ক্যাটেগরিঃ ভ্রমণ

ঘুরে বেড়ানোর নেশাটা  ছোটবেলা থেকেই।কোথাও যাবার নিমন্ত্রণ পেলে তাই আর তর সইতে চায় না। জুলাই মাসের মাঝের দিকে বড় মামা সিল্ক সিটি  রাজশাহীতে বেড়িয়ে আসার প্রস্তাব দিলেন। রাজিও হয়ে গেলাম। তবে একা নই; সঙ্গে পুরো ফ্যামিলি -আমি, বাবা, মা আর ছোট ভাই হৃদয়।

বরিশাল সিটি নির্বাচন ৩০ জুলাই হওয়াতে তার আগে রাজশাহী যাওয়ার উপায় রইল না। ভোটের পরদিন রাতে লঞ্চে উঠলাম। সুরভী-৯ লঞ্চ কীর্তনখোলার তীর ছাড়লো যখন তখন রাত ৯টা।

সকাল ৮টা নাগাদ নামলাম যান্ত্রিক শহর ঢাকায়। সোজা চলে গেলাম কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশন সংলগ্ন রেলওয়ে অফিসার্স রেস্ট হাউজে।

দুপুরের আগ পর্যন্ত আশেপাশে ঘোরাঘুরির সুযোগ দিলেন মামা। টিকেট আগে থেকেই করে রেখেছিলেন তিনি। দুপুর আড়াইটায় সিল্কসিটি এক্সপ্রেসে করে রাজশাহীর উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু হবে আমাদের।

একটার দিকে খবর এলো, ট্রেন আসতে ঘন্টাখানেক দেরি হবে। অগত্যা রেস্ট হাউজেই সময়টা কাটিয়ে বিকাল সাড়ে তিনটায় ট্রেনে উঠলাম।

মিটারগেজ লাইনে বহুবার চলাচল করলেও ব্রডগেজ লাইনে এটাই আমার প্রথম যাত্রা। ট্রেন ছাড়ার ঠিক আগে আমার পাশের সিটে এক যাত্রী এসে বসলেন। উনার আশেপাশে অফিসারদের আনাগোনা দেখে বুঝলাম বড় মাপের অফিসারই হবেন। কিছুক্ষণ বাদে মামা বললেন, ভদ্রলোক রেলপথ মন্ত্রানালয়ের যুগ্ম সচিব।

ট্রেন ভ্রমণের যে আনন্দ ছিল মনে তা মুহূর্তেই ম্লান হয়ে গেল। যুগ্ম সচিবের পাশে বসে নেট ব্রাউজিং, গান শোনা বড়ই বেমানান হবে ভেবে গোবেচারা হয়ে রইলাম।

কিন্তু কতক্ষণই আর চুপচাপ বসে থাকা যায়? ভদ্রলোকও কিছু বলছেন না। ভাবলাম একটা লম্বা ঘুম দেই। ঘুমে ঘুমে সময়টা পেরিয়ে যাক। যে ভাবা সেই ঘুম।  যখন উঠলাম তখন সবে বঙ্গবন্ধু সেতুতে উঠছে ট্রেন।

জানালার পাশ দিয়ে নদী দেখে দেখে বিশ মিনিটের মত সময় পার করলাম। এরপর আবার ঘুম। এরপর যখন উঠলাম তখন ট্রেন বেশ ফাঁকা। যাত্রীদের অনেকেই নেমে গেছে। কেউ কেউ লাগেজ নামাচ্ছে। ট্রেনের স্পিকারে নারী কন্ঠে ভেসে এলো আর কিছুক্ষণের মধ্যেই রাজশাহী স্টেশনে পৌঁছবে সিল্কসিটি এক্সপ্রেস।

যখন রাজশাহীতে পা রাখলাম তখন রাত সাড়ে ১০টা। স্টেশন থেকে বের হয়ে অটোরিক্সা নিয়ে চলে গেলাম রেলওয়ে অফিসার্স কোয়ার্টারে। ব্যাগ রেখে ফ্রেশ হয়ে রাতের খাবার খেয়ে হাতের কাজ নিয়ে বসলাম।  কচ্ছপ গতির ইন্টারনেট দিয়ে আধা ঘণ্টার কাজ দুই ঘন্টায় শেষ করে আবারো ঘুমের রাজ্যে চলে গেলাম।

উঠলাম ভোরেই। নাস্তা শেষে কোয়ার্টার থেকে বেরিয়ে রাজশাহীর সবচেয়ে বড় উদ্যান শহীদ এ এইচ এম খাইরুজ্জামান উদ্যান ও চিড়িয়াখানায় চলে গেলাম।  হাঁটতে হাঁটতে হারিয়ে গেলাম উদ্যানের মাঝে।

গাছপালায় ঘেরা উদ্যানের মাঝখান দিয়ে  লেক। আর লেকে ভেসে চলেছে নৌকা। এখানে লেকের পানিতে নৌকায় চরে ভেসে বেড়াতে পারেন। শিশুদের বিনোদনের জন্য রয়েছে নানান রকমের রাইডের ব্যবস্থা।  রয়েছে পিকনিক স্পট।

কেউ যদি এই উদ্যানে এসে রান্না করে খেতে চান তার জন্য রয়েছে মাটির চুলা। উদ্যানে কিছু দূর পর পর রয়েছে ভাস্কর্য। লেকের মধ্যে ছোট্ট দ্বীপে রয়েছে মৎস্যকন্যার মূর্তি। বিভিন্ন প্রজাতির পাখিদের অভয়ারণ্য এই উদ্যান; পাখিদের কিচিরমিচিরে মুখরিত চারদিক।

হাঁটতে হাঁটতে চোখে পড়লো কাঠবেড়ালি; কখনো রাস্তায়, কখনো গাছে গাছে ছুটে চলেছে।

মাটি দিয়ে বেশ উঁচু করে বানানো হয়েছে পাহাড়, সেই পাহাড়ের মাঝখান দিয়ে নেমে এসেছে ঝরনা। বাঘ, সিংহ, হাতি, জিরাফসহ অনেক প্রাণিই রয়েছে এই উদ্যানটিতে।  বাদাম চিবুতে চিবুতে পুরো উদ্যান ঘুরে দেখতে কেটে গেল প্রায় দুই ঘন্টা।

এবার শহর দেখার পালা। গাড়ি রিজার্ভ করে ছুটলাম। চার লেনের রাস্তা মাঝে  ডিভাইডার। তাতে লাগানো হয়েছে সতেজ সবুজ গাছাপালা।

বেলা ১২টার দিকে  এলাম  রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে। ঘুরতে ঘুরতে মনে পড়লো ২০১৩ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির জন্য আবেদন করেছিলাম। পরীক্ষা দিতে যাবার জন্য টিকেটও কেটেছিলাম। শেষ সময়ে বিএনপির হরতাল-অবরোধের কারণে যাত্রা বাতিল করতে হয়েছিল। এবার ভাল করে ঘুরে দেখলাম রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরো চত্বর।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বেড়িয়ে সোজা পদ্মা নদীর তীরে চলে এলাম। নদীর ভাঙ্গন রক্ষায় ইংরেজি  ‘টি’ আকৃতির মত তিনটি বাঁধ দেওয়া হয়েছে নদীর অংশে। নদীর বাতাস আর স্রোতস্বিনী পদ্মা দেখে ফিরে এলাম।

রাতে মামা বললেন, আগামীকাল আমরা চাঁপাইনবাবগঞ্জ যাব। আমের শহর চাঁপাই দেখতে হলে ভোর সাড়ে ৫টার ট্রেনে রওনা করতে হবে।

ভোরে এখান থেকে যানবাহন পেতে সমস্যা হতে পারে তাই রাত ১১টা দিকে ঠিক হলো স্টেশনে গিয়ে থাকবো। মামা বললেন, ওখানে আমার রুম আছে। রাতে ওখানে ঘুমাবো, ভোরবেলা ঘুম থেকে জেগেই ট্রেন ধরবো।

রাতের খাবার শেষ করে মধ্যরাতে চলে এলাম রাজশাহী রেলওয়ে স্টেশন।

সকাল সাড়ে ৫টায় ট্রেন ছাড়লো চাঁপাইনবাবগঞ্জের উদ্দেশ্যে। রাজশাহী শহর পেছনে ফেলেতেই চোখে পরতে শুরু করল মাটির দেয়ালের ঘর। বিশাল বিল।  ফাঁকে ফাঁকে অনেক জমি জুড়ে আমবাগান।

সকাল ৮টায় ট্রেন থেকে নামলাম। আগে থেকে গাড়ি রিজার্ভ করাই ছিল। ড্রাইভারকে সকালের নাস্তা খেতে বলে কিছুক্ষণ স্টেশন মাস্টারের রুমেই বিশ্রাম নিলাম। এরপর স্টেশন সংলগ্ন একটা হোটেলে সকালের নাশতা খেয়ে বেরিয়ে পড়লাম।

রাস্তার দুইপাশেই বিশাল বিশাল আমবাগান। আর আমি  ছুটে চলেছি মাঝের মহাসড়ক দিয়ে।

গাছে গাছে আম ঝুলে আছে। বড় বড় গাছের আমগুলো দেখতে পেলাম গাছেই প্যাকেট করা। পোকামাকড়ের আক্রমণ, বৈরি আবহাওয়া থেকে বাঁচাতে আমের কুড়ি থাকাকালেই কাগজ দিয়ে বানানো বিশেষ প্যাকেটে মুড়িয়ে দেওয়া হয়। ফলে আমগুলো দেখতেও বেশ সুন্দর হয়, আর পোকামাকড়ও ফল খেয়ে ফেলতে পারে না।

সাইকেলের দুই পাশে আম ভর্তি ঝুড়ি বেঁধে বাজারে নিয়ে যাওয়ার দৃশ্য দেখলাম। এমনভাবে ঝুড়িগুলো বসানো হয় যে চালকের বসার কোনো সুযোগই থাকে না। ঠেলে ঠেলেই নিয়ে যেতে হয় সাইকেল। একটা বাজার দেখে গাড়ি থামিয়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জের বিখ্যাত চাঁপা কলা কিনলাম। টাটকা কলা খেতে খেতে আবারো ছুটে চলা।

চলতে চলতে চলে এলাম সোনা মসজিদে। পাথরের এই মসজিদের ছাদ গম্বুজ আকৃতির। একটা সময় এই মসজিদে বিচারকাজ বসতো। কাজীর বিচারের জন্য মাচা পাতা রয়েছে। মসজিদের দেয়ালগুলো ছুঁয়ে দেখে পাথর খোদাই করে কারুকার্য সৃষ্টি করা সেই শ্রমিকের পরিশ্রম উপলব্ধি করতে চাইলাম।

সোনা মসজিদ দেখা শেষে  তাহখানা দেখতে এলাম। মুঘল সম্রাটদের জন্য বিশ্রামাগার ছিল এই তাহখানা, এখানে রয়েছে বিশেষ স্নানাগার।  মাটির পাইপ দিয়ে গরম জল আসার ব্যবস্থা দেখলাম।

ছোট ছোট কুঠুরি দেখা গেল। এমনভাবে ঘরগুলো করা হয়েছে যা গোলক ধাঁধায় ফেলে দেবে। এক কোনের দিক থেকে মাটির নিচে নেমে গেছে সিঁড়ি। ঐ সিঁড়ি ধরে নিচে নেমে পাওয়া গেল সুড়ঙ্গপথ।  আলো না থাকায় সুড়ঙ্গপথ ধরে এগোতে সাহস করলাম না।

তাহখানার পাশেই রয়েছে দাফিউল বালা দিঘী।

এবার ছুটলাম চাঁপাইনবাবগঞ্জ স্থল বন্দরে। ভারত থেকে ট্রাক আসছে, এপার থেকে ট্রাক যাচ্ছে। সীমান্তে গিয়ে দেখা গেল, বিজিবির চেকপোস্ট। ভারত যেতে ইমিগ্রেশনের অপেক্ষায় বসে আছেন অনেকেই।

অনুমতি নিয়ে কিছুটা সামনে এগোলাম। ছোট্ট একটা সীমান্ত পিলার, যার এপাশে বাংলাদেশ, আর ওপাশে ভারত।  আমার কাছে সীমান্ত খুব রোমাঞ্চকর লাগে; এখানে একই সাথে দুই দেশেই পা রাখা যায়।  এক পা বাংলাদেশে, আরেক পা ভারতে রেখে সেই অনুভূতি নিয়ে এবার রাজশাহী ফেরার প্রস্তুতি নিতে হলো।

দুপুরের খাবার চাঁপাইনবাবগঞ্জে খেয়ে ট্রেনে উঠে বসলাম। বিকাল পাঁচটা নাগাদ ফিরে এলাম রাজশাহী। পরদিন ভোরের ট্রেন ধরে দুপুরে ঢাকায় ফিরলাম। রাতে লঞ্চ ধরে পরদিন ভোরে চোখ মেলে দেখলাম  কীর্তনখোলার তীরে আমার শহর বরিশাল। যদিও  মনের চোখে তখনও দেখতে পাচ্ছি চাঁপাইকে।

মন্তব্য ০ পঠিত