ক্যাটেগরিঃ আন্তর্জাতিক

 

নূরজাহান, ওস্তাদ নুসরাত ফতেহ্ আলী খান, আবিদা পারভীন, সাবরি ব্রাদার্স আর রুনা লায়লার মতো কিংবদন্তীদের কণ্ঠে আমাদের বহু বছর ধরে আচ্ছন্ন করে রেখেছে বিখ্যাত সুফী সঙ্গীত দমাদম মস্তকলান্দর।

মূল রচনা প্রখ্যাত উর্দু কবি আমীর খসরুর যা ত্রয়োদশ শতাব্দীতে কিছুটা পরিবর্তিত হয় সুফী দরবেশখ্যাত লাল শেহ্বাজ কলান্দর এর হাতে। এই লাল শেহবাজ কলান্দরের মানবতার বাণী হিন্দু মুসলিম আর শিখদের প্রভাবিত করেছে শতাব্দীর পর শতাব্দী। লাল শেহবাজের অন্তিম শয়ান সিন্ধু প্রদেশের শেহ্ওয়ানে যা তার ভক্তদের কাছে পরিণত হয়েছে তীর্থস্থানে। তার প্রতি সম্মান জানিয়ে দরগার মূল প্রবেশ পথের জন্য সোনায় মোড়ানো প্রধান ফটক দান করেন ইরানের শেষ শাহ রেজা শাহ পাহলভী। তার দরগা প্রতিবছর পরিদর্শন করেন হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে লাখ লাখ অনুরাগী।

লাল শেহবাজের দরগায় প্রতি বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা প্রার্থনায় অনুষ্ঠিত হয় আধ্যাত্মিক নৃত্য ধামাল। এই ধামাল চলাকালীন গত ১৬ ফেব্রুয়ারি এক আত্মঘাতী বোমা হামলায় নিহত হয় ৮৮ ভক্ত আর আহত ২৫০ জন। এই হামলার সূত্র খুঁজতে আমাদের ফিরে যেতে হবে সেই ১৯৭৯তে ইরানে আয়াতুল্লাহ খোমেনীর সফল বিপ্লব আর আফগানিস্তানে সোভিয়েত আগ্রাসনের শুরুর দিনগুলোতে। পাকিস্তানের তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউল হক আর আইএসআই যোগ দেয় সিআইএ পরিকল্পিত সৌদি অনুদানে শুরু হওয়া তথাকথিত জিহাদে। সৌদি পেট্রোডলারের প্রবাহ পাকিস্তান আর আফগানিস্তান জুড়ে জন্ম দেয় ওয়াহাবী মতানুসারী একদল ঊগ্র ধর্মীয় মৌলবাদীর। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে শক্তিশালী হয়ে উঠা এই মৌলবাদীরা কেবল সোভিয়েত নয় তাদের আক্রমণের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করে শিয়া সম্প্রদায়ের পাশাপাশি সুফী মতাবলম্বীদের। তাদের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয় প্রভাবশালী সেক্যুলার নেতৃবৃন্দসহ সকল ভিন্নমতাবলম্বী।

৯/১১ ঘটনা পরবর্তী মার্কিন প্রতিক্রিয়া আর আফগানিস্তানে মার্কিন হস্তক্ষেপ পাকিস্তানে ওয়াহাবী প্রভাব বৃদ্ধিতে নিয়ামক হিসেবে কাজ করে। আইএসআই যখন অব্যাহত সর্মথন দিয়ে যাচ্ছিল আফগান তালেবানদের তখন পাকিস্তান জুড়ে সেনাবাহিনী অভিযান পরিচালনা করছিল স্বদেশী জঙ্গী গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে যেমন তেহরিক-ই তালেবান (টিটিপি), লস্কর-ই-জ্যাংভী ইত্যাদি। যারা চ্যালেঞ্জ জানিয়ে আসছিল পাকিস্তানের সংবিধানকে । এ অভিযানের মূল কেন্দ্র ছিল পশতুন উপজাতি সমৃদ্ধ পাক-আফগান সীমান্ত এলাকা। সামরিক অভিযান অব্যাহত থাকার পরও শিয়া সম্প্রদায় ও গিলগিট, বালটিসটান, বেলুচিস্তান ও পশতুন অধ্যুষিত অঞ্চলে তাদের পবিত্র স্থাপনাসমূহ ক্রমাগত হামলার শিকার হয়েছে। পাকিস্তানী সামরিক বাহিনীর টিটিপি’র বিরুদ্ধে পরিচালিত অভিযানে আবাসচ্যুত হয়েছে ১০ লাখের বেশি উপজাতি আর মাতৃভূমি ছেড়ে আফগানিস্তানে পালিয়ে গেছে অসংখ্য মানুষ।

এই পালিয়ে যাওয়া উপজাতি সম্প্রদায়ের অনেকে যারা ঘনিষ্ঠ ভাবে যুক্তছিল টিটিপি’র সঙ্গে তারা আজ নেতৃত্ব দিচ্ছে পাকিস্তানী সরকার আর সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে পরিচালিত হামলায়। ওয়াহাবী অনুসারীদের সঙ্গে যুক্ত হয়ে তারা আজ হামলা পরিচালনা করছে পাকিস্তান সেনাবাহিনী আর সরকারের বিরুদ্ধে যেমন তারা অতীতে হামলা চালিয়েছে শিয়া সম্প্রদায় ও সুন্নী মতানুসারী সাধারণ মানুষের ওপর। পাকিস্তান সরকার শেহওয়ান হামলার জন্য দায়ী করেছে টিটিপি অনুমোদিত জামাত-উল-আহরারকে এবং আফগানিস্তানের কাছে আবেদন জানিয়েছে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের। পাকিস্তান সেনাবাহিনী আফগানিস্তানের অভ্যন্তরে নির্দিষ্ট লক্ষ্যে বোমাবর্ষণ করেছে এই অভিযোগে যে, সেগুলো জামাত-উল-আহরার ঘাঁটি। পাকিস্তানী সেনা প্রধান ৭৬ জন অভিযুক্ত সন্ত্রাসীকে তার দেশের কাছে হস্তান্তরের দাবি জানিয়েছেন আফগান কর্তৃপক্ষের কাছে। আর আফগানিস্তান সরকার তাদের মাটিতে পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর বোমাবর্ষণের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে পাল্টা অভিযোগ করেছে আফগান তালেবানেরা পাকিস্তানী ভূখন্ড ব্যবহার করে তাদের মাটিতে সন্ত্রাসী কার্যকলাপ পরিচালনা করে আসছে। বর্তমানে পাকিস্তানী ভূখন্ড ব্যবহার করে সন্ত্রাসী কার্যকলাপ পরিচালনার অভিযোগ কেবল আফগানিস্থানেরই নয় ভারতেরও। সমস্যা সমাধানে কূটনৈতিক উদ্যোগ সময় নেবে বলেই ধারণা। অনেক কিছুই নির্ভর করে পাকিস্তানের প্রতি চায়নার সমর্থনের ওপর আর ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের সাম্ভাব্য চাপ পাকিস্তান কিভাবে মোকাবেলা করবে তার ওপর।

আশার কথা এই যে, সিন্ধু প্রদেশের সাধারণ মানুষ আক্রমণের হুমকি উপেক্ষা করেই শেহওয়ান জিয়ারত অব্যাহত রেখেছেন। তাদের মনে প্রত্যাশা সে’দিনের, যেদিন সাধারণ ভারতীয়রাও লাল শাহবাজের মাজার, শুক্কুরে সাধু বেলার মন্দির কিংবা চাঘওয়ালে কাটাসরাজ মন্দিরে বিনা বাধায় নৈবেদ্য নিবেদন করতে পারবেন। তেমনি তারাও পরিদর্শন করতে পারবেন আজমীর কিংবা ভারতের যে কোন পুণ্যস্থান।নিশ্চিতভাবেই এ প্রত্যাশাপূরণে পাকিস্থানকে পাড়ি দিতে হবে দীর্ঘ পথ।

প্রকাশিত: দৈনিক জনকণ্ঠ, ১৫ মার্চ ২০১৭