ক্যাটেগরিঃ ভ্রমণ

বরিশাল নথুল্লাবাদ বাসস্ট্যান্ড থেকে সরাসরি সাতলার বাস যায়। সাতলাগামী বাসে চড়ে বসলেই হলো। তবে যেতে হবে খুব ভোরে। বাসে যেতে ঘন্টাখানেক বা তার একটু বেশি সময় লাগবে। ভাড়া ৬০-৭০ টাকা। আর নৌকার ভাড়া মাঝির সঙ্গে দরদাম করে নিতে হবে। ৩০০-৫০০ টাকার মধ্যে দেড় দুই ঘন্টা ঘোরাঘুরির জন্য নৌকা ভাড়া পাওয়া যাবে। কিন্তু কেন যাচ্ছি সাতলায়?

গত বছর অক্টোবরের শেষ সপ্তাহে শাপলার রাজ্যে যাবার পরিকল্পনা করলাম। তখন কেবল শীতের শুরু । শেষ রাতে গায়ে কাঁথা গায়ে জড়াতে হয়। ভোররাতের দিকে কুয়াশা পরতে শুরু করে। কুয়াশার ঘনত্ব খুব বেশি না হলেও কুয়াশায় আচ্ছন্ন হয়ে থাকে চারদিক। সকাল ৮টার আগে যেন সেই আচ্ছন্নতা কাটতেই চায় না।

কুয়াশার আচ্ছন্নতা কাটুক আর নাই কাটুক খুব ভোরে ঘুম থেকে জেগে ফ্রেশ হয়ে বেড়িয়ে পড়লাম যাত্রা শুরু করবার জন্য পূর্বনির্ধারিত স্থানে। সকাল সকাল পৌঁছতে না পারলে শাপলার সৌন্দর্য দেখা হবে না।

বলে রাখা ভাল সেপ্টেম্বর মাসের শেষের দিকে বরিশালের উজিরপুরের সাতলায় লাল শাপলায় ছেয়ে যায় চারদিক। সেপ্টেম্বরের শেষের দিকে থেকে শাপলা থাকে নভেম্বর মাস পর্যন্ত। এই সময়টাতেই যেদিকে চোখ যায় শুধু লাল শাপলা আর লাল শাপলা। দূর থেকে দেখলে মনে হবে লাল শাপলা দিয়ে বিছানা সাজিয়ে রাখা হয়েছে।

খুব ভোরে শাপলা ফুটতে শুরু করে, কিন্ত বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গেই শাপলার ফুটন্ত পাপড়িগুলো নিজেদের গুটিয়ে নিতে শুরু করে। তাই শাপলার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য দেখতে হলে খুব ভোরে ভোরে পৌঁছতে হবে শাপলার বিলে।

সকাল ৬টায় রওয়ানা দিলাম বিএম কলেজের শহীদ মিনার গেট থেকে। দুই বাইকে করে মোট চারজন যাচ্ছি। আমি আর ফয়সাল ভাই একটাতে; মোকলেস ভাই আর তুহিন ভাই অন্যটাতে।

বরিশাল বিমানবন্দর এলাকার হাইওয়ের পাশে থাকা একটা পেট্রোল পাম্প থেকে পেট্রোল ভরে নিয়ে পুনরায় যাত্রা শুরু। দোহারিকা শিকারপুর ব্রিজ পেরিয়ে আমরা ছুটে চলেছি শাপলার রাজ্য জয় করতে।

উজিরপুর বাজারের পর সানুহার বাজার। সেখান থেকে আমাদের সাথে যোগ দিলে আরো একজন। এরপর আঁকাবাঁকা পিচ ঢালা পথ মাড়িয়ে ছুটে চলা।

মাঝখানে হস্তিশুন্ড বাজারে ক্ষানিক সময় চা বিরতি। এখানকার কলা খুব বিখ্যাত।

এরপর ডানে-বায়ে ছোটখাট অনেকগুলো বাজার পেরিয়ে যখন এগিয়ে যাচ্ছি তখন নজরে এলো লাল শাপলার হাতছানি।

সাধারনত দিঘী ও ছোটছোট খালে শাপলা ফুটতে দেখা যায়। কিন্তু উজিরপুরের সাতলা অঞ্চলের বিশাল বিল জুড়ে ফুটে থাকে শাপলা। বিলের থৈ থৈ জল ঢেকে দিয়েছে শাপলা আর শাপলা পাতা।

বাইক দুটো পার্ক করে হালকা কিছু খাবার নিয়ে ছোট ছোট দুটো নৌকা রিজার্ভ করে নেমে গেলাম লাল শাপলার সৌন্দর্য কাছ থেকে দেখতে। শাপলার বুক চিরে আমাদের নৌকা এগিয়ে চলছে; আর নৌকার কারণে দুই পাশে সরে যাচ্ছে শাপলা।

নৌকার একপাশে বসে হাত বাড়িয়ে দিয়ে স্পর্শ করতে লাগলাম প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের আধার বরিশালের লাল শাপলা। শাপলার পাপড়িতে জমে থাকা শিশিরবিন্দু। আহা কি রুপ! আমাদের নৌকা এগুচ্ছে আর শাপলা ছুঁয়ে যাচ্ছে আমাদের।

তুহিন ভাই আর ফয়সাল ভাই জামা বদলে নেমে গেলেন শাপলা তুলতে। বিলের পানি তখন কমে এসেছে, তাই কোনো কোনো স্থানে হাঁটু সমান আবার কোনো কোনো স্থানে বুক সমান পানি। দুজনে বেশ প্রতিযোগিতা করেই শাপলা তুলছেন। আমি তখন নৌকায় বসে তাদের ছবি তুলে ব্যস্ত সময় পার করছি।

বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শাপলাগুলো নিজেদের সৌন্দর্য লুকিয়ে ফেলছিল। আর মাথার উপর খোলা আকাশের উত্তপ্ত রোদ আমাদের দুর্বল করে দিচ্ছিল।  আমরা নৌকা ছেড়ে শাপলাগুলো আটি বেঁধে বাইকে চেপে বসলাম; যেন জয় করেছি শাপলার রাজ্য।