ক্যাটেগরিঃ রাজনীতি

প্রাচীন বাংলার ইতিহাসে শশাঙ্ক একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছেন। সপ্তম শতকের বাংলার ইতিহাসে গোড়াধিক শশাঙ্ক অকস্মাৎ উল্কাপিন্ডের মত উদিত হয়ে কিছু সময়ের জন্য আপন কৃতিত্বের দ্বারা সমকালীন ইতিহাসে আলো ছড়িয়ে দেন। শশাঙ্ক এক অজ্ঞাত ও অখ্যাত স্থান থেকে নিজ যোগ্যতার জোরে ভারত ইতিহাসের পাদপ্রদীপের সামনে এসে দাঁড়ান। শশাঙ্ক শুধুমাত্র দুঃসাহসিক অভিযানকারী (adventurer) ছিলেন না। তার শাসনব্যবস্থা সম্পর্কে বিশদ কিছু জানা না গেলেও তার প্রজাহিতৈষণা কম ছিল মনে করা যায় না। তিনি গৌড়দেশের শুধুমাত্র মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করেননি, তার স্বয়ং-সম্পূর্ণ অর্থনীতি গঠনের আয়োজন করেন। তবে তার প্রতিষ্ঠিত সাম্রাজ্য স্থায়ী হয়নি। প্রতিকুল পরিস্থিতির চাপে তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর সাম্রজ্য ধ্বংস হয়। বাংলার প্রথম জাতীয় সম্রাট হিসাবে তাঁকে ইতিহাসে স্বীকৃতি দেওয়া হয়।

৬৩৭ খ্রীস্টাব্দে শশাঙ্কের মৃত্যুর পর বাংলার রাজনৈতিক ঐক্য ভেঙ্গে পড়ে। (১)কজাঙ্গাল; (২)পুন্ড্রবর্ধন; (৩)কর্ণসুবর্ণ; (৪)তিম্রলিপ্ত; (৫)সমতট এই বিভিন্ন অঞ্চলে ভাগ হয়ে যায়। বৌদ্ধ আর্যমঞ্জুশ্রী মুলকল্পের মতে, ব্রামণ, ক্ষত্রিয়, বণিক যে যেভাবে পারে ক্ষমতা আধিকার করে। হত্যা, গৃহযুদ্ধ, দুর্বলের উপর বলবানের অতাচ্যার বাংলায় নিত্য-নৈমিত্তিক ঘটনা হয়ে দাঁড়ায়। বাংলায় অরাজকতা ও কুশাসন যেন একটি স্বাভাবিক নিয়মে পরিণত হয়। উত্তর ভারতে বাংলার এই অরাজকতাকে “গৌড়তন্ত্র” অর্থাৎ গৌড় দেশের নিয়ম বলে ব্যঙ্গ করা হত। বাংলার এই দুরবস্থার সুযোগে কিছু দিনের জন্য হর্ষবর্ধন পশ্চিম বাংলা ও কামরুপে ভাস্কর বর্মন পূর্ব বাংলা দখল করেন। শশাঙ্কের পুত্র মানবদেব তাঁর পিতার গৌরব রক্ষা করতে পারেননি।

লামা তারানাথের বর্ণনা ও অন্যান্য বৌদ্ধ গ্রন্থ হতে জানা যায় যে, এ সময় বাংলায় ‘মাৎস্যন্যায়’ দেখা দেয়। মানুষ মাছের মত আচরণ করে তখন মাৎস্যন্যায় বলা হয়। মৎস্য জগতে বড় মাছ ছোট মাছকে গিলে ফেলে। মনুষ্য সমাজে যখন প্রবল, দুর্বলকে পীড়ন করে তাকে ‘মাৎস্যন্যায়’ বলা হয়। ব্রামণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য যে যেখানে সম্ভব নিজ নিজ অধিকার স্থাপন করে। এ যুগে বাংলার এমন অর্থনৈতিক দুর্গতি হয় যে, সমকালীন কোন রৌপ্যমুদ্রা এখনও পর্যন্ত কোথাও পাওয়া যায়নি। সম্ভবতঃ বাংলায় রৌপ্যমুদ্রায় সংখ্যা অত্যন্ত হ্রাস পায়। এর ফলে ব্যবসা-বাণিজ্য বন্ধ হয়। তাম্রলিপ্ত বন্দর এই যুগে ধ্বংস হয়ে যায়।

বাংলার এই সর্বনাশা অবস্থা উপলব্ধি করে বাংলার “প্রকৃতিপুঞ্জ” বাংলার সিংহাসনে গোপালকে নির্বাচন করে। গোপাল ছিলেন বাংলার সামন্ত রাজাদের অন্যতম। কীলহর্ণ খলিমপুর লিপির ব্যাখ্যা করে বলেছেন যে, গোপালকে “প্রকৃতিপুঞ্জ” অর্থাৎ জনসাধারণ নির্বাচন করেছিল। গোপালের কৃতিত্বে বাংলা স্বৈরাচারী ও “কামাকারী” অর্থাৎ অরাজকতা সৃষ্টিকারীদের কবল থেকে উদ্ধার হয়। অরাজকতার অবসান ঘটিয়ে বাংলায় পুণরায় শান্তি-শৃঙ্খলা ফিরে আসে।

পৃথিবীর মানচিত্রে আমাদের এই সোনার বাংলা একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম দেশ। এই স্বাধীনতা আমাদের কেউ ইচ্ছে করে দেয়নি, এক সাগর রক্তের বিনিময়ে আমরা পেয়েছি এই স্বাধীন সার্বভৌম দেশ। আমাদের এই স্বাধীনতা আজ অল্প সংখ্যক লোক হাতে বন্দি হয়ে পড়েছে। যার দরুন স্বাধীনতার ৪১ বছর পরও স্বাধীনতার সুফল থেকে দেশের সাধারণ মানুষ বঞ্চিত। আজ আমাদের এই স্বাধীন দেশে গণতন্ত্রের নামে নির্বাচিত স্বৈরতন্ত্র বিরাজ করছে। এখানে জনগনের ইচ্ছা অনইচ্ছার কোন মূল্য নেই সবকিছু নির্ভর করে নেত্রীর ইচ্ছার ওপর। আমাদের দুই নেত্রীর হিংসাত্বক মনোভাব আজ আমাদের দেশটাকে খাদের কিনারে নিয়ে গেছে। চারদলীয় জামাতযোট সরকারের অপশাসনে অতিষ্ট হয়ে দেশের সাধারণ মানুষ বর্তমান মহাজোট সরকারকে ক্ষমতায় বসিয়েছে। নির্বাচিত হবার পর থেকে বর্তমান সরকারের কার্যক্রম চারদলীয় জামাতযোট সরকারকে হারমানিয়েছে।

আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধী দলের নেতা দুজনেই নারী সত্ত্বেও দেশে নারীরা প্রতিনিয়ত ধর্ষনের শিকার হচ্ছে। এই ধর্ষক হায়ানাদের হাতে কোলের শিশু থেকে শুরু করে বৃদ্ধা পর্যন্ত রেহাই পাচ্ছেনা। প্রতিনিয়ত আমাদের মা বোনেরা হত্যা, ধর্ষন, এসিড, ইভটিজিং ও বৈষম্যের শিকার হচ্ছে। আমাদের এই দুই নেত্রী প্রধানমন্ত্রী থাকা অস্থায় বিরোধীদল দমনে ১০০% সফল হলেও নারীদের রক্ষায় এগিয়ে আসেনি।

আজ পত্রিকার পাতা খুললেই দেখতে পাই খুন, গুম, ধর্ষন, চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে মারা, আগুন দিয়ে আমাদের প্রাণপ্রিয় শ্রমিকদের পোড়ানো ও ক্রসফায়ারের নামে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ দমন। এযেন ‘গৌড়তন্ত্র’ বা ‘মাৎস্যন্যায়’ অবস্থাকে হার মানিয়েছে।

আমাদের এই বাংলাদেশের সর্বনাশা অবস্থা থেকে মুক্ত করতে বিকল্প রাজনীতি বা তৃতীয় শক্তির কোন বিকল্প নেই। আমরা তৃতীয় শক্তির নামে সামরিক শাসন চাইনা। তাই তৃতীয় শক্তি মানে তাই সামরিক শক্তি নয়, একটি রাজনৈতিক শক্তি। অর্থাৎ আমরা একজন গোপাল চাই, যে “প্রকৃতিপুঞ্জ” বা জনসাধারণ নির্বাচিত হয়ে এই দেশ পরিচলনা করবে। যার কৃতিত্বে বাংলাদেশ স্বৈরাচারী ও “কামাকারী” অর্থাৎ অরাজকতা সৃষ্টিকারীদের কবল থেকে উদ্ধার করবে। অরাজকতার অবসান ঘটিয়ে বাংলায় পুণরায় শান্তি-শৃঙ্খলা ফিরে আসবে।