ‘না-গল্প না-কবিতা’র বিকাশ ও প্রকাশ।

২০ জানুয়ারি ২০১২