ক্যাটেগরিঃ প্রকৃতি-পরিবেশ

 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের ২য় বর্ষের ফিল্ড ট্রিপের অংশ হিসেবে গিয়েছিলাম সিলেট শহরে। উদ্দেশ্য ছিলো, ভূমিকম্প নিয়ে সিলেট শহরের বিভিন্ন প্রাতিষ্ঠানিক এবং পাড়া মহল্লা ভিত্তিক প্রস্তুতি যাচাই করা। তো, সিলেট শহরে যাবার পর গ্রুপ করে আমাদের ছেড়ে দেয়া হলো কোশ্চেনিয়ার হাতে। আমরাও সমান উৎসাহ নিয়ে নেমে পড়লাম সিলেট শহর সার্ভে করার জন্য। সার্ভে করতে যেয়ে যা জানলাম তা ছিলো অত্যন্ত হতাশার।

যেকোনো দূর্যোগে সবার আগে এগিয়ে আসবে ফায়ার সার্ভিস। সিলেট শহরে ফায়ার সার্ভিস নিজেদের অবস্থাই ছিলো অত্যন্ত করুণ। তাদের হেড কোয়ার্টারই মাঝারী মাত্রার ভূমিকম্প হলে ভেংগে পড়বে – এই দশা ছিলো।

সিলেট শহরের রাস্তাঘাট অত্যন্ত সরু। বড় ধরনের ভূমিকম্প হলে রাস্তা বন্ধ হয়ে যাবে, উদ্ধারকারী পৌঁছাবার মতও অবস্থা থাকবে না।

সিলেট একটা বর্ধিষ্ণু শহর। আমরা সেখানে ফায়ার সার্ভিসের বড় কর্তাদের সাথে বসেছিলাম ভূমিকম্প প্রস্তুতি নিয়ে কথা বলতে। একই সাথে বসেছিলাম জেলা প্রশাসকের সাথেও। ফায়ার সার্ভিসের বড় কর্তাদের কাছে আমার প্রশ্ন ছিলো যে, “নতুন আবাসিক এলাকা তৈরির সময় একটা আরবান প্লানিং করা হয়। তো, সে সময় ফায়ার সার্ভিসের কোনো পরামর্শ নেয়া হয় কিনা?” ফায়ার সার্ভিসের কর্তারা আমাকে সদুত্তর দিতে পারেন নি অথবা সন্তুষ্ট করতে পারে নি।

সাধারণত, প্রশাসনের কাজ হয় বিভিন্ন সরকারী দপ্তরের মাঝে সমন্বয় করা। তাই, জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে আমরা অনেক ধরনের পরিকল্পনার কথা শুনেছি। বন্যা সহ নানান ক্ষেত্রে বাংলাদেশের জেলা প্রশাসন গুলো বড় ধরনের কার্যকরী ভূমিকা রাখছে। তবে, ভূমিকম্প নিয়ে তাদেরও পরিকল্পনা কতটুকু আছে আরো নীরিক্ষার বিষয়।

সিলেট শহরের সিটি কর্পোরেশনের প্যানেল মেয়র জনাব কায়েশ লোদীর সাথে আমরা বসেছিলাম বেশ কয়েকজন।

তার ভাষ্য ছিলো সিটি কর্পোরেশনের নিজস্ব ট্রাক, এম্বুলেন্স সহ লজিস্টিকাল ব্যাপারে মারাত্বক সঙ্কট আছে।

তবে আশার বিষয় হলো প্রচুর পাড়া মহল্লা ভিত্তিক স্বেচ্ছাসেবক তৈরি করা হচ্ছে প্রতিনিয়ত। যদিও, লজিস্টিকাল ভাবে ঘাটতি আছে তবুও দুর্যোগ পরবর্তী সময়ে অনেক দক্ষ মানুষ পাওয়া যাবে এটাই আশার বিষয়।

তো, ভূমিকম্প এড়ানো যাবে না বা এটা এমন একটা দূর্যোগ যে সাইক্লোনের মত আশ্রয় কেন্দ্রেও যাবার সুযোগ নেই। কারণ, এটার কোনো পূর্বাভাস ব্যবস্থাই নেই। এক্ষেত্রে মানুষ জন কী ভাবছে তা নিয়ে আমরা অনেক সাধারণ মানুষের মুখোমুখি হয়েছিলাম। অনেক ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষের ধারনাই ছিলো না যে তারা ভূমিকম্প হলে কি করবে বা পূর্বপ্রস্তুতি কিভাবে নেবে। সেটা থেকে বড় ব্যাপার ছিলো যে এই বিষয় মানুষের চিন্তা ভাবনাতে বড় ধরনের শুণ্যতা বিরাজমান করছে। যেকোনো মাজারের এক মুরিদকে জিজ্ঞেস করা হলো যে – সিলেটের ভূমিকম্প নিয়ে সে কী ভাবছে?

তার উত্তর ছিলো- ‘সিলেট ৩৬০ আউলিয়ার দেশ তাই ভূমিকম্প হবে না। আর ভূমিকম্প হলেও মাজারের কিছু হবে না। ভূমিকম্প থেকে বাঁচতে হলে মাজারের আশে পাশে বাড়ি বানাতে হবে। মাজারের আশে পাশে বাড়ি না বানালে ভূমিকম্প ঝুঁকিতে থাকতে হবে।”

কাজের কথায় আসি। বাংলাদেশে বিল্ডিং কোড আমরা সহজে মানি না। ইচ্ছে মত নিজেরা ভবন তুলি। টাকার লোভ অনেক বড় হয়ে দাঁড়ায় আমাদের কাছে। কত মাত্রার ভূমিকম্প হলে কি হবে সে গাণিতিক হিসাবে আমি যাচ্ছি না। আপনার লোভ আপনার কবর তৈরি করবে। এমনকি এখন তৈরি হয়ে যাওয়া ভবনেও রেট্রোফিটিং করে তার ভূমিকম্প ঝুঁকি কমানো যায়। আর, মৃত্যু থেকেও ভয়াবহ হলো পংগু হয়ে বেঁচে থাকা। সাবধানতা বা সচেতনতার বাণী অনেক বেশি বার উচ্চারিত হয়েছে। কাজের কাজ কিছু হয় নি। সরকারের যেমন দায়িত্ব আছে, তেমনি আমাদেরও দায়িত্ব আছে। কারণ, জীবনটা আমাদের।