ক্যাটেগরিঃ স্বাধিকার চেতনা

 

সুপ্রাচীন ঐতিহ্যের অধিকারী আমাদের এই বাংলাদেশ। আমরা বর্তমানে যে স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশের অদিবাসী, তা বাংলা ভাষা-ভাষী জনগোষ্ঠী অধ্যুষিত বিস্তৃত জনপদের একটি অংশ। বাংলাদেশের বাইরে ভারতের পশ্চিম বঙ্গ, বিহার, উড়িষ্যা, ত্রিপুরা ও আসামে বাংলা ভাষাভাষী লোক বাস করে। বাংলাদেশের প্রাচীন নাম বঙ্গ ও বঙ্গাল থেকে এর অধিবাসীরা বাঙাল বা বাঙালি নামে পরিচিত।

বর্তমানে পৃথিবীতে স্বাধীন রাষ্ট্রের সংখ্যা ১৯৫ টি। বাংলাদেশ তার একটি। এই স্বাধীনতা আমাদের কেউ ইচ্ছে করে দেয়নি, এক সাগর রক্তের বিনিময়ে আমরা পেয়েছি এই স্বাধীন সার্বভৌম দেশ।
১৯৪৭ সালে দ্বি-জাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে পাকিস্তান রাষ্ট্রের জন্মের পর থেকেই পূর্ব বাংলার প্রতি অবহেলা ও প্রবঞ্চনা শুরু হয়। পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী প্রথম আঘাত হানে সংখ্যাগরিষ্ঠ অধিবাসীর বাংলা ভাষার উপর। বাঙালির মুক্তি সংগ্রামের ইতিহাসে ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন প্রথম মাইলফলক। তৎকালীন পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ তথা ৫৬.৪০% অধিবাসীর ভাষা বাংলাকে বাদ দিয়ে মাত্র ৩.২৭% অধিবাসীর ভাষা উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার পায়েতারা করে। ভাষা আন্দোলনের প্রধান উদ্দেশ্য ছিল উর্দুর সাথে বাংলা ভাষাকেও রাষ্ট্রভাষা করা। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারী বুকের রক্ত দিয়ে তাদের দাবি প্রতিষ্ঠা করে।

পাকিস্তান রাষ্ট্রটির জন্মের পর থেকেই পশ্চিম পাকিস্তান পূর্ব বাংলার প্রতি রাজনৈতিক, সামরিক, অর্থনৈতিক সাংস্কৃতিক প্রভৃতি ক্ষেত্রে বৈষম্যমুলক আচরণ শুরু করে। পাকিস্তানি শাসক গোষ্ঠী কোন দিনই পুর্ব বাংলাকে তাদের রাষ্ট্রের অংশ মনে করেনি, মনে করেছে তাদের উপনিবেশ । এর প্রমাণ, পাকিস্তানের মোট জনগোষ্ঠীর সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ (প্রায় ৫৬%) পূর্ব বাংলায় বাস করা সত্ত্বেও এর রাজধানীসহ কেন্দ্রীয় সরকারের সকল বিভাগ, রাষ্ট্রীয় ব্যাংক এবং সরকারী বেসরকারী অন্যান্য আর্থিক ও বিভিন্ন উন্নয়ন সংস্থার প্রধান কার্যালয় পশ্চিম পাকিস্তানে প্রতিষ্ঠিত হয়। পাকিস্তানের মোট জনগোষ্ঠীর সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ পূর্ব বাংলায় বাস করা সত্ত্বেও দেশ পরিচালনার মূল ক্ষমতা পশ্চিম পাকিস্তানিদের হাতে থাকে। প্রেসিডেন্ট ও প্রধান মন্ত্রী, বিভিন্ন বাহিনীর প্রধান, গুরুত্ত্বপূর্ণ মন্ত্রনালয়ের মন্ত্রীত্ব থাকে অবাঙালি পাকিস্তানিদের হাতে। এছাড়া আয় বৈষম্য, সম্পদ পাচার, বৈদেশিক সাহায্য, শিল্পের উন্নয়নসহ প্রতিটি ক্ষেত্রে বৈষমের শিকার হয় পূর্ব বাংলা।

পাকিস্তানী ঔপনিবেশিক শাসন ও শোষণ থেকে মুক্তির জন্য জাতির জনক শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৬৬ সালে ৬-দফা কর্মসূচী ঘোষণা করেন। জাতির জনকের ৬-দফা শোষিত ও নির্যাতিত বাঙালির নিকট তাদের “ম্যাগনাকার্টা” বা “মুক্তিসনদ” রুপে গৃহীত হয়। জাতির জনকের কারিশমা এবং বাংলার সংগ্রামী ছাত্র সমাজের গতিশীলতা অল্প সময়ের মধ্যেই এই কর্মসূচীকে সকল স্তরের বাঙালিকে এক্যবদ্ধ হওয়ার বলিষ্ঠ ঘোষণায় পরিণত হয়।

১১-দফা দাবিতে ১৭ জানুয়ারী (১৯৬৯) থেকে পূর্ব পাকিস্তানের ছাত্ররা আন্দোলন শুরু করে। ঐ দিন ছাত্র সংগ্রাম কমিটি হরতাল এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বটতলায় সভা আহবান করে। একই দিনে গণতান্ত্রিক সংগ্রাম কমিটিও পল্টন ময়দানে সমাবেশ ও মিছিলের কর্মসূচী গ্রহল করে। এই কর্মসুচী চলাকালে পুলিশের সাথে ছাত্র জনতার সংঘর্ষ বাধে। এতে জনমনে ভীষন ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। ১৮ জানুয়ারী প্রতিবাদ দিবস পালিত হয়। এদিনও পুলিশি নির্যাতনে বহু ছাত্র আহত ও গ্রেফতার হয়। এ আন্দোলয় ২০ জানুয়ারী চরমে পৌছে। এদিন হাজার হাজার ছাত্রের মিছিল রাস্তায় নামলে পলিশ মিছিলের উপর গুলিবর্ষন করে। এতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আসাদ শহীদ হয়। আসাদের মৃত্যুতে গণজাগরের বিস্ফোরণ ঘটে। ২১ জানুয়ারী ঢাকা শহরে সর্বাত্মক হরতাল পালিত হয়। ২২ ও ২৩ জানুয়ারী প্রতিবাদ মিছিল হয় এবং ২৪ জানুয়ারী ঢাকা শহরে সাধারণ হরতালের ডাক দেয়া হয়। ২৪ জানুয়ারী সকাল থেকেই ছাত্রসহ লক্ষ লক্ষ শ্রমিক, শহরের দরিদ্র ও মেহনতি মানুষসহ সকল পেশার মানুষ রাজপথে নেমে আসে। হরতাল সম্পূর্ণরুপে সফল হয়।

ঊনসত্তরের গণঅভ্যুথানের মধ্য দিয়ে স্বৈরাচারী আইয়ুব খানের পতন হলে জেনারেল ইয়াহিয়া খান পাকিস্তানের শাসন ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে পূর্ব পাকিস্তানের জনগন একচাটিয়াভাবে ৬-দফার পক্ষে রায় প্রদান করে। আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। নির্বাচনের পর শেখ মুজিবুর রহমান ৬-দফার ভিত্তিতে শাসনতন্ত্র প্রনয়নের দলের অভিমত জানিয়ে দেন এবং এ ব্যাপারে অনড় থাকেন। ইয়াহিয়া খান, ভূট্রো সাহবের প্ররোচণায় আওয়ামী লীগের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর না করে নানা তালবাহানা শুরু করেন এবং গোপনে পূর্ব পাকিস্তানে সৈন্য আমদানী করতে থাকেন। ইয়াহিয়া ১৯৭১ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারী ঘোষনা করেন, ৩ মার্চ ঢাকায় জাতীয় পরিষদের অধিবেশন বসবে। কিন্তু ভু্ট্রোর সাথে গোপন বৈঠকের পর ১ মার্চ ইয়াহিয়া ৩ মার্চের অধিবেশন স্থগিত ঘোষণা করেন। ইয়াহিয়ার এই ঘোষনায় সারা দেশে প্রতিবাদ ও বিক্ষোভের ঝড় উঠে। শেখ মুজিবুর রহমান এর প্রতিবাদে ২ ও ৩ মার্চ ঢাকায় হরতাল এবং ৭ মার্চ রেসকোর্সের ময়দানে জনসভার ঘোষনা দেন। ২ ও ৩ মার্চ ঢাকায় হরতাল সফল হয়। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান রেসকোর্সের ময়দানের ঐতিহাসিক ৭ মার্চের জনসভায় ঘোষনা করলেন “………..এবারের সংগ্রাম, আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম, আমাদের স্বাধীনতার সংগ্রাম,……..”। ৭ মার্চের ভাষণ সারা দেশের মানুষকে রোমাঞ্চিত করে তোলে। তার এ ভাষণ মুক্তি যুদ্ধের ৯ মাস বাঙালির মনে সংগ্রামী প্রণোদনা যোগায়।

২৫ মার্চ মধ্যরাত্রি হতে বাঙালির উপর শুরু হয় ইতিহাসের সর্বাপেক্ষা বর্বরতম গণহত্যা অভিযান। বাঙালিরাও এ গণহত্যা অভিযানের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিরোধ গড়ে তোলে। ঐ রাতেই জাতির জনক শেখ মুজিবুর রহমানকে গ্রেফতার করা হয়। তবে তিনি পাক-হানাদার বাহিনীর হাতে বন্দি হবার পূর্বে ২৫ মার্চ রাত্রি ১টা ১০ মিনিটে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষনা দিয়ে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীকে সর্বতোভাবে মোকাবেলার আহবান জানান। ২৭ মার্চ চট্রগ্রামের কালুরঘাটে স্থাপিত স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী বেতার কেন্দ্র থেকে মেজর জিয়াউর রহমান শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষে স্বাধীনতার ঘোষনা পাঠ করেন। এই যুদ্ধ দীর্ঘ নয় মাস ধরে চলে। ৯ মাসের মুক্তিযুদ্ধে লক্ষ লক্ষ তাজা প্রাণের বিনিময়ে আসে আমাদের স্বাধীনতা। আজ এই দিনে বিজয় ছিনিয়ে আনে বাঙালি জাতি। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর পাক হানাদার বাহিনীর অধিনায়ক লে: জেনারেল আমির আবদুল্লাহ নিয়াজী তার ৯৩ হাজার সৈন্য ও অস্ত্রশস্ত্রসহ ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে যৌথ কমান্ডের প্রধান জগজিৎ সিং অরোরা ও বাংলাদেশ বাহিনীর পক্ষে উপ প্রধান এ. কে. খন্দকারের উপস্থিতিতে আত্মসমর্পনের দলিলে স্বাক্ষর করেন।

দীর্ঘ ২৪ বছরের শোষণ-সঞ্চনার বিরুদ্ধে স্বাধীনতা সংগ্রামের পর ১৯৭১ সালের ৯ মাসের মুক্তিযুদ্ধে লক্ষ লক্ষ বাঙালির রক্তদানের মধ্য দিয়ে বিশ্বের মানচিত্রে স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশের উদ্ভব হয়। আজ এই বিজয় দিবসে জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানদের জানাই লক্ষ সালাম।