ক্যাটেগরিঃ ভ্রমণ

 

 

নিজেকে সত্যিই অপ্রকৃতস্থ মনে হল।

????

আমার অপ্রকৃতিস্থ হওয়ার গল্প তাহলে আপনাদের শোনাই-

 

এক

আমি যা করছি এটাকে চরম নির্লজ্জতায় বলা যায় কিন্তু তবুও করছি, কারণ করতে হবেই, এটা তো অফিসিয়াল সুবিধা হয় তুমি গ্রহণ কর অথবা না করলে তোমার পরিবর্তে অন্য কাউকে এটা দেওয়া হবে অথবা কাউকে দেওয়া হবে না। এখানে নিয়ম মানা হয় নীতিমালা দেখে। বাংলাদেশে কোথাও না বেড়ালেও ভারতে আমাকে বেড়াতে যেতে হবে কারণ অফিস ধার্য করেছে এবার নির্বাচিত ব্যক্তিদেরকে ভারতে বেড়াতে নিয়ে যাবে। অফিসের নির্দেশ অনুযায়ী পাসপোর্ট করা হয়ে গেছে, বিরাট সৌভাগ্যবশত: আমি যে অফিস থেকে পাসপোর্ট করলাম সেখানকার অফিস কর্ণধার নাকি নতুন এসেছেন যথেষ্ট সৎ, পাসপোর্ট করতে যেয়ে তাই মনে হয়েছিল, কারণ পাসপোর্ট করতে যেয়ে কোন প্রকার সমস্যায় পড়তে হয়নি, কোন বাড়তি টাকা পয়সাও খরচ করতে হয়নি। সরকারী অফিস সম্পর্কে আমার ধারণাটাই পাল্টে গেছে। তবে আমার ভুলের কারণে পাসপোর্টে ছোট্ট একটা গণ্ডগোল আছে।

 

বিপত্তিটা তখনই শুরু হল, যখন আমাকে ভারতীয় ভিসা সংগ্রহ করতে হল। যেহেতু আমার কম্পিউটার ও অনলাইন এ সব সম্পর্কে কিছুটা ধারনা আছে সেহেতু চাইছিলাম নিজেই অনলাইনে ভিসার আবেদন করে ভিসা সংগ্রহ করব। আমার কলিগদের ভিসা ফর্ম দেখে দেখে মোটামুটি নির্ভুল ভাবে ফর্ম পূরণ করলাম কিন্তু ইন্ডিয়ান এমবাসিতে যাওয়ার তারিখ কোন ভাবে সংগ্রহ করতে পারলাম না, কিন্তু আমি নাছোড় বান্দা তিন মাস ধরে একাধারে চেষ্টা করতে থাকলাম। এদিকে অফিসের সকলেই ভারত থেকে ঘুরে এসেছে। আমি কখনও দেশে বা বিদেশে সেই অর্থ ঢাকা ছাড়া একা কোথাও বেড়াতে যাইনি।ঢাকা যদি একা বেড়ানো যায় বিশ্বের যে কোন জায়গা একা বেড়ানো সম্ভব এই দৃঢ় বিশ্বাস অনেক আগে থেকে আমার মনে জন্ম নিয়েছে।সবাই নানান রকম ভাবে একা যাওয়া ব্যাপারে নিরুৎসাহিত করতে লাগল। অন্যের উৎসাহ অনুৎসাহ বেশ কিছু দিন খুব একটা পাত্তা দেইনা, এবারও দিলাম না। এদিকে তিন মাস ধরে ভিসা সংগ্রহ করতে না পেরে দালাল ধরে  দুই থেকে তিন সপ্তাহের মধ্যে সংগ্রহ করতে তা সমর্থ হলাম। টাকা প্রকৃত খরচের চেয়ে পাঁচ গুণ বেশি লাগল বটে; তবে আমাকে ভারতীয় এমবাসিতে পর্যন্ত যেতে হল না।

 

ভিসা সংগ্রহ করার পর একজন সঙ্গী খুঁজতে লাগলাম কম বেশি Xenophobia তো কাজ করছেই। তবে একদিন খোঁজার পরে দুর্ভাগ্যবশত: অথবা সৌভাগ্যবশত যখন কাউকে খুঁজে পেলাম না খুব দ্রুতই তার পরদিন অফিস থেকে টাকা নিয়ে ভারতের উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিলাম। আমার বাসা থেকে চেকপোস্ট সব মিলিয়ে তিন কিলোমিটারের মত হবে। ব্যাগ এন্ড ব্যাগেজ গুছিয়ে নিলাম গুছানো মাত্রই একজন কলিগকে পেয়ে গেলাম। মোটর বাইকে করে ভদ্রলোক বাংলাদেশী ভারতে ঢোকার চেকপোস্টে সর্বোচ্চ দশ মিনিটের মধ্যে আমাকে পৌঁছে দিলেন। চেকপোস্টে ঢোকার পরপরই বেশ কয়েকজন লোক আমার পাশে এসে উপস্থিত হলেন। তারা আমাকে সহযোগিতা করতে চায়, প্রয়োজনীয় সমস্ত লেখালেখির কাজ তারাই করে দিবে। এমন সময় দেখি আমার শশুরের ফোন আসল, বললেন-

-আলমগীর তুমি তোমার কুদ্দুস আঙ্কেলের সাথে দেখা কর ও সব ঠিকঠাক করে দেবে।

আমি চেক পোস্টে একজন কে জিজ্ঞেস করলাম-

-এখানে কুদ্দুস আঙ্কেল কে?

-জামাই আমি।

বুঝলাম শশুর মশাই ওনাকে যা বলার বলে দিয়েছেন।

-তুমি এখানে বস, আমি চায়ের কথা বলে দিচ্ছি, এই জামাইকে এক কাপ স্পেশাল চা দাও। এক দোকানদারকে বললেন।

বুঝলাম অন্যদের ধরে গেলে যে টাকা খরচ হতো ইনার মাধ্যমে গেলে তারচেয়ে একটু বেশিই খরচ হবে কারণ ওনার স্নেহও অতিমাত্রা সহযোগিতার একটা মূল্য দিতে হবে। তথ্য সংগ্রহ করলাম সাধারণত: যারা সহযোগিতা করে তাদেরকে কত টাকা দিতে হয়। ধরে নিলাম শশুরের রেফারেন্স-এর কারণে খরচটা আমাকে দ্বিগুণ করতে হবে।

 

-বাবা তুমি কি ইন্ডিয়া যাবা? এক বৃদ্ধ ভদ্রলোক আমাকে জিজ্ঞেস করলেন।

-জী, আপনিও কি যাচ্ছেন?

-হ্যাঁ বাবা কিন্তু দেখো এরা আমাকে খুব ঝামেলা করছে, সকাল সাতটা থেকে আছি এখন সাড়ে নয়টা বাজে, আড়াই ঘণ্টা ধরে অপেক্ষা করছি।

আমি চিন্তা করলাম আমার সবে মাত্র মিনিট দশেক হয়েছে। তার মানে এখনও ঘণ্টা দুই/তিন অপেক্ষা করতে হবে।

-জামাই বাবাজি এসো। কুদ্দুস আঙ্কেল আমাকে ডাক দিলেন।

ভদ্রলোকের পিছে পিছে গেলাম, একটি রুমে নিয়ে গেলেন, পুলিশের মত পোশাক পরে থাকা কম্পিউটারের সামনে বসা ব্যক্তিটি, আমাকে জিজ্ঞেস করলেন-

-কি করেন আপনি?

-একটা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকুরী করি।

-কেন ভারতে যাচ্ছেন?

-বেড়াতে যাচ্ছি, অফিস বেড়ানোর সুযোগ দিয়েছে।

-স্যার ইনি আমার জামাই। কুদ্দুস আঙ্গেল বসে থাকা ব্যক্তিকে বললেন।

অনেক লোকের মধ্যে আমার পাসপোর্ট আগে হাতে নিয়ে আমারটার কাজ আগে সেরে দিলেন। ভাবলাম এত সুবিধা যখন পাচ্ছি টাকা দু’শো অতিরিক্ত খরচ হলে সমস্যা নেই। দুইশ টাকার বিনিময়ে দুই ঘন্টা সময় পাচ্ছি মন্দ কি।

-জামাই তোমার সব কাজ শেষ।

মাত্রই পনের মিনিটই সব হল। আমি বিস্ময়ে জিজ্ঞেস করলাম।

-আঙ্কেল আপনাকে কয় টাকা দিতে হবে?

-মেয়েকে ভাল করে দেখেশুনে রেখো, টাকা তোমাকে দিতে হবে না।

খুব লজ্জা পেয়ে গেলাম। কি বলব বুঝতে পারছি না।

-চল তোমাকে বিজিবিদের সাথে পরিচয় করে দিয়ে আসি। তাহলে ওরা তোমাকে কোন ঝামেলায় করবে না।

বলতে বলতে কয়েকজন বিজিবি সদস্য বসে আছেন সেখানে পৌঁছে গেলাম।

-স্যার আমার জামাই।

-আচ্ছা যান আপনি চলে যান।একজন ভারত ফেরত ব্যক্তির ব্যাগ চেক করতে থাকা বিজিবি সদস্য আমাকে বললেন।

ইশারায় জানতে চাইলাম আমার ব্যগ চেক করবে কিনা।ইশারায় উনারও ব্যাগ চেক না করার কথা জানিয়ে দিলেন।

-জামাই তুমি ভ্যানে চলে যাও; গেদে চেক পোস্ট পর্যন্ত চল্লিশ টাকা ভাড়া নেবে।

-হেঁটে গেলে কত সময় লাগবে? আমি একটু লাজুক ভঙ্গিমায় জিজ্ঞেস করলাম।

-তোমার ব্যাগতো ভারি না। তুমি হাটতে হাটতে যাও মাত্র চার পাঁচ মিনিট লাগবে।

-ভ্যানে না উঠলে আবার কোন প্রকার সমস্যা হবে নাতো।

-না তা হবে না।

-তা হলে হাঁটতে হাঁটতে যাই।

কুদ্দুস আঙ্কেল একটা কার্ড মানি ব্যাগ থেকে বের করে দিলেন। বললেন-

-তুমি এর কাছে চলে যাও ও সব কিছু ঠিক-ঠাক করে দিবে, ওখান থেকে তুমি টাকা ভাঙিয়ে নিবে। তাহলে ঠকবে না। অন্য জায়গায় গেলে ঠকতে হবে।

দুই/তিন মিনিট হাঁটার পরই ঠিক কাঁটা তারের বেড়া যেখানটাতে দেওয়া ঠিক সেই জায়গায় পৌঁছে গেলাম। তখনই ঠিক মাথার উপর দিয়ে কয়েকটি কাক ভারতীয় সীমান্তবর্তীয় গাছ থেকে উড়ে বাংলাদেশে এসে প্রবেশ করল। পাখিগুলোর পাখার শাঁ শাঁ শব্দ আমার কানে এসে লাগল। মানুষ হিসাবে জন্মানোর চরম নির্লিজ্জ্বতা উপেক্ষা করার একটা সলজ্জ হাসি হাসলাম। একটু সামনেই বিজিবি সদস্যগণ ভারত গামী ও ভারত ভ্রমণ শেষ করে ফেরত আসা বাংলাদেশীদের পাসপোর্ট চেক করছে। আমার পাসপোর্টের যেহেতু একটা সমস্যা আছে সেহেতু মনের মধ্যে একটু ভয় লাগতে শুরু করল। ওখানে তো আর শশুরের বন্ধু নেই।

 

 

 

দুই

এক কথায় মেয়েটা শ্যাম সুন্দরী। ভুরু দুইটা সাজানো গোছানো। কাল বড় দু’টো চোখের উপরে ভ্রুগুলো শিল্পী দিয়ে মনে হয় সাজিয়ে রাখা হয়েছে। ইউনিফর্মটা অফিসিয়াল বানানোর পরিবর্তে আরও সুন্দরী বানিয়েছে। উচ্চতা পাঁচ ফুট ছয় ইঞ্চির মত হবে। অপ্রয়োজনীয় মেদ শরীরের কোন অংশে অহেতুক ভিড় করেনি। শরীরের যে অংশ যেমন হলে মানায় ঠিক সেই অংশটি সেই রকমই আছে।

-হ্যালো দাদা তোমার পাসপোর্টটা দাও আর এই নাও এখানে স্বাক্ষর কর।

পাসপোর্টের গণ্ড-গোলটা আমাকে খোঁচা দিতে লাগল। এই বুঝি সমস্যায় পড়ে যাই। পাসপোর্টটা হাতে দিয়ে স্বাক্ষর করলাম।

-দাদা তুমি এটা কি করলে?

ভয় পেয়ে গেলাম, পাসপোর্টের সমস্যাটা ধরে ফেলল নাকি।ধরলে অনেক যন্ত্রনা হতে পারে।বিশেষত এসব ক্ষেত্রে ছোটখাট সমস্যা থাকলেও বড় ধরনের যন্ত্রনা দেয়, কিছু টাকা পয়সা খরচ করলে আবার ছেড়ে দেয়।একবার মোটর সাইকেল নিয়ে কোথাও যাচ্ছিলাম।কাগজ দেখার জন্য আমাকে কয়েকজন পুলিশ সদস্য আটকালো।নতুন মোটর সাইকেল।রেজিস্ট্রেশন সংক্রান্ত বিষয়াদি তখনও পর্যন্ত শেষ হয়নি।কাগজ দেখতে চাইলে নিবন্ধন সংক্রান্ত কাগজপত্রের ফটোকপি দেখালাম।ড্রাইভিং লাইসেন্স দেখতে চাইলে দেখাতে পারলাম না।স্বাভাবিক ভাবেই আটকে রাখল, মামলা করবে বলছে।কর্তৃপক্ষের সমস্যা হচ্ছে তারা মোটরসাইকেল আটকে রাখতে পারেন না যা পারেন তাহলো  এইসব ভুলের জন্য মোটর সাইকেলের নিবন্ধন সংক্রান্ত কাগজপত্র আটকে রেখে মামলা করতে।ব্যাপারটা আমি পথ চলতে চলতে বুঝে গেছি।কিন্তু কাগজগুলোতো ফটোকপি আটকে কোন লাভও হবে না।আবার যারা গাড়ীগুলো আটকাচ্ছে তাদেরও গাড়ীর কাগজপত্র চেক করার বৈধ ক্ষমতা আছে বলে মনে হলো না।যারা একাজগুলো করতে পারে তাদের সহজেই চেনা যায় কিন্তু আমি চিনতে পারিনা।লক্ষ্য করলাম অন্য আরোহীদের কাছ থেকে পঞ্চাশ টাকা একশ টাকা যা পাচ্ছে তাই নিয়ে ছেড়ে দিচ্ছে।ব্যাপারটা বোঝার পর আমি টাকা দিতে চাইলাম না।বললাম

– মামলা করে দেন আটকে রাখছেন কেন?

একজন পুলিশ সদস্য আলাদা জায়গায় ডেকি নিয়ে বললেন-

-ভাই একশ টাকা দিয়ে দেন ছেড়ে দিবে, অহেতুক ঝামেলায় জড়াতে চাচ্ছেন কেন?

-না ভাই আমি ঘুষ দিতে পারবনা, পারলে আমার বিরুদ্ধে মামলা করে দেন।

নানান ধরনের ঝামেলার ভয় দেখালেন কিন্তু  কিছু করতে পারছেন না।কিছুক্ষণ পরে কয়েকটা প্র্রশ্ন করে ওপরামর্শ দিয়ে ছেড়ে দিলেন।আর বলে দিলেন আমি যেন কাউকে কিছু না বলি।

এখানে হয়তো ঝামেলা হলে ভালই হবে।সামলাতে পারবনা, এই সেক্টরে আমার মামা খালু কেউ চাকুরী করেন না ঝামেলা হলে যারা সমাধান করে দিবেন।

-দাদা তুমি কোথায় স্বাক্ষর করলে? দেখছো না এক ঘর ফাঁকা রাখতে হবে। শ্যাম সুন্দরী একটু বিরক্ত হয়ে বললেন।

-সরি, সরি, সরি।

-ঠিক আছে যাও, এই দিক দিয়ে ট্রেন স্টেশনে যাও।

যাক পাসপোর্ট সংক্রান্ত সমস্যাটা তাহলে ওনার চোখেও ধরা পড়েনি। তবে এখানে আরও দশ মিনিট সময় দেরী হলে সময়ের খুব একটা অপচয় হতো না।

-দিদি এখানে পার্থকে? শ্যাম সুন্দরীকে জিজ্ঞেস করলাম

-স্টেশনে চলে যাও, মানি চেঞ্জারের কেউ হবে।

আর চার/পাঁচ মিনি হাটার পর গেদে ট্রেন স্টেশনে পৌঁছে গেলাম। সব মিলিয়ে এই স্টেশনটি আমার বাসা থেকে সাড়ে তিন থেকে চার কিলোমিটার হবে। কাঁটাতার এই দূরত্বকে অনেক অনেক বাড়িয়ে দিয়েছে। মানুষের অবিশ্বাসী দৃষ্টি কাটা তারের গ্লাস দিয়ে ঢাকতে চাইছে, বড়ই হাস্যকর।

 

-Excusme দাদা, এখানে পার্থ কে?

-আপনি আলমগীর? একজন অনুর্দ্ধো ত্রিশ বছর বয়সের এক যুবক এসে আমাকে জিজ্ঞেস করল।

– জি

-আসুন আমার সাথে আসুন

-দেখি আপনার মোবাইল বের করেন।

-মোবাইল কি করবেন?

-ইন্ডিয়ান সিম নিবেন না।

-হুম,

মোবাইলটা পকেট থেকে বের করে দিলাম, অনেকক্ষণ ধরে চেষ্টা করল কিন্তু আমার স্বল্প মূল্যের স্মার্ট ফোনে কোন ভাবেই  ইন্ডিয়ান সিম সাপোর্ট করল না। এনিয়ে একটা ট্রেন মিস করেছি। আরেকটা ট্রেনের ছাড়ায় সময় হয়ে গেলো প্রায়।

-অফিসে চলেন

-একবার তো পাসপোর্ট দেখেছে আবার দেখবে নাকি

-দেখবে না? ওরতো বিএসএফ শুধু আপনার নাম এন্ট্রি করেছে মাত্র। এখানে এরা আপনার পাসপোর্ট স্ক্যান করে নেবে, আপনার ছবিও তুলে নেবে।

একটু ভয় পেয়ে গেলাম। না জানি কি সমস্যায় পড়ে যায়।

-ওখানে পাসপোর্টটা দেন।

-আপনার নাম কি? ভেতর থেকে পাসপোর্ট মেলে ধরে আমাকে একজন জিজ্ঞেস করলেন।

-আলমগীর কবির

-নাম তো ভুল বললেন

-উমম না ঠিকইতো বললাম।

-পুরো নাম বলেন

-আলমগীর কবির

-আগে কিছু নেই

-মোহাম্মদ আলমগীর কবির।

-হুমম এই বার ঠিক বলেছেন। এই ইনিকি তোমার পরিচিত? পার্থ বাবুকে জিজ্ঞেস করলেন। যান আপনি চলে যান আপনার কাজ শেষে।

একটা নাভিশ্বাস ছাড়লাম। তাহলে এযাত্রাও বেঁচে গেলাম।

 

-ও আপনার টাকা চেঞ্জ করতে হবে?

-হুমম

-কত টাকা করবেন?

-আপাতত দশ হাজার টাকা করি।

-দশ হাজার টাকা দিলে কত রূপি পাব?

-সাত হাজার নয়শ রূপি।

দ্রুত দশ হাজার টাকা বের করে দিলাম,

-সাত হাজার নয়শ থেকে সিম ও সিমের রিচার্জ বাবদ বাদ দেন দু’শ রুপি এবং ট্রেনের টিকিট বাবদ ত্রিশ রূপি তাহলে আপনি পাচ্ছেন সাত হাজার ছয়শ সত্তর রূপি।

দ্রুত রূপিগুলো কয়েক ভাগে ভাগ করে কয়েকটি পকেটে রেখে দিলাম। আগামী এক সপ্তাহ মেয়ের সাথে যোগাযোগ না করে থাকতে হবে, মনটা প্রচণ্ড খারাপ হতে শুরু করল।

-দাদা আপনার ট্রেন চলে এসেছে, দ্রুত আপনার ভোডাফোনের সিমটা দেন।

-কিন্তু আমি তো ওটার টাকা আপনাকে দিয়ে দিয়েছি এমনকি আমি রি-চার্জও করেছি।

-দাদা দ্রুত দিননা সিমটা, আপনার ট্রেন ছেড়ে দেবে।

কিচ্ছু করার নেই সিমটা ওনার হাতে দিয়ে ট্রেনের দিকে ছুটতে থাকলাম

-আরে যাচ্ছেন কোথায়? দাঁড়ান।

-ট্রেন ছেড়ে দেবেতো।

-আরও চার মিনিট আছে তারপর ছাড়বে।

-টিকি নিতে হবে না?

-আপনার টিকিট তো কাটা হয়েছে গেছে।

দ্রুত একটি বাড়ীর মধ্যে দৌড়ে গেলো, বলল

-দাঁড়ান আমি যাব আর আসব।

প্রায় ত্রিশ চল্লিশ সেকেন্ডের মধ্যে বাড়ীর মধ্যে থেকে ফিরে আসল

-এই নিন এই মোবাইলটা নিন, একটি পুরনো মোবাইল হাতে দিয়ে বলেলন।

-কত টাকা দিতে হবে?

-কোন টাকা দিতে হবে না, আপনার ট্রেন এখনই ছেড়ে দেবে। এই নেন টিকিট টা নেন।

আমি একটু কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে গেলাম, মোবাইল কি ওনি ফেরত নিবেন না, নাকি পরে এসে টাকা দিতে হবে, নাকি ছোট খাট কোন ঝামেলা অপেক্ষা করছে, কিছুই বুঝতে পারছি না। দৌড়ে ট্রেনে উঠে পড়লাম। ভাবতে লাগলাম বাসা থেকে বাংলাদেশের সীমান্ত চেকপোস্টে আসতে ফুয়েল ফুরিয়েছে বড় জোর পাঁচ টাকার আর ট্রেনের টিকিটের মূল্য ত্রিশ রুপী মোট বাংলাদেশী টাকা চল্লিশ টাকায় আমি কলকাতা যেতে পারব। আমার বাসা থেকে আমার গ্রামের বাড়ীতে বাসে দু ঘণ্টা সময় এবং একশত টাকার মত অর্থ ব্যয় করতে হয়। এই একশত টাকার পথে আমি সপ্তাহে একবার যাতায়াত করি কিন্তু কাঁটাতারের বেড়া চল্লিশ টাকার পথ অতিক্রম করার সুযোগ আর কখনও  দিবে কিনা জানি না।

 

তিন

ট্রেন ছাড়ার দ্বিতীয় স্টেশনে পৌঁছানো মাত্রই প্রচণ্ড ভিড় জমে গেলো। কোন রকম ভাবে সীটে বসে আছি। শিয়ালদহ স্টেশনে পৌঁছাতে তিন ঘণ্টারও বেশি সময় লাগতে পারে। সাথে The beloved-এর কম্পিউটার প্রিন্টেড কপি আছে, ব্যাগের ভেতর থেকে বের করে পড়তে শুরু করলাম। না বই পড়ার হয়তো সময় পাওয়া যাবে। জানালা দিয়ে ভারতীয় বাংলাদেশ দেখতে থাকলাম, স্টেশনগুলোতে কোথাও কবিগুরুর, কোথাও মহাত্মা গান্ধীর, কোথাও বা স্বামীজীর বড় বড় ছবি টাইলস আঁকা রয়েছে। আর বাকি সব বাংলাদেশের মতই লাগল।

 

প্রায় সাড়ে তিন ঘণ্টার যাত্রা শেষে করে শিয়ালদহ স্টেশনে নামলাম, অনেক বড় স্টেশন, প্রচুর লোক সমাগম।

-Execue me দাদা

-বলুন

-দাদা আমি রবীন্দ্র সরণী, নাখুদা বড় মসজিদ কিভাবে যাব?

-আপনার বাড়ী কোথায়? ওনি ওলটা প্রশ্ন করলেন।

-দাদা আমি বাংলাদেশ থেকে এসেছি।

-সে দাদা কথা শুনে বুঝতে পেরেছি। কাউকে বলেন না বাংলাদেশ থেকে এসেছি।

-কেনা বলব না। আর তাছাড়া না বললেও তো বুঝে ফেলবে আপনি যে ভাবে বুঝে ফেললেন আমি বাংলাদেশী।

-তাতো বুঝলাম, কিন্তু বাংলাদেশী বললে সমস্যা আছে।

-সরি দাদা যত সমস্যাই হোক না কেন, আমি বাংলাদেশী নই এটি আমি কোন ভাবে বলতে পারব না।

-আচ্ছা ঠিক আছে তাহলে একটু সাবধানে থাকবেন, ব্যাগ, টাকা পয়সা সাবধানে রাখবেন। সামনে আর একটু হেটে যান, ওখানে বাস পাবেন, ট্যাক্সিও পাবেন, বাসে গেলে দশ টাকা খরচ হবে কিন্তু ট্যাক্সিতে গেলে একশ টাকার মত খরচ হবে। তবে কলকাতায় আপনি যেহেতু নতুন সেহেতু ট্যাক্সিতে যাওয়া উচিৎ।

সামনে যেয়ে উপস্থিতি একজনের কাছ থেকে তথ্য নিয়ে বাসে উঠে পড়লাম। পনের বিশ মিনিটের মধ্যে সাত টাকা খরচ করে আমি আমার কাঙ্ক্ষিত জায়গা পৌঁছে গেলাম।

-Execue me দাদা

-জি বলুন

-দাদা এখানে স্ট্যান্ডার্ড হোটেলটি কোন জায়গা বলতে পারেন?

-এখানে যা আছে সব নিম্ন মানের হোটেল, Standard হোটেল পাবেন না।

কথা না বাড়ীয়ে সামনে হাটতে শুরু করলাম। Xenophobia ভালমতো কাজ করতে শুরু করেছে, বিশেষ করে স্টেশন থেকে সাবধান বাণী শোনার পর থেকে। এখন বুঝতে পারছি ওটা কোন ভাবে সাবধান বাণী ছিলনা, ওটা ছিলা ভীতি বাণী।

 

-Execue me দাদা

-জি বলুন

-দাদা এখানে স্ট্যান্ডার্ড হোটেলটি কোন জায়গা বলতে পারেন?

-না আমার জানা নেই।

আর একটু সামনে গিয়ে একটি দোকান পেলাম। এই এলাকাতে প্রচুর মোসলমানদের দোকান আছে, এখন বুঝতে পারছি যিনি আমাকে হোটেলের ঠিকানাটা দিয়েছেন তিনি আসলে এই কারণেই এই এলাকার ঠিকানা দিয়েছেন। আফটার অল তিনিতো মুসলমান। পকেট থেকে কার্ডটা বের করলাম।

 

-আসসালামু আলাইকুম

-উ-আলাইকুম আসসালাম।

– কিছু বলবেন? দোকানে বসে থাকা লোকটি হিন্দিতে জিজ্ঞেস করলেন

আমি যখন একটু দূর থেকে ওনার কথা শুনতে পাচ্ছিলাম তখন ওনি হিন্দি স্টাইলে বাংলায় কথা বলছিলেন, এখন আমার সাথে হিন্দিতে কেন কথা বলছেন সেটা আমার বোধগোম্য হচ্ছে না। হিন্দি কথা শুনে আমি ইংরেজিতে জিজ্ঞেস করলাম-

-How can I get the hotel standard?

-Hotel Standard?

-yes

-আপনি কি বাঙালী?

এই বার বাংলায় জিজ্ঞেস করলেন?

-জি আমি বাঙালী, আমি বাংলাদেশ থেকে এসেছি।

-সামনে ঐ মোড় টা পর্যন্ত হেটে যান, ওখানে যেয়ে একজনকে জিজ্ঞেস করুন দেখিয়ে দেবে। শুদ্ধ বাংলায় বললেন।

 

-Execue me

-How can I get the hotel standard?

-রাস্তার ঐ পাশে চলে যান, তারপর সামনে একটু হাঁটুন হোটেল পেয়ে যাবেন।

আমার কাছে মনে হল আমি যদি এদের কাছে বাংলায় কিছু জিজ্ঞেস করি এরা তখন হিন্দিতে কথা বলছে কিন্তু ইংরেজিতে বললে ঠিকই বাংলায় কথা বলছে। এরা কি জানে না কবিগুরুর, কবিগুরু হবার প্রায় একশ বছরও কোন হিন্দি ভাষী আজও পর্যন্ত তাঁর ধারে কাছে পৌঁছাতে পারেনি। বুঝতে সময় লাগল না হিন্দি ভাষা এদের মুখোশ কিন্তু বাংলা ভাষাটা মুখশ্রী হতে পারত। হাটতে হাটতে হোটেলে পৌঁছে গেলাম। মোবাইলের চার্জার কেনা দরকার। হোটেলে উঠার আগে চার্জার কিনে নেই, প্রায় চার ঘণ্টা সময় পেরিয়েছে গেছে কিন্তু এখনও পর্যন্ত মেয়ের সাথে যোগাযোগ হয়নি। যাইহোক চার্জার কেনার সুযোগে আমার হিন্দি সংক্রান্ত ধারনাটাও যাচাই করা হয়ে যাবে।

 

 

চার :

-দাদা আপনার কাছে এই মোবাইলের চার্জার হবে? মোবাইল দেখিয়ে জিজ্ঞেস করলাম।

আমি হিন্দি খুব কম বুঝি, যেটুকু বুঝি সেটুকু দিয়ে আমি বুঝলাম ওনি হিন্দিতে বললেন-

-হবে।

-If it is available with you, Please give me one.

মুখে কিছু না বলে আমার হাত থেকে মোবাইলটা নিয়ে একটি চার্জার বের করে চেক করতে লাগলেন।

-How much price of this charger?

-দাদা আশি টাকা দিতে হবে। হিন্দি স্টাইলে তবে বাংলায় বললেন।

-ও আপনি বাংলা জানেন।

-আমরা বাংলা, হিন্দি, ইংরেজি সব জানি।

-আচ্ছা আপনি ষাট টাকা নেন

-না হবে না। আপনি সত্তর টাকা দেন। একটু বিরক্ত হয়ে বলল

শরীর ও মনে ক্লান্তি জড়িয়ে গেছে। বিশেষ করে মনেই ক্লান্তিটা জড়িয়ে গেছে। দ্রুত চার্জার নিয়ে একটা হোটেল থেকে পোলাও খেয়ে সেই Standard হোটেলে উঠে পড়লাম। কিছুক্ষণের মধ্যে আবিষ্কার করলাম হোটেলের মালিক মুসলমান। আফটার অল আমাকে যিনি হোটেলের ঠিকানা দিয়েছেন তিনিতো মুসলমান।

 

ষাটোর্দ্ধো একজন মানুষ। বাংলা বলতে এবং বুঝতে দু’টো ভাল মত পারেন যদি উচ্চারণে একটা হিন্দি ভাব আছে। শরীরটা ভেঙ্গে গেছে। চোখে বিরক্তির ছাপ, সমস্ত পৃথিবীর উপর তার বিরক্তি, চাকুরী খাতিরে সেই বিরক্তিকে অবদমন করতে হয়।

বাঁকা বাংলায় জিজ্ঞেস করলেন

-কোথা হতে এসেছেন?

-বাংলাদেশ থেকে এসেছি

-সিঙ্গেল রুম চান না ডাবল রুম চান?

-সিঙ্গেল রুম চাই।

কয়েকটা চাবি দিয়ে আরেকজনকে বললেন

-যাও রুমগুলো দেখিয়ে নিয়ে আস

রুম দেখতে যেয়ে চরম হতাশ হতে হল। সিঙ্গেল রুম বলতে একটি রুমকে হরায়জোন্টাল এবং ভার্টিকাল দুইদিকে দেয়াল বা ছাদ টেনে দিয়ে চার রুম করা হয়েছে। একটি রুম বলতে যা বোঝানো হয়েছে কোন রকম দরজা দিয়ে ঢুকেই বড়জোর মাঝারি গড়নের একজন মানুষ শুয়ে থাকতে পারবে । সিলিং ফ্যান টানানোর কোন জায়গা নাই। দেয়ালে খুবই সাধারণ মানের ফ্যান টানানো আছে।

-আমি ডাবল রুম চাই।

ভাবলাম সিঙ্গেল রুম যদি এই রকম হয়ে থাকে ডাবল রুম নিশ্চয় সিঙ্গেল রুমের মতে হতে পারে।

-স্যার এই দিকে আসেন।

পিছে পিছে যেতে শুরু করলাম। না সত্যিকার অর্থেই রুমটা ডাবল। ডাবল সাইজের একটি খাট পাতা আছে। এ্যাটাস বাথরুম। রুমটা পছন্দ করে ফেললাম।

-রুমটা আমার পছন্দ হয়েছে। এটাই নেব।

-স্যার আপনার নাম কি?

-আলমগীর কবির, আপনার নাম?

-মোঃ আব্দুল করিম।

বুঝলাম বাংলা সিনেমার স্ক্রিপ্ট রাইটারগণ কাজের লোকদের এ জাতিয় নাম খুব যৌক্তিক কারণেই রাখেন। কি জানি এটাও হতে পারে আব্দুল করিম হয়ে জন্মগ্রহণ করে কাজের লোক হবে বলে।

-স্যার আপনি এখানে থাকেন কোন সমস্যা হবে না। কোন সমস্যা হলে আমাকে বলবেন। এরা হিন্দু মানুষ এদের থেকে একটু সাবধানে চলা ফেরা করবেন।

মোঃ আব্দুল করিমের চোখের দিকে তাকাতেই অপরাধীর মত মাথাটা নিচু করে ফেলল।

 

ভ্রমণে খুব বেশি ক্লান্ত হতে হয়নি। মোট চার ঘণ্টার ভ্রমণে হোটেল পর্যন্ত পৌঁছে গেছি। গোসল সেরে, সামান্য বিশ্রাম নিয়ে বেড়ানোর উদ্দেশ্যে রুম থেকে বের হলাম।

-কাকা আজকে দিনের যে সময়টুকু বাকি আছে তাতে কোথায় কোথায় বেড়াতে পারব?

– কাছেই ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল আছে, যেতে পারেন।

কিভাবে যাব জিজ্ঞেস করে নিলাম। মোটামুটি সাধারণ খরচেই হোটেল থেকে ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল পৌঁছে গেলাম। গেটে টিকিটের মূল্য লেখা আছে এই রকম-দেশী নাগরিকদের জন্য প্রবেশ মূল্য দশ টাকা এবং বিদেশী নাগরিকদের জন্য টিকিটের মূল্য দুইশ টাকা। দশ টাকা বের করে টিকিট কাউন্টারের দিকে যেতে শুরু করলাম। হঠাৎকরে মনে হল আমিতো পাসপোর্ট ভিসা নিয়ে এদেশে প্রবেশ করেছি তাহলে আমি তো বিদেশী। সুতরাং আমার জন্য দশ টাকার টিকিট নয় দুইশ টাকার টিকিট লাগবে। দশ টাকার নোট মানি ব্যাগে রেখে পাঁচশ টাকার নোট বের করলাম। টিকিট কাউন্টারে গিয়ে বললাম

-দাদা একটি টিকিট দিন তো?

টিকিট দাতা চোখ ভরা বিরক্ত নিয়ে আমার দিকে তাকালেন আর বললেন

-ছোট নোট নাই?

-কত টাকার নোট দেব?

-টিকিটের দাম দশ টাকা।

-ও আচ্ছা, আমি মানি ব্যাগ থেকে দশ টাকার নোট বের করে দিলাম।

মনে মনে ভাবলাম তাহলে আমি বিদেশিও নই বা ভারতীয়ও নই। আমি বাংলাদেশী।

ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল দেখে হাটতে হাটতে ফেরার চেষ্টা করলাম। কিন্তু অনেক পথ জেনে পাতাল রেলে ফিরলাম। বাংলাদেশী হিসাবে পাতাল রেলে আমি রীতিমত মুগ্ধ হলাম। ঢাকাতে এই ধরনের ব্যবস্থা থাকলে নিশ্চয় ঢাকার জ্যাম অনেক কমত।

 

দুই দিনে যতটুকু সম্ভব হল কলকাতা ঘুরে দেখলাম। এর পর একা একা ট্রেনে চেপে দীঘা গেলাম। সেখানে নতুন অভিজ্ঞতা হল। সাধারণ মুসলিম পরিবাবেরর অসাধারণ ধর্ম বিশ্বাসী সব মানুষের কাছ শিক্ষা পেয়ে বড় হয়েছি। সারা জীবন ধরে জীবনের সকল ক্ষেত্রে এটাই শিখেছি যে, ধর্মই সব বাকী সব গৌণ। কিন্তু আমার মা বাবার চরম দুর্ভাগ্য যে আমি এখন আর নামায কালাম পড়িনা। পড়িনা শুধু তাই নয় এমনকি আমি নামায পড়িনা একথা বলতেও লজ্জা পাইনা। এই কারণে আমার মা-বাবা বোন ও আত্মীয়-স্বজন আমাকে নিয়ে খুবই লজ্জিত। আমার পরিবারের শাসক যারা তাদের শাসনের সমস্ত কর্মকৌশল ধর্ম থেকে পাওয়া। এই শাসক শ্রেণীর অনুশাসন বা অপশাসনে আমি বড় হয়েছি। কথা সত্য আমি মুসলিম ধর্মের সংজ্ঞা অনুযায়ী এখন আর মুসলিম নেই কিন্তু আমার সেন্টিমেন্ট সেখানে পড়ে আছে।চাইলে দু-দশ দিনে ধর্ম ত্যাগ করা যায় কিন্তু দশ-বিশ বছরেও সেন্টিমেন্ট পরিবর্তন করা যায়না।তাই পঞ্চাশ বছরের নাস্তিকদের মধ্যেও আমি চরম মুসলিম সেন্টিমেন্ট দেখেছি।সেই কারণেই দীঘার মদ, নারী এসবের সহজলভ্যতা আমার কাছে অবাক করার মত ব্যাপার। না স্ত্রীর প্রতি কমিটমেন্ট থেকে নয় ভয় থেকে ওগুলো স্পর্শ করে দেখিনি। কথা সত্য মাথা ভাঙ্গার পাড় থেকে কোন ভাবেই আমার স্ত্রীর দ্বারা দেখা সম্ভব নয় যে আমি ভারত মহাসাগর উপকূলে কি করছি। কিন্তু স্ত্রীর জাগ্রত আত্মা সব সময় আমার স্কন্ধে ভর করে থাকে আর সেটাই আমার ভয়।

 

পাঁচ

নানান ফোবিয়ার কারণে দীঘায় না থেকে লোকাল ট্রেনে সন্ধ্যায় কলকাতা ফিরলাম।

ভ্রমণের চতুর্থ দিন চিন্তা করলাম হেটে হেটে সারাদিন কাউকে কিছু জিজ্ঞেস না করে কলকাতা দেখব। তাই করলাম। হাওড়া ব্রিজ, কালী ঘাট, আমার প্রিয় ক্রিকেট মাঠ ইডেন গার্ডেন, আকাশবাণী আরও কোথাও কোথাও যেন ঘুরলাম। কিছু  জিনিষ ভিতরে প্রবেশ করে দেখলাম, কিছু বা নানান আইনগত জটিলতার কারণে বাইরে থেকে দেখেই সন্তুষ্ট থাকলাম।

 

পরবর্তী দিন আমার সিনিয়র কলিগ তার স্ত্রী আমার সাথে যোগ দিলেন। মূলত তারা চিকিৎসা সেবা নেওয়া জন্যই কলকাতায় গেছেন। কলকাতায় তারা তাদের দুঃসম্পর্কের এক আত্মীয়র বাসায় উঠেছেন। ফোনে যোগাযোগ করে এক জায়গায় হলাম। আমি পরের দিন আমার ঈশ্বর কবিগুরুর স্বপ্নের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান রবীন্দ্র ভারতীতে যেতে চাইলাম কিন্তু নানান কারণে সেখানে যাওয়ার চিন্তা বাদ দিয়ে দার্জিলিঙে যাবার টিকিট কাটার জন্য বিদেশীদের জন্য যেখানে ট্রেনের টিকিট বিক্রি করা হয় সেখানে গেলাম। অফিসটাতে প্রচুর বিদেশী ও বাংলাদেশী (যেহেতু এর আগে প্রমাণ হয়ে গেছে আমি বিদেশী নই) এমন লোকের প্রচুর ভিড় যারা ভারতবর্ষকে ঘুরে দেখতে চায়। তবে সব মিলিয়ে বাংলাদেশীদের ভিড় বেশী । সাধারণত অফিসিয়ালগণ কিছু লোককে বকাঝকা করবে এটা হতে হবে, তা নাহলে আর অফিসিয়াল কিসের। বাংলাদেশ থেকে যারা গেছেন আজকে বকা ঝকা করার জন্য তাদেরকে বেছে নেওয়া হয়েছে বোধ হয়, নাকি প্রতিদিনই বাংলাদেশীদের বেছে নেওয়া হয় আমি জনি না। টোকেনের নাম্বার অনুযায়ী আমার সিরিয়ালের আগের জনকে ডাকা হয়েছে। খুব সাধারণ কারণে তাকে বকা হচ্ছে। আমার নাম্বার ডাক পড়তেই আমি গেলাম-

-কোথায় যাবেন? আমাকে জিজ্ঞেস  করলেন।

-দার্জিলিং

-এর আগে কখন গেছেন?

-না, এই প্রথম যাচ্ছি। কিভাবে দার্জিলিং যাব ভদ্রলোক খুব ভালভাবে আমাকে বুঝিয়ে দিলেন। আচ্ছা আপনি খুব ব্যস্ত তা না হলে আপনার সাথে একটু কথা বলতাম।

-কোন প্রোবেলেম নাই, বলুন কি বলতে চাচ্ছেন।

-আপনি ওনাকে ঐভাবে বকলেন কেন? একটু সাহস নিয়ে জিজ্ঞেস করলাম

-ওনি সহজ কথা বুঝতে পারছিলেন না। নরম স্বরে উত্তর দিলেন।

-আপনি জানেন একজন মানুষ যখন দেশের বাইরে কোথাও যায় তার মধ্যে একটি ভীতি কাজ করে যেটাকে Xenofobia বলা হয়। Xenofobia থেকে এমনটি হয় যে আপনি যা বলছেন ওনি তা বুঝতে পারবেন না বা ওনি যা আপনাকে বোঝাতে চাচ্ছেন তা বোঝাতে পারছেন না।

-আমি দু:খিত, আপনার যাত্রা শুভ হোক। বলে আমাকে বিদায় জানালেন অথবা উঠে যেতে বললেন।

 

এই ভ্রমণে দ্বিতীয় বারের মত হোটেল ত্যাগ করছি।

-গতকাল দুপুরে যখন হোটেল ছেড়ে যাই তখনতো আপনি বকশিস নিয়েছিলেন এখন আবার চাচ্ছেন কেন?

-এই হোটেলের মালিক মুসলমান, লোকটা আচ্ছা রকম কৃপণ আর বদ, ঠিকমত বেতন দিতে চায় না। আমি আজ পঁয়ত্রিশ বছর ধরে চাকুরী করছি কিন্তু খুবই সামান্য বেতন দেয়, যা দেয় তা ঠিকমত দেয় না। আমি বছরে দুই বার বাড়ী যাই।

-আপনার বাড়ী কোথায়?

-বিহার।

-আচ্ছা নেন, কিন্তু কম করে রাখেন, হাতে নোট পেয়ে বেশী রাখবেন না।

 

 

টানা পনের থেকে ষোল ঘন্টার ভ্রমণ শেষে কলকাতা থেকে দার্জিলিং পৌঁছালাম।চরম ভয় আর সৌন্দর্যের সংমিশ্রণে দার্জিলিংকে দেখলাম। সূর্য উদয়ের পর কাঞ্চনজঙ্ঘাকে বিশাল আকৃতির একটা ডায়মন্ড মনে হচ্ছিল। মনে হচ্ছিল পৃথিবীর সকল সুন্দর ওখানে গিয়ে ভীড় জমিয়েছে।

 

আর এক ভয়ঙ্কর সুন্দর রাস্তা হল, রক গার্ডেনের রাস্তা। রক গার্ডেনে গিয়ে মন ফিরতে চাইছিল না। না রক গার্ডেনের সৌন্দর্য দেখে নয়, ফিরে আসার রাস্তার ভয়াবহতার কথা ভেবে।

 

আমি কখনও আমার জীবনে চার ডিগ্রি তাপমাত্রার মুখোমুখি হয়নি।জীবনের প্রথম বার দার্জিলিং-এর হোটেলে থাকা কালীন সময় চার ডিগ্রি তাপমাত্রার মুখোমুখি হলাম, এত বেশি ঠান্ডা অনুভূত হচ্ছিল যে, মনে হচ্ছিল আমার বোধ হয় কোল্ড স্ট্রোক করবে। কোন রকম সেটাকে সামলে নিয়ে তার পরের রাতে কলকাতার উদ্দেশ্যে দার্জিলিং থেকে রওয়ানা দিলাম। অত:পর কলকাতা থেকে লোকাল ট্রেনে (একমাত্র পরিবহন) করে গেদের উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম। ঠিক-ঠিকমত গেদে স্টেশনে পৌঁছে গেলাম। আর মহা বিপদের ঘটনাটি তখনই ঘটল।

 

 

ছয়

ভ্রমণ শেষ করে দেশে ফিরছি না বাড়ীতে ফিরছি। ট্রেন থেকে নেমে যথারীতি চেকপোস্টের দিকে হাটতে শুরু করলাম। যিনি আমাকে যাওয়ার সময় মোবাইল দিয়েছিলেন দেখি তিনি দাঁড়িয়ে আছেন।

-দাদা, দাদা, কেমন আছেন?

কোন উত্তর দিলেন না

-পাসপোর্টটা দেন।

-তার আগে দাঁড়ান আপনার মোবাইলটা ফেরত দেই, দাদা আমি একটা চার্জার কিনেছিলাম এটি আমার কোন কাজে আসবেনা, আপনি রেখে দিন।

হাত বাড়িয়ে মোবাইল ও চার্জারটা নিয়ে নিলেন

-মানি চেঞ্জ করবেন না? চেক পোস্টের দিকে হাটতে হাটতে আমাকে জিজ্ঞেস করলেন।

-দাদা কাছে আছে মাত্র দুইশ রুপি

-দেন

কাজের কথা বলতে বলতে ওনার মানি চেঞ্জ অফিসে এসে পৌঁছে গেলাম।আমাকে দুইশত চল্লিশ টাকা দিলেন। ভ্রমণ করে টাকা যা ছিল তার মধ্যে এই টাকাটা রয়েছে। আসার অভিজ্ঞতার আলোকে বলতে পারি যেহেতু বাংলাদেশের চেকপোস্টের শশুরের সুপরিচিত লোক আছে এবং এই পারে সেই সুপরিচিতের পরিচিত লোক আছে সেহেতু চেকপোস্টে কোন টাকা লাগবে না। পরিবহন ভাড়া সর্বোচ্চ আর ত্রিশ টাকা খরচ হবে।

-দেন পাসপোর্টটা দেন?

-চলেন দিচ্ছি

ব্যাগের যে পকেট টাতে পাসপোর্ট রেখেছিলাম সেই পকেটটাতে হাত দিলাম। না কোন কোন কিছুইতো খুঁজে পাইনা। একটু বিচলিত হলাম। মাউন্টেইন ব্যাগটা কাঁধ থেকে নামিয়ে ফেললাম। ব্যাগের চার পাঁচটি পকেট সবগুলোতে খুঁজতে লাগলাম। না পাসপোর্টের মত কোন কিছুইতো পাইনা। কিছু কাগজের ফটোকপি ও কার্ড আছে ওগুলো সব পকেট থেকে বের করলাম কিন্তু পাসপোর্ট খুঁজে পাইনা। হারিয়ে গেলো কিনা বুঝতে পারছি না। হারালে কোথায় হারাতে পারে সেটিও মনে করার চেষ্টা করলাম কিন্তু না মনে পড়ছে না।

-আপনি পাসপোর্টটা খুঁজেন অফিসে লোক এসেছে। এ কথা বলে মানি চেঞ্জার দাদা চলে গেলেন।

বেশ ঘাবড়ে গেলাম। অফিসের ভেতর থেকে একজন অফিসিয়াল রাগি স্বরে বলে উঠলেন-

-আপনি একপাশে যেয়ে খোঁজা খুঁজি করেন, ওনাদের কাজ করতে দেন।

আমি একপাশে যেয়ে খুঁজতে লাগলাম। দার্জিলিং-এর শীতের হাত থেকে রেহায় পাওয়ার জন্য কিছু কাপড় কিনতে হয়েছিল সেগুলো একে একে ব্যাগের ভিতর থেকে বের করে ফেললাম কিন্তু না কোথাও পাসপোর্ট খুঁজে পেলাম না। জীবনের এই প্রথম মানব সৃষ্ট সীমানা পার হয়ে বাংলাদেশের মানচিত্রের বাইরে এসেছি। জানিনা এই পরিস্থিতিতে কি করতে হয়। যেহেতু জীবনে প্রথম বার বাইরে আসছি সেহেতু আসার পূর্বে অনেকেই অনেক পরামর্শ দিয়েছিলেন কিন্তু কেউ পরামর্শ দেননি পাসপোর্ট হারালে কি করতে হবে। তবে আমি এইটুকু জানি পাসপোর্ট হারালে যথেষ্ট বিপদ হতে পারে। কিন্তু সেই বিপদের স্বরূপ কেমন তা জানি না। এমনিতেই পাসপোর্ট স্থায়ী ঠিকানা ও বর্তমান ঠিকানা বিষয়ক একটা জটিলতা রয়েছেই যা আসার সময় নানান ভাবে পেইন দিচ্ছিল।

 

-প্লিজ আপনি আমাকে পরামর্শ দিন এখন আমাকে কি করতে হবে?

-আপনি কি বৈধ ভাবে বাংলাদেশ থেকে এসেছেন? নাকি অবৈধ ভাবে?

-দেখুন অবৈধ ভাবে আসলে তো আমিতো ফিরেও যেতাম অবৈধ ভাবে।

-তাহলে আপনি প্রমাণ দিন যে আপনি বৈধ ভাবে এসেছিলেন, তখন আমরা আপনাকে পরামর্শ দেব আপনি কি করবেন?

চুপ করে থাকলাম, বোঝার চেষ্টা করলাম আমার কাছে কোন কি প্রমাণ আছে যে প্রমাণ করে যে আমি বৈধ ভাবে এসেছিলাম। না তেমন কোন প্রমাণ আমি খুঁজে পাচ্ছি না। তাছাড়া কিছু ভাবতেও পারছিনা।

 

-আপনি প্রমাণ দিন যে আপনি বৈধ ভাবে এসেছেন। আপনি চুপ করে থাকবেন না। প্রমাণ দিন। তা নাহলে আমরা আপনাকে পুলিশের হাতে দেব তারা যা করার করবে।

 

এক সপ্তাহ পরে বাসায় ফিরব। আমার মেয়ের জন্মের পর কখনও ওকে এক সপ্তাহ না দেখে থাকিনি। তাছাড়া ওর জন্য সামান্য কিছু জিনিষপত্রও কিনেছি যেগুলো ও পেলে খুব খুশি হবে। সেই খুশি দেখার জন্য অপেক্ষা করাটা খুব কঠিন হয়ে যাচ্ছে। আমি যে বৈধ পাসপোর্ট ভিসায় এখানে এসেছি বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ কোনটা হতে পারে আমি ভাবছি।

 

হঠাৎ করে মাথায় আসল বাংলাদেশ ছাড়ার পূর্বে পাসপোর্টের ফটোকপি করে ব্যাগের মধ্যে এনেছিলাম সে গুলো খোঁজা যেতে পারে। তন্ন তন্ন করে ব্যাগ খুঁজতে লাগলাম কিন্তু ফটোকপিও খুঁজে পেলাম না। পরে মনে পড়ল হোটেল থেকে চাওয়া হয়েছিল ফটোকপিগুলো সেখানে দেওয়া হয়েছিল।

 

-ওই ওনাকে পুলিশ ফাঁড়িতে নিয়ে যাও। চেক পোস্ট অফিসের কেউ একজন বলেলন।

খুব নিকটেই পুলিশ ফাঁড়ি একজন আমার দিকে হেটে আসছেন।

-জি দাদা আমি প্রমাণ দিতে পারব যে আমি বৈধ ভিসা পাসপোর্টে এসেছি।

-আপনি কিভাবে প্রমাণ দিবেন?

 

-প্রথমত আমি 27-02-15 তারিখে যখন যাই তখন আপনারা মনে হয় সমস্ত প্রমাণ রেখেছিলেন। ঐ সময়ে আপনার আমার ছবি তুলে রেখেছিলেন এবং নিশ্চয় ঐ সময় তথ্যও রেখেছিলেন।

-আচ্ছা আপনার পাসপোর্টের তথ্য দেন আমরা দেখছি কি করা যায়।

-পাসপোর্টের তথ্যতো আমার মনে নাই।

বাক্যটি শেষ করা মাত্রই মনে হল আমার ইমেইলে তথ্যগুলো আছে। পরক্ষণেই আবার মনে পড়ল বেশ কয়েকদিন হলো মেইলটা তো হ্যাকড হয়েছে। না জিমেইলেএ্যাটসমেন্ট হিসাবে ওটি পাব।

-দাদা আমি যদি একটু ইন্টারনেট ব্যবহার করার সুযোগ পাই তাহলে আমি আপনাকে আমার পাসপোর্ট সংক্রান্ত সকল তথ্য দিতে পারব।

-দেখুন, এখানে কোথাও পাবলিক সার্ভিস দেওয়ার মত দোকান খুঁজে পাবেন। প্লিজ সেখানে থেকে তথ্য নিয়ে আমাদেরকে দিন আমরা আপনাকে ভাল পরামর্শ দিতে পারব। কিন্তু দাদা আপনি এর সমাধান না হওয়া পর্যন্ত দেশে ফিরে যেতে পারবেন না।

 

মেজাজ টা প্রচণ্ড খারাপ হতে লাগল। কিন্তু কার উপর মেজাজ খারাপ করব বুঝতে পারছি না। নিজের উপর, যে কিনা পাসপোর্টটা হারিয়ে ফেলল। নাকি তাদের উপর যারা এই ব্যবস্থা করল যে ….. না আর ভাবতে পারছি না। আমি যেখানে পাসপোর্ট নামক কয় পাতা কাগজের জন্য আটকে আছি সেখান থেকে  আমার বাসায় ফিরে যেতে কোন ভাবেই বিশ মিনিটের বেশি সময় লাগবে না। এখানে বাংলাদেশের মোবাইল নেটওয়ার্ক ও পাওয়া যায় সেই হিসাবে সর্বোচ্চ পঞ্চাশ পয়সা খরচ করে কাউকে ফোন দিলে আমার মোটর বাইক নিয়ে পাঁচ সাতা মিনিটের মধ্যে চলে আসতে পারবে। কিন্তু এখন তা সম্পূর্ণরূপে অসম্ভব। প্রবেশ পথ অরোধ্য অদৃশ্যমান কাটা তারের বেড়া দিয়ে সব বন্ধ করা। পাসপোর্ট সংক্রান্ত জটিলতা নিরসনের জন্য দশ মিনিটের পথ অতিক্রম করতে দশ দিন সময় লাগতে পারে আবার সেক্ষেত্রে টাকা খরচই বা কত হতে পারে কোন বিষয়ে আমার কোন ধারনা নেই। ব্যাংক এ্যাকাউন্টে প্রতিমাসে সেই পরিমাণ টাকা থাকে যে পরিমাণ টাকা না থাকলে ব্যাংক ওয়ালারা টাকা তুলতে দেয়না। সেই হিসাবে টাকার প্রয়োজন হলে আমার স্ত্রী তা ধার করে পাঠাবে। সবচেয়ে বেদনাদায়ক বিষয় এটাই যে বিশ মিনিটের এই পথ আগামী কতদিনে শেষ হবে সেটাই বুঝতে পারছি না।

 

কয়েকদিন ধরে আমি পাসপোর্টটা সতর্কতার সাথে বয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছিলাম কিন্তু ওই কয় পাতা কাগজ এখন আমাকে যন্ত্রণাদায়ক পথে বয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছে।

 

পার্শ্ববর্তী টাকার বিনিময়ে ইন্টারনেট সেবা পাওয়া যায় এইরকম একটি দোকান থেকে প্রিন্ট করে তথ্য সরবরাহ করলাম। এখনও পর্যন্ত যে তথ্য পেলাম তাতে আমাকে আবারও কলকাতা যেতে হবে সেখানে বাংলাদেশ এ্যাম্বাসিতে যোগাযোগ করতে হবে এবং হারানো পাসপোর্টের ব্যাপারে তাদেরকে জানাতে হবে। পরবর্তীতে তারা আমাকে তথ্য প্রমাণের ভিত্তিতে সহযোগিতা করবেন।

 

আমার জীবনে অনেকবারই অনেক বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়েছি কিন্তু আজকের মত এতটা বিব্রতকর পরিস্থিতিতে কখনও পড়িনি। আমার স্ত্রীর জন্ম কিন্তু এই ভারতেই তবে এখন সে নানান কারণে বাংলাদেশের নাগরিক। তবুও সে এদেশে ও ওর দাদা দাদী বা আত্মীয় স্বজনকে দেখতে আসতে পারেনা কারণ তার কাগজী পরিচয় সে আজ বাংলাদেশী। কিছুদিন আগে ওর দাদা মারা গেছেন কিন্তু কাগজী পরিচয়ের অভাবে দেখতে আসতে পারেনি।

 

প্রায় পাঁচ ঘণ্টা হলো চরম বিরক্তি নিয়ে আমি এখানে বসে আছি। আর কতঘন্টা কত দিন আমাকে বসে থাকতে হবে, কোথায় কোথায় ঘুরতে হবে আমি জানি না। আমার সামান্য অসতর্কতার কারণে আমার এই দুর্ভোগ।আমি নানান ভাবে প্রমাণ দিতে পারি যে আমি বাংলাদেশের একজন নির অপরাধ মানুষ, ফোন দিলেই স্ব স্ব মানুষ বলবে যে ওনি এদেশের একজন মানুষ যে কোন অপরাধ করে ভারতে যায়নি, বেড়াতে গিয়েছিল।হাজার হাজার রক্ত মাংসের মানুষ স্বাক্ষী দিবে যে আমি বাংলাদেশে থেকে কয়েকদিনের জন্য ভারতে বেড়াতে গিয়েছিলাম।  কিন্তু যে কয়েকপাতা কাগজ একথা বললে আমাকে ছেড়ে দেবে সেই কয়েকপাতা কাগজ আমি হাজির করতে পারছি না।

 

ফোনের রিংটোন অফ করা আছে। ফোনের ভাইব্রেশন হচ্ছে

-হ্যাঁ বল,

-ফোন করেই যাচ্ছি তুমি ধরছনা কেন? ফোনের অপর প্রান্ত থেকে আমার স্ত্রী বলল। তুমি এখন কোথায়?

-এই গেদে স্টেশনে, প্রায় পাঁচ ঘণ্টা অপেক্ষা করছি।

-এখনও আসছ না কেন?

-পাসপোর্ট খুঁজে পাচ্ছি না।

-তাহলে কি হবে? শুনে আৎকে উঠে জিজ্ঞেস করল।আমার সাথে থাকা কোন মানুষের হারানোর কথা শুনে সে এতটা আৎকে উঠত না। মেয়ে বাবা আসছে না কেন করে কান্নাকাটি করেই যাচ্ছে। ওর গায়ে খুব জ্বর হয়েছে। তুমি যে ভাবেই হোক তাড়া-তাড়ি আসার চেষ্টা কর।আবার বলল।

অবনির এক বছর কি দেড় বছর বয়সে একবার জ্বর হয়েছিল, ওর মা আর আমি প্রায় সারা রাত জেগে সেবা করছিলাম।একবার  ওর  কোকানো দেখে আমি কাঁদছিলাম।   আজকেও আমার মেয়ে নিশ্চয় সেইরকম করছে।

 

অন্যদিকে অফিস থেকে পাওয়া ছুটিও আজকে শেষ হয়ে যাচ্ছে। সবকিছু মিলিয়ে কি হবে কিছু ভাবতে পারছি না। মেয়ের জন্য চরম খারাপ লাগছে।

-দাদাকে এই দিকে আসেন, স্যার আপনাকে ডাকছে। ওনার ডাক শুনে হাটতে শুরু করলাম। জানিনা ওনি আমাকে কি বলবেন। তবে পাসপোর্ট হারিয়ে গেলে কি কি করতে হবে সেই বিষয়ে একটি পিডিএফ ফাইলে মোবাইলে নামানো ছিল। তা এই ছয় ঘণ্টার এক ফাকে পড়ে নিয়েছি। তাতে যা লেখা আছে তাহলো-

 

HELP! I LOST MY PASSPORT ABROAD

By Paula Sollami Covello, Esq.

Mercer County Clerk

If your passport is lost or stolen, it is a serious matter. Report it to the embassy immediately and to the local or regional police. A stolen US Passport can be of great value to criminals, imposters and others who wish to do harm. The official personnel are usually available around the clock to provide emergency assistance and are trained to handle such situations to get you home. A photocopied ID page will help to prove your citizenship and will aid officials so they can possibly issue you a limited-use passport within a day or so. However, be aware that once a passport is reported lost or stolen it is often canceled and invalidated and will not get you back in to the country, if you happen to find it hiding under your hotel bed…….

লেখাটি পড়ার পর ভয়ের পরিমাণ আরও বেড়ে গেছে।

 

-আপনি এই গরমে শীতের পোশাক গায়ে জড়িয়ে আছেন কেন?

-আমি ভুলেই গিয়েছিলাম যে দার্জিলিং থেকে এই শীতের পোশাকটি গায়ে জড়িয়েছিলাম যা এখনও পর্যন্ত জড়ানো রয়েছে। বলে উইলের শীতের পোশাকটা খুলে হাতে নিয়ে হাটতে শুরু করলাম। এমন সময় পেছন থেকে এই দাদা, এই দাদা বলে একজন চিৎকার করছে। আমি বুঝতে পারিনি ওনি আমাকেই ডাকছে। আমার বিপরীত দিকে একজন হেটে যাচ্ছেন তিনি বললেন-

-দাদা ওনি আপনাকে ডাকছেন।

-জি বলুন দাদা কি বলবেন? আমি পিছন ফিরে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলাম।

-আপনি তো দাদা আপনার পরিচয় পথে ফেলে দিলেন।

-জি?

-আপনার পাসপোর্টটা তা আপনার পকেট থেকে পড়ে গেলো। দাদা আপনি হারিয়ে যান কোন সমস্যা নেই কিন্তু পাসপোর্টটা যদি আপনার সাথে থাকে কোন সমস্যা নেই। আপনি আছেন পাসপোর্ট নেই বিরাট সমস্যা, তবে আপনিও নেই পাসপোর্টও নেই তাহলে কোন সমস্যা নেই। বলে হাসতে লাগল।

 

ওনাকে আমি কি বলে ধন্যবাদ দেব বুঝতে পারছি না।

-দাদা আপনাকে অনেক অনেক ধন্যবাদ। এটার জন্য আমি ছয় ঘণ্টা ধরে ভুগছি।

পাসপোর্ট হারানোর জন্য চেকপোস্ট অফিসের লোকজন গালমন্দ না করলেও পাসপোর্ট পাওয়ার পর সবাই মিলে আমার বোকামির জন্য আচ্ছা মত বকাঝাক করল। যার যা মনে হল বলতে লাগল। অফিসের অপেক্ষমাণ বাংলাদেশী লোকজনও ঘটনা শুনে তারাও গালমন্দ করতে লাগল। যার যা খুশি তিনি তাই বলে আমার বুদ্ধির কটূক্তি করতে লাগল।

 

পশ্চিম দিকে তাকিয়ে দেখি সূর্যের তির্যক রশ্মি প্রায় ম্লান হয়ে গেছে। সেই ম্লান রশ্মি লাল রং ধারণ করে সামনে ভাসমান মেঘের চারপাশ দিয়ে তির্যক ভাবে ছড়িয়ে যাচ্ছে।কেবলমাত্র আকাশেরই এই একটাগুণ দেখি যা আর কোথাও দেখিনা। আকাশ যখন পরিষ্কার থাকে তখন অপরূপ নীল রং ধারণ করে সেটা এক বিরাট সৌন্দর্য্য, যখন মেঘাচ্ছন্ন থাকে তখন প্রত্যেকটা মেঘমালাতেই তাকে অপরূপ লাগে, সেটা কাল মেঘ, সাদা মেঘ, ভাঙ্গা মেঘ, লাল মেঘ তা সে যে রকম মেঘই হোক না কেন।এক একটা মেঘে এক এক ধরনের সুন্দর লাগে।

 

ঠিক বাংলাদেশ ও ভারতীয় সীমান্তে একটি নাম না জানা গাছ কিছু শাখা প্রশাখা এলোমেলো করে ছড়িয়ে দিয়ে সীমানা সাক্ষী হিসাবে দাড়িয়ে আছে। আমি বুঝতে পারছিনা গাছটার মালিকানা সত্ত্ব কোন দেশের তবে এইটুকু বুঝতে পারছি আমার মত ও কোন ভূখণ্ডে দাড়িয়ে আছে সেটা নিয়ে ওর কোন মাথা ব্যথা নেই। ও যে দেশের ভূখণ্ডেই থাক না কেন ও একই আচরণে আলো বাতাস পানি থেকে ওর খাদ্য সংগ্রহ করবে। যদিও আমার কোন দেশের নাগরিক এটা আমার খাদ্য সংগ্রহে বা খাদ্য অভ্যাসে ব্যাপক পার্থক্য সৃষ্টি করতে পারে। এই মুহূর্তে গাছের ছায়া দরকার নেই কিন্তু বিগত ছয় ঘণ্টা ধরে আমার উপর দিয়ে যে মানসিক ধকল গেছে তাতে আমি প্রচণ্ড বিপর্যস্ত। যদিও মেয়ের জন্য চরম খারাপ লাগছে তারপরও একটু স্বস্তি, একটু শান্তির জন্য গাছটির নিচে বসে পড়লাম। পাসপোর্ট হাতে নিয়ে দেখতে লাগলাম কয়েক পাতা কাগজের একটি বই আমাকে কিভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে অবশ্যই সেটা ও পারছে মানুষের প্রাকৃতিক নিয়মগুলো উপেক্ষা করার কারণে। মাথার উপর হঠাৎ করে একটা কাক কা কা করে ডাকছে। জানিনা কাকের জন্ম কোন দেশে? বাংলাদেশের দিক থেকে আরও কয়েকটা কাক উড়ে এসে গাছটিতে বসল। গাছে হেলান দিয়ে বসে পাসপোর্টটা হাতে নিয়ে কাকগুলো দেখতে লাগলাম। হঠাৎ করে একটি কাক উড়ে বাংলাদেশের দিকে গেলো। একটু পরেই একটি কাক আমার পাসপোর্টের ওপর পায়খানা করে দিল।

 

-ভাই আপনি  কি কাককে গল্প শোনাচ্ছিলেন?

-হুম? হঠাৎ প্রশ্নটা শুনে অপ্রস্তুত হয়ে গেলাম, কোন কথা বললাম না।

-তা কাক কা কা করে আপনার সাথে কি গল্প করছিলো? প্রশ্ন করে হো করে হাসতে শুরু করল।বুঝছি আপনি ইন্ডিয়াতে ঘুরে পাগল হয়ে গেছেন। তা কয়দিন ঘুরলেন?

-এক সপ্তাহ

-এক সপ্তাহ ঘুরে কাকের সাথে কথা বলছিলেন তাহলে আমার মত দুই সপ্তাহ ঘুরলে তো আপনি আরও অনেক পাখির সাথে গল্প করবেন। যান আরও ঘুরে আসুন। বলে হো হো করে হাসতে শুরু করল।

 

আমি একটু লজ্জা পেলাম বটে কিন্তু কোন কথা বললাম না। কাকটা কাটা তারের উপর থেকে উড়ে বাংলাদেশের দিকে আসল। আমি কিছু বুঝতে না পেরে আরও কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলাম, অত:পর পাসপোর্ট থেকে গাছের পাতা ছিঁড়ে কাকের পায়খানা মুছতে শুরু করলাম। ভাবতে লাগলাম না থাক সেটা নেই বা বললাম।তবে নিজেকে সত্যিই অপ্রকৃতিস্থ মনে হলো।