ক্যাটেগরিঃ জনজীবন, ফিচার পোস্ট আর্কাইভ

 
10_Eid-cattle_051014_0001

সবসময়ই সাধ আর সাধ্যের দ্বন্দ নিয়েই আমাদের মত মধ্যবিত্ত মানুষগুলোর পথচলা। কুরবানি ঈদের সময়ও ব্যাপারটা একই রকম। পশুর হাটে গিয়ে সাধ আর সাধ্যের ইকুইলিব্রিয়াম পয়েন্টে কোন একটা ছাগল কেনার জন্য ঘন্টাখানেক ধরে হাটের এপাশ থেকে ওপাশের মোটামুটি সমস্ত বিক্রেতার সাথে ছাগলগুলোরও পরিচিতি হয়ে যায়। ঈদের এক দিন বাকী। জোড়াগেটের হাটে আমাদের অবস্থাটাও এর থেকে খুব একটা ভিন্ন কিছু ছিল না। যেটা পছন্দ হয় সেটার দাম হিসাবের বাইরে; আর যেটার দাম সাধ্যের মাঝে সেটাকে কেমন যেন কোরবানি করার জন্য পছন্দের সীমারেখায় আনাটা বেশ কষ্টকর হয়ে যাচ্ছিল। ঘন্টাখানেকের ঘোরাঘুরির পর আল্লাহ সাধ আর সাধ্যের ব্যালান্স করে একজন বিক্রেতা মিলিয়ে দিলেন। ছাগলটার চেহারাটা আসলেই পছন্দ করার মত ছিল। বাঙালির চিরায়ত দামাদামীর পর্বটা শেষে যথেষ্ট আনন্দের সাথে ছাগলটা কিনে সিটি কর্পোরেশনের ফি পে করার সময় যখন ওদের কাউন্টারের সামনে দাঁড়ানো হল; তখন সেই আনন্দটা অনেকটা ম্লান হয়ে গেল।

“ছাগলটা আমার খুব প্রিয়; জুট মিলে চাকরি করি। ঐখানেই ছাগলটারে পুষে নিজেই বড় করেছি তো। আল্লাহ ইচ্ছা করলে আর বেতনটা পাইলে হয়ত বাড়িতেই এবার আল্লাহর ওয়াস্তে কুরবানী দিতাম ছাগলটা। বোনাস পাইসি; কিন্তু বেতন পাই নাই। এদিকে মেয়ে, জামাই আসছে। ঈদের খরচের জন্য ছাগলটারে… ”। কথাগুলো আসলেই আর শোনার মত পরিস্থিতি ছিল না আমার মনে। আর তার অবস্থা তো ওই কয়েকটি মুহূর্তের জন্য বুঝতেই পারছিলাম। আপনজনের মত ছাগলটাকে যে তিনি ভালোবাসতেন সেটা আরো ভালো করেই বুঝতে পারলাম যখন তিনি আমাদের সাথেই রাস্তা পর্যন্ত ছাগলটাকে নিজেই ধরে নিয়ে আসলেন। সন্তানের প্রতি ভালোবাসার জন্য সন্তানের মতই হয়ত সযত্নে পালন করা পশুটাকে তিনি আজ বিক্রি করছেন। হয়ত চাইছিলেন আরো কিছুটা সময় তার পছন্দের পোষা ছাগলটা তার চোখের সামনে থাকুক। আসলেই এক দিকে যেমন পছন্দসই একটা কুরবানির পশু কিনতে পারার ভালো লাগা তেমনি অন্যদিকে বিক্রেতার প্রতি একটা সহানুভূতি সব মিলিয়ে কেমন যেন একটা মিশ্র অনুভূতি কাজ করছিল।

বাসায় ফেরার পর ভাবছিলাম ওই মানুষটির কথা। ভাবছিলাম উদ্ভট আমাদের দেশের কথা। মাত্র চার-পাঁচ হাজার টাকার জন্য একজন মানুষকে তার খুব পছন্দের কুরবানির পশুটিকে বিক্রি করে দিতে হয়। অথচ সরকারের কাছে তার প্রাপ্য বেতন সময় মত পেলে হয়ত তিনি তার স্বপ্ন পূরন করতে পারতেন। পাশাপাশি জুট মিলের সরকারিগুলো লোকসানের ধোয়া তুলে চলে না; অথচ বেসরকারিগুলা ঠিক মতই চলে; সমস্যাটা তাহলে কোথায়? সমস্যা হল আমাদের রাজনৈতিক নেতাদের স্বজনপ্রীতি; আমাদের দূর্নীতির মানসিকতা; আমাদের হীনতা।

আমরা কোন একটি মানুষকে মাসে কোটি টাকা বেতন দিই; অথচ প্রাপ্য মাত্র কয়েক লক্ষ্য টাকা খরচ করে কয়েক হাজার মানুষকে ঈদের আনন্দ করার সূযোগ করে দিতে আমাদের দেশ পারে না। কোন একটা প্রতিষ্ঠান হাজার হাজার কোটি টাকা লোপাট করে নেওয়াটা দোষের হয় না; কিন্তু, কোন একটা সরকারি প্রতিষ্ঠান মাত্র কয়েক লক্ষ্য টাকা লোকসান করাটা বিরাট ক্ষতির। হায়রে দেশ! সুদ-ঘুষের টাকায় কয়েক লাখ টাকা দামের উট কুরবানি দেন যারা; তারাই খেটে খাওয়া মানুষের প্রাপ্য অর্থ আত্মসাত করেন। আবার তারাই সবার সামনে মার্সিডিজে চড়ে স্যালুট নিয়ে বেড়ান আর খেটে খাওয়া মানুষগুলো নিজের পোষা পশুটিকে বিক্রি করে এক হাতে চোখ মুছতে মুছতে বাড়ি যায় নিজেকে সান্তনা দিতে দিতে।

আর কতদিন এভাবে একদল মানুষ অন্যায়ভাবে অর্থের পাহাড় গড়বে আর একদল মানুষ তাদের প্রাপ্যটুকুও পাবে না? আর কতদিন ভালো মানুষগুলো, সৎ মানুষগুলোর সততা, ন্যায়, আদর্শ অসত মানুষগুলোর অর্থের দাপটে অর্থহীন হয়ে যাবে? আর কতদিন সরকার, রাষ্ট্র হবে শুধুই ধনীদের; অন্যায়কারীদের; চাটুকারদের; অসৎ মানুষদের? ওই বিক্রেতার তো কোন অনুকম্পার প্রয়োজন নেই; শুধু তার প্রাপ্য বেতনটাই তো তার স্বপ্নগুলোকে জীবন্ত রাখতে পারত। দেশ, সরকার, রাষ্ট্র এসবের কি কিছুই করার নেই প্রাপ্য অধিকারটুকু, পাওনাটুকু সময়মত মানুষের হাতে পৌছে দেবার জন্য? কিছুই কি করার নেই তাদের মুখে হাসি ফোটাতে না পারলেও অন্তত সবার অজান্তে যাতে চোখ মুছতে না হয় সেটার ব্যবস্থা করার? অপেক্ষায় রইলাম সেই দিনের…

 

 

প্রকৌশলী এস এ এহসান রাজন
প্রভাষক
কম্পিউটার বিজ্ঞান বিভাগ
খুলনা পাবলিক কলেজ, খুলনা।
E-mail: ahsan.rajon@gmail.com