ক্যাটেগরিঃ দিনলিপি

 

সুইসাইট নোটে শুধু একটি লাইন লেখাছিল ’’আমি কোন অন্যায় করিনি’’। নিথর দেহ একটি ছোট ধড়ির মধ্যে ছিল ঝুলানো অবস্থায়। সবাই গিয়ে দেখছে। চেয়েছিলাম দেখব না, কিন্তু পরে আর পারিনি। নিজ চোখে দেখার জন্য আমাদের দৈনিক যুগভেরী পুরাতন অফিসে ঢুকলাম। যেখানে বেশ কিছুদিন ধরে অবস্থান করছিলেন আমাদের মিন্টুদা। আমার সহকর্মী, এক সাথে কাজ করেছি অনেকদিন। যদিও মিন্টু দা আমার বছর খানেক পড়ে কাজে যোগদ্না করেছিলেন। তার পরও আমি দাদা বলে ডাকতাম কারণ বয়সে আমার চেয়ে অনেক বড় তিনি। মিন্টুদার বড় শখ ছিল একটা মোটর সাইকেল চালানো। মৃত্যুর একদিন আগে একটি মোটর সাইকেল কিনেছিলেন। কিন্তু চালিয়ে আর দেখা হয়নি………….

ছুটিতে ছিলাম বেশ কিছুদিন। অফিসে ফিরে আমার ঠিক বিপরীত দিকের টেবিলে ছিমছাম শরীর নিয়ে শ্যামল বর্ণের একজন কে পেয়েছিলাম। নিজ থেকে হাত বাড়িয়ে দিলেন আমার দিকে বললেন আমি মিন্টু। পরিচয়ের প্রথম দিনেই কেন যেন বেশ আপন মনে হল মিন্টুদাকে। আর বেশী আপন হতে পেরেছিলাম। কারণ আমি খুব বেশী চা খাই আর মিন্টু দাও। মাঝে মধ্যে একের পর এক সিগারেট টানতেন। আর হঠাৎ করে কবিতার আবৃতি শুরু করতেন। সুনিল গঙ্গোপাধ্যায়ের কেউ কথা রাখেনি, খুব ভাল আবৃত্তি করতেন। মাঝে মধ্যে মঞ্চনাটকের কিছু ডায়লগ শোনাতেন আমাদের। প্রায়ই বিজ্ঞাপনের কাজ করতে । পত্রিকা থেকে বলা হল ঈদের জন্য অন্য যে কোন বছরের ছেয়ে আলদা একটি সংখ্যা করা হবে। আর তখনই বিজ্ঞাপনের কাজে নেমে পড়লেন মিন্টুদা। বেশ কিছু বিজ্ঞাপনও এনছিলেন তিনি। আর সেজন্য সেবছর আমাদের যুগভেরী থেকে খুব ভাল একটি ঈদ সংখ্যা বের করা সম্ভব হয়েছিল। এক ঝাক তরুণ সাংবাদিক দের নিয়ে ছিল আমাদের পথ চলা। অপূর্ব দা আমাদের নিয়ে কর্ম পরিকল্পনা সাজাতেন। আর সে অনুযায়ী কাজ করে যেথাম সজল দা, দেবুদা, মিন্টুদা, সৈয়দ রাসেল, সাকি, দিভাংশু, তুহিন ও আমি সহ অন্য সবাই। আর কাজের ফাকে চলত মিন্টুদা ও সজল দার গান, কবিতা। বেশ ভাল কাটছিল আমাদের সময় গুলো। অফিসে গেলে যেন চোখের পলকে সময় পুরিয়ে যেথ।
আম্ভরখানায় আমাদের অফিসের সামনে যে চায়ের দোকান ছিল সেখান থেকে একটু পর পর আমার ও মিন্টুদা’র চা খাওয়ার অভিযান চলত। আমি প্রায় বলতাম দাদা সিগারেট খাওয়াটা বাদ ওেয়া যায় না। তিনি আমাকে বলতে তুমি কি চা খাওয়া বাদ দিতে পারবে। তখন আমি আর কিছু বলতে পারতাম না। কারণ আমি জানি চা আমি চাড়তে পারব না কোন দিন।

মিন্টুদা একটি মোটর সাইকেল কিনবেন। উনার অনেকদিনের শখ ছিল এটি। টাকা প্রায় জোগারও হয়েছে। কিন্তু তিন হাজার টাকার জন্য সাইকেল আনতে পাড়ছেন না। আমাকে রাত আটটার দিকে বললেন কি করা যায়। প্রথমে বলেছিলাম আমার কাছে কোন টাকা নাই। তার পর আবার ভাবলাম মিন্টুদা বেশ শখ করেছেন সাইকেল কিনবেন কিন্তু অল্প টাকার জন্য আনতে পারছেন না। তাই বললাম চলেন। এখনই আপনাকে টাকা দেব ব্যাংক থেকে। সাথে সাথে আম্ভর খানা থেকে জিন্দাবাজার গিয়ে ডাচ বাংলা ব্যাংকের এটিএম বুথ থেকে টাকা তুলে দিলাম। আর আমি আবার অফিসে। কিছুক্ষণ পর মিন্টুদা আরেক জনকে সাথে নিয়ে সাইকেল আমাদের অফিসে নিয়ে আসলেন। তিনি চালাতে পারতেন না বলে। দুদিন ছিল আমাদের অফিসের সামনে।
বাসা থেকে বেড় হতে যাব এমন সময় আমাদের স্টাফ ফটো সাংবাদিক রাজীব ফোন করে জানালেন যে মিন্টুদা নাকি আত্মহত্যা করেছেন। আমি প্রথমে বিশ্বাসই করেনি, আরেক জন সহকর্মীকে ফোন দিয়ে নিশ্চিত হলাম। মিন্টুদা আর আমাদের মাঝে আর নেই। দৈনিক যুগভেরীর পুরাতন অফিস যুগভেরী কমপ্লেক্স এ গিয়ে দেখলাম মানুষের বেশ ভীড়। প্রথমে দেখতে চাইনি। কারণ একজন প্রিয় মানুষের মৃত দেহ দেখার পর কারোই ভাল লাগার কথা নয়। প্রথমে দেখতে না চাইলেও পড়ে দেখলাম্ একটি নিথর দেহ একটি ছোট ধড়ির মধ্যে ছিল ঝুলানো অবস্থায়। পাশে রাখা কিছু কাপড়। আর সুসাইট নোটে লিখা আমি কোন অন্যায় করিনি। যে ক’মাস এক সাথে ছিলাম সে সময় মনে হয়নি মিন্টু দা কোন অন্যায় করতে পারেন। আর তা আমি বিশ্বাসও করিনি না। এখন একটা প্রশ্ন মনের মধ্যে ভীড় করে এমন একটা মানুষ কেন নিজে কে নিজে নিজে শেষ করে দিল।

সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পোষ্টমডেম হয়েছিল মিন্টুদা’র আমার সবাই ছিলাম সেখানে। পরেরদিন শশ্মানে লাশ সৎকার করা হয়েছিল। আমি যাইনি কারণ আমার সামনে মিন্টুদার দেহ আগুন দিয়ে জ্বালানো হবে তা দেখে সহ্য করতে পারব না সেজন্য। এখন অফিসে গেলে আমার টেবিলে বসলে যেন মিন্টুদা’র মুখ আমার চোখের সামনে ভেসে উঠে। হঠাৎ শুনি শুভ চল চা খেয়ে আসি পরক্ষনে আবার বুঝি এটি সত্যি নয়। আমার বন্ধু মাহবুবের সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসাপাতালের কোয়ার্টারে যখন যাই। তখন কলেজের পোষ্টমর্ডেম রুমটাও দেখা যায়। যখনই ঐরুমেরর দিকে চোখ পড়ে তখনই মিন্টুদার নিথর দেহটা আমার চোখের সামনে ভেসে উঠে। আর তাই মিন্টুদার মৃত্যুর পর আমি ভুলতে পারি না। প্রতিনিয়তই মনে পড়ে মিন্টুদাকে।