ক্যাটেগরিঃ ক্যাম্পাস

 

শিক্ষা মানুষের মৌলিক অধিকার। এই মৌলিক অধিকারকে বাস্তবায়নের প্রয়াসে প্রাথমিক শিক্ষাকে বাধ্যতামূলক করা হয়েছে অনেক বছর আগেই। নিম্ন মাধ্যমিক শিক্ষা, মাধ্যমিক শিক্ষা এবং উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষার প্রতিও রয়েছে যথেষ্ট গুরুত্ব। মাধ্যমিক ও উচচ মাধ্যমিক পর্যায়ে শিক্ষার হার বৃদ্ধির ক্ষেত্রে বাংলাদেশের এই সাফল্য নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবী রাখে। কিন্তু এই মূদ্রার অপর দিকে রয়েছে ব্যর্থতার এক করুণ কাহিনী। উচ্চ শিক্ষার ক্ষেত্রে (বিশেষতঃ স্নাতকোত্তর পর্যায়ে) সেই ঔপনিবেশিক আমল থেকে চলে আসা অবহেলার বলয় যেন আজও আমরা সযত্নে লালন করে যাচ্ছি। আর এ কারনেই বোধ হয় আমরা কথায় কথায় মেধা পাচারের কথা বলি, মেধাবীদের বিদেশমূখীতাকে ভৎসনা করি; অথচ, একটি বারের জন্যও আমরা ভেবে দেখি না যে, আমরা তাদের জন্য কতখানি করতে পেরেছি, তাদের বিদেশমূখীতা রোধ করার জন্য কি কি পদক্ষেপ নিয়েছি। একটা সাধারণ বিশ্লেষনে আসি; আমরা যদি বিগত এক দশকের ক্ষেত্রে একটু খেয়াল করি তবে স্পষ্টভাবেই প্রতীয়মান হবে যে, বাংলাদেশ থেকে প্রতি বছর উচ্চ শিক্ষার্থে যতজন বাইরে যাচ্ছেন তার সিংহভাগই বিজ্ঞান, প্রকৌশল, প্রযুক্তি তথা প্রফেশনাল বিষয়ে মাস্টার্স/পিএইচডি প্রোগ্রামে অধ্যয়নের/গবেষণার জন্য বিদেশে যাচ্ছেন। অন্যান্য নন-প্রফেশনাল বিষয়গুলির ক্ষেত্রে বিদেশে গমনকারী শিক্ষার্থীদের সংখ্যা তূলনামূলকভাবে কম। এবার একটু দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর দিকে তাকাই; বিশেষত খ্যাতনামা পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর দিকে। প্রকৌশল ডিগ্রীর পাশাপাশি বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো উল্লেখযোগ্য হারে প্রফেশনাল ডিগ্রী দেওয়া শুরু করে নব্বই দশকের দিক থেকে। সেই সময় থেকেই অপেক্ষাকৃত মেধাবী শিক্ষার্থীদের প্রথম পছন্দ আর অভিভাবকদের স্বপ্ন হয়ে দাঁড়ায় এই সমস্ত যুগোপযোগী বিষয়সমুহ।

মেধাবী শিক্ষার্থী আর নিবেদিত শিক্ষকদের এই সমন্বয় ধীরে ধীরে এই স্নাতক প্রোগ্রামগুলোকে যথেষ্ট মর্যাদার আসনে প্রতিষ্ঠিত করে। এই গ্রাজুয়েটরা তাদের মেধার স্বাক্ষর রাখতে শুরু করে সমাজের ব্যবহারিক চ্যালেঞ্জিং পেশাগুলোতে। কিন্তু দুঃখের বিষয়, প্রায় দুই দশক পেরিয়ে গেলেও এই বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অধিকাংশই এখনো পর্যন্ত ঐ সকল প্রফেশনাল বিষয়ের গ্রাজুয়েটদের উচ্চ শিক্ষা নিশ্চিতকরণের জন্য স্নাতকোত্তর ডিগ্রী চালু করতে পারেনি। সাধারণভাবে, একজন মেধাবী শিক্ষার্থী যে একটি তীব্র প্রতিযোগিতার মধ্যে দিয়ে কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতক প্রোগ্রামে ভর্তি হয়, এবং চার/পাঁচ বছর ডিগ্রী অর্জনের পর দেখতে পায় যে, বাংলাদেশে উচ্চ শিক্ষা অর্জনের মাধ্যমে তার মেধা ও দক্ষতার বিকাশের কোনই সুযোগ নেই, তখন স্নাতকোত্তর ডিগ্রীর জন্য তার বিদেশমূখী হওয়া ব্যতীত কোন গত্যন্তর থাকে না। পাশাপাশি, যখন অধিকাংশ ক্ষেত্রে মধ্যবিত্ত পরিবারের এই সকল মেধাবী গ্রাজুয়েট দেখেন যে, বিদেশে উচ্চ শিক্ষার্থে স্কলারশীপসহ গেলে একদিকে যেমন তিনি তার কাঙ্খিত মানসম্মত ডিগ্রী প্রায় সম্পূর্ন বিনা-ব্যায়ে পাচ্ছেন এবং পাশাপাশি কোন কোন ক্ষেত্রে ঐ দেশ তাকে তার মেধার জন্য বা উক্ত বিশ্ববিদ্যালয়কে গবেষণাকর্মে সহযোগিতার জন্য পর্যাপ্ত অর্থ প্রদান করছে যা তার ও তার পরিবারের জন্য নিঃসন্দেহে ফলপ্রসু তখন স্বাভাবিকভাবেই তিনি দেশ ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হন। বাংলাদেশের আর্থ সামাজিক অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে এই সার্বিক বিষয়টির জন্য সম্ভবতঃ কোনভাবেই আমরা প্রফেশনাল গ্রাজুয়েটদেরকে দোষ দিতে পারি না। একটি ছেলে বা মেয়ে কখনোই তার পরিবার থেকে শত-সহস্র মাইল দূরে যেতে চাইবে না, যদি দেশেই তার প্রয়োজন বা চাহিদার পূর্নতা ঘটানো সম্ভব হয়। আমরা এই গ্রাজুয়েটদের জন্য উচ্চ-শিক্ষার ব্যবস্থা দেশে করতে পারছি না বলেই তাদের বিদেশে যাবার প্রবণতাকে তীর্যক দৃষ্টিতে দেখার কোন গ্রহনযোগ্য কারন থাকতে পারে না। আমরা যদি উদাহরণস্বরূপ কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশল বিষয়ের প্রতি দৃষ্টিপাত করি তবে বিষয়টি আরো সুস্পষ্ট হয়। বর্তমানে বাংলাদেশের অধিকাংশ পাবলিক ও প্রায় সব কয়টি বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ে কম্পিউটার বিজ্ঞান বিষয়টি চালু থাকায় প্রতি বছর প্রায় আট থেকে দশ হাজার শিক্ষার্থী কম্পিউটার প্রকৌশল ডিগ্রী লাভ করে। সফটওয়্যার কোম্পানিসহ অন্যান্য প্রতিষ্ঠানে আইটি বিশেষজ্ঞের প্রচুর চাহিদা থাকায় এই পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাশ করা মেধাবী প্রকৌশলীদের একটি বড় অংশ অত্যন্ত অল্প সময়ের ব্যবধানে মোটামুটি সম্মানজনক চাকুরীর সূযোগ পান। মেধাবীদের আরেকটি বড় অংশের ক্ষেত্রে ঘটে বিপত্তি। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম সারির এই শিক্ষার্থীদের উচ্চ শিক্ষার ইচ্ছা থাকা স্বত্তেও তারা দেশে কোন সুযোগ পান না; কারন আশির বেশি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ডিগ্রী অর্জনকারীদের জন্য কম্পিউটার প্রকৌশলে স্নাতকোত্তর প্রোগ্রামের সূযোগ রয়েছে দশটির মত বিশ্ববিদ্যালয়ে। যারা সুযোগ পান, তাদেরও পড়তে হয় মনস্তাত্বিক জটিলতায়। কারণ, পূর্ণকালীন এই শিক্ষার্থীরা যখন দেখেন যে, তারই কোন বন্ধু উচ্চ-বেতনে চাকুরি করছে, আর তাকে নির্ভর করতে হচ্ছে পরিবারের প্রতি, তখন অনেক ক্ষেত্রেই তারা স্নাতকোত্তর পর্যায়ের পড়াশোনায় ইতি টানেন। আবার, যে সমস্ত চাকুরিজীবী খন্ডকালীন শিক্ষার্থী হিসাবে স্নাতকোত্তর শুরু করেন, তারাও অনেক ক্ষেত্রে প্রফেশনাল জীবনের চ্যালেঞ্জ ও ব্যস্ততা কাটিয়ে লেখাপড়া/গবেষণা চালিয়ে যেতে ব্যর্থ হন। ফলশ্রুতিতে বাংলাদেশ ব্যর্থ হয় উচ্চশিক্ষিত বিশেষজ্ঞ প্রকৌশলী, বিজ্ঞানী তৈরি করতে। এবার আসি গবেষণার বিষয়ে। একটি গবেষণার বড় সাফল্য হল মানসম্মত আন্তর্জাতিক সম্মেলন অথবা জার্নালে সেই গবেষণার প্রকাশনা। বাংলাদেশের মেধাবীদের জন্য গবেষণা অথবা গবেষণাপত্র তৈরি করা যত না কঠিন হয়, তার থেকে শত সহস্র গুন বেশি কঠিন হয় সেটির প্রকাশনার ব্যবস্থা করা। কারণ অধিকাংশ আন্তর্জাতিক সম্মেলন অথবা জার্নালে প্রকাশনার জন্য যে অংকের প্রকাশনা চার্জ অথবা রেজিষ্ট্রেশন ফি দেওয়ার প্রয়োজন হয় তা বহন করা শিক্ষার্থী গবেষকদের জন্য শুধু কষ্টকরই নয় কোন কোন ক্ষেত্রে অসম্ভবও বটে, যার প্রেক্ষিতে উক্ত গবেষণার কাঙ্খিত লক্ষ্য ব্যহত হয়। অথচ, বিদেশে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এ ধরণের সামগ্রিক খরচই শুধু বহন করে না বরং গবেষণার জন্য উক্ত গবেষককেও পৃষ্ঠপোষকতা দেয়।

বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক অবস্থার প্রেক্ষিতে আমরা কখনোই আশা করি না যে, উন্নত বিশ্বে উচ্চ-শিক্ষার্থীদের ও গবেষকদের যে সমস্ত পৃষ্ঠপোষকতা বা সুযোগ সুবিধা দেওয়া হয় তার সব কিছু আমরা আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও গবেষকদের দিব অথবা দিতে পারব। কিন্তু, স্বাধীনতা অর্জনের চল্লিশ বছর পূর্তির এই সময় অন্ততঃ আমাদের উচিৎ উচ্চ শিক্ষা ও গবেষনায় উল্লেখযোগ্য হারে পৃষ্ঠপোষকতা প্রদান শুরু করা। প্রাথমিক শিক্ষায় সবচেয়ে বড় অংকের বরাদ্দের প্রয়োজন, এই ব্যাপারে কোন দ্বিমত নেই এটা যেমন সত্যি, তেমনি এটিও বাস্তব যে, আমরা যদি উচ্চ শিক্ষা ও গবেষণাকে প্রয়োজনীয় পৃষ্ঠপোষকতা দিতে না পারি তবে আমাদের হয়ত জীবনমূখী ক্ষেত্রগুলোতে অচিরেই মেধাশূন্যতায় ভুগতে হবে। প্রতি বছর বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে বিদেশী কনসালটেন্ট নিয়োগ করার জন্য আমরা যে পরিমান অর্থ ব্যয় করি সেই অর্থ যদি আমরা দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মাস্টার্স/পিএইচডি শিক্ষার্থীদের গবেষণার জন্য প্রদান করতাম তবে দেশ একদিকে যেমন “থিঙ্ক-ট্যাঙ্ক” পেত তেমনি নিজের সম্পদকে দেশের মধ্যে রাখতে সক্ষম হত। স্বাধীনতার চল্লিশ বছর অতিক্রম করে যখন আমাদের এই পথচলার সূচনার কথা ভাবতে হয় তখন বাস্তবিক অর্থেই আমাদের চিন্তার বন্ধ্যাত্ব সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে। ব্রিটিশদের কাছ থেকে উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া এই কেরানি তৈরির শিক্ষাব্যবস্থার জাল ছিন্ন করতে না পারলে হয়ত সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার আমাদের সোনালী স্বপ্ন প্রতি পদক্ষেপে হোঁচট খাবে; উচ্চ শিক্ষার প্রতি আমাদের যে সুস্পষ্ট অবহেলা তা দূর করতে না পারলে হয়ত অদূর ভবিষ্যতে বাংলাদেশ এটি মেধাহীন রাষ্ট্রে পরিণত হবে, যা কখনোই কারো কাছে প্রত্যাশিত নয়। তাই, বাংলাদেশের নীতি নির্ধারকদের উচিৎ শিক্ষা খাতের মোট বরাদ্দের একটা গুরুত্বপূর্ণ অংশ উচ্চ শিক্ষা ও গবেষণার জন্য ব্যয় করা, যে ব্যয় বাস্তবিক অর্থে কোন খরচ নয় বরং এক সুস্পষ্ট সর্বব্যপী বিনিয়োগ, যা দেশকে নিয়ে যেতে পারে সাফল্যের স্বর্ণশিখরে।