ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

 

রঙ্গলাল বন্দোপাধ্যায় লিখেছিলেন, ‘এত ভঙ্গ বঙ্গ দেশ তবু রঙ্গে ভরা’ কথায় বলে ‘রঙ্গভরা বঙ্গদেশ’। যে অর্থেই বলা হোক বিষয়টির সত্যতা অস্বীকার করার উপায় নেই। দরিদ্র এই দেশে অনেক কিছুর অভাব থাকলেও রঙ্গ, রসিকতার অভাব হয়েছে কদাচ। ইতিহাস সাক্ষী এই বঙ্গভূমিতে বিশ্বমানের দার্শনিক হয়ত নাই, তাই বলে সে মানের ভাঁড় ছিল না এ কথা বলা যায় না। মহাসমারোহে তারা বিরাজমান ছিলেন এই পুণ্য ভূমিতে। গোপাল ভাঁড় তো যে কোন বিচারে বিশ্ব ভাঁড়কুলের মুকুটহীন চ্যাম্পিয়ন। তারা ছিলেন পেশাদার ভাঁড়। তাদের দিন ফুরিয়েছে। তাই বলে বাঙালির জীবনে রঙ্গ রসিকতার খোরাক যোগানোর লোকের অভাব পড়েনি। সেই স্থানটি সগর্বে অধিকার করেছিলেন রাজনীতিবিদগণ।

সাবেক এক উর্দিধারীর শাসনামলে রাজনৈতিক ভাঁড়ামি তো রীতিমতো শিল্পের পর্যায়ে উপনীত হয়েছিল। মানতেই হয় ঝাড়ুদার হওয়ার আকুল আকাঙ্ক্ষা ব্যক্তকারী মন্ত্রী মহোদয়গণ জাতিকে ব্যাপক বিনোদনের খোরাক যুগিয়েছে। বেঁচে থাকলে তাদের চাটুকারিতার মাত্রা দর্শনে গোপাল ভাঁড়ও বিষমভাবে বিষম খেতেন তাও শ্রীপুরের বড়ির কার্যক্ষমতার মতোই শতভাগ গ্যারান্টিড। আমোদপ্রিয় বাঙালি আরও শুনেছে ‘লুকিং ফর শত্রুজ’ ও ‘আল্লাহর মাল আল্লায় নিয়ে গেছেন’ জাতীয় অমিয়বাণী। রাজপথে সর্বরোগের অষুধ বিক্রেতার ভাষণ তো আমাদের দৈনন্দিন জীবনে অফুরান আনন্দের উৎস। যা হোক আইনের দৃষ্টিতে নির্দোষ বিধায় এসব নিছক রঙ্গ বলে মেনে নেয়া যেতেই পারে। সমস্যা অন্যত্র, আজকের প্রসঙ্গও ভিন্ন।

02_Wrong+side_Vehicle_Law_Traffic_AP_09062016_013

গত ক’দিন ধরে তাবড় তাবড় হোমড়া-চোমড়াদের প্রকাশ্য রাজপথে উল্টোগমন ও পুলিশের জালে আটকের সংবাদ পাবলিকের মনে বিমলানন্দ যুগিয়েছে। আইনভঙ্গের সংবাদ কোন আনন্দের বিষয় নয়। তারপরও ক্ষমতাবানদের আইনভঙ্গের মহড়া দেখে সদা অভ্যস্ত অসহায় আমজনতা আমোদ লাভ করলে মহাভারত নিশ্চয়ই ক্ষুদ্র হয়ে যাবে না। তবে এ নিয়ে যত রঙ্গই করি না কেন বিষয়টি ভাববারও বটে। বিশেষ করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীও যখন বীরদর্পে আইনভঙ্গের মহড়ায় লিপ্ত হয় তখন আর বিষয়টিকে নিছক আমোদ বলে উড়িয়ে দেয়া যায় না। আবার সব দোষ নন্দঘোষ বলে কেবল আইন-শৃঙ্খলা রক্ষী বাহিনীকে দায়ী না করে, পাঠক আপাত স্বচ্ছ জলের নিচে ঘোলা চিত্রটি তলিয়ে দেখতে পারেন। চিত্রটি সন্দেহাতীত উদ্বেগ জাগানিয়া।

বলছি সম্প্রতি উল্টোপথে তথা রং সাইডে চলা গাড়ির স্রোত ও তার বিরুদ্ধে পুলিশী অভিযানের কথা। ধৃত গাড়ির মালিক/ব্যবহারকারীদের পরিচয় সাধারণ বুদ্ধিকে ক্ষণিকের তরে হলেও হতবুদ্ধি করে দেয়। কে আছেন সে তালিকায় না বলে বলা যায় কে নেই সেখানে? মন্ত্রী, সাংসদ, সচিব, আমলা, পুলিশ কর্মকর্তা, রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ী থেকে আমজনতা পর্যন্ত। অভিযানের সংবাদ প্রথম বড় আকারে সংবাদমাধ্যমে আসে ২৫ সেপ্টেম্বর। ২৪ তারিখ বিকেলে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন সুগন্ধার সামনে যথানিয়মে ট্রাফিক পুলিশ তাদের দায়িত্ব পালন করছিল। বিকেল ৪টায় সেখানে উপস্থিত হন দুদক চেয়ারম্যান ইকবাল মাহমুদ। বোধকরি তাতেই বদলে যায় নৈমিত্তিক চিত্রটি। কর্তব্যরত পুলিশ মহাউৎসাহে আটক করতে শুরু করে এমন সব গাড়ি যা অভাবনীয় বিধায় ছিল ভাবনার অতীত। অন্তত গাড়ির মালিক ও আইনের ভাষায় ব্যবহারকারীদের জন্য। অভিযান চলাকালীন সেখানে জনতার ভিড় জমে। তারা যেমন অভিযানের সমর্থনে কথা বলেন তেমনি ধৃতদের সর্বোচ্চ শাস্তির দাবি জানান। তাদের বক্তব্য অন্তত এটুকু প্রমাণ করে যতই ম্যাংগোপিপল বলি না কেন, আমজনতা বিদ্যমান আইনের বাস্তবায়ন চায়। এ জন্য গৃহীত যে কোন পদক্ষেপকে তারা সমর্থন করতে প্রস্তুত।

অভিযানের বিবরণ রঙ্গ জাগানিয়া। পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় সচিব মাহফুজা সুলতানার গাড়ি আটক করে কাগজপত্র চাইলে চালক বাবুল মোল্লা বিস্ময়ভরা কণ্ঠে উপস্থিত সার্জেন্টকেই উল্টো প্রশ্ন করেন। ‘নতুন কোন আইন হইছে নাকি?’ প্রশ্নটি মনে রঙ্গ জাগালেও পাঠক তিষ্ঠ ক্ষণকাল। বাবুল মোল্লা ও আইনের ভাষায় গাড়ি ব্যবহারকারীর আরও রঙ্গ অপেক্ষমাণ। প্রতিমন্ত্রী মহোদয় স্বয়ং উপস্থিত থাকার পরও তার গাড়ি উল্টোপথ চলার ব্যাখ্যায় তিনি বলেন, তিনি ফাইল পড়ছিলেন আর সে সুযোগে জ্যাম দেখে ড্রাইভার উল্টোপথে চলে যায়। তার ভাষায় তিনি ড্রাইভারকে বকে দিয়েছেন, কোন মামলা বা জরিমানা হয়নি। যদিও আইনভাঙ্গা হয়েছে। তবুও মন্ত্রীর বকা বলে কথা! তিনি বকা না দিলেই বা কী করার ছিল।

অভিযোগ আছে নিজেদের উর্ধতন কর্মকর্তার গাড়ি পলায়নেও দায়িত্বরতরা দু’একবার সহযোগিতা করেছেন। সেক্ষেত্রে তারা বলতেই পারেন, চেয়ে চেয়ে দেখলাম তুমি চলে গেলে, আমার বলার কিছু ছিল না। অভিযানের দ্বিতীয় দিনটি অন্তত একটি ঘটনার কারণে আরও চমকপ্রদ। আবারও বাবুল মোল্লা। পুরনো আইন বিদ্যমান জেনে আবারও উল্টোযাত্রা এবং ধরা। এবার বাংলামোটরে। এবারও গাড়িতে উপস্থিত ছিলেন সচিব মহোদয় স্বয়ং। পরিণতিতে বাবুল মোল্লার দায়িত্ব হতে অব্যাহতি ও কারণ দর্শানোর নোটিসপ্রাপ্তি। বাবুল মোল্লার কল্লা সুলভ বিধায় তা সহজেই কতলযোগ্য। বলতে ইচ্ছা হয়, সিন্নি খাইলি বিল্লি/মোল্লা না চিনলি! তবে এ ব্যাপারে সচিব মহোদয় কোনভাবেই দায়ী নন। এ বিষয়ে সরকারী ব্যাখ্যাও কৌতুক জাগানিয়া। অপরাধ করেছে গাড়ির চালক ও মালিক। মালিক যেহেতু সরকার তাই চালকই আপাতত শিকার। আইনের ভাষায় ব্যবহারকারী নিতান্ত নির্দোষ। অধম অবশ্য বুঝিতে অক্ষম আইনের ফাঁক গলিয়া গেলেও মহারথীরা কি নৈতিকভাবেও দায়ী নন?

চিত্র কিন্তু তা বলে না। বিদ্যুত মন্ত্রণালয়ের এক অতিরিক্ত সচিবের ধৃত গাড়িচালক উল্টোযাত্রী আবুল কালাম আজাদ ধরা পড়েও দুঃখিত নন মোটেও। বরং এ রকম অভিযান অব্যাহত রাখার প্রার্থনা জানিয়ে বলেন, ‘একটু জ্যাম দেখলেই স্যাররা খালি উল্টোপথে যেতে বলেন।’ কাজেই আইনের ফোকর গলে স্যারেরা পার পেলেও এ সমস্ত অজুহাত পুরনো ঢাকার ঘোড়াগাড়ি চালক সহিসকে অন্তত না বলাই ভাল। শুনলে তিনি নিশ্চিতভাবেই বলবেন, ‘আস্তে বলেন স্যার, ঘোড়ায় হাসব।’ আটক এক গাড়ি হতে মৃদুকণ্ঠে কর্তব্যরত সার্জেন্টকে বলা হলো, ‘সিআইডির এ্যাডিশনাল ডিআইজি স্যারের গাড়ি।’ জানা যায় অতিরিক্ত ডিআইজি মহোদয় গাড়িতে বসা ছিলেন। তবে আশার কথা তাতে ভবি ভোলেনি।

এও সত্যি নৈতিক দায় স্বীকার করে পদত্যাগ করার সংস্কৃতি আমাদের দেশে এখনও চালু হয়নি। অতটা সভ্য আমরা হয়ে উঠিনি। তবে আইনপ্রণেতা আর প্রয়োগকারীদের অবলীলায় আইনভঙ্গ কোন তামাশার বিষয় নয়। সামান্য জরিমানা বা মামলাতে সমাধান সম্ভব কি? মনে হয় না। সমস্যা মনস্তাত্ত্বিক। ক্ষমতাবানদের আইন অমান্যের প্রবণতার চিত্রটি আজ উন্মোচিত। মাঝে দুদকের চেয়ারম্যান মহোদয় বিবৃতি দিয়ে জানিয়েছেন তিনি এ অভিযানের সঙ্গে কোনভাবেই সম্পৃক্ত নন, এটি তার কাজও নয়। তিনি কেবল কিছুক্ষণ ঘটনা পর্যবেক্ষণ করছিলেন। তারপরও তার উপস্থিতি যদি কর্তব্যরতদের স্বাভাবিক দায়িত্ব পালনে উৎসাহ দেয় তবে তাকে ধন্যবাদ জানাতেই হয়। আরেকটি বিষয় তিনি ভেবে দেখতে পারেন, যারা প্রকাশ্য দিবালোকে বুক ঠুকে রাষ্ট্রের আইন অমান্য করেন তারা আরও বড় অন্যায় করতেও পারেন। অন্তত ক্ষমতা তাদের সে সুযোগ দিয়েছে। তাই বলি, তাদের অন্তত কয়েকজনের সম্পদ বিবরণী চেয়ে দুদক যদি নোটিস করে মন্দ হয় না। তারা নির্দোষ হলেও নোটিসের জবাব দেয়ার হ্যাপা পোহানো কম ঝক্কির নয়। আর উদাহরণের চেয়ে বড় শিক্ষা কি আছে? অন্তত এ ধরনের নোটিসের ফলে অন্যরাও এ রকম কর্ম করার আগে দুবার ভাববে নিশ্চিত।

যে কারণে এত কথা এবার সেটি খুলে বলি। নেহায়েত ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা। একসময় মগের মুল্লুক বলে পরিচিত পার্শ্ববর্তী রাষ্ট্রে গিয়েছি ভ্রমণার্থে। বিমানবন্দরে অবতরণ রাত প্রায় একটায়। ট্যাক্সিযোগে হোটেল যাত্রা। সুনসান রাত্রি। ফাঁকা রাজপথ। জনমানব, গাড়িঘোড়া ও পুলিশের চিহ্নমাত্র নেই। এমন সময় ট্যাক্সিটি লাল আলো দেখে দাঁড়িয়ে পড়ল। চারপাশে তাকিয়ে দেখি ফাঁকা চারদিক। বাঙালিসুলভ অভ্যাসবশত চালককে বললাম, ‘দাঁড়িয়ে কেন? কেউ তো নেই চলে যাও।’ পাঠক পরবর্তী মুহূর্তটি এ অধম আমৃত্যু ভুলিব না। রীতিমতো চোখ পাকিয়ে পেছন তাকিয়ে ট্যাক্সিচালক জবাব দিল, ‘বিদেশী তুমি কি আমাকে আইন ভাঙতে বল? তাও আমার নিজের দেশের আইন!’ বিষয়টি অনুধাবন করে সেখানে ধরণীর কাছে অধমের প্রার্থনা ছিল।’ হে ধরণী তুমি দ্বিধা হও, আমি মুখ লুকাই। মূল কথা এটুকুই। হে রথী- মহারথীগণ আপনারা কি জানেন আপনারা আইনভঙ্গ করছেন এবং তা আপনার নিজের দেশের আইন। এও নিশ্চিতভাবেই জানেন, সংক্ষেপে, আইন হলো সার্বভৌমের আদেশ। যে সার্বভৌমত্ব অর্জনে রক্ত দিয়েছে ৩০ লাখ শহীদ। ভদ্র মহোদয়গণ, বিষয়টি কি আপনাদের কাছে কোন অর্থ বহন করে?