ক্যাটেগরিঃ আর্ত মানবতা

নাহ… গত বছরের কেনা ব্লেজারটা কেমন যেন একটু ফ্যাকাশে হয়ে গেছে… অবশ্য ফ্রেন্ডরা, কলিগরা যেখানে নয়-দশ হাজার টাকা দিয়ে কিনেছিলো, সেখানে আমার পাঁচহাজারের ব্লেজারের এ অবস্থা হওয়াটাই স্বাভাবিক। সপ্তাহের ছয়দিন অফিসে চারটা স্যুট দিয়ে আর হচ্ছে না… আরো দুইটা দরকার; কতই বা আর খরচ; দুইটার জন্য হাজার বারো হলেই মোটামুটি চলে। টাইগুলাও শার্ট আর কোটের সাথে কেমন যেন ম্যাচ করছে না। ছয়-সাতশ টাকারই তো ব্যাপার প্রতিটা টাই- এর জন্য। এদিকে আবার থার্টি ফার্স্ট নাইটের জন্য প্রিপারেশন নিতে হবে। বছরে তো একটাই থার্টি-ফার্স্ট নাইট সেলিব্রেশন…। রয়্যালে নাকি এবার বুফে আড়াই হাজার টাকা; কমই তো। গতবারের মেনুগুলা খুব একটা ভালো ছিলো না। সেই সাথে কালচারাল আইটেমগুলাও এনজয় করিনি। এবার সিটি ইন এ পাঁচ হাজারের প্যাকে গেলে কেমন হয়? সেই সাথে ’ও-কে’ একটা সারপ্রাইজ গিফট দেবো ভাবছি; মানে নেক্সট এক উইকে বিশ হাজারের মত পকেট থেকে এক্সপেন্স করার প্লান রয়েছে। কেমন হবে সব মিলিয়ে? – না, না এটা আমার প্রশ্ন না। তবে এটা হয়ত আমাদের অনেকেরই প্রশ্ন। উত্তরে হয়ত বলতাম; নিশ্চয়ই… খারাপ হবে না। আসলেই তাই। আমি, আপনি আজ রঙ ফ্যাকাশে হওয়া পুলওভার, ব্লেজারের কথা ভাবছি; সপ্তাহের ছয়টি ওয়ার্কিং ডে তে ছয় সেট ড্রেস না হলে মন খারাপ করছি অথচ যে চোখে আপনার কাছে ধরা পড়ছে যে আপনার নতুন ড্রেসের রঙ ফ্যাকাশে হয়ে গেছে সে চোখ মেলেই একটু দেখুন না; আপনার আশেপাশে কত মানুষ একটা গরমের কাপড় দিয়ে সারা শীত কাটাছে… আপনার রুম হিটার টা একটু পুরানো হলেই লেপের মধ্যে থেকে আপনি যেমন চিল্লা-পাল্লা শুরু করেন যে ঠান্ডা লাগছে, একটু খবর নিয়েই দেখুন না, আপনার অফিসে অনেক ফোর্থ-ক্লাস স্টাফ জাস্ট দুইটি চাদর গায়ে দিয়ে নিশ্চুপ রাত কাটাচ্ছে। একবার জিজ্ঞাসা করেই দেখুন না আপনার ওই স্টাফদের, ওদের ছোট সন্তানদেরকে একটু উষ্ণতা দেওয়ার জন্য কতগুলা রাত ওরা মিথ্যা বলেছে ওদের সন্তানদের… “আমার গরম লাগছে; তোরাই আজ কম্বলটা ডাবল করে গায়ে দে…”। কতটা রাত ওরা ঠকঠক করে কেপেছে সকালে ধুয়ে দেওয়া একমাত্র গরম কাপড়টা পুরোপুরি শুকানো না হওয়ায়। আপনার অফিস রুমে রুম ওয়ার্মারে অথবা এয়ার কন্ডিশোনারে যখন আপনি বুঝতেই পারেন না যে, বাইরে তাপমাত্রা কত; এমনকি অফিসের গাড়ীতে বাসায় ফেরার পথেও যখন আপনার চোখের সানগ্লাস আর গাড়ীর কালার গ্লাসগুলো আপনাকে দেখতে দেয় না বাইরের মানুষগুলোর কষ্ট তখন একটু গাড়ীর গ্লাসটা নামিয়ে বাতাসকে স্পর্শ করে দেখুন না; আপনার ড্রাইভারেরই কতটা কষ্ট হতে পারে তার ওই টিনের ঘরে? আপনার রুম ওয়ার্মারটি সময়মত অন করে দিচ্ছে যে পিওনটা, আপনার অফিস রুমের বাইরে করিডোরে প্রচন্ড বাতাসের মাঝে বসে যে অপেক্ষায় থাকে কখন আপনি কলিংবেল বাজাবেন কোন অর্ডার দেওয়ার জন্য, তার ড্রেসটার দিকে একবার তাকিয়ে দেখেন না, কী অবস্থা ওর… না হয় জাস্ট একটা বার হ্যান্ডশেক করে অনুভব করেন না; ওর হাতটা কতটা ঠাণ্ডা…?

থার্টি ফার্স্ট নাইটে একটু আনন্দ করাই যায়… তাই না? হ্যা… তাই তো…। তবে রেস্টুরেন্টে… ক্লাবে যাবার পথে একটু রেলওয়ে স্টেশন; অথবা মসজিদগুলোর বাইরে; পার্কে এমনকি রাস্তার পাশে একটু আপনার গাড়ি থামিয়েই দেখুন না মাটিতে শুয়ে থাকা ওই homo-sapiens দের। ওরা তো আপনার মত প্রিয়জনের সাথে ড্রিংস এর পেয়ালা শেক করতে চায় না; শুধু এতোটুকু চায় যে শিতে যেন ওদের হাড়গুলো ঠক-ঠক করে একে অন্যের সাথে শেকিং না করে। ওরা তো আপনার মত রুমে রুম-হিটার চালিয়ে গরম কাপড় খুলে সাধারণ ড্রেস পরে থাকার মত পরিবেশ চায় না… শুধু এতোটুকু চায় যেন প্রচন্ড শীতে ওদের প্রানটা বের হয়ে না যায়…। আপনি যখন রয়্যাল অথবা সিটি ইনে বুফে মিডনাইট-ডিনারে ব্যস্ত তখন হাজারো মানুষ কিন্তু ঘুমিয়ে পড়েছে… ঠান্ডা আর ক্ষুধার থেকে নিজেকে কিছুটা সময় দূরে রাখার জন্য… আপনি যখন ব্যান্ডের সুর-মূর্ছনায় হাসছেন, তখন অনেক বাবা-মা’ই কিন্তু এটা ভেবে নিশ্চুপে কাঁদছেন এটা ভেবে যে আগামীকাল সকালে বছরের প্রথম দিনে হয়ত তার সন্তানকে খাওয়ানোর মত কিছুই নেই তাদের হাতে… আপনি যখন আপনার ড্রিংক্সের বোতলটা রাস্তায় ছুড়ে ফেলছেন তখন অতো রাতেও কিন্তু হাফ-প্যান্ট পরে থাকা ওই বস্তির ছেলেটা ওটা কুড়িয়ে নিচ্ছে সেটাকে আগামীকাল সকালে বেচে কয়েকটা টাকা পাবার জন্য… আপনি যে ড্রামের শব্দে হাসছেন আপনার আপনজনের হাত ধরে তখন সেই ড্রামের শব্দ কিন্তু রাস্তার অন্যদিকের ফুটপাথে শুয়ে থাকা মানুষগুলোর বুকে আঘাত করছে… আপনি যতই চাইছেন যেন থার্টিফার্স্ট নাইটটা আরো লম্বা হোক কিছুটা সময়ের, তখন কিন্তু হাজারো-লাখো মানুষ স্রষ্টার কাছে প্রার্থনা করছে যেন এই প্রচন্ড শীতের রাতটায় কনকনে ঠাণ্ডায় শীতবস্ত্রের অভাবের কষ্টটা থেকে তাড়াতাড়ি মুক্তি পেতে পারে সকালের সূর্যোদয়ের মধ্য দিয়ে… আরো একটা শীতের রাত যেন বিদায় হয় তাড়াতাড়ি…।
আমার আপনার নতুন স্যুটের দরকার… থার্টি ফার্স্ট নাইট সেলিব্রেশনের দরকার… প্রিয়জনকে নিউ-ইয়ার গিফটস দেওয় দরকার… সব কিছুই অবস্থা আর অবস্থানের জন্য ঠিক… কিন্তু, আসুন না… আপনার তিন হাজার টাকার ব্লেজার কেনার বাজেট থেকে তিনশটা টাকা গরীব মানুষকে দেই… আপনার কাছের মানুষটা আপনার পাচ হাজার টাকার গিফটের ড্রেসটা হয়ত পাঁচমাস ব্যববার করবে, আর পাঁচশ টাকায় আপনার কিনে দেওয়া শীতের পোষাকটা হয়ত ওই গরীব মানুষটার আগামী পাঁচ বছরের পুরো শীতের সময়টাতে স্বস্তি দিবে… মাত্র একটা রাতের ডিনারের চার হাজার টাকায় হয়ত আপনি একটা ঘন্টা আনন্দ পাবেন… আর চারশ টাকার একটা কম্বল হয়ত একটা পরিবারের অনেকগুলো মানুষকে দশ বছরের জন্য একটু শান্তিতে ঘুমানোর সূযোগ দিবে…। তাই আসুন না… কয়েকশ টাকা… অথবা একটা পুরানো কম্বল… নতুনা আপনার বাসায় অব্যবহৃত পড়ে থাকা পুরানো ড্রেসটা নিয়ে প্রচন্ড শীতে কষ্ট পাওয়া মানুষগুলোর পাশে দাড়াই…। ওই শীতার্ত মানুষগুলোর পাশে দাঁড়িয়ে ওদের প্রতি সাহায্যের হাত বাড়িয়ে ওদের হাসিমাখা মুখটা দেখার আনন্দে এই থার্টি ফার্স্ট নাইটের আনন্দটা একটু অন্যভাবে উপলব্ধি করার, উপভোগ করার আমন্ত্রণ রইলো…।

প্রকৌশলী এস. এ. এহসান রাজন
প্রভাষক, কম্পিউটার বিজ্ঞান বিভাগ,
খুলনা পাবলিক কলেজ, খুলনা।
ই-মেইলঃ ahsan.rajon@gmail.com