ক্যাটেগরিঃ ক্যাম্পাস, ফিচার পোস্ট আর্কাইভ

 

18_SSC+Exam_030213

৭৫ নং সীতারামপুর সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়, সীতারামপুর, কাশিয়ানী, গোপালগঞ্জ। ১৯০৬ সালে স্থাপিত এই বিদ্যালয়টিতে বর্তমানে ছাত্র-ছাত্রী সংখ্যা প্রায় দুইশত জন। ক্লাস ফোর ও ফাইভে ছাত্র-ছাত্রী আছে প্রায় ১০০ জন। স্কুল ভবন ২টি এবং শিক্ষক ও শিক্ষিকার সংখ্যা মোট ৬ জন। উপস্থিত শিক্ষকগণ ঠিকঠাকমতই ক্লাস নিচ্ছেন। বাচ্চাদের কলকাকলিতে মুখরিত একটি বিদ্যালয়। সব কিছুই মনে হয় ঠিক আছে।

কিন্তু উদ্বেগের বিষয় হল, ক্লাসের ভিতরে গিয়ে খোঁজ খবর নিলে দেখা যায় যে, ক্লাস ফোর ও ফাইভের প্রায় ১০০ জন ছাত্র-ছাত্রীর মধ্যে ভাঙ্গা ভাঙ্গা ইংরেজি পড়তে পারে খুব বেশি হলে ৭/৮ জন। আর বাংলা মোটামুটি ভাবে পড়তে পারে খুব বেশি হলে ১৪/১৫ জন। স্কুলের ২০০ ছাত্র-ছাত্রীর মধ্যে অন্তত অর্ধেক ছাত্র-ছাত্রী ব্যাঞ্জনবর্ণ ঠিকমত চেনেই না। অথচ বাংলা পড়তে গেলে ব্যাঞ্জনবর্ণ ছাড়াও আরো কতকিছু যে জানার প্রয়োজন হয় তা আর কাকে বলব। যা হোক, ২০০ ছাত্রছাত্রীর মধ্যে ঠিকভাবে বাংলা পড়তে পারে না প্রায় ১৮৫ জন এবং ইংরেজি পড়তে পারে না প্রায় ১৯২ জন। চতুর্থ ও পঞ্চম শ্রেণির ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে সাধারণ যোগ-বিয়োগ, গুণ-ভাগ যথাযথ ভাবে করতে পারে হাতে গোনা কয়েক জন, কিন্তু অন্যান্য ভাষামূলক অংক করা তাদের অধিকাংশের নিকট হিমালয় পর্বতে আরোহনের সামিল। অথচ এরা আমাদেরই সন্তান, আমাদের ভবিষ্যত এবং বাংলাদেশের ভবিষ্যত নাগরিক, ভবিষ্যত পরিচালক। এবং তার চেয়েও মজার ব্যাপার হল, এদের শতকরা ১০০ ভাগই সব পরীক্ষায় পাশ করে এবং আগামী পঞ্চম শ্রেণি-সমাপনী পরীক্ষায়ও ১০০% পাশ করবে এবং যথেষ্ট ভাল রেজাল্ট নিয়েই পাশ করবে।

পরীক্ষায় সবার যে জিপিএ-৫ পেতে হবে বা সাঙ্ঘাতিক ভাল রেজাল্ট করতে হবে তা মোটেও নয়। কিন্তু বছর বছর ক্লাস পার হওয়ার সাথে সাথে শিক্ষার্থীদের যে অন্তত তাদের অতিক্রম করা শ্রেণির পাঠ্যসূচী অনুযায়ী নুন্যতম পড়ালেখা শেখার বা যোগ্যতা ও দক্ষতা অর্জনের প্রয়োজন রয়েছে, সেটিওতো মিথ্যা নয়। এ প্রসঙ্গে আমি এই বিদ্যালয় সহ গ্রামাঞ্চলের আরো কয়েকটি সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকগণের সঙ্গে কথা বলে যেটা জানতে ও বুঝতে পারলাম সেটি মোটেই সুখকর নয়। প্রাথমিক শিক্ষকদের বক্তব্য হল, সরকারের দেওয়া সিদ্ধান্তই এর জন্য দায়ী। তাদের মতে, সরকার আপাতত তাঁদের নিকট থেকে কোন পড়ালেখা চাচ্ছে না। সরকার চাচ্ছে, বাচ্চাদের ১০০% হাজিরা এবং বাংলাদেশের ভবিষ্যত নাগরিকদের সকলে যেন অন্তত পঞ্চম শ্রেণি পাশ করে, পড়ালেখা কিছু শিখে হোক বা না শিখেই হোক। পড়ালেখা না পারা বা না করা সহ, সৃংখলা রক্ষা বা অন্য কোন কারনে বাচ্চাদের উপর কোন চাপ দেওয়া বা রাগ করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ, বেত দিয়ে শাসন করা তো বহু দূরের কথা। একটি বাচ্চা যদি সারা বছরে এক অক্ষরও না পড়ে বা কখনো স্কুলে এক অক্ষরও পড়া না দেয়, তার জন্য তাকে কিছুই বলা যাবে না। বকা দেওয়াতো সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। বাচ্চারা স্কুলে আসবে এবং যাবে। শিক্ষকগণ মূলতঃ বাচ্চাদের কেয়ারটেকার হিসাবে তাদের দেখাশোনা করবেন পুকুরে ডুবে বা স্কুল গেটের বাইরে গিয়ে গাড়ির নীচে প’ড়ে যাতে কারো বাচ্চা মারা না যায় বা দুর্ঘটনায় না পড়ে।

এছাড়া, শিক্ষকগণ ক্লাস নেবেন, তবে তা হবে কলেজ/বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাস নেওয়ার মত। শিক্ষক তার লেকচার দেবেন, বাচ্চা তা শুনুক বা না শুনুক, সে অনুযায়ী পড়ে আসুক বা না আসুক তাতে কোন সমস্যা নেই। এমনকি, স্যারের লেকচার না শুনে তারা যদি ক্লাসের ভিতরের দেওয়ালে কাঁচা আম ছুড়ে ফাটিয়ে খায় বা লুডু নিয়ে খেলতে শুরু করে দেয়, তাতেও শিক্ষকের কিছুই বলার নেই। তবে, তাদের চাকুরীর শর্ত একটি, তাহল তার পড়ানো বিষয়ে যেন কোন বাচ্চা ফেল না করে। তার মানে কী? বুঝতে পারছেন তো? বাচ্চা সারা বছর এক অক্ষরও না পড়ুক বা না শিখুক তাকে পাশ ঠিকই করিয়ে দিতে হবে। অর্থাৎ দুর্ণীতি করতে হবে। তাও আবার সকলে মিলে, সংঘবদ্ধভাবে। কেননা একজন পড়াচ্ছেন, আর একজন পরীক্ষা নিচ্ছেন এবং আর একজন খাতা দেখছেন। ঘুরে ঘুরে সবাই-ই সব কাজ করছেন। তাই এই তিনদল মিলে একজোট হয়ে দুর্নীতি না করলে তো কেউই বাচতে পারবেন না। তাই জোটবদ্ধভাবেই দূর্ণীতি চালাতে হবে এবং চালাচ্ছেনও তাই। মাঝখান থেকে ফাঁকিতে প’ড়ে যাচ্ছে আমার দেশের অবোধ শিশুরা অর্থাৎ এ দেশ, এ জাতি, এদেশের ভবিষ্যত (অবশ্য একথাগুলির সবই শিক্ষকদের নিকট থেকে শোনা। কতদূর সত্য বা মিথ্যা তা যাচাই করা খুব দরকার। তবে, স্কুল শিক্ষার্থীদের অক্ষর জ্ঞানের বা পড়ালেখা জানার মাত্রা এবং তাদেরই পরীক্ষার ফলাফলের মধ্যে সামঞ্জস্যহীনতা এসব কথার সত্যতাকেই প্রমাণ করে)।

আর সরকারের এই ইচ্ছাটি যেদিন থেকে শিক্ষকগণ বুঝতে পেরেছেন, সেদিন থেকেই সরকারের এই সিদ্ধান্তের সুযোগ পুরোপুরি কাজে লাগাচ্ছেন শিক্ষকগণ। তবে সুযোগ কাজে লাগানোর ব্যাপারে সবচেয়ে এগিয়ে আছেন সারা দেশব্যাপী সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকগণ। তাঁরা-তাঁরা বাচ্চাদের পড়ালেখা না করিয়ে এবং অনেক ক্ষেত্রে অক্ষরজ্ঞানহীন বাচ্চাদেরও পাশ করানোর কাজটি করে যাচ্ছেন নৈতিকতাকে বিসর্জন দিয়ে। শিক্ষকগণ অঘোষিতভাবে শিদ্ধান্ত নিয়ে নিয়েছেন যে, সরকার যেহেতু চাচ্ছে তাই পরীক্ষার খাতায় ছাত্র-ছাত্রীর দেওয়া উত্তর সঠিক হোক বা না হোক, সকলকে বিনা বিচারে পাশ করিয়ে দিতে হবে। এতে করে সরকারের সিদ্ধান্তেরও বাস্তবায়ন করা হল এবং শিক্ষকগণও ঝামেলা থেকে রেহাই পেলেন। এতে তাঁদের সুবিধা সীমাহীন। প্রথমতঃ পরীক্ষার মাধ্যমে ছাত্র-ছাত্রীদের পড়ালেখার মান সত্যিকারভাবে যাচাই করতে গেলে সঠিকভাবে খাতা মূল্যায়ন করতে হয় এবং তা করা যথেষ্ট কষ্টসাধ্য এবং সময় ক্ষেপনের বিষয়।কিন্তু বর্তমানে তাঁরা যেভাবে করছেন তাতে মোটেও কোন কষ্ট বা সময়ের অপচয় হচ্ছে না। সেই সময়টুকুতে তাঁরা বরং প্রাইভেট পড়িয়ে টাকা কামাই করতে পারছেন। আর পরীক্ষার কোন একটি খাতার মধ্যে দু-চারটি দাগ দিয়ে আনুমানিক একটি নাম্বার দিয়ে দিলেই হল। সেটি তো আর কেউ দেখতে যাচ্ছে না। সে কাজটিও শিক্ষকগণ বিশেষক’রে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে মাধ্যমিক স্কুলের শিক্ষকগণ করছেন হয় তাদের ছাত্র-ছাত্রীদের দিয়ে, নাহয় ভাই-বোন আত্মীয় স্বজন দিয়ে।

অবশ্য পরীক্ষার খাতার প্রথম দু-একটি পৃষ্ঠা নাকি তাঁরা উলটে পালটে দেখেন এবং তাতে যদি মানসম্মত দু-চার লাইন লেখা পাওয়া যায় তাহলে সে খাতাটি মোটামুটি ভাবে মূল্যায়ন করা হয়। আর যেটির প্রথম বা দ্বিতীয় পৃষ্ঠায়ই নিম্নমানের উত্তর থাকে তা আর শেষ পর্যন্ত পড়া হয় না। আনুমানিক একটি নম্বর তাতে দিয়ে দেওয়া হয়। অবশ্য প্রাথমিক সমাপনীতে আবোল তাবোল লিখে খাতা ভ’রে রাখলেও প্লাস পাওয়া যায়। কেননা, আবোল তাবোল লিখে খাতা ভ’রে রাখতেও তো অনেক কষ্ট হয় এবং তারওতো একটা মূল্য আছে। আর ফেল করার বা ফেল করানোর কোন সুযোগ বা অপশনই সরকারী প্রাইমারী স্কুলে নেই। একইভাবে হাইস্কুলের শিক্ষার্থীদের পরীক্ষার খাতাও ইদানিং দেখা হয় যাচ্ছেতাই ভাবে। কেননা, খাতা সঠিকভাবে মূল্যায়ন করা হচ্ছে কিনা তা দেখার কোন ব্যাবস্থাই খুব সম্ভবত নেই বা অতীতে থাকলেও ইদানিং সে নিয়ম তুলে নেওয়া হয়েছে।

তাছাড়া, সঠিকভাবে খাতা মূল্যায়ন করলে, প্রচুর ছাত্র-ছাত্রী ফেল করত, শিক্ষকদের জবাবদিহি করতে হত, চাকুরী বা বেতন নিয়ে টানাটানি বাধত, ক্লাসে কষ্ট করে পড়াতে হত, ক্লাসে সুন্দর ক’রে পড়াতে হলে শিক্ষককে বাড়ি ব’সে পড়তে হতো, আরো কত কি। পড়ালেখার কোন মূল্যায়ন না থাকায়, ক্লাসে গিয়ে খেটে খুটে পড়ানোরও কোন প্রয়োজন থাকছে না আর শিক্ষককে বাড়ি ব’সে পড়ালেখা করার তো প্রশ্নই আসে না । স্কুলে শুধু হাজিরা দিলেই হল। সরকারই নাকি এ সব ঝামেলা থেকে তাঁদের রেহাই দিয়েছেন। আর দায়িত্বরত অফিসার এবং ম্যানেজিং কমিটির প্রধানের সঙ্গে কিছু টাকা পয়সা মাঝে মধ্যে শেয়ার করলে নিয়মিত স্কুলে হাজিরা দেওয়ারও কোন প্রয়োজন হয় না। মাঝে মধ্যে গিয়ে বাকি দিনগুলির স্বাক্ষর করে আসলেও চলে।

কিন্তু আমার প্রশ্ন হল, যে প্রাথমিক বা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে জাতির মেধা বিকাশের ভিত্তি রচিত হয়, সেই বিদ্যালয়ের যদি এই অবস্থা হয়, তাহলে জাতির ভবিষ্যতের কী হবে? তাছাড়া, একটি দরিদ্র জাতির ১৬ কোটি মানুষের কষ্টের ঘামে অর্জিত শত শত কোটি টাকা বেতন হিসাবে শিক্ষকদের দিয়ে সে টাকার যদি কোন ফল আদায় করা না হয়, তাহলে এই কোটি মানুষের অর্জনইবা কী হল?

এখানে আমি অবশ্য শিক্ষকদের খুব বেশি দোষ বা দায় দিতে চাই না। কেননা, খারাপ শোনা গেলেও, তাঁরা হলেন প্রজাতন্ত্রের টাকায় (বেতনে) কেনা মজুর। নিয়োগকর্তা তাকে যা এবং যেভাবে করতে বলবেন তিনি তা সেভাবেই করবেন। কিন্তু নিয়োগ কর্তা বা প্রজাতন্ত্রের ঐ বিষয়ক কর্মকর্তাগণ যদি তাকে কিছু করতে না বলেন বা তাঁর কাজের জন্য কোন রকম জবাবদিহি না করেন বা খোঁজ খবরই না নেন, তাহলে মজুর ঠিক মত কাজ না করার জন্য মজুরের তো দোষ দেওয়া যায় না। তাঁরাওতো মানুষ এবং দোষে-গুণেই মানুষ।

আচ্ছা, আমার দেশের ভবিষ্যত নাগরিকদের ১০০% স্বাক্ষর হবে বা অন্তত পঞ্চম শ্রেণি পাশ করবে, এটা নিঃসন্দেহে সরকারের একটি প্রসংশনীয় উদ্যোগ। কিন্তু তাই ব’লে অক্ষরজ্ঞানহীন বাচ্চাও পঞ্চম শ্রেণি পাশ করে হাইস্কুলে যাবে, বিশেষকরে পড়ালেখা কিছু না শিখেও একের পর এক ক্লাস পার হয়ে উপরের ক্লাসে উঠে যাওয়া যায়, এই বিষয়টি যখন একটি বাচ্চার মাথায় ঢুকে যাবে তখন কষ্ট ক’রে পড়ালেখা করার ইচ্ছা বা চেষ্টা তো একেবারেই তার থাকবে না এবং এভাবেই একটি অবোধ শিশুর মেধার কবর রচিত হবে। তাই এই বিষয়টিতে সমর্থন দিতে বা তার প্রসংশা করতে কেন যেন মন সায় দিতে চাচ্ছে না।

তার চেয়ে বরং এমন করলে হত না যে, পরীক্ষা পদ্ধতিকে সর্বোচ্চ মান সম্পন্ন ভাবে প্রতিষ্ঠিত ক’রে এবং রেখে যোগ্যতা অনুযায়ী যার যে ফলাফল প্রাপ্য তাকে তাই দিয়ে বাদ বাকি বাচ্চাদেরকে ‘বিশেষ পাশ’ নামের একটি গ্রেড দিয়ে পঞ্চম শ্রেণি পার ক’রে হাইস্কুলে উঠিয়ে দেওয়া হবে। আর একই সাথে ঐ ‘বিশেষ পাশ’ গ্রেড প্রাপ্ত বাচ্চাদের বাবা-মা বা অভিভাবকদেরকে ডেকে স্কুলের শিক্ষক ও কমিটির লোকজন পরিস্কার ভাবে জানিয়ে দেবেন যে, এই ‘বিশেষ পাশ’ আসলে কোন পাশ নয়, এটি আসলে ফেল শব্দটিরই নামান্তর মাত্র কিন্তু বাচ্চাদের জন্য এটি একটি সুযোগ যে সুযোগ সুধুমাত্র পঞ্চম শ্রেণিতেই আছে বিধায় তাঁদের বাচ্চা সে সুযোগ পেল, কিন্তু পরবর্তীতে সে সুযোগ আর সে পাবে না। সুতরাং পড়ালেখা যদি তাকে শেখাতে হয় তাহলে অভিভাবকগণ যেন সেভাবে প্রস্তুতি গ্রহন করেন।

আর আমার এই বিশেষ উদ্যোগের বিষয়টি বলার মূল কারন হল, প্রাইমারী লেভেলে বাচ্চাদের পড়ালেখার সত্যিকার মান যাচাই করা এবং একই সাথে, দরিদ্র জাতির মাথার ঘামে অর্জিত শত শত কোটি টাকা প্রাইমারী শিক্ষকদের দিয়ে তার বিনিময়ে জাতি আসলে কি পাচ্ছে সেটি মূল্যায়ন করা। যদিও ব্যক্তিগত ভাবে আমি আমাদের প্রজাতন্ত্রের সম ক্যাটাগরির যে কোন চাকুরীর তুলনায় শিক্ষকদের বেতন বেশি দেওয়ার পক্ষে। কেননা, দেশের অধিকাংশ পরিবারেই ছাত্র-ছাত্রী রয়েছে। তাই শিক্ষকদেরকে বেশী বেতন দিলে তার সুফল সকলেই পাবে। কিন্তু বেতন আমরা যা-ই দেই না কেন, তার সম পরিমান সেবা তো আমরা পাওয়ার আশা করতেই পারি বা তা আদায় করা নিশ্চয়ই অপরাধের মধ্যে পড়ে না।

এই পদ্ধতির মাধ্যমে, বিশেষ ক’রে ‘বিশেষ পাশ’ গ্রেড প্রাপ্ত বাচ্চারা, তাদের অভিভাবকগণ, তাদেরকে পাঠ দানকারী শিক্ষকগণ এবং কর্তৃপক্ষ, সকলেই জানবেন এবং বুঝবেন যে, এই ‘বিশেষ পাশ’ হল ফেল করার অপর একটি বিকল্প নাম বা শব্দ। প্রাথমিক সমাপনীতে ১০০% পাশ দেখালেও এই পদ্ধতিটির মাধ্যমে একটি প্রাইমারী স্কুলে আসলে কতটি বাচ্চা পাশ করেছে এবং কতটি বাচ্চা সত্যিকার অর্থে ফেল করেছে সেটি যেমন পরিস্কার ভাবে বোঝা যাবে, তেমনি শিক্ষকদের পার্ফরমেন্স এবং তাঁদের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেওয়াও সহজ হবে। এমনকি যে শিক্ষকের সাব্জেক্টে ৫০% বা তার বেশি শিক্ষার্থী ‘বিশেষ পাশ’ গ্রেডের নামে আসলে ফেল করে, সেই শিক্ষককে সরাসরি অযোগ্য ঘোষনা করা যেতে পারে। তবে যে ফলাফলের উপর শিক্ষকদের চাকুরী, বেতন ও মর্জাদা নির্ভর করবে সে পরীক্ষা গ্রহন এবং খাতা মূল্যায়নের বিষয়টি একটু ভিন্নভাবে বিবেচনা করতে হবে অবশ্যই। আর এর মাধ্যমে সত্যিকারের মেধাবী বাচ্চাগুলির মূল্যায়নও করা হবে। নিরক্ষর বাচ্চার নাম শিক্ষিতের খাতায় তুলতে গিয়ে জাতির ভবিষ্যতকে অন্ধকারে ঠেলে দেওয়া বা জাতির মেরুদণ্ড ভেঙ্গে দেওয়া মোটেও উচিত হবে না।

এই পদ্ধতির মাধ্যমে আমি যেটা আশা করতে চাই তাহল, ঐ ‘বিশেষ পাশ’ গ্রেড প্রাপ্ত বাচ্চা এবং তার অভিভাবক অনুধাবন করুক যে, আসলে সে পাশ করে নাই। সরকার দয়া করে তাকে এবারের বৈতরনী পার ক’রে দিয়েছে যাতে সে জীবনের এই প্রথম ধাক্কাতেই এবং কিছু বুঝে ওঠার আগেই পড়ালেখার রাস্তা থেকে ছিটকে খাদে প’ড়ে না যায়। কিন্তু এই সুযোগ তাকে আর দেওয়া হবে না। তার মানে, পড়ালেখা যদি তাকে চালিয়ে যেতেই হয় এবং উজ্জ্বল ভবিষ্যত যদি তাকে বা তাকে দিয়ে গড়তেই হয়, তাহলে এবার তাকে পড়ার টেবিলে বসতে হবে এবং যেক’রেই হোক ন্যুনতম পড়ালেখা তাকে শিখতেই হবে। এছাড়া, সামনে এগোনোর কোন সুযোগ তার আর থাকছে না।

যা হোক, কথা বলছিলাম ৭৫ নং সীতারামপুর সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয় সম্পর্কে। পঞ্চম শ্রেণির সমাপনী পরীক্ষা দিয়ে, পাশ ক’রে এবং মোটামুটি ভাল রেজাল্ট করেই (রহস্যজনক ভাবে) তারা ভর্তি হচ্ছে ৬ষ্ঠ শ্রেণিতে। শত বর্ষী এই প্রাথমিক বিদ্যালয়টির সঙ্গে সংলগ্ন এই গ্রাম ও এই ইউনিয়নের একমাত্র মাধ্যমিক বিদ্যালয়টি যার নাম সীতারামপুর মোফাজ্জেল হোসেন উচ্চ বিদ্যালয়। তাই স্বাভাবিক ভাবেই, ৭৫ নং সীতারামপুর সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং সে সাথে ইউনিয়নের আরো কয়েকটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীরাও ভর্তি হয় মোফাজ্জেল হোসেন উচ্চ বিদ্যালয়ে। আর এই উচ্চবিদ্যালয়টিতে ছাত্র-ছাত্রীদের পড়ালেখার অবস্থা যাচাই করলেই বোঝা যায় এ অঞ্চলের প্রাথমিক বিদ্যালয় গুলির পড়ালেখার মান কেমন।

মাধ্যমিক বিদ্যালয়টিতে ছাত্র-ছাত্রীর সংখ্যা প্রায় ৩০০জন। যাচাই করলে দেখা যাবে, এই ৩০০ ছেলেমেয়ের মধ্যে ৩০/৩২ জন ছাত্র-ছাত্রী কোনমতে ভাঙ্গা ভাঙ্গা ইংরেজি পড়তে পারে এবং ৫০/৫৫ জন মোটামুটিভাবে বাংলা পড়তে পারে। অর্থাৎ ৩০০ জনের মধ্যে ২৫০জনই ঠিকমত বাংলা পড়তে পারে না (এদের অবস্থা দেখে ভাষা শহীদ রফিক, জব্বার, সালামদের কথা খুব মনে পড়ে। তাঁদের বিদেহী আত্মার কাছে আমাদের জবাব কি আমি সত্যিই জানি না) এবং ২৭০জন ইংরেজি পড়তে পারে না। এছাড়া ৭৫-৮০% ছাত্র-ছাত্রীর বাংলা লেখা মারাত্মক ভুল এবং অক্ষর অস্পষ্ট বা বোধগম্য নয়। আর ইংরেজী লেখার কথা তো বাদই দিলাম। তবে, এই যে কয়জন বাংলা ও ইংরেজি পড়তে পারে, এটার জন্য মাধ্যমিকের শিক্ষকগণকেই কৃতিত্ব দিতে হবে কারন প্রাথমিক স্তরে থাকতে তারা বাংলা ইংরেজিতে আরো খারাপ ছিল। আর এখানকার গণিত সহ অন্যান্য বিষয়ের পার্ফরমেন্স সাংঘাতিক ভাবে নিম্নমানের। সরকার সত্যিকার ভাবে পড়ালেখার মান যাচাই মূলক পরীক্ষা নিলে ৫% ছাত্র-ছাত্রীও পাশ করবে কিনা এ নিয়ে আমার সন্দেহ শতভাগ।

৮ম শ্রণীর একটি ছাত্রকে আগের দিন একটি প্যারাগ্রাফ মুখস্ত করে আসতে বলা হল এবং পরের দিন তা লিখতে বলা হলে সে দুই পৃষ্ঠা ব্যাপী প্রায় ১৮টি Sentence–এর Paragraph-টি লিখলে দেখা গেল যে, তার মধ্যে একটিও নির্ভুল Sentence পাওয়া গেল না (প্রত্যেকটি Sentence–এ Verb–এ ভুল) এবং অনিচ্ছাকৃতভাবে তাকে ১০ নম্বরের মধ্যে শুন্য দেওয়া ছাড়া আর কোন গত্যান্তর রইল না। বাংলা বই থেকে পড়তে বলা হলে তার অবস্থা দেখা গেল খুবই শোচনীয়। গণিতের অবস্থাও আরো খারাপ। অথচ জানা গেল সে ক্লাস ফাইভে জিপিএ-৫ পেয়েছে এবং সে তার ক্লাসে মোটামুটি ভাল ছাত্র হিসাবেই গন্য। হয়ত ৮ম শ্রণির সমাপনী অর্থাৎ জে,এস,সি-তেও সে জিপিএ-৫ পাবে। কেননা, লেখার মধ্যে নম্বর দেওয়ার মত কিছু না থাকলেও, খাতা ভর্তি ক’রে লেখার মোক্ষম যোগ্যতা তার রয়েছে। এছাড়া, পরীক্ষার ৪/৫ দিন আগে সারা দেশের ছাত্র-ছাত্রীদের মত সেও সব প্রশ্ন পেয়ে যাবে এবং পরীক্ষার হলে পুরোদমে নকল করার সুযোগতো সন্দেহাতীতভাবে পাবেই।

স্কুলের ৯ম শ্রেণির ভাল ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে থেকে একজন ছাত্রী বলছিল যে, গত জে,এস,সি পরীক্ষায় অংকের প্রশ্নটি দুঃখজনকভাবে সে পরীক্ষার আগে পায়নি। সে নিজে থেকে অনেক চেষ্টা করে ৩টি অংকের উত্তর করতে পেরেছিল যাতে সে পাশের ধারে কাছেও যেতে পারছিল না। আর সে জন্য সে অংকে প্রায় ফেল-ই করতে যাচ্ছিল। অন্য ছাত্র-ছাত্রীদের অবস্থা ছিল তার চেয়েও খারাপ। তবে, এহেন পরিস্থিতিতে পরীক্ষার হলের একজন দয়ার সাগর ডিউটি শিক্ষক বললেন, ‘তোমরা যে যা পার তাই কর, কিন্তু চেচামেচি করবে না এবং ম্যাজিষ্ট্রেট সাহেব আসেলে তোমাদের যার কাছে যা থাকবে তা লুকিয়ে ফেলবে’। এরপর ছাত্রীটি তার সামনের, পিছনের এবং পাশের বেঞ্চে বসা পরীক্ষার্থীদের সাথে অংক লেনদেন করে অবশেষে পাশ করার ব্যবস্থা করে। কিন্তু দুঃখের বিষয় হল, সেবার তাদের ক্লাসের অর্ধেক ছাত্র-ছাত্রী গণিতে ফেল করে যায়। অবশ্য এ ব্যাপারে তাদের ধারনা যে, তাদের পরীক্ষার খাতা যে শিক্ষক দেখেছিলেন, তিনি ছিলেন খুবই বেরসিক। কারন, এর আগে এই জে,এস,সি পরীক্ষায় অনেক ছাত্র-ছাত্রী ১০টি অংক ভুল করেও ৫০/৬০ নম্বর পেয়েছে ব’লে তাদের জানা আছে। অবশ্য, এরা পরবর্তীতে জানতে পেরেছে, ইদানিং নাকি যেকোন পরীক্ষার শর্ত একটি তা হল, ভুল হোক বা ঠিক হোক, খাতায় লেখা থাকতে হবে। তাহলেই ভাল রেজাল্ট হবে। আর কেউ সাদা খাতা দিয়ে আসলে সে পাশ করতে পারবে না। যে ভুলটি তাদের ক্লাসের প্রায় অর্ধেক শিক্ষার্থী সেবার করে এসেছিল।

জে,এস,সি পরীক্ষার খাতা মূল্যায়নকারী এক ব্যাক্তির সঙ্গে কথা হচ্ছিল। তাঁর এক বর্ণনা শুনে খুব মজা পেলাম। এক শিক্ষার্থী ‘শিল্পকলা কী?’ এই প্রশ্নের উত্তরে লিখেছে, ‘যে গান করে সে-ই শিল্পী, এবং শিল্পী যে কলা খায়, তাকেই বলে শিল্পকলা’। এই উত্তর লেখার পরেও তাকে ঐ প্রশ্নে বেশ ভাল নম্বর দেওয়া হয়েছে। জে,এস,সি সমাজ পরীক্ষার উত্তর পত্রে একজন শিক্ষার্থী প্রথম পাঁচটি প্রশ্নের উত্তরে পাঁচটি গান লিখে রেখেছে এবং তারপর ৬ নং প্রশ্নের উত্তরে লিখেছে ‘প্রশ্নটিই বুঝলাম না বলে উত্তর লিখলাম না’ এবং ৭ নং প্রশ্নের উত্তরে লিখেছে ‘উত্তর পারি না তাই লিখলাম না’। উত্তরপত্রে এসব লিখার পরেও তাকে ৫০ নম্বর দেওয়া হয়েছে।

এটা শুনে আমি তাঁকে না বলে পারলাম না যে, ‘আপনাদের নৈতিকতা কি জলাঞ্জলি দিয়েছেন?’ উত্তরে তিনি বললেন, ফেল করানো নিষেধ আছে। ফেল করালে জবাবদিহি করতে হয় কিন্তু পাশ করালে কোন জবাবদিহি করতে হয়
না। সুতরাং কি দরকার ঝামেলা করার? তিনি এ বছরেই গণিত খাতা মূল্যায়নকারী তাঁর এক বন্ধুর আর একটি উদাহরণ দিলেন যেটিও কম মজার নয়। তার গণিতের শিক্ষক বন্ধুটি খাতা মূল্যায়ন করতে গিয়ে লক্ষ্য করলেন যে, প্রায় এক বান্ডিল খাতা অর্থাৎ খুব সম্ভবত একটি স্কুলের গণিতের অধিকাংশ শিক্ষার্থী দু-একটি অংক করে বাকি প্রায় সাদা খাতা জমা দিয়ে চলে গিয়েছে। এ অবস্থায়, সঠিক ভাবে মূল্যায়ন করলে ঐ স্কুলের প্রায় সকল পরীক্ষার্থীকেই ফেল করিয়ে দিতে হয়। কেননা, তাদের খাতায় যদি ৫/১০টি ভুল অংকও থাকত, তার উপর ভিত্তি করেও তাদের পাশ করিয়ে দেওয়া যেত। কিন্তু খাতায় কিছু লেখা না থাকলে সে ক্ষেত্রে কি আর করার থাকে।
এ অবস্থায়, ঐ শিক্ষক একটি বিকল্প কৌশলের আশ্রয় নিলেন। তারঁ ছিল দুই কন্যা যারা একজন সপ্তম এবং অপর জন দশম শ্রেণিতে পড়ালেখা করে। এবার শিক্ষক মহোদয়, তাঁর কন্যাদ্বয়কে বলেলেন, তারা পরবর্তী পনের দিন যাবৎ তাদের গৃহ শিক্ষক, কোচিং শিক্ষক এবং ঘরের প্রাক্টিসের সময় যত গণিত করবে তা যেন ঐ পরীক্ষাপত্রগুলির অবশিষ্ট সাদা পৃষ্ঠায় করে। কন্যাদ্বয় পিতার নির্দেশ মোতাবেক তাই করল এবং এর মাধ্যমে শিক্ষক মহোদয় যেমন কয়েক দিন কন্যাদের জন্য কাগজ কেনা থেকে বেঁচে গেলেন, তেমনি তিনি কন্যাদ্বয়ের করা ৭ম ও ১০ম শ্রেনীর গণিত দিয়ে হতভাগ্য প্রায় দুই ডজন জে,এস,সি পরীক্ষার্থীকে শুধু পাশই নয়, ভাল রেজাল্ট করিয়ে দিয়ে বিশাল মহানুভবতার পরিচয় দান করলেন।

অতঃপর, এ প্রসঙ্গে আমি যখন আমার সামনে থাকা শিক্ষক সাহেবকে প্রশ্ন করলাম, সাদা খাতা জমা দেওয়া শিক্ষার্থীদেরকে ফেল না করিয়ে উনি দূর্ণীতির আশ্রয় নিয়ে তাদের পাশ করাতে গেলেন কেন? তখন উত্তরে তিনি বলেলেন, এটাই সরকারের চাওয়া। কেননা, ঐ শিক্ষক যে এই কাজটি করলেন, বা বহু শিক্ষক যে ইদানিং খাতা মূল্যায়ন করতে গিয়ে অপ্রাসঙ্গিক কথা বার্তা লেখা থাকা সত্তেও বা খাতা ভরা ভুল অংক থাকা সত্তেও পরীক্ষার্থীদেরকে পাশ করিয়ে দিচ্ছেন, আজ পর্যন্ততো তার কোন প্রতিবাদ বা খারাপ প্রতিক্রিয়া হয়নি। অথচ, কেউ যদি ১০০% যথাযথ ভাবে খাতা মূল্যায়ন করেন এবং ফেল করার উপযুক্ত পরীক্ষার্থীকে ফেল করিয়ে দেন, তাহলে দেখা যাবে, সংশ্লিষ্ট বিষয়ের শিক্ষককে ছাত্র ফেল করার অপরাধে জবাবদিহি করতে করতে তার জান ও মান যাবে। কিন্তু রসায়ন, পদার্থ বা ধর্ম খাতায় কেউ যদি দাগ নাম্বার ঠিক মত বসিয়ে, প্রতি দাগের উত্তরে ‘সম্রাট বাবরের ছেলের নাম ছিল আকবর (হুমায়ূন নয়)’, বাক্যটি প্রয়োজনীয় সংখ্যক বার লিখে দিয়ে আসে, তাহলে সে অনায়াসে পাশ তো করবেই, বরং ভাল রেজাল্টও করতে পারে। অর্থাৎ সরকারের শিক্ষা বিভাগ অঘোষিত ভাবেই শিক্ষকদেরকে বুঝিয়ে দিয়েছে যে, তাদের কি করতে হবে।

আর সরকার যদি এমনটি চায়, তাহলে সরকারের বেতন ভুক্ত কর্মচারী শিক্ষকদের এমনটি করতে অসুবিধা কী? সরকারের সংশ্লিষ্ট কোন কর্তা ব্যক্তি যদি এ বিষয়ের সত্যতা যাচাই করে দেখতে চান, তাহলে আজই বোর্ডে জমা থাকা পি,এস,সে, জে,এস,সি বা এস,এস,সি-এর কয়েক বান্ডেল খাতা নিয়ে, হয় নিজে অথবা পি,এস,সি (বিসিএস এ্যাকাডেমী), ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বা কোন একটি ক্যাডেট কলেজে পাঠিয়ে মূল্যায়ন করালেই এর সত্যতা পেয়ে যাবেন আশা করি। এছাড়া, পি,এস,সি, জে,এস,সি বা এস,এস,সি-তে জিপিএ-৫ পাওয়া কতগুলি শিক্ষার্থীকে বিশেষক’রে গ্রামের স্কুল থেকে জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীকে ১৫দিনের নোটিশে আবার যথাযথভাবে পরীক্ষা নিয়ে দেখুন তো তারা আসলে কতটুকু পড়ালেখা শিখে জিপিএ-৫ পেয়েছে বা কতজন সত্যিকারভাবে ৩৩% নম্বর পেয়ে পাশ করে?

যাহোক, এই হল বর্তমানে স্কুল লেভেলের পড়ালেখার অবস্থা। অথচ মাত্র কয়েক বছর আগেও অবস্থা এত করুন ছিল না। তখনও ছাত্র-চাত্রীদের মধ্যে একটি ধারনা ছিল যে পাশ করতে হলে কম-বেশি পড়ালেখা করতে হয় এবং সামান্য হলেও কিছু পড়ালেখা শিখতে হয়। কিন্তু এখন সে ধারনাটি পুরোপুরি সেকেলে হয়ে গিয়েছে। এবং আমার পক্ষে যতদূর খোঁজ খবর নেওয়া সম্ভব হয়েছে তাতে আমার ধারনা, এই হাল শুধুমাত্র সীতারামপুরের ছাত্র-ছাত্রীদেরই নয়, এ হাল প্রায় সমগ্র বাংলাদেশের গ্রাম গঞ্জের স্কুল-কলেজগুলির।

চায়ের দোকানে এক ভদ্রলোকের গল্প শুনছিলাম। তাঁর ভাষ্যমতে তিনি তাঁর ১০ম শ্রণি পড়ুয়া পুত্রটিকে ৪দিন চেষ্টা করেও একটি Paragraph মুখস্ত করাতে পারেন নাই। এমনকি ছেলেকে কোনভাবেই পড়ার টেবিলে বসাতেই তিনি পারছেন না। কারন ছেলের সব সময় একই কথা, ‘এস,এস,সি-তে জিপিএ-৫ পেলেইতো হল, আমি তা তোমাকে পাইয়ে দেখাব’। তাছাড়া, পরীক্ষার আগে একটিও Paragraph, Essay, Letter, Application বা জ্যামিতি না পড়ে বা তার গ্রুপের সাব্জেক্টে তেমন সময় না দিয়েও তার চাচাতো ভাই গত বছর এস,এস,সিতে জিপিএ-৫ পেয়েছে এবং সে নিজেও প্রায় নিশ্চিত যে সে এবছর তা পাবে। কীভাবে পাবে, সে প্রশ্নের উত্তরে সে তার বাবাকে বলেছে যে গত জে,এস,সিতে যেভাবে পেয়েছিল সেভাবে পাবে। আর তার মাকে বলেছে যে, পরীক্ষার অন্তত চার দিন আগে সে সব প্রশ্ন পেয়ে যাবে, তার চাচাতো ভাই এবং প্রায় সব ছাত্র-ছাত্রী যেমনটি পেয়েছিল বা প্রতিবছর পায় আর পরীক্ষার হল তো উন্মুক্তই থাকবে। যেমনটি সে তার জে,এস,সি পরীক্ষায় করেছিল এবং জে,এস,সি ও পি,এস,সিতেও সে জিপিএ-৫ ঠিকই পেয়েছিল, তেমন কোন কিছু না শিখেই। অতএব, এবছর কেন এত পড়ালেখা করতে হবে?

এ বিষয়ে দেশের নীতিনির্ধারকদের বৈঠকে কেউ হয়ত বুঝাতে পারেন যে, কোন একটি ছেলে বা মেয়েকে বিনা বাধায় যদি মাষ্টার্স পর্যন্ত নিয়ে যাওয়া যায় তাহলে সে খুব ভাল রেজাল্ট না করলেও শুধুমাত্র প্রতিটি শ্রেণির ক্লাসগুলিতে মোটামুটি নিয়মিত হাজির থাকলে তাতে টুকটাক যা শিখবে, তা মিলিয়ে তার জীবনে চলার মত ন্যুনতম জ্ঞান, বুদ্ধি, বিবেক বা চ’লে ফিরে খাওয়ার মত যোগ্যতা ঠিকই তৈরী হয়ে যাবে। আমার প্রশ্ন হল, টুকটাক, মোটামুটি, ন্যুনতম, এসব কেন?আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা কি বিনা পয়সায় চলছে, নাকি এ জাতির ভবিষ্যত ছাগল-গরুর ভবিষ্যতের সমতুল্য? সপ্তম শ্রেণিতে পড়ুয়া ছাত্র ব্যাঞ্জন বর্ণমালার অধিকাংশ বর্ণ (ক,খ) চেনে না, ইংরেজি বর্ণমালা (A,B,c,d) চেনে না। প্রমান দেখতে চান? চ’লে আসুন আজই, প্রমান দিচ্ছি। এই নিরক্ষর বা অর্ধাক্ষর ছেলেও হয়ত এস,এস,সি পাশ করবে, কলেজে যাবে এবং হয়ত এম,এ পাশও করতে পারে। বাবার টাকা থাকলে হয়ত সে মোটা অংকের টাকা ঘুষ দিয়ে একটি ভাল চাকুরী নিয়ে দায়ীত্বশীল একটি টেবিলে ব’সেও পড়তে পারে। কিন্তু তাতে দেশ ও জাতীর লাভ কি? সে বিশৃংখলা সৃষ্টি করা ছাড়া জাতিকে আর কী দিতে পারবে? আপনারা হয়ত বলতে পারেন, ‘বাবা-মা কিছু না জানলে ছেলে তো অমন হবেই’, কথা ঠিক আছে। নিরক্ষর বাবা-মায়ের সন্তান নিরক্ষরই থাক। কিন্তু শিক্ষিত করার নাম ক’রে ঐ পরিবারটির সঙ্গে এত বড় প্রবঞ্চনা করা কেন? পারলে তাকে কিছু অক্ষরজ্ঞান দিন, না হয় অন্তত নিরক্ষর ও দরিদ্র লোকটির বাচ্চা পড়ানোর নামে তার অতি কষ্টের অর্থের সর্বনাস আমরা না করি। আমরা কী অদ্ভুত সময় ও পরিস্থিতিতেই না বাস করছি?

আচ্ছা, এমন একটি সময় ছিল, যখন আমরা জাতীয় বাজেট স্বল্পতার কারনে আমাদের শিক্ষার জন্য পর্যাপ্ত টাকা খরচ করতে পারতাম না। সুতরাং সঙ্গত কারনেই তখন আমরা শিক্ষকদেরও ভাল বেতন দিতে পারতাম না। অথচ তখন মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক স্তরে পাশের হার ছিল তুলনামূলকভাবে যথেষ্ট। কিন্তু বর্তমানে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড আমাদেরকে পাশের যে হারই দেখাক না কেন, প্রকৃত মান ঠিক রেখে বা ১৫/২০ বছর আগের মানেও যদি খাতা মূল্যায়ন করা হয়, তাহলে দেখা যাবে যে, বর্তমানের এই স্তরে শিক্ষার্থীদের পাশের হার ২০% এর নীচেই থাকবে এবং এই হার ১০%-এ নামলেও খুব আশ্চর্য হওয়ার কিছু থাকবে না। যাহোক, বলছিলাম যে, জননেত্রী শেখ হাসিনার যোগ্য নেতৃত্বের কারনে আজ শিক্ষা খাতে অর্থ বিনিয়োগের সে দৈন্যদশা আজ আর নেই। তাহলে হাজার কোটি টাকা ব্যায়ের এই ক্ষেত্রে আমাদের এমন দৈন্যদশা থাকবে কেন? টুকটাক, মোটামুটি, ন্যুনতম, এসব শব্দের ব্যবহার আমরা করতে যাব কোন দুঃখে? আমরা আজ শিক্ষকদের যা বেতন দেই, বিশেষক’রে সরকারী প্রাথমিক শিক্ষকদের, তা মোটেও খুব অপ্রতুল নয়। তাছাড়া, এখন আমরা চাইলে এ ক্ষেত্রে আরো অনেক কিছু করতেই পারি। অনেকে হয়ত বলতে পারেন যে, স্কুলের ক্লাসে চাপ দিলে, সাজা দিলে বাচ্চা ঝরে পড়ার হার বাড়বে। ঝরে পড়ার হার বাড়বে ব’লে পড়ালেখাই বন্ধ ক’রে দিতে হবে নাকি?
পড়ালেখাই যদি না থাকলো তাহলে স্কুলইবা কেন আর সেখানে ছাত্র বাড়িয়েই বা লাভ কি? সর্দি সারছে না বলে মাথা কেটে ফেলার সিদ্ধান্ত তো কোন সুস্থ্য সিদ্ধান্ত হল না। পড়ালেখার মান ঠিক রেখে ঝরে পড়া কিভাবে কমানো যায় সেই চেষ্টা করতে হবে। জননেত্রী শেখ হাসিনার নেত্রীত্বে আমাদের যেহেতু টাকার সমস্যা বেশ খানিকটা কমেছে, সেহেতু আমরা বাচ্চা ঝরে পড়া কমানোর জন্য স্কুল ফিডিংকে আরো জোরদার ও ফলদায়ক করার পাশা পাশি আরো অনেক কিছুই নিশ্চয়ই করতে পারি। বৃত্তির সংখ্যা বাড়াতে পারি, নিয়মিত হাজির থাকা এবং প্রতিটি পরীক্ষায় গড়ে ৮০% নম্বর পাওয়া বাচ্চাদের বাবা-মাকে বৃত্তি দেওয়া যেতে পারে যার মাধ্যমে অভিভাবকগণ বাচ্চাদের পড়ালেখার ব্যাপারে আরো উৎসাহিত হবেন। ক্লাসে অধিক হারে হাজির থাকলে এবং পরীক্ষায় ভাল করলে বাচ্চাদের সপ্তাহে সপ্তাহে বা মাসে মাসে শিক্ষা সহায়ক লোভনীয় উপহার দেওয়া যেতে পারে। আরো কত কী?

তাছাড়া, পড়ালেখাকে আর একটু সহজ করতে চাইলে তাও করা যেতে পারে। ধরুন ইংরেজি বিষয়ের Paragraph বা Composition শেখার কথাই বলি। যদিও বাচ্চাদের Sentence making–এর অভিজ্ঞতা নিয়ে নিজ থেকেই Paragraph বা Composition লেখার কথা কিন্তু বাংলাদেশব্যাপী সরকার এখনও পর্যন্ত এমন দক্ষ শিক্ষক নিয়োগ দিতে পারে নাই যে তাঁরা তাঁদের ছাত্র-ছাত্রীদের সেভাবে দক্ষ করে গড়ে তুলতে পারবে। তাই এখনও পর্যন্ত বাংলাদেশের অধিকাংশ স্কুলের বিশেষক’রে গ্রাম-গঞ্জের স্কুলগুলির বাংলা মিডিয়ামের ছাত্র-ছাত্রীরা এই Paragraph বা Composition মুখস্ত করে থাকে। তবে, এখনও পর্যন্ত যেমন পি,এস,সি; জে,এস,সি এবং এস,এস,সি পরীক্ষার জন্য Paragraph বা Composition–এর সিলেবাস প্রায় আনলিমিটেড। অর্থাৎ ঠিক কয়টি বিষয়ের উপর Paragraph বা Composition শিখলে, পরীক্ষায় Common পাওয়া যাবে তার নিশ্চয়তা নেই। তবে, তারপরও সাধারনত জে,এস,সি লেভেলে ১৫/২০টি Paragraph পড়লে Common পাওয়া যায়। আমরা যদি পড়ালেখাকে আর একটু সহজ বা হালকা করতে চাই, তাহলে Paragraph–এর এই সংখ্যাকে ৮-১০টির মধ্যে বেঁধে দেওয়া যেতে পারে যে, ৬ষ্ঠ থেকে ৮ম শ্রেণি পর্যন্ত ঐ ৮/১০টি Paragraph-এর মধ্যে থেকেই সব পরীক্ষায় আসবে। তাতে ক’রে বাচ্চারা মোটে না শেখার চেয়ে অন্তত ৮/১০টি বিষয়ের উপর Paragraph লেখা তো শিখল।

এভাবে প্রতিটি বিষয়ের সিলেবাসই ছোট বা সংক্ষিপ্ত করে তা ঘোষনা করে দেওয়া যেতে পারে। আর তার সাথে সাথে পরীক্ষা পদ্ধতি এমনভাবে ঢেলে সাজাতে হবে যাতে ঐ ৮-১০টির কম Paragraph পড়লে কেউ Common পাওয়ার কোন ধরনের নিশ্চয়তা খুঁজে পাবে না কোন ভাবেই। সিলেবাস সহজ বা ছোট করে দিলে, পড়ালেখার যথাযথ মান যাচাইমূলক পরীক্ষা পদ্ধতি যতই কঠিন হোক না কেন, তাতেও স্কুলে ফেল করার প্রবনতা অনেক কমে যাবে অথচ বাচ্চারা ঠিকই মানসম্মত পড়ালেখা শিখে যোগ্যতা অর্জন করতে পারবে। তবে পড়ালেখার মান যাচাই অর্থাৎ পরীক্ষা পদ্ধতি যথাযথ করার কোন বিকল্প নাই। কেননা, এই যথাযথ পরীক্ষা পদ্ধতির মাধ্যমেই শুধু ছাত্র-ছাত্রীদের পড়ালেখার মান যাচাই-ই নয়, শিক্ষকরা তাঁদের কাজে অর্থাৎ পাঠ দানে ফাঁকি দিচ্ছেন কিনা তাও অনায়াসেই ধরা সম্ভব। শিক্ষা ক্ষেত্রে দূর্ণীতি বন্ধে এটি একটি মোক্ষম অস্ত্র।

তবে, শিক্ষক রাজনীতি বা নেটওয়ার্কিংএর মাধ্যমে তাঁরা যেহেতু সারা দেশ ব্যাপী একে অপরের সঙ্গে সহজেই যোগাযোগ করার মাধ্যমে সংঘবদ্ধ দূর্ণীতি ক’রে (কিছু না জানা ছাত্রকেও পাশ করিয়ে দিয়ে) একে অপরকে রক্ষা করতে পারেন, শ্রম ও সময় বাঁচানোর জন্য যাচ্ছেতাই ভাবে খাতা দেখতে পারেন, নিজের কোচিং সেন্টারে যেতে বাধ্য করার জন্য বাচ্চাদেরকে অন্যায় ভাবে চাপ দিতে পারেন, প্রশ্ন ফাঁস ক’রে বানিজ্য করতে পারেন, ইত্যাদি কমিয়ে আনার জন্য পাব্লিক পরীক্ষার মত সাময়ীক বা অর্ধবার্ষিক পরীক্ষার প্রশ্নও বোর্ডের মাধ্যমে তৈরী ও ব্যাংকে রেখে পরীক্ষার আগ মূহুর্তে বিতরন করা উচিত। এবং মাঝে মাঝে যে কোন পরীক্ষার মূল্যায়ীত খাতা থেকে কিছু কিছু খাতা নিয়ে পি,এস,সি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বা কোন একটি ক্যাডেট কলেজে যাচাই করা উচিত যে সব কিছু ঠিকঠাক মত চলছে কি না।

এছাড়া, আমরা যেহেতু এ খাতে মোটামুটি টাকা ব্যয় করতে পারছি তাই আমাদের এখন সময় এসেছে শুধুমাত্র পরীক্ষার খাতা মূল্যায়ন করার জন্য আলাদা একটি ডিপার্টমেন্ট তৈরী করার। যেখানে প্রয়োজনীয় সংখ্যক শিক্ষক বা যোগ্য ও প্রশিক্ষিত ব্যক্তিকে নিয়োগ দেওয়া হবে যারা সারা বছর শুধু পরীক্ষার থাতা মূল্যায়ন করতে থাকবেন (সঙ্গে সঙ্গে সময় থাকলে তাঁরা বিভিন্ন দপ্তরের চাকুরীর নিয়োগ পরীক্ষার খাতাও মূল্যায়ন ক’রে দিতে পারেন)। কেননা, স্কুল কলেজে পড়ানো শিক্ষক মন্ডলী দিয়ে পরীক্ষার খাতা যথাযথভাবে মূল্যায়ীত হয় না বা তাঁরা তা ঠিক ভাবে ক’রে উঠতে পারেন না সময় এবং পরিশ্রমজনিত কারনে। এছাড়া, এখাতে দুর্ণীতি তো রয়েছেই। তাছাড়া, স্কুলের পাব্লিক পরীক্ষাগুলিরই গণিত ও ইংরেজি বাদে বাকি বিষয়গুলিতে ইদানিং হয়ত ৮০-৯০% খাতা শিক্ষকগণ তাদের ছাত্রদের বা আত্মীয় স্বজনদের দিয়ে মূল্যায়ন করে থাকেন যা কোনভাবেই শিক্ষার বা পড়ালেখার যথার্থ মূল্যায়ন হতে পারে না। তবে, সবার আগে প্রশ্ন ফাঁস হওয়া বন্ধ করা দরকার।

সত্য বলতে কি, এদেশের অগনিত মানুষের ধারনা, স্কুল-কলেজের বোর্ড বা পাব্লিক পরীক্ষাগুলিতে নিয়মিতভাবে প্রশ্ন ফাঁসের যে ঘটনা ঘটেই চলেছে, সেটি সরকারের শিক্ষা বিভাগের ইচ্ছাতেই ঘটছে অর্থাৎ সরকার-ই ইচ্ছা ক’রে ঘটাচ্ছে। এরা ট্রাফিক পুলিশের (মেরুদন্ডের সাথে ৪৫ ডিগ্রী কৌনিক ভাবে) হাত তুলে গাড়ি থামানোর মত করে বোগল উঁচু করে প্রশ্ন ফাঁসের মত ভয়াবহ দূর্নীতিকে থামাচ্ছেন। অর্থাৎ আমি হাত উঁচু করে লোকজনকে ওদিকে যেতে নিষেধ করলাম এবং মনে মনে বললাম, আমার বোগলের তল দিয়ে ওরা যায় তো যাক। আর জনগন বিশেষকরে দুর্নীতিবাজেরা বিষয়টি বুঝতে পেরে এখন সীমাহীনভাবে তা শুরু করে দিয়েছে। তা না হলে, সরকার আন্তরিকভাবে চাইলে এটা বন্ধ করা মোটেও কঠিন কোন বিষয় নয়।

শুধুমাত্র বোর্ড কন্ট্রোলারকে প্রশ্ন ফাঁস বন্ধ করতে বলুন, দেখুন সঙ্গে সঙ্গে তা বন্ধ হয়ে যাবে। তবে, সাথে সাথে তাঁকে বলে দিতে হবে যে, এ বিষয়ে জাতীয় সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হবে না এমন যে কোন কিছু করার ক্ষমতা তাঁকে দেওয়া হল এবং একই সাথে তাকে জানিয়ে দেওয়া হল যে, তাঁর বোর্ডের প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনা যে-ই ঘটিয়ে থাকুক না কেন, তার সত্যতা প্রমানীত হওয়া মাত্র, ধরা পড়া অপরাধী বা অন্য কারো কিছুই হোক বা না হোক, শুধুমাত্র কন্ট্রোলার সাহেবের কমপক্ষে সাত বছরের জেল এবং তাঁর পেনশন ও সরকারের কোষাগারে জমা হওয়া সমূদয় অর্থের সমপরিমান অর্থ জরিমানা করা হবে। এমনকি, এ জাতীয় আইন বিদ্যমান না থাকলে, প্রয়োজনবোধে জাতীয় সংসদের মাধ্যমে আইনটি প্রনয়ন ক’রে নিতে হবে এবং তা বোর্ড কন্ট্রোলারদেরকে জানিয়ে দেওয়া হবে। এবার দেখুন দুর্নীতি বন্ধ হয় কি না। হয় তিনি দুর্নীতি বন্ধ করবেন, না হয় চাকুরী ছেড়ে চ’লে যাওয়ার সুযোগও তার সামনে অবারিত থাকবে।

তাছাড়া, শিক্ষা ক্ষেত্রে যাবতীয় দুর্ণীতি বন্ধ করা খুবই জরুরী। কারন, জীবনের একেবারে শুরুতেই ফাঁস হওয়া প্রশ্ন নিয়ে, পড়ালেখা না শিখে এবং নকল ক’রে, ছয় নম্বরী-দুই নম্বরী জাতীয় দুর্ণীতি করে যে ছাত্র-ছাত্রী পরীক্ষায় পাশ করে, সে তার বাস্তব বা কর্মজীবনে গিয়ে যে চুরি, সূদ, ঘুষ বিরোধী বিরাট এক সুনীতিবান ব্যক্তি হয়ে উঠবে, সে আশা করা নিঃস্বন্দেহে সর্বশ্রেষ্ঠ বোকামী। তারমানে আমরাই স্কুলগামী অবোধ বাচ্চাদেরকে জীবনের প্রথম লেসন হিসাবে পড়ালেখা না শিখিয়ে দূর্ণীতিবাজী শিক্ষা দিচ্ছি বা দূর্ণীতিবাজ বানাচ্ছি। ৭৫ নং সীতারামপুর সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের একতলা ভবনটির ক্লাস রুমে ঢুকে কথা বললেই বোঝা যায়, শিক্ষাবিভাগের অযোগ্য, নকল ক’রে পাশ করা এবং ঘুষের মাধ্যমে চাকুরী পাওয়া ইঞ্জিনিয়ারদের কাজের দুর্গতির অবস্থা। এত অধিক পরিমানে প্রতিধবনি হয় যে বাচ্চারা শিক্ষকের কথা ঠিকমত শুনতেই পায় না বা বুঝতেই পারে না।

হাবার্ট স্পেন্সার বলেছিলেন, ‘শিক্ষার প্রধান উদ্দ্যেশ্য মানুষের চরিত্র গঠন করা’। আমি যদি হাবার্ট স্পেন্সারের কথাটিকে আর একটু বাড়িয়ে বলি তাহলে বলতে পারি, শিক্ষার প্রধান উদ্দ্যেশ্য চরিত্রবান ও দক্ষ মানুষ তৈরী করা। এবার আপনিও স্পেন্সারের কথাটিকে বাড়িয়ে বা কমিয়ে বলতে যান, আমি নিশ্চিত যে আপনিও আপনার সে কথার মধ্যে অবশ্যই অবশ্যই চরিত্র এবং সৎ চরিত্রের বিষয়টি উল্লেখ করতে বাধ্য হবেন। এবং এ কথাটিকে যদি একজন দাগী চোর বা প্রফেশনাল ডাকাত বা দুর্ণীতিবাজকেও বলতে বলেন, সেও এর মধ্যে সৎ চরিত্রের কথার উল্লেখ করবে। কেননা, ‘শিক্ষার উদ্দেশ্য অসৎ চরিত্র গঠন’ এই কথাতে কেউই সাড়া দেবেন না, তা সেলোক যত চিরিত্রহীন-ই হোক না কেন। আচ্ছা, আমরা তাহ’লে কী করছি?

আমার ধারনা, বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষই আমার সাথে একমত হবেন যে, বর্তমানে বাংলাদেশের অর্থনীতি যেভাবে সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, শুধুমাত্র দুর্ণীতি বন্ধ করা গেলে, এই গতিতেই আগামী দশ বছরের মধ্যে বাংলাদেশের অর্থনীতি মালয়েশিয়া বা সিঙ্গাপুরের অর্থনীতিকে টক্কর দেওয়ার অবস্থায় পৌঁছে যাবে। আর তা যদি সত্য হয়, তাহলে আমরা বুঝতে পারছি যে, এ মুহুর্তে আমাদের সবচেয়ে বড় সমস্যা জাতীয় পর্যায়ের দুর্ণীতি এবং যত শিঘ্র সম্ভর এই দুর্ণীতি বন্ধ করা দরকার। কিন্তু ১৬ বছর ধ’রে একটি বাচ্চাকে পকেট মারা শিখিয়ে, অবশেষে আমি যদি তাকে হাদিস শোনাই এবং দুর্ণীতি বন্ধ করতে বলি, সে আমার কথা শুনবে তো?

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী মহোদয়, আপনি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী বা আওয়ামীলীগের সভানেত্রী সেজন্য নয়, আপনার একটি মাত্র পরিচয়ের উপর ভরসা করে এই কথাগুলি বলছি কারন আপনি আমার জাতির জনক বঙ্গবন্ধু মুজিবের কন্যা। আপনি তো নিশ্চয়ই জানেন বঙ্গবন্ধু মুজিব কেমন বাংলাদেশ চেয়েছিলেন। আর আমরাও জানি যে আপনি বঙ্গবন্ধু মুজিবের স্বপ্ন অনুযায়ী একটি শক্তিশালী ও মর্জাদা সম্পন্ন বাংলাদেশের স্বপ্নকে সামনে রেখে দিন রাত পরিশ্রম করে চলেছেন। এবং ইতোমধ্যে আমরা তার সুফল পেতেও শুরু করেছি বা ইতোমধ্যে আমরা তা পেয়েওছি। আর তা যদি সত্য হয়, তাহলে আমি নিশ্চিত যে, বাংলাদেশের যারা ভবিষ্যত মেরুদন্ড সেই ছাত্র-ছাত্রীদের পড়ালেখার এই ভয়াবহ খারাপ অবস্থার কথা আপনি অবশ্যই জানেন না বা খুব সম্ভবত বাস্তব সত্যটিকে আপনাকে জানতে বা বুঝতে দেওয়া হচ্ছে না।

তবে হ্যা, পড়ালেখা যে বাংলাদেশে কোথাও হচ্ছে না তা কিন্তু নয়। ঢাকা শহরে হচ্ছে এবং দেশের বড় বড় শহরগুলিতে যেখানে শিক্ষিত সচেতন ও স্বচ্ছল মানুষগুলি বসবাস করে সেখানে ঠিকই পড়ালেখা হচ্ছে। তবে সেখানকার স্কুল-কলেজগুলিতে হোক বা না হোক, পড়ালেখা সেখানে হচ্ছে পুরোপুরি ব্যাক্তিগত বা পারিবারিক উদ্যোগে। শিশু শ্রেণি থেকে শুরু করে উচ্চমাধ্যমিক পর্যায় পর্যন্ত প্রতিটি ছাত্র-ছাত্রীর পিছনে সেখানে লেগে রয়েছেন ২/৪/৫ জন প্রাইভেট শিক্ষক। এবং তাঁদের তত্ত্বাবধানে ছাত্র-ছাত্রীরা বাধ্য হয়ে এমন নিরবচ্ছিন্ন ও মানসম্পন্ন পড়ালেখা চালিয়ে যাচ্ছে যে, কোন রকম সময় অপচয় করার কোন সুযোগ তাদের কাছে নাই। আর সে জন্যই অভিভাবকগণ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পড়ালেখানর কোন ধার ধারেন না। সেখানে কি পড়াল বা না পড়াল বা আদৌ কিছু পড়াল কিনা তার ধার ধারার কোন প্রয়োজনই তাদের নেই। এছাড়া পড়ালেখা হচ্ছে প্রাইভেট স্কুল-কলেজগুলিতে। তবে সেখানেও পিতামাতার ব্যতিগত উদ্যোগই মূখ্য।

অথচ কিছু না পড়িয়েও সামান্য ভূমিকা রেখেও ঐ স্কুল-কলেজ বা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলি বিশাল রেজাল্টের কৃতিত্ব পেয়ে যাচ্ছে শুধুমাত্র বাছাই করা ছাত্র-ছাত্রী নিয়ে এবং অভিভাবকদের প্রচেষ্টার কারনে। আর সেই কৃতিত্বের গৌরবে তারা বিশাল বড় বড় বুলি আউড়িয়ে চলেছেন যে, পড়ালেখার জন্য ছাত্র-ছাত্রীদের কোন রকম বকা-ঝকা বা সাজা দেওয়া যাবে না কোন ভাবেই। এমনকি পরীক্ষা পদ্ধতিও কঠিন রাখা যাবে না, একে বরং সহজ থেকে সহজতর করে দিতে হবে। কারন তাঁরা দেখতে পাচ্ছেন যে, ক্লাসে বিশ্ববিদ্যালয়ের মত লেকচার দিয়ে চলে যাচ্ছেন, বাড়ির পড়া জোর দিয়ে ধরছেন না, পড়া না করার কারনেও কোন রকম চাপ বা সাজা দিচ্ছেন না, অথচ ছাত্র-ছাত্রীরা ডজনে ডজনে, শতকে শতকে জিপিএ-৫ পেয়ে যাচ্ছে। তাঁরা কি জানেন না যে, ঐ সকল ভাল রেজাল্টধারী বাচ্চাদেরকে তাদের প্রাইভেট শিক্ষকরা ঠিকই বকাও দিচ্ছেন, সাজাও দিচ্ছেন মারধরও করছেন এবং এই চকচকে রেজাল্ট বা সার্টিফিকেট মূলত সে কারনেই তৈরী হচ্ছে। অবশ্য কিছু পড়ালেখা হচ্ছে বাংলাদেশের সশস্ত্রবাহিনী পরিচালিত প্রতিষ্ঠানগুলিতে। তবে সেটিতো খুবই অপ্রতুল।

আসুন না, আমার সীতারামপুরের মত গ্রাম বাংলার হাজারো বিদ্যালয়ে যেখানে একজন ছাত্র/ছাত্রী এমনকি মাতৃভাষা বাংলা পড়ার যোগ্যতা অর্জন না করেই হাইস্কুলে চলে এসেছে। তার উপরে আবার নিরক্ষর ও হতদরিদ্র পিতামাতার সন্তান হওয়ায় সারা বছরে একটি মাসও প্রাইভেট পড়ার কথা যারা ভাবতে পারে তো না-ই, তার উপরে আবার পরিবার থেকেও পড়ালেখা বুঝিয়ে দেওয়ার ব্যাপারে কোন ধরনের সাহায্য পায় না। এছাড়া, গ্রাম্য দুরন্ত শৈশবের কারনে নিয়মিত স্কুলে না যাওয়া বা স্কুল থেকে ফিরেই বই খাতা ফেলে খেলতে চলে যাওয়া ও অভিভাবকের অসচেতনতার সুযোগে সন্ধ্যায় ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়ার সুযোগতো রয়েছেই। এমন পরিস্থিতে এমন বাচ্চাদেরকে স্কুল থেকে চাপ বা সাজা না দিয়ে পড়ালেখা শেখানো যাবে এমন বুদ্ধি সরকারকে কে দিল এবং সরকার তা সমগ্র বাংলাদেশ ব্যাপী বাস্তবায়ন করা শুরু করে দিল কিভাবে, আমি সত্যিই তা বুঝতে পারছি না। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, দয়া করে এ বিষয়ের বিষেশজ্ঞদেরকে গ্রামের দু-একটি স্কুলে গিয়ে প্র্যাকটিক্যাল ক’রে দেখিয়ে দিতে বলুন, কত ধানে কত চাউল হয়।

মাঝে একবার মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে ইংরেজিতে নিরবচ্ছিন্ন Comunicative System চালু ক’রে দেওয়া হল এবং বলা হল যে বাংলা মিডিয়ামের ছাত্র-ছাত্রীদের ইংরেজি শিখতে গ্রামারের কোন প্রয়োজনই নাকি নেই। ছাত্র-ছাত্রীরা অনর্গল ইংরেজি বলবে এবং বলতে বলতেই নাকি সব শিখে যাবে। যাদের ইংরেজি শিক্ষকেরা একটি পরিপূর্ণ ইংরেজি Sentence তৈরী করতে পারে না (গ্রামে গঞ্জে হাইস্কুলগুলিতে একটু তদন্ত ক’রে দেখুন), বাবা ঠিকমত বাংলা পড়তে পারে না, মা নামটিও লিখতে পারে না, আর তাঁদের বাচ্চারা অনর্গল ইংরেজি বলবে এবং বলতে বলতে ইংরেজি শিখে যাবে? বাস্তবতা নিয়ে পর্যবেক্ষন বা গবেষনা না ক’রেই শিক্ষাক্ষেত্রে এজাতীয় হাস্যকর পদ্ধতি চালু ক’রে দেওয়া কর্তৃপক্ষের দায়ীত্বজ্ঞান সম্পর্কে বলার আর তেমন কিছু অবশিষ্ট থাকে না। অবশেষে সেই মহাজ্ঞানীদের সিস্টেম কি মুখ থুবড়ে পড়ে নাই? তাহলে শুধু শুধু কেন অর্থের এই অপচয় এবং কোমলমতি শিক্ষার্থীদের কেন এই হয়রানী? একটি দেশ ও জাতির শিক্ষাক্ষেত্র তো কোন মস্করা করার জায়গা নয়, এটা তো জাতির কোটি কোটি মানুষের জীবন ও ভবিষ্যতের প্রশ্ন। তাই সকলের প্রতি বিনীত অনুরোধ জানাতে চাই, ছাত্র-ছাত্রীদের প্রতি একটু দয়াবান হোন প্লীজ। আর শিক্ষাক্ষেত্রে নতুন কিছু করতে হলে সেই স্তরের শিক্ষকদেরকে যাঁরা তার বাস্তবায়ন করবেন, তাঁদেরকে সঙ্গে রেখে তা করুন।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী মহোদয়, আমি বেশ কিছু গ্রামের স্কুলগুলিতে ঘুরে ঘুরেই আমার এমন ধারনা হয়েছে, বাংলাদেশের অধিকাংশ স্কুলগামী ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে বদ্ধমূল ধারনা জন্মেছে যে, প্রশ্ন ফাঁস হওয়া একটি অঘোষিত সরকারী নিয়ম যেটি বছর বছর চলতেই থাকবে। এবং যেদিন থেকে এই ধারনাটি ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে বদ্ধমূল হয়েছে, সেদিন থেকে এবং যেদিন থেকে পরীক্ষার খাতা মূল্যায়ন তার ন্যুনতম মান হারিয়েছে এবং যেদিন থেকে বিদ্যালয়ে পড়া না ক’রে যাওয়া সত্যেও কোন রকম চাপ বা সাজা দেওয়া থেকে শিক্ষকদেরকে সরকারীভাবে বিরত করা হয়েছে, সেদিন থেকেই ছাত্র-ছাত্রীরা বিশেষকরে গ্রাম গঞ্জের ছাত্র-ছাত্রীরা পড়ার টেবিল থেকে উঠে গিয়েছে এবং ঠিক সেদিন থেকেই জাতির ভবিষ্যতের ভয়াবহ সর্বনাশের সূচনা হয়েছে। জাতি আজ বিশাল ও ভয়াবহ এক মেধা গ্যাপের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।

একদা যেখানে সমগ্র দেশ থেকে বাছাই হয়ে মেধা বেরিয়ে আসত, এখন পড়ালেখার চর্চা শুধুমাত্র শহরের সচেতন ও স্বচ্ছল পরিবার কেন্দ্রিক হওয়ায় শুধুমাত্র শহরে বসবাসরত অধিক সুবিধাভোগী ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে থেকেই মেধা বেরিয়ে আসার সুযোগ পাচ্ছে যাদের হার সারা দেশের তুলনায় খুব বেশি হলে ২০%। তারমানে, সারা দেশ থেকে মেধা আসলে প্রতি বছর যেখানে হত এক লক্ষ, সেখানে শুধুমাত্র শহর কেন্দ্রিক হওয়ায় সেই সংখ্যাটি দাড়াচ্ছে মাত্র বিশ হাজার। অর্থাৎ এক লক্ষ এর জায়গায় মাত্র বিশ হাজার। আর বাকি আশি হাজার মেধা তৈরীই হতে পারছে না বা সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। গ্রাম গঞ্জে অবশ্য দু চারটি সচেতন ব্যাক্তি যে নাই বা তাদের মধ্যে থেকে যে দু-একজন ছাত্র-ছাত্রী উঠে আসছে না তা নয়, কিন্তু সে সংখ্যা কোন শতকরা হারের মধ্যে পড়ার মত নয়। তার মানে, এই হিসাব যদি সামান্যও সঠিক বা যৌক্তিক হয়, তাহলে এটা বলাই যায় যে, দেশ ও জাতি অদূর ভবিষ্যতে এক বিশাল ও ভয়াবহ মেধা গ্যাপে পড়তে যাচ্ছে যা আগামী ১০/১৫ বছরের মধ্যেই স্পষ্ট হয়ে উঠবে।

আমরা সকলেই জানি যে, সন্দেহাতীতভাবে আমাদের দেশ প্রায় সবদিক দিয়ে দারুন ভাবে এগিয়ে যাচ্ছে। আর আমরা এও জানি যে একটি দেশ ও জাতির এগিয়ে যাওয়ার জন্য প্রথমত দরকার যোগ্য ও সঠিক নেতৃত্বের এবং দ্বিতীয়ত সেই নেতৃত্বের নির্দেশনার বাস্তবায়নের জন্য এক ঝাক যোগ্য ও দক্ষ জনবলের। আজ যে আমার সোনার বাংলা পিছনে না তাকিয়ে শুধু সামনে এগিয়ে যাচ্ছে তা সম্ভব হচ্ছে ঐ দুয়ের সমন্বয়ে। অর্থাৎ জননেত্রী শেখ হাসিনার যোগ্য ও সঠিক নেতৃত্ব এবং তার বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় যোগ্য ও দক্ষ জনবল, এই দুটি জিনিসেরই সমন্বয় ঘটেছে। আর আজ জননেত্রী শেখ হাসিনার যোগ্য ও সঠিক নেতৃত্বকে বাস্তবায়নে যারা অগ্রনী ভূমিকা পালন করছেন, প্রজাতন্ত্রের সেই কর্মকর্তা-কর্মচারী বা সেই মানুষগুলির অধিকাংশেরই কিন্তু পড়ালেখার ভিত্তি স্থাপিত হয়েছিল পাকিস্তান আমলে, যখন পড়ালেখা জেনেই বা শিখেই কিন্তু পাশ করতে হত। প্রজাতন্ত্রের দক্ষ জনবলের যে দ্বিতীয় অংশ তারাও কিন্তু উঠে এসেছেন বাংলাদেশের প্রথম আমলে যখনও (১৯৭১-১৯৭২ সাল বাদে) কম-বেশি পড়ালেখা শিখে বা জেনেই পাশ করতে হয়েছে বা উঠে আসার সুযোগ তারা পেয়েছেন। আজকের মত ঠগি-বগি ভাবে কিছু না জেনে না শিখে তখন তারা পাশ করতে পারেন নাই।

কিন্তু আজকে যারা স্কুল কলেজে পড়া লেখা করছে বিশেষ করে গ্রাম গঞ্জের স্কুল কলেজে তারা যখন আজ থেকে ১০/১৫ বছর পরে একটি দায়ীত্বপূর্ণ অবস্থানে পৌঁছাবে, তখন এই রাষ্ট্র পড়বে এক মেধাশুন্য অবস্থায়। আর সে পরিস্থিতিতে সর্বত্র দেখা দিতে পারে বিশৃংখলা। জননেত্রী শেখ হাসিনার আজকের যে অর্জন, সেদিন যোগ্য ও দক্ষ জনবলের অভাবে সেই অর্জন হয়ত ভেঙ্গে পড়তে পারে, ব্যার্থতায় পর্যবসিত হতে পারে সম্পূর্ণ আয়োজন। কেননা, মাত্র ২০% মানুষ কখনো ১০০% মানুষের কাজ করতে পারবে না।

পরিশেষে আমার প্রশ্ন হল, ১৪ই ডিসেম্বর ১৯৭১-এ মাত্র এক দিনে আমাদের কয়েক ডজন বুদ্ধিজীবি হত্যার মধ্যে দিয়ে পাক হানাদার ও এদেশীয় রাজাকারেরা আমাদের যে সর্বনাশ সাধন করেছিল, বলা হয়ে থাকে যে, বাঙ্গালির মেধাশুন্যতা সৃষ্টির লক্ষ্যে করা সে ক্ষতি পোষাতে এ জাতির হয়ত কয়েক শতাব্দি লেগে যাবে, কিন্তু আজকে জাতির ৮০% মেধাকে অর্থাৎ লক্ষ-কোটি মেধাকে অঙ্কুরিতই হতে না দিয়ে জাতির যে ভয়াবহ মেধাশুন্যতা সৃষ্টি করা হচ্ছে, এটা কার স্বার্থে এবং কী উদ্দেশ্যে?

নুন্যতম পড়ালেখা বা যোগ্যতা ও দক্ষতা অর্জন ছাড়াই একটি বিশাল জনগোষ্ঠিকে শিক্ষিতের খাতায় নাম তুলে দেওয়ার কী অর্থ ও উদ্দেশ্য থাকতে পারে তা আমার বোধগম্য হচ্ছে না কোন ভাবেই। দ্বিতীয় বিভাগে পাশ করার যোগ্যতা যার নাই, তাকে গোল্ডেন প্লাস পাইয়ে দেওয়ার মাধ্যমে আমাদের অবোধ সন্তানদের সঙ্গে প্রবঞ্চনা করে জনাব শিক্ষামন্ত্রী মহদয়গণ বা বাংলাদেশের প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বিভাগ, জননেত্রী শেখ হাসিনার সরকারকে ঠিক কি পাইয়ে দিতে চাচ্ছেন, সেটিও আমার বোধগম্য হচ্ছে না। পি,এস,সি; জে,এস,সি; এস,এস,সি এবং এইচ,এস,সি-তে তারা শুভঙ্করের ফাঁকির মাধ্যমে অযোগ্য ছাত্র-ছাত্রীদেরও জিপিএ-৫ পাইয়ে দিচ্ছেন বটে, কিন্তু পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাল ভাল সাবজেক্টগুলিতে কি তাঁরা চান্স পাইয়ে দিতে পারছেন? চাকুরীর পরীক্ষাগুলিতে কি তাঁরা আমাদের অযোগ্য থেকে যাওয়া ছেলে-মেয়েগুলিকে যোগ্যতর স্থানে স্থান পাইয়ে দিতে পারছেন? পারছেন না। এজন্যই হাজার হাজার গোল্ডেন প্লাস পাওয়া ছাত্র-ছাত্রী পরীক্ষা দিয়েও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগে চান্স পায় মাত্র ২ জন। অথচ গোল্ডেন প্লাস নয়, পরীক্ষা পদ্ধতি ও খাতা মূল্যায়ন প্রকৃয়া যদি স্বাভাবিক মানের থাকত তাহলে আজ সাধারন রেজাল্ট করেও এই ছাত্র-ছাত্রীগুলি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাল ভাল সাবজেক্টগুলিতে ঠিকই চান্স পেত, আগে যেমনটি পেয়েছে।

আর এই বিষয়গুলি যখন একজন সদ্য পড়ালেখা শেষকরা ব্যক্তি বুঝতে পারছে, ততদিনে তার নিজেকে যোগ্য ও দক্ষ ক’রে গ’ড়ে তোলার সকল সুযোগ সে পার ক’রে এসেছে। এখন সব কিছু বুঝেও আর কিছুই করার নেই আফসোস করা ছাড়া। আজ যখন একটি ছাত্র বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাল বিষয়ে চান্স পাচ্ছে না, চাকুরীর পরীক্ষায় পাশ করতে পারছে না, কোথাও গিয়ে কোন ঠাই খুঁজে পাচ্ছে না, তখন আফসোস করা ছাড়া তার আর কোন গত্যান্তর থাকছে না। এহেন পরিস্থিতিতে সে কার দোষ দেবে? সত্যিকার অর্থে কে এর জন্য দায়ী? এ অবস্থা যদি চলতেই থাকে, আগামী ১০/১৫ বছর পরে বাংলাদেশে কোটি কোটি মানুষের এমন বাজে পরিস্থিতিতে পড়তে হবে। তাই আজই যা করার আপনারা করুন। আজকের শিশুটি কিন্তু সত্যিই বুঝতে পারছে না, কি ধরনের ভবিষ্যত তার জন্য অপেক্ষা করছে। যখন সে বুঝবে, তখন আর তার কিছু করার থাকবে না।

মাননীয় শিক্ষামন্ত্রী মহোদয়গণ হয়ত বলবেন যে, শতকরা হয়ত দু-একজন অযোগ্য থেকে যাচ্ছে। কিন্তু মাননীয় মন্ত্রী মহোদয়গন, আপনাদের কাছে একশত জনের মধ্যে অযোগ্য থেকে যাওয়া যে একজন, সে যে আমার একমাত্র সন্তানটি, যার দিকে এই দরিদ্র আমি, নিরক্ষর আমি শত আশা নিয়ে তাকিয়ে আছি, তাকিয়ে আছে আমার ভবিষ্যত।

তাছাড়া, এমন যদি হত যে, কোন এক জামায়াত সমর্থকের অযোগ্য সন্তান কোন এক পরীক্ষায় প্লাস পাওয়ায় সে তার গুষ্ঠিশুদ্ধ খুশি হয়ে আওয়ামীলীগে যোগ দিত, বা ৯০% পাশের এই বিশাল রেজাল্টের ফলে সারা দুনিয়া নিঃশর্ত ঋণ দিয়ে বাংলাদেশকে ভরিয়ে দিত তাহলেও এক কথা ছিল। তার কিছুই তো দেখতে পাচ্ছি না। তাহলে জাতির ভবিষ্যতের সঙ্গে কেন এই প্রবঞ্চনা? তাছাড়া, ঋণ সাহায্য পেলেই যে তা না বুঝে গলধকরন করতে হবে, তারওতো কোন মানে নেই। বিনা শর্তে এবং বিনা মূল্যে ইউরোপ থেকে আমাদের দেশে যদি শুকরের মাংস সরবরাহ করা হয়, টাকা না লাগার কারনে এবং কোন রকম শর্ত না থাকার কারনে আমরা মুসলমানেরা কি মুসলমান হয়েও সেই শুকরের মাংস খাওয়ার জন্য হুমড়ি খেয়ে পড়ব? হারাম হালাল, মঙ্গল অমঙ্গল, ইতিবাচক নেতিবাচক কিছুই কি ভাবব না? নিশ্চয়ই তা নয়। বিশেষক’রে জননেত্রী শেখ হাসিনা তো জাতির জন্য ক্ষতিকর এমন কিছু করতেই পারেন না। যাহোক, এর মাধ্যমে দেশ ও জাতির ভবিষ্যতের যেমন সর্বনাশ হয়ে যাচ্ছে, তেমনি আবার জননেত্রী শেখ হাসিনার আওয়ামীলীগেরও ভাব মূর্তি নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। কেননা, সারা দেশের প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের হাজার হাজার শিক্ষকগনের অধিকাংশই সরকারের বিরুদ্ধে এই ফাঁকিবাজির বিষয়টি গোপন না রেখে বরং তা নিয়ে সীমাহীন অপপ্রচার করে চলেছেন। তাঁরা অপপ্রচার করার সময় বলছেন যে, তাঁরা তাঁদের বিবেকের তাড়নায় এই সমালোচনা করছেন, কিন্তু বিবেকের তাড়নায় ক্লাস ফাঁকি না দিয়ে বা অন্যায় ভাবে চাপ দিয়ে নিজের কোচিং সেন্টারে বা প্রাইভেটে নিয়ে না গিয়ে বরং বাচ্চাদেরকে স্কুলে বসিয়েও যে ঠিকভাবে পড়ালেখা শেখানো যায়, সে কাজটি কিন্তু তাঁরা করছেন না। কী বিচিত্র সব চরিত্র?

যা হোক, জাতিকে মেধাশুন্য ক’রে দেওয়া বা মেধার গ্যাপে ফেলে দেওয়ার জন্য এটা ৭১-এর পরাজিত বাহিনী বা অন্য কোন বিদেশীদের সুক্ষ্ণ ও সুদূরপ্রসারী চক্রান্ত নয় তো? আজ সমগ্র বিশ্বের সুপার হীরো হল চীন। তারা কীভাবে এটা হল? তারা কি হঠাৎ করে লক্ষ লক্ষ সোনার খনি পেয়ে গিয়েছিল? না, তারা যা করেছিল, তা হল, মাওসেতুং এর পরিকল্পনা অনুযায়ী তারা তাদের সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা ও সক্ষমতা দিয়ে তাদের মেধার বিকাশ ঘটিয়েছিল। তাদের ভারাক্রান্ত জনসংখ্যাকে মেধাবী জনসম্পদে রূপান্তরিত করেছিল। তার ফলই আজকের বিশ্বের সুপার পাওয়ার চীন যেদেশে রয়েছে বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে বেশি সংখ্যক ইলেক্ট্রনিক্স ও জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ার। বাংলাদেশ সহ বিশ্বের যে কোন দেশের ইলেক্ট্রনিক্স সামগ্রী, হালকা ও ভারী যন্ত্রপাতি এবং ফল জাতীয় খাদ্যের বাজারের দিকে তাকালেই চাইনিজ ঐ সব ইঞ্জিয়ারদের মেধা ও কাজের প্রমান দেখতে পাওয়া যায়।

একদা জাপান ছুটেছিল টাকার পিছনে, তারা গড়ে তুলেছিল বড় বড় ব্যাংক। আর আমেরিকা তখন ছুটছিল মেধার পিছনে, তারা গড়ে তুলেছিল বিশাল বিশাল সব বিশ্ববিদ্যালয়। যার ফলে আমেরিকা আজ বিশ্বের মধ্যে সবচেয়ে ধনী ও শক্তিশালী। তার মানে, শুধু টাকা নয়, সবচেয়ে বড় সম্পদ এবং সবচেয়ে আগে প্রয়োজন হল মেধা। টাকা তো মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলিরও আছে এবং অনেক বেশিই আছে অথচ দেখুন মেধার অভাবে তাদের কি বিচ্ছিরি অবস্থা। আর আমাদের সেই মেধাকেই ধবংস করে ফেলা হচ্ছে, ঠিক কি জন্য, তা জানা আজ অত্যন্ত জরুরী হয়ে উঠেছে।

৭১-এর পরাজিত বাহিনী আজ বাংলাদেশেও স্পষ্টভাবেই পরাজিত। বাঙালি জাতিকে অর্থনীতি সহ সব দিক দিয়ে মুক্তি এনে দেওয়ার জন্য জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বর্তমানে নতুন যুগের যে মুক্তিযুদ্ধ চলছে, সে মুক্তিযুদ্ধে জননেত্রী শেখ হাসিনার কাছে তারা যে পরাজিত হয়ে গিয়েছে তা আমরা ঠিক ভাবে বুঝতে না পারলেও তারা কিন্তু ঠিকই বুঝতে পেরে গিয়েছে। এবং দেশের ক্রোমোন্নয়নে সন্তষ্ট হয়ে, দেশ বাসি যেভাবে শেখ হাসিনার নেতৃত্বের দিকে প্রতিনিয়ত ঝুঁকে পড়ছে, তা দেখে তারা বেশ বুঝতে পারছে যে, অন্য দলের কাঁধে চ’ড়ে বা অন্য কোন কৌশলেই খুব তাড়াতাড়ি তারা হয়ত আর ক্ষমতায় ফিরে যেতে পারবে না।

অর্থাৎ শেখ হাসিনা যদি তাঁর বাদ বাকি জীবন ক্ষমতায় থাকেন এবং তাঁর মৃত্যুর পরেও যদি তাঁর যোগ্য উত্তর সূরীরা বাংলাদেশকে নেতৃত্ব দিতেই থাকেন তাহলে তা সেই পরাজিত বাহিনীর জন্য মোটেও সুখকর হবে না। তাই এ অবস্থার বিকল্প হিসাবে কি করা যায়, সেটি ভাবা তাদের জন্য মোটেই অযৌক্তিক নয়। আর সে জন্যই তারা তাৎক্ষনিক পরিকল্পনার অংশ হিসাবে জননেত্রী শেখ হাসিনাকে হত্যার পরিকল্পনা নিতে পারে এবং দীর্ঘ মেয়াদি পরিকল্পনার অংশ হিসাবে তারা ভবিষ্যতে জাতির মধ্যে যাতে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয় ও জাতির উন্নয়ন পরিকল্পনা মুখ থুবড়ে পড়ে, এবং সেই ঘোলা পানিতে যাতে তারা তাদের কাংখিত মাছটি শিকার ক’রে নিতে পারে, তার জন্য জাতিকে একটা বিশাল মেধা শুন্যতা বা মেধা গ্যাপের মধ্যে ফেলে দেওয়ার ষড়যন্ত্র বা নীল নকশা তারা তৈরি করতেই পারে, যেমনটি ১৯৭১ সালে নিশ্চিত পরাজয় জেনেও পাক হানাদার এবং তাদের এদেশীয় জানোয়ারেরা করেছিল। আচ্ছা, আজকের শিক্ষা ক্ষেত্রে যে শুভংকরের ফাঁকি দেখতে পাচ্ছি, সেটি সেই নীল পরিকল্পনার অংশ নয় তো?

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী মহোদয়ের নিকট আমার আকূল আবেদন, জাতিকে এই ভয়াবহ সর্বনাশা থেকে রক্ষা কল্পে, বঙ্গবন্ধু কন্যা হিসাবে, বিষয়টি একটু বিশেষভাবে বিবেচনা ক’রে দেখবেন এবং যথাশীঘ্র এর সমাধানের ব্যাবস্থা নিবেন। বঙ্গবন্ধু কন্যা জননেত্রী শেখহাসিনার দীর্ঘায়ূ এবং বাংলাদেশের প্রত্যেকটি মানুষের মঙ্গল কামনা করছি।

ইজাজ আহমেদ।
সীতারামপুর, কাশিয়ানী, গোপালগঞ্জ।
(ফেসবুক ও ব্লগ লেখক)