ক্যাটেগরিঃ স্বাধিকার চেতনা

 

স্বাধীনতার ৪০ বছর পাড় হয়ে গেছে। এখনো সমাধান হয়নি “প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা” ব্যপারটার। আসলে কারা প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা?! আরেকটা কথা দেশে মুক্তিযোদ্ধা কোটা আছে বীরাঙ্গনা কোটা নেই? কেন? আমরা কেন এখনো লিঙ্গ বৈষম্য থেকে বের হতে পারছি না? কারণ আমাদের গোড়ায় গলদ। আর যারা সম্মুখ যুদ্ধে অংশ নেয়নি তারাও কি যোদ্ধা নয়? যারা শারীরিক ভাবে নির্যাতিত হয়নি তারাও কি যোদ্ধা নয়?

এবার আমার নিজের পরিবারের কথা বলি। মোহাম্মদপুর নূরজাহান রোড এলাকায় তখন পাকিস্তানি বিহারীতে ভরা। এমন সময় মার্চ মাসের শুরুতে আমার খালা (তখন ১৬ বছর) নিজে রাত জেগে সেলাই করে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা তৈরি করেন। পরের দিন এলাকায় সেটা উত্তোলন করেন আমার মামা। পরে ২৬ মার্চের পর আমার মামা যুদ্ধে যান। ২৬ মার্চ পাকিস্তানি হামলার সাথে সাথে তৎপর হয়ে ওঠে বিহারীরা। আমার মা তখন অনেক ছোট। ৫-৬ বছরের বালিকা। আমার বাকি খালাদের বয়স তখন ১৬ থেকে ২৫-২৬ বছরের মধ্যে। সেই রাতে কোন মতে প্রাণ বাঁচিয়ে কিছুদিন পরেই গ্রামের বাড়ি (ধরের বাড়ি, টাঙাইল) চলে যান। টানা কয়েকদিন না খাওয়া অবস্থায়। পায়ে হেঁটে। আজকের দিনে চিন্তা করতে পারবেন এটা? জানি পারবেন না। আর আমার বড় মামা তখন ১৪-১৫ বছরের তরুন। সেই বয়সেই যুদ্ধ করেছেন। বাকিটা সবাই জানেন। দেশটা স্বাধীন হল। মামা মারা যাওয়ার আগ পর্যন্ত ছিলেন দাপটের সাথেই। এলাকার বিহারীরা তাকে বাঘের মত ভয় পেত।

এলাকার মসজিদ কমিটিতে ছিলেন আমার নানা। তিনি কি শান্তি কমিটিতে নাম লেখানোর প্রস্তাব পাননি? তিনি কি পারতেন না নিজের এবং নিজের মেয়েদের নিরাপত্তার জন্য মাথা নিচু করতে? না তিনি করেননি। তার ছেলেকে পাঠিয়েছেন যুদ্ধে। দাঁত কামড়ে পরে থেকে নিজের কষ্টের টাকায় বানানো বাড়ি ছেড়ে পাড়ি জমিয়েছেন গ্রামের বাড়িতে। কিসের জন্য? স্বাধীন একটা দেশের নেশায়।

এবার আমার বাবার কথা বলি। না তিনি কোন সার্টিফিকেটধারী মুক্তিযোদ্ধা নন। একটা গছিয়ে দেয়া বাতিল হয়ে যাওয়া সার্টিফিকেট অবশ্য আছে। তখন বাবার বয়স ১৬। টগবগে তরুন। সিরাজগঞ্জ শহরে থাকেন। ট্রেনিং নিয়েছিলেন। তবে, সম্মুখ যুদ্ধে যাওয়ার সুযোগ তার হয়নি। তিনিও সিরাজগঞ্জ শহরে প্রথম পতাকা উত্তোলন করেছিলেন।

শেষ কথা:
একটা স্বাধীন দেশ প্রাপ্তিতে তখনকার সবারই কম বেশি অবদান আছে। যারা যুদ্ধকে শুধুমাত্র ভারতীয় সাহায্য বলে খাঁটো করতে চায় তাদের আমি ঘৃনা করি। যারা প্রকৃত মুক্তযোদ্ধা কোটা নিয়ে লাফায় আর বীরাঙ্গনাদের অধিকারের কথা বলে না, তাদের ব্যাপারে আমি কিছু বলবো না। কারণ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আমি গালি দিতে চাই না।

মুক্তিযুদ্ধ ছিল আমাদের অসাম্প্রদায়িক চেতনায় পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর সংগ্রাম। দেয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়ার পর অধিকার আদায়ের লড়াই। দেশের সর্বস্তরের মানুষের সহযোগীতা ছাড়া এই বিজয় আসতো না। মুক্তিযোদ্ধা আর বীরাঙ্গনাদের সম্মান বলতে এখন শুধৃ আমরা “৩০ লক্ষ্য শহীদের রক্ত ও ২ লাখ মা-বোনের ইজ্জতের বিনিময়ে….. ” ছাড়া আর কিছুই বলি না। কারণ আজো আমরা এক হতে পারি না। পারি না লিঙ্গ বৈষম্য থেকে বের হয়ে আসতে; পারি না দুটি রাজনৈতিক দলের গন্ডী থেকে বের হয়ে আসতে; পারি না সবাইকে একচোখে দেখতে। আমাদের মধ্যে বরাবরই একতার অভাব। স্বাধীনতার পর শুধু একতার জন্যই স্বৈরাচারী এরশাদের পতন কিংবা ১/১১ এর পর গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে। তাই একতা ছাড়া সর্বজনীন সমৃদ্ধি আসবে না। গত ৪০ বছরে এই একতার অভাবটাই বার বার দেখা গেছে আমাদের মধ্যে।

আরেকটা কথা:
২৬ মার্চ কিংবা ১৬ ডিসেম্বর আসলেই শুধু এই ব্যাপার নিয়ে কথা বলবো আর বাকিটা সময় চুপ- এই ধারায় আমি বিশ্বাসী নই। মাফ করবেন।