ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

ইদানিং সাংবাদিক, আইনজীবী, রাজনীতিবিদ, সংসদ সদস্য এমনকি সাধারণ মানুষের উপরও ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের উগ্র আচরণ সচেতন মহলে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। কেউ কেউ ভাবতে শুরু করেছেন, হঠাৎ করে পুলিশ এত উগ্র হয়ে উঠল কেন? আমার জানামতে সারাদেশেই পুলিশকে উগ্র আচরণ করতে দেখা যাচ্ছে। তবে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশেই এর মাত্রা সবচেয়ে বেশি। আমার মতে এর কারণ নিম্নরূপ:

১। এই মূহুর্তে পুলিশের কমান্ড পোস্ট গুলোতে কর্তব্যরত কর্মকর্তারা প্রায় সবাই ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত। এদের কারো বাড়ি গোপালগঞ্জ বা বৃহত্তর ফরিদপুরে, কেউ কেউ ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ নেতাদের আত্মীয় স্বজন, কেউ কেউ ছাত্রজীবনে ছাত্রলীগের নেতা ছিলেন। এই সব কমান্ড পোস্টে থেকে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা এমনিতেই ক্ষমতার অধিকারী, তার উপরে আবার এরা নিজেই সরকারী দলের নেতা। তাই দুই ক্ষমতার সন্নিবেশ মাঠ পর্যায়ের পুলিশ কর্মকর্তাদের বেশামাল করে তুলেছে।

২। কমান্ড পোস্ট, বিশেষ করে, ঢাকা মেট্রোপলিটনের কমিশনার থেকে শুরু করে ডিএমপি এর ফাড়ি বা পুলিশ ক্যামপের ইনচার্জ পর্যন্ত পুলিশ অফিসারদের সিংহভাগের বাড়ি গোপালগণ্জে। প্রধানমন্ত্রীর নির্বাচনী এলাকার ধুলোমাটি গায়ে থাকায় তারা ভালো ভালো পদগুলো দখল করেছে। এই জন্য তারা এখন ধরাকে সরাজ্ঞান করছে। কারণ, গোপালগণ্জে বাড়ির কথা শুনলে একজন কনস্টেবলকে অন্য জেলায় বাড়ি, এমন একজন ডিসি বা যুগ্ম কমিশনারও ডরায়। এতে পুলিশের চেইন-অব-কমান্ড ভেঙ্গে পড়েছে।

৩। কমান্ড পোস্টে নিয়োগ পেতে পুলিশ অফিসারদের বর্তমানে একটি বড় ধরণের বিনিয়োগ করতে হয়। যদি গোপালগণ্জ বা ফরিদপুরের বাইরে বাড়ি হয় কিংবা আওয়ামী লীগ/ছাত্রলীগ করার ইতিহাস না থাকে, তবে কমান্ড পোস্টের পদ কিনতে একজন পুলিশ অফিসারের কয়েক লক্ষ টাকা বিনিয়োগ করতে হয় বলে জনশ্রুতি রয়েছে। তাই অর্থের বিনিময়ে পোস্টিং পেলে লাভ না হোক নিদেন পক্ষে আসলটাতো উঠাতে হবে? তাই, পুলিশ অফিসার জনসেবা বা আইন প্রয়োগ নয়, ব্যক্তিগত স্বার্থ উদ্ধারেই সর্বদা ব্যস্ত থাকে। এজন্য যে কাজে অর্থ সমাগমের কোন সম্ভবনা নেই, কাজে পুলিশের কোন আগ্রহ থাকেনা। হরতাল, মিছিল, মিটিং ইত্যাদি কাজে পুলিশের শক্তিক্ষয় হয়, কিন্তু অর্থ আসে না। তাই অর্থ ব্যতীত এদের উপর চড়াও হবে এটাই স্বাভাবিক।

৪। রাজনৈতিক আন্দোলন ঠেকানোর জন্য সরকার পুলিশকে যাচ্ছেতাই ব্যবহার করছে। বিরোধী দলীয় কর্মী-সমর্থক থেকে শুরু করে বিরোধী দলীয় চিপ হুইপ পর্যন্ত সবাইকে বেধড়ক পেটানোর লাইসেন্স পেয়েছে পুলিশ। যে পুলিশ অফিসার অন্দোলনকারীদের উপর যতবেশি শক্তি প্রয়োগ করেছে, সেই পুলিশ অফিসার ততো বেশী লাভবান হয়েছে। এদের পদোন্নতি হয়েছে, বিদেশ যাওয়ার সুযোগ পেয়েছে এবং ঘুষের জাগায় পোস্টিং পেয়েছে। নির্যাতনকারী অফিসারদের পক্ষে মন্ত্রী কথা বলেছেন, উপদেষ্টারা কথা বলেছেন। তাই যে আচরণ প্রসংশা পায়, পুলিশ সেই আচরণই করে।

৫। পুলিশের নিয়োগ বিশেষ করে কনস্টেবল আর সাব-ইন্সপেক্টর নিয়োগে আওয়ামী লীগ ফ্যামিলির বাইরে কাউকে নিয়োগ দেওয়া হচ্ছেনা। এদের নিয়োগ পেতে এক থেকে আট লক্ষ টাকা পর্যন্ত খরচ হচ্ছে। এখন মাঠ পর্যায়ে এসে তারা সেই টাকা কামানোর ধান্ধায় থাকে। সাংবাদিক ও আইনজীবী পুলিশের টাকা কামানোর ধান্ধায় বাধা দেয়। তাই সুযোগ পেলে পুলিশ এদের দুই ঘা মারার চেষ্টা করে।

তাই দেশবাসি যতই আকাঙ্খা করুক, তাদের প্রত্যাশ্যা মতো পুলিশি আচরণ তারা কখনই পাবেন না।

এই অবস্থা থেকে উত্তোরণের কয়েকটি উপায়:

১। পুলিশকে পেশাদার করতে হবে;
২। তাদের আইন অনুসারে কাজ করতে দিতে হবে;
৩। রাজনীতি থেকে তাদের মুক্ত করতে হবে;
৪। পুলিশের আইনে পরিবর্তন করতে হবে;
৫। যদি খারাপ আইন থাকে, তাহলে বাতিল করতে হবে;
৬। দরকার হলে নতুন আইন তৈরি করতে হবে।