ক্যাটেগরিঃ ধর্ম বিষয়ক

 

হে সুবেহ বঙ্গের বিবেক,

সালাম নিবেন। সুনীল গাঙ্গুলি নাকি লিখিয়াছিলেন ( ভালোবাসা প্রেম নয় ) অশ্রু জল কে – সৃষ্টির পবিত্র জল। জানি এতিম হইয়া জন্ম নিয়াছি তাই ভাগ্য নির্ধারিত গন্তব্যর পথ ধরিয়া কাওমি এতিমখানায় মানুষ বিধায় নিশ্চিত জঙ্গি। আর জঙ্গির অশ্রুজল আপনাদের মধ্যে চেতনার বাদশাদের মুত্র অপেক্ষা মূল্যহীন।তবু সেই জলে সিক্ত আঁখি নিয়া একটি প্রার্থনা করি, প্রার্থনাটি আপনাদের ভাষায় বাংলাদেশের সেরা জঙ্গি, জঙ্গি কুলের বেতাজ বাদশা, আমার শিক্ষক আল্লামা শাহ আহমেদ শাফির পক্ষে। উনি গুরুতর অসুস্থ, তাহার জন্য সম্ভব হইলে প্রার্থনা করিবেন, যে যে ধর্মে বিশ্বাস করেন সেই মতে অথবা ধর্মে আস্থা নাই কিন্তু মানবতায় বিশ্বাস করেন তবে মানবতার নামে প্রার্থনা করিয়েন আমার শিক্ষকের জন্য, যিনি ৯ বছর বয়সে হাট হাজারি মাদ্রাসায় আসেন এবং শিক্ষা জীবন শেষে দীর্ঘ ৬৫ বছর প্রায় অল্প বিদ্যা লইয়াই শিক্ষকতায় নিয়োজিত আছেন।

অতি লজ্জার সহিত নিজের এবং আমার মত অনেকের জন্য আরেকটি প্রার্থনা (কী করিব ভিক্ষান্নে পালিত তো !), আমাদের ফাঁসিতে চড়াইয়া দিন। কেন?

১/ এতিম খানায় পালিত হইয়া জঙ্গি হইব বলিয়া নিশ্চয়ই আমাদের অনেকে মাতৃ গর্ভে পিতাকে মারিয়া ফেলিয়া এতিম জন্ম লইয়াছি- এই অপরাধে ।

২/ নিশ্চয়ই জন্মের ৪/৫ বছরের মাথায় পিতাকে হত্যা করিয়া এতিম হইয়াছি আর নিঃসম্বল তরুণী মাতা দ্বিতীয় বিবাহের পূর্বে, “ঐ খানে তরে কে খাওয়াবে ?  ”  বলিয়া  একদিন হাতে ধরিয়া এতিম খানায় রাখিয়া যাওয়ার সময় নিজের চোখ মুছিয়া বলিয়াছিল , “থাক বাবা, এখানে অন্তত ৩ বেলা খাইতে পাবি। “, শুনিলে অবাক হইবেন ওইটুকুই জীবনে সুখের সৃতি। দয়া করিয়া আমার জননীকে জঙ্গি তৈরির কারিগর বলিয়েন না, বেচারি জঙ্গি শবটিও শোনে নাই , আমাকে ফাঁসিতে চড়াইয়া দিন , কেন এতিম হইলাম এই অপরাধে।

এমন অসংখ্য নীরব কান্না, অসহায়ত্ব , পিতামাতা হারা বা কোনদিন দেখি নাই তাদের , নানা/ দাদাজান রাখিয়া গিয়াছিল কাওমি মাদ্রাসা ও এতিম খানায় কেবল তিন বেলা খাইতে পাইব। আর নয় উনি মরিয়া গেলে কে খাওয়াইবে এই ভয়ে। এই তিন বেলা ভাতের জন্য নিরুপায় আমরা, এতিম আমরা ইচ্ছায় কি অনিচ্ছায় এতিম হইয়াছি সে বিচার না করিয়াই , আপনাদের ভাষায় জঙ্গি — এই অপরাধে ফাঁসিতে চড়াইয়া দিন ।

মুর্তজা ভুটটো তনয়া, আফগান জঙ্গিদের বাড়িয়া ওঠার বিষয়ে বলিয়াছিল , উহাদের দোষ দেওয়া খুব সোজা, কিন্তু জীবন এখানে খুব কঠিন, হয়ত ৫০/৬০ মাইলের মধ্যে কোন স্কুল নাই, চিকিতসালয় নাই, হয়ত জীবনে বিদ্যুৎ বাতি দেখে নাই যে ছেলেটি যে অর্ধভুক্ত পেট লইয়া ক্রোশ পথ হাঁটিয়া, ইসলাম সম্পর্কে অজ্ঞ এক মাওলানার কাছে বিদ্যা চর্চার জন্য যায় ও জঙ্গি হইয়া বের হয় তখন উহাকে জঙ্গি গালি দেয়া সহজ, তাহার ন্যূনতম অধিকার নিশ্চিত করার চেয়ে ।

তাহার সাথে সুর মিলাইয়া আমরা দাবী করি না, আপনারা নিজের সন্তানের শিক্ষা বাবস্থা আধুনিক করেন , দাবী আদায় করেন আমাদের জন্য বলিয়াছেন কখনও ? কি যুক্তি আমরা বাধা দেই ! আসুন দেখুন আমার সমান শ্রেণীতে পড়া আপনার সন্তান যখন নানান বিষয়ে জানিতেছে, পড়িতেছে আমরা নীরবে কাঁদি, লজ্জায়, কষ্টে কিন্তু আমাদের হইয়া কথা বলিবেন না কোন জ্ঞানের বাতিঘর। তার চেয়ে জঙ্গি বলিয়া গালি দিলে বিভিন্ন দুতাবাসে রাতের আসরে দাওয়াত পাওয়া যায়। আপনারা চেতনার ও চিন্তার বাদশারা আমাদের দুঃখ শুনিবার চেয়ে জঙ্গি গালি দিয়া আত্ম প্রসাদে ভুগিবেন , প্রগতিশীল ভাবিবেন, ধর্মের ছিদ্র খুজিবেন কিন্তু ভাই ( ভাই বলায় মাফ করিয়েন ) আমাদের কাছে তিন বেলা ভাত হইল প্রগতিশীলতা — তাই আমরা জঙ্গি। আরেক টু বলি – যাদের ভিক্ষায় আমরা ভাত খাই তারাই এই মাদ্রাসায় আধুনিক শিক্ষা চালুর অন্যতম অন্তরায় তারা সোজা বলে — মাদ্রাসায় ভিক্ষা দেই ধর্ম শিক্ষার জন্য, বাবা মার নামে তাদের আত্মার সোয়াবের জন্য – ইংরেজি শিখার জন্য দেই? কই কোন সাংবাদিক এই বিষয়টিকে উঠাইয়া আনিয়াছে । কেউ কি বলিয়াছে , আমাদের জন্য সম্পন্ন ঘরের ছেলে যাও আছে দেখবেন বাবামা ৪ ছেলের মধ্যে ১ জনকে হাফেজ বানাইয়া বেহেশতে ঘর চায় এই আশায় দিয়াছে, যে বাড়ীতে গেলে আধুনিক তিন ভাই হইতে টুপি খানি লুকাইয়া লজ্জায় পালাইয়া থাকে, তবু সে জঙ্গি !

শুনিয়াছি, মাদার তেরেসা সভ্যতার আধুনিক দেবী, যদিও অল্প বিদ্যা হইতে পোষাকে বুঝি উনি মূলত মিশনারি, পিতা মাতা হারা এতিম সন্তানদের আশ্রয় দিয়া, অসুস্থ দুর্গতদের সেবা করিয়া নোবেল পুরস্কার পাইয়াছেন। জানার জন্য একটি প্রশ্ন করি উনি শুরু হইতে আজ পর্যন্ত কতজন এতিম নিরাশ্রয়কে আশ্রয় দিয়াছেন? আর আমাদের কাওমি মাদ্রাসায় বছরে কতজন এতিম অনাথ প্রতিপালিত হয়? এক বছরের সংখা তুলনা করুন। এই কাওমি এতিমদের ইমাম আল্লামা শাফি, স্বাধীনতার পর হইতে আজ পর্যন্ত কত জন প্রতিপালিত হইয়াছে এই এতিম খানাগুলোতে জানেন কি? এই আশ্রয় টুকু না থাকিলে যে সামাজিক সংকট তৈরি হইত তা বোঝেন কি? আচ্ছা আপনাদের ত অনেক দয়া, চেতনা, মানবতা কত কথা বলেন, প্রতিজনে দুইটি করিয়া পিতামাতা হারা এতিম বাচ্চার দায়িত্ব নিবেন? জঙ্গি হওয়া হইতে ওরা বাঁচিয়া যাক । সমস্যা তাই না? এই শফি হুজুরেরা অন্তত খাওয়াইয়া, পরাইয়া বাঁচাইয়া রাখিয়াছে। স্বীকার করি আমাদের শিক্ষা বাবস্থায় গলদ আছে, যারা ভিক্ষা দেন আধুনিক শিক্ষা দেখিলে দিতে চান না ভিক্ষা, না বাঁচিলে শিখিব কী? এও ঠিক কাওমি শিক্ষা বাবস্থায় শিক্ষক বা ওস্তাদর আদেশ শেষ কথা, ওস্তাদের আদেশ আর জীবন সমান কিন্তু একদিনে কি সব সংশোধন হয়>? আধুনিক শিক্ষা কি একদিনে এই অবস্থায় আসিয়াছে ? তবু আল্লামা শাফি জঙ্গি , ঠিক। এই লক্ষ লক্ষ অসহায় এতিম কে বাঁচাইয়া রাখিতে আপনাদের দেয়া মুকুট উনার! শেষ করি, লক্ষ্য করিয়াছেন কি না জানিনা, আমি কাওমি বলিতেছি বারবার। আলেয়া বা ফেতনা/ ফ্যাসাদ সৃষ্টি কারী মউদুদি অনুসারী আলেয়া পন্থিদের কথা নয় , যদিও জানি ওখানেও আমাদের মত অসহায় স্বীকার অনেক। লজ্জা দিব না আপনাদের কেবল জিজ্ঞেস করি,

১/ বাংলাদেশে জামাত/ শিবির তথা মউদুদি বাদ বিরোধী প্রধান কণ্ঠটি কে?

২/ মউদুদিকে ফেতনা/ ফ্যাসাদ সৃষ্টি কারী ভ্রান্ত মুসলিম ও সেই  ইহুদি বাদের মত পরিত্যাজ্য বলিয়া পরিস্কার ঘোষণা কার ? তবে শান্তির ধর্ম বিধায় সংঘর্ষ হানাহানি এড়ানোর নির্দেশ ও উনার । আর তথা কথিত প্রগতির মূর্খ পাণ্ডা আপনারা ও সাঙ্ঘাতিকদের মাধ্যম নাক সিটকানোর কারনে সামনে আসে নাই ।

৩/ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশাল গর্বের ধনেরা, নর্থ সাউথের শিক্ষিতরা সব খানে শিবির আছে, ২২০০০ শিক্ষার্থীর প্রতিষ্ঠান হাট হাজারিতে শিবির দেখান তো? লজ্জা পাইলেন ? লজ্জার কি, আমরা জঙ্গি !!

শুনুন, অস্বীকার করি না, আমাদের প্রাচীন পন্থি কিছু মানুষ আছেন, স্বীকার করি ওয়াজ মাহফিলে কেউ কেউ বিভিন্ন বিষয়ে বাড়তি কথা বলেন, ভুল আছে কিন্তু আমরা কাওমি আলেমরা রাষ্ট্র ক্ষমতা দাবী করি নাই, জামাতি দের মত রাষ্ট্রীয় ভাগ চাই নাই , বহু রাত হাট হাজারিতে গেছে সকালে কি খাইবে ঠিক নাই, আল্লাম শাফি কেবল বলিয়াছেন আল্লাহ র উপর ভরসা ছাড়া তো পথ নাই, ভরসা রাখ। দেখুন আপনাদের প্রগতির পাণ্ডারা ভাষণে যা বলেন , যে সব উদ্ভট কথা বলেন মন্ত্রীরা প্রতিদিন তাতে দোষ নাই । আধুনিক কবি নারীকে টিস্যু বলিলে রুপক হয় আর শাফি হুজুর বলিলে তেতুল হুজুর না? তবু বলি কিছু প্রাচীন ধারনা আছে, সব সময় তা ঠিক এমনও নয় ।

যারা হেফাজত জামাত কথাটি বলেন, তারা কাওমি মাদ্রাসা ও তার পদ্ধতি জানেন? সরকারের একটি বিশেষ সংস্থা সেই ৫ তারিখের আগে শফি হুজুরের সাথে দেখা করতে গেলে এবং জামাতের কথা বলিলে শাফি হুজুর বলিয়াছিলেন, ” মিয়া সাবেরা জামাত জামাত করেন, জানি না আপনারা কয় দিন হইল জামাত বিরোধী, আমি শফি ১৯৫৪ সন শিক্ষকতার শুরু হতে এই মাটিতে দাঁড়াইয়া জামাতের বিরোধিতা করিয়া আসিতেছি, বলেন এই দেশে আমার চেয়ে বেশী জামাত বিরোধী কে আছে ? ( কালের কণ্ঠে সাক্ষাৎকার) এটিও ঠিক হুজুরের নির্দেশ ধর্ম জোড়ের বিষয় নয় ঐ জামাতি গোষ্ঠীর জন্ম হইয়াছে ফ্যাসাদ সৃষ্টির জন্য, কাজেই ওদের ফাদে ফা দিও না । হে প্রগতিশীলেরা কোনদিন জামাতের মোকাবেলায় আমাদের কাছে আসিয়াছেন, আমাদের মত জানিতে চাহিয়াছেন? আমরা এতিম , জঙ্গি আপনাদের কাছে যাইতেও সাহস পাইনা, মনে আছে হেফাজতের মহাসচিব আল্লামা ববুনগরি কে রিমান্ডে জিজ্ঞেস করিয়াছিল , আপনি নাকি প্রধানমন্ত্রী হইতে চাহিয়াছিলেন? উনি উত্তরে বলিয়াছিলেন এসব কি বলেন আমি জীবনে মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রি এইসব কল্পনায় ও দেখি নাই প্রধানমন্ত্রী তো স্বপ্নের ও বাইরে! ৫ তারিখ কি হইয়াছিল? আমরা মঞ্চের পাশে শহীদ সাথীদের লাশ নিয়া সর্ব মান্য আল্লামা শাফির অপেক্ষায় ছিলাম , কফিনে জড়ানো সাথী দের লাশ । কে বা কাহারা সংঘর্ষে জড়াইয়াছে সময় উত্তর দিবে, জামাত আমাদের ঘোষিত শত্রু , আপনারা রাজনৈতিক শত্রু জামাতের, উপরে নীচে অনেক খেলা হয় রাজনীতির কিন্তু ধর্মীয় শত্রুতা অনেক গভীর আপোষের সুযোগ নাই । লক্ষ লক্ষ লোক সাথীদের লাশ মঞ্চের পাশে রাখিয়া ইমামের অপএক্ষায় বসা তবু আমরাই জঙ্গি । একথা বলি না , ঐ রাতের পর সংঘর্ষ ছড়াইয়া পরেনাই, কেউ কেউ ক্ষোভ হইতে জড়ায় নাই তাতে, তারপর ও বলিব যতদূর জানি আল্লামা শাফি সহ ঊর্ধ্বতন নেতৃত্ব হতভম্ব হইয়া ছিল , আল্লামা শাফি ঘটনা স্থলে পৌঁছিলে, প্রথম নির্দেশ হইত , এই মুহূর্তে ফেরত যাও। যাক আমাদের ভুল থাকিতে পারে , কিন্তু একটা কথা বলি, যদি সামান্য সুযোগ আমাদের দিতেন , শিবির এই দেশে থাকিত না । মনে আছে প্রথমে বলিয়াছিলাম — কাওমি ছাত্রদের কাছে, ওস্তাদের নির্দেশ জীবন বরাবর, আল্লামা শাফির নির্দেশ পাইলে, এই দেশে ইসলামের নামে মউদুদি বাদ উৎখাত খুব বেশী হইলে ৪৮ ঘণ্টা। আপনাদের কে বুঝাইবে জ্ঞানের উঁচা নাসিকা নিয়া সামনের মানুষ দেখেন না , আকাশ ভাবেন, যে মানুষটি বন্ধু হইতে পারিত কত দ্রুত তাহাকে শত্রু বানান যায় তা বোঝেন, জামাত আর হেফাজত কে এক ভাবেন!

তবু অনুরোধ, এতিম হইয়া জন্ম নিয়াছি উহা কি আমাদের অপরাধ? তিন বেলা খাওয়া জুটিবে এই ভাবিয়া রাখিয়া গিয়াছে, উহা আমাদের অপরাধ? সম্পন্ন বাবা-মা হইলেও বেহেশতে ঘরের আশায় হাফেজ খানায় দিয়াছে ইহাও আমাদের অপরাধ? আমরা জঙ্গি?  হইতেও পারি, অত রাজনীতি বুঝি না, ৫ তারিখের খেলায় কার কি ভূমিকা নির্ধারণ করিব অত বুদ্ধিও নাই । কেবল একটা কথা জানি, আল্লামা শাহ আহমেদ শফির শেষ ছাত্রটি জীবিত থাকিতে মওদুদির ইসলাম এই মাটিতে ঠাঁই পাইবে না । এই কারনে হইলেও আমার শিক্ষকের জন্য প্রার্থনা করিয়েন। যে পুণ্যে মাদার তেরেসা কে নোবেল দেন, সেই অপরাধে আল্লামা শফিকে জঙ্গি বলেন আপত্তি নাই মানিয়া লইব, আর এও স্বীকার করি কিছু ভুল আছে আমাদের সংশোধন না করিয়া উহা দ্বিগুণ করুন আপত্তি নাই । আমরা এতিম বিধায় জঙ্গি- তাই ফাঁসিতে চড়াইয়া দিন, মানবতার জয় হোক ।