ক্যাটেগরিঃ স্বাধিকার চেতনা

১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশের বিজয় দিবস। এই দিনটিতে মুক্তিযোদ্ধারা ফিরে যান সেই আগুনঝরা দিনগুলোর স্মৃতিতে। নিজেদের ভূমিকার পাশাপাশি স্মরণ করেন দীর্ঘ নয় মাস ধরে চলা যুদ্ধের শেষ পর্যায়ে তাদের সশস্ত্র সংগ্রামে যোগ দেয়া ভারতীয় সহযোদ্ধা গার্ড রেজিমেন্টের এমভিসি এলবার্ট এক্কা অথবা মাহের রেজিমেন্টের ১৮ বছরের তরুণ আনুশ প্রাসাদের মতো অনেকের কথা।

লেঃ কর্নেল (অব) সাজ্জাদ জহিরের (বীর প্রতীক) মতো অনেকেই আবার শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন যুদ্ধক্ষেত্রের সেসব বীর ভারতীয় সহযোদ্ধার কথা, ইতিহাস যাদের সেভাবে মনে রাখেনি। তার স্মৃতিপটে ভেসে ওঠে আর্টিলারি রেজিমেন্টের ক্যাপ্টেন এস এস ডুগ্গালের নাম। বিয়ের নির্ধারিত তারিখের মাত্র দু’মাস পূর্বে যিনি স্বেচ্ছায় যোগ দিয়েছিলেন শক্তিশালী পাকিস্তানী ঘাঁটি সিলেটের শমসেরনগর বিমানবন্দরে পরিচালিত এক বিপজ্জনক অভিযানে।

এই বিমানবন্দরটি নির্মিত হয় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালে। বিমানবন্দরটির নিরাপত্তায় নিয়োজিত ছিল পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর এলিট রেজিমেন্ট ফ্রন্টিয়ার ফোর্স। বিমানবন্দর ঘিরে মোতায়েন করা হয় ভারি অস্ত্রশস্ত্র। এখান থেকে ছোড়া গোলাগুলি সীমান্ত পেরিয়ে নিয়মিতভাবে গুঁড়িয়ে দিচ্ছিল ভারতীয় গ্রামগুলো, বাড়ছিল হতাহতের সংখ্যা।

লেঃ কর্নেল সাজ্জাদের বর্ণনায় স্বাধীনতা যুদ্ধে অসম সাহসী ভারতীয়দের অবদান কেবল ক্যাপ্টেন ডুগ্গালের আত্মোৎসর্গেই শেষ নয়, একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে বাংলাদেশের স্বাধীনতার রক্তে রঞ্জিত পথে সিংহহৃদয় ভারতীয় অফিসারদের চূড়ান্ত ত্যাগকে তিনি কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করেন। ক্যাপ্টেন ডুগ্গালের সাহস ও বিশ্বাসের দৃঢ়তার প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে লেঃ কর্নেল সাজ্জাদ বলেন, ‘যেহেতু সামনেই ছিল তার বিয়ে, তাই আমি তাকে এ ধরনের বিপজ্জনক অভিযানে অংশগ্রহণের বিষয়ে সতর্ক করে দেই। আমি তাকে আরও বলি এই অভিযান থেকে তার জীবিত ফিরে আসার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। আমি অনেকটা বাধ্য হয়েই তাকে সতর্ক করি, সে ছিল আমার ভাইয়ের মতো আর ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিতব্য তার বিয়েতে যোগদানের জন্য সে আমাকে অমৃতসরে আমন্ত্রণ জানিয়েছিল। তার নির্ভীক উত্তর ছিল, একজন সৈনিকের কাছে তার দায়িত্ব সবার আগে।’

লেঃ কর্নেল সাজ্জাদ ছিলেন পাকিস্তানী প্যারা ট্রুপার। আগস্ট ১৯৭১-এ তিনি পক্ষত্যাগ করে সাকারগার সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে প্রবেশ করেন। একজন লেফটেন্যান্ট হিসেবে তাকে সরাসরি সিলেট সংলগ্ন আসাম-ত্রিপুরা বর্ডারে কুকিতাল গ্রামের মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্পে নিয়োগ দেয়া হয়। সেখান থেকে শমসেরনগর বিমানবন্দরের দূরত্ব ছিল মাত্র ছয় কিঃমিঃ। সাপ্লাই এবং রিইনফোর্সমেন্টের জন্য বিমানবন্দরটির গুরুত্ব বাড়ছিল ক্রমেই। বিমানবন্দরটি গুরুত্বপূর্ণ ছিল কৌশলগত কারণেও। পূর্বাঞ্চলে পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর পতন ঘটাতে এটি দখল ছিল অনিবার্য। এছাড়া সেখানকার ভারি গোলাবর্ষণে ক্ষতিগ্রস্ত ভারতীয় গ্রামগুলোর আদিবাসীরা ভারতীয় সেনাধ্যক্ষদের কাছে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের অনুরোধ জানাচ্ছিল।

ক্যাপ্টেন ডুগ্গাল সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি কুকিতাল ক্যাম্পে লেঃ কর্নেল সাজ্জাদের সঙ্গে দেখা করে সাজ্জাদকে জানান, তিনি ভারতীয় সেনাবাহিনীর স্থানীয় কমান্ডারের দায়িত্বে আছেন, যারা নানাভাবে মুক্তিযোদ্ধাদের সাহায্য করছিল। সাজ্জাদের ভাষায়, ‘প্রথম দেখার পর থেকে আজ পর্যন্ত ডুগ্গাল হয়ে আছেন আমার দেখা সবচেয়ে নায়কোচিত পুরুষ। প্রথম দেখাতেই সে আমার মন জয় করে নেয় তার বিয়েতে আমাকে দাওয়াত করে। আমি তাকে বলি ফেব্রুয়ারি এখনও অনেক দূর। কিন্তু তার স্থির বিশ্বাস ছিল তার বিয়ের নির্ধারিত সময়ের পূর্বেই যুদ্ধ শেষ হবে। প্রথম দেখাতে গড়ে ওঠা আমাদের ব্যক্তিগত বোঝাপড়া পরবর্তীতেও চমৎকার কাজে দিয়েছে।’

শমসেরনগর বিমানবন্দরে মোতায়েনকৃত ভারি অস্ত্রের ছোড়া গোলাগুলিতে ভারতীয় গ্রামগুলোতে হতাহতের সংখ্যা বৃদ্ধি পেতে থাকলে ভারতীয় কমান্ডাররা বাধ্য হয়ে ২৮ নভেম্বর রাতে শমসেরনগর আক্রমণের পরিকল্পনা গ্রহণ করেন। ক্যাপ্টেন ডুগ্গাল স্বেচ্ছায় তৃতীয় পাঞ্জাব রেজিমেন্টের অগ্রবর্তী দলের সাথে পর্যবেক্ষক কর্মকর্তা হিসেবে যোগ দেন, যাতে তিনি তার আর্টিলারি রেজিমেন্টকে নিখুঁতভাবে পাকিস্তানী সেনা অবস্থানের ওপর গোলাবর্ষণের নির্দেশ দিতে পারেন।

যুদ্ধের তীব্রতা বাড়ছিল রাতজুড়ে, আর আমি প্রার্থনা করছিলাম ডুগ্গালের নিরাপদ প্রত্যাবর্তনের। এই অভিযানে ভারতীয় পক্ষে হতাহতের সংখ্যা বাড়তে থাকায় আমি ডুগ্গালের বিষয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ি। সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে আমি জিপ দিয়ে টেনে আনা ট্রেইলারে রক্ষিত ভারতীয় সেনাদের মরদেহ দেখতে এগিয়ে যাই। ট্রেইলারটি তারপুলিনে ঢাকা ছিল। সেই দ্বিধাগ্রস্ত অবস্থায় আমি দেখি কবজিতে দামি হাতঘড়ি জড়ানো একটি হাত বেরিয়ে আছে তারপুুলিনের ফাঁক দিয়ে। আমার হৃদস্পন্দন যেন থেমে গেল। ঘড়িটি যুদ্ধক্ষেত্রে, এমনকি গাঢ় আঁধারে নিখুুঁত সময় দিত বলে তা ছিল ডুগ্গালের খুব প্রিয়। আমি তারপুলিনের ফাঁক দিয়ে তার রক্তে সিক্ত দেহটি দেখি, যা শনাক্ত করা যাচ্ছিল না। দৃশ্যটি আমাকে এতটাই আঘাত করে যে, আমি জমে যাই। কতক্ষণ আমি সেখানে মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে ছিলাম নিজেও জানি না।’ ২৯ নবেম্বর রাতে এক বেপরোয়া আক্রমণ চালিয়ে শমসেরনগর বিমানবন্দর দখল করা হয়।

এক বছর পর লে. কর্নেল সাজ্জাদকে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে এডভ্যান্স কোর্সের জন্য পাঠানো হয় বিখ্যাত ডিওলালি আর্টিলারি ট্রেনিং সেন্টারে। তিনি প্রতিটি বিষয়ে সর্বোচ্চ নম্বর পেয়ে ডিসটিংশন লাভ করেন। ভেঙ্গে দেন পূর্বের সব রেকর্ড। তার এই বিরল কৃতিত্ব সাদরে অভিনন্দিত হয় ফ্যাকাল্টি সদস্যদের দ্বারা। লেঃ কর্নেল সাজ্জাদ যখন পরিচালকের কাছে জানতে চান কার রেকর্ড তিনি ভেঙ্গেছেন, পরিচালক তাকে বিনয়ের সাথে জানান এ প্রশ্নের উত্তর দেয়া সেন্টারের নিয়ম ও ঐতিহ্যবিরোধী। সাজ্জাদের ভাষায়, ‘যে কারণেই হোক আমার মন বলছিল আমি ডুগ্গালের রেকর্ড ভেঙ্গেছি। আমি জানতাম সে ছিল এই একাডেমির অন্যতম সেরা ছাত্র।’ তাই আমি ডিরেক্টরকে বলি, ‘স্যার, যদি সেটি না বলা যায় আমি আপনাকে অনুরোধ করব আপনি আমার নম্বর কমিয়ে দিন, যাতে ডুগ্গালের রেকর্ড অক্ষুণ্ণ থাকে। আমি তার রেকর্ড ভাংতে চাই না। আর এভাবেই আমি আমার দেশের স্বাধীনতার জন্য বিনা দ্বিধায় জীবন উৎসর্গ করা আমার ভারতীয় ভাইটিকে ন্যূনতম সম্মান জানাতে চাই।’ ডিরেক্টরের আপত্তি সত্ত্বেও আমি চাচ্ছিলাম একটি ব্যতিক্রমী দৃষ্টান্ত অন্তত স্থাপিত হোক।

পূর্ব প্রকাশিত

মূল রচনা: মানস ঘোষ

অনুবাদ: আকিল জামান ইনু