ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

জনাব শামসুদ্দিন চৌধুরী ( মাণিক) সুপ্রীম কোর্ট অব বাংলাদেশ এর আপীল বিভাগ হতে সদ্য অবসরে যাওয়া মাননীয় বিচারপতি । সম্প্রতি ইংল্যান্ডে উনি দ্বিতীয় বারের মত শারীরিক আক্রমণের স্বীকার হলেন, যতদূর জানা যায় ঘটনার নায়ক বাংলাদেশী গোত্রভুক্ত। বিষয়টির গুরুত্ব, আগামী দিনে এর প্রভাব বিবেচনায় নিলে এটিকে এড়িয়ে যাবার কোন সুযোগ আছে বলে আমি মনে করি না । মূল বিষয়ে প্রবেশের পূর্বে, আমার ব্যাত্তিগত ধারনা যা বাঙ্গালী জীবনের অন্যতম ট্র্যাজেডি বলা যায়, তা বিনয়ের সাথে নিবেদন করিঃ

—-বলা হয় , ” বাঙালিকে যে আনন্দ দিয়াছে অর্থাৎ হাসাইয়াছে বাঙালি তার নাকের জল, চোখের জল এক করিয়া কাঁদাইয়া ছাড়িয়াছে”! অর্থাৎ ইউরোপ, আমেরিকায় কৌতুক নির্মাতা, অভিনেতা রা যখন রাজকীয় জীবন জাপন করেন , বাঙ্গালী কমেডিয়ান না খেয়ে মরেন। আইন বিষয়ে আমি নিজে একটি মত ধারন করি দীর্ঘদিন হতে তা হল , ” এদেশে বাঙ্গালী কে যে প্রকৃত আইন বুঝাইতে গিয়াছে, বাঙ্গালী তাহাকে হাইকোর্ট তার জন্মপূর্ব দেখা বলিয়া সদরঘাট ( ঢাকায় বসবাসের অযোগ্য বিধায় প্রস্থান পথ অর্থে) দেখাইয়াছে দিয়াছে” । মাননীয় বিচারপতি (অব) জনাব শামসুদ্দিন চৌধুরী মাণিক এর অবস্থা দর্শনে আমার বিশ্বাস কেবল দৃঢ় হয় নাই সাথে এটিও যোগ করিতে চাই, ” বাঙ্গালীর কাছে আইনের শাসন মানে ক্রিকেট খেলায় আম্পায়ার আমার প্লেয়ার নয়ত তুই ব্যাটা চোর ” !

যাই হোক মূল প্রসঙ্গে আসি, জনাব চৌধুরী ১৯৭৮ এ হাইকোর্টে আইন পেশায় যোগদান করেন। এরমাঝে উনি লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়য়ে প্রভাষক হিসেবে কাজ করেন, ইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়য়ে পোস্ট গ্র্যাজুয়েট গবেষণারত ছাত্রদের এক্সটারনাল সুপারভাইজার হিসেবে কাজ করার অর্জন উনার আছে । যারা সামান্য ধারনা রাখেন তার জানেন যুক্তরাজ্যে আইন চর্চায় অকল্পনীয় উপার্জনের সুযোগ আছে, সেই সাথে মর্যাদাও। আধুনিক জীবনযাপনের সুযোগ না হয় বাদ দিলাম । সব ছেড়ে মাতৃভূমির সেবা করবার সিদ্ধান্ত গ্রহনে( ক্ষণটিকে কি বলিব জানিনা) উচ্চ আদালতে ডি, এ, জি হিসেবে যোগদান করেন। ঐ পদে তার আলোচিত মামলা বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলা, ইয়াসমিন হত্যা মামলা পরিচালনায় যে ভুমিকা রাখেন তা দেশের আইনের ইতিহাসে স্থানলাভের জন্য যথেষ্ট ছিল । কৃতিত্ব ছিনতাইয়ের এই দেশে প্রাপ্য না পেলেও উনি থামতে পারতেন। জাতির বৃহতর দায়িত্ব পালন করতে যেয়ে অতিরিক্ত বিচারপতি পদে যোগদান ও বিতর্কের শুর, জোট সরকারের হেনেস্থা,স্থায়ী নিয়োগ না পাওয়া ও পুনরায় নিয়োগ প্রাপ্তি মাত্র সব অভিমান সরিয়ে, উচ্চ আয়ের প্রলোভন ত্যাগ করে জাতির সেবায় নিজ কে নিয়োজিত করেন । স্থায়ী নিয়োগ লাভ করেন ।

বিচারপতি হিসেবে তার জীবনের এই পর্বটি ব্যাপক আলোচিত দুই অর্থেই অর্থাৎ একদল সমালোচানার নামে কেবল নিন্দামন্দে ক্ষান্ত হন নাই , অশ্লীলতার কোন সীমা থাকিলে ভাষার ক্ষেত্রে তাও ছাড়াইয়া গিয়াছেন, উচ্চ আদালত প্রাঙ্গনে আইনের উচ্চ ডিগ্রি ধারীরা দিনের পর দিন স্লোগান দিয়াছেন অশ্লীল ভাষায়। আর কিছু মানুষ হয়ত খুব সাধারন তাদের কাছে উনি হারিয়ে যাওয়া আইনের সন্মানের প্রতীকে পরিনত হন। যে আমলাতন্ত্র সাধারনের ধরা ছোঁয়ার বাইরে এক আতংকের নাম ছিল আমরা দেখলাম জনাব মাণিক ও আইনের শাসনের নামে তাদের থরহরিকম্প। উর্দিধারী বা উর্দি ছাড়া বড় বড় সাহেবেরা কেবল জোরহস্ত আইনের সামনে দাঁড়াইলেন না, কাঁপিলেন, এই বাংলাদেশে তাহারা যে ধরা ছোঁয়ার বাইরে নন এই শিক্ষাটি নুতন করিয়া লভিলেন। বহু গল্প শুনিয়াছি আইনত করতে বাধ্য কিন্তু করিতে নারাজ এমন বড় সাহেবের কানে উনার নামটি উচ্চারন করাই যথেষ্ট ছিল ! আমলাতন্ত্রে এই ধরনের ঝাঁকি দেয়া সম্ভব, আমরা অবাক হইয়া দেখিলাম। তার মূল অর্জন টি তবে কি ছিল আমাদের সামনে? সেই মহান বাক্য:

” ন্যায় বিচার কেবল সম্পন্ন হয় নাই তা দৃশ্যমান হইল ” । ও ” বিচার বিভাগের মর্যাদা সবার উপর ” ।

তার নিস্পত্তি করা কিছু মামলা আইনের জগতে আলোচিত হবে না কেবল উদাহরন হয়ে থাকবে । একথাও সত্যি কিছু আচরণগত অভিযোগ আছে, আবার এও সত্যি বিচারপতিও তো মানুষ। অনেক ক্ষেত্রেই আমাদের আইনজীবীরাও মামলা বা মক্কেলের স্বার্থে ও অগ্রহণযোগ্য আচরন করেন, যথাযথ জ্ঞানের অভাব বা সাময়িক ভ্রান্তির কারনেও উনারা ভুল আইনি দাবী উত্থাপন করেন, মক্কেল সন্তুষ্টির জন্য হলেও সময় নষ্ট করে কথা বলা (অনানুষ্ঠানিক নাম ফি হালাল করা) প্রচলিত অনেকদিন ধরেই । এসব কারনেও একজন বিচারক মানুষ হিসেবে সাময়িক নিয়ন্ত্রন হারাতে পারেন হয়ত। মনে রাখতে হবে মামলা জটের কারনে কম সময়ে অধিক মামলা শ্রবন, নানামুখী চাপ, আইনের বিবেচনা সবনিয়েই তাকে কাজ করতে হয়। এর বাইরে সন্মানিত আইনজীবী গন এর দলীয় বিবেচনা তো আছেই । সব মিলিয়ে সবার মেজাজের নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতাও সমান নয় । কিন্তু যদি প্রশ্ন করি, তার মূল কাজ যেটি সেই বিচার ও তার রায় নিয়ে যৌক্তিক কোন প্রশ্ন কি খুব উচ্চারিত হয়েছে, আইনগত প্রশ্নে? কিছু রাজনৈতিক বিষয় জড়িত এমন মামলায় অহেতুক নিন্দা মন্দ করা ছাড়া তার আদেশ নিয়ে আইনগত কোন অসংগতি কেউ দেখিয়েছেন ? এর বাইরেও বিচার বিভাগের স্বাধীনতার প্রশ্নে তার আপোষহীন ভুমিকা, আইনগত অবস্থানে তার অনড় অবস্থান কি মূল্যায়ন হয়েছে না কেউ ভাবার প্রয়োজন মনে করেছেন? এটি তার নয়, এই জাতির দুর্ভাগ্য। আর প্রাসঙ্গিক কিনা জানি না তবে বিচারপতি চৌধুরীর তুলনাহীন সততা জাতির সামনে আদর্শ হতে পারত । দুর্ভাগ্য আমাদের এই মানুষ টিকে বিদায় বেলায় সামান্য মর্যাদা আমরা দেইনি! কিন্তু আদালত অবমাননা অথবা যে অজুহাতেই আড়াল করা হোক, এবং প্রকারান্তরে উনাকে দায়ী করা হল যে দুটি বিষয়ে, সেটি এত বেশী মৌলিক যে ঐ বিষয়ের সমাধান ছাড়া কোন সভ্য জাতি আইনের শাসন পেতে পারে না, পাবে না । একদিন হয়ত সেই সমাধানের জন্য হলেও তার দিকে তাকিয়ে ” ধন্যবাদ আমরা কৃতজ্ঞ ” কথাটি বলতে হবে এই অকৃতজ্ঞ জাতিকে ।

এবার মূল প্রশ্নে আসি, কেন হামলা? উনি কি কোন সন্ত্রাসী যে, পূর্ব শত্রুতার জের? উনি কি কারো জমি দখল করেছেন? অবৈধ ক্ষমতাবান শাসক হয়ে কারো অধিকার কেঁড়ে নিয়েছিলেন কি উনি? আমলা হয়ে জনতার সম্পদ আত্মসাৎ করেছেন কি উনি ? উনার নামে কি কোন কয়েক পুরুষ ধরে চলে আসা হানাহানির মামলা আছে ? না । এর কিছুই নেই । কাজেই যৌক্তিক ভাবেই বলা যায় তার বিচারিক কার্যাবলী কে ঘিরেই এই হামলা। সাংবিধানিক পদে শপথ নিয়ে জাতির সেবা করেছেন, করার চেষ্টা করেছেন। এই হামলার কারন ও উৎস বলা যায় এদেশেই লন্ডনে কেবল সুযোগ নেয়া হয়েছে। আপীল বিভাগের একজন অবঃ বিচারপতি যদি তার দায়িত্ব পালনের জন্য শারীরিক আক্রমণের স্বীকার হন যার কারন উৎস এদেশে তবে সর্ব শক্তি দিয়ে সেই উৎস উদ্ঘাটন ও দায়ীদের আইনের আওতায় আনার কোন বিকল্প আছে কি ? আমাদের মাননীয় বিচারকগন কি অবঃ পরবর্তী জীবনে আক্রান্ত হওয়ার ভীতি নিয়েই কাজ করবেন ? আইনের শাসন নিশ্চিত করবেন, কোন আইনী সুরক্ষা পাবেন না জেনেও ? ভাবুন ।

জনাব শামসুদ্দিন চৌধুরী মাণিক, আমরা ক্ষমাপ্রার্থী, আমরা অনেক বড় বড় কথা বলি, আমরা বলি প্রবাসী মেধা ফিরিয়ে আনার কথা, আপনার পরিনতি তাদের কি বার্তা দেবে জানিনা । কিন্তু আপনার উদারতার কাছে ক্ষমাপ্রার্থী , আমরা লজ্জিত যথাযথ সন্মান না দিতে পারায় , আইনের শাসনের পক্ষে কথা না বলায় ।