ক্যাটেগরিঃ দিনলিপি

 

দিনে দুই-তিনটা রোজা রাখা তখন ছিল মামুলি ব্যাপার । ওহহ! আপনিতো আবার বুঝদার মানুষ। বলবেন দিনে দুই-তিনটা রোজা ক্যামনে রাখে, এ্যা !!! রাখে ছোটরা রাখে, যেমন আমরা রাখতাম। সারা রাত জেগে থাকতাম সেহরি খাওয়ার জন্য কিন্তু সেহরি খাওয়ার একটু আগেই ঘুমিয়ে পড়তাম। তবে বাবা-মা ঘুম থেকে ডেকে তুলতেন। নইলে তো সারাদিন সহ্য করতে হতো গাল ফুলিয়ে ঠোঁট বাকানো কান্না।

সেহরির সময় সেহরি খেতাম, সকাল ১১ টার সময় একবার ইফতার সেরে নিতাম, দুপুরে আবার সেহরি খেয়ে সন্ধ্যায় সবার সাথে ইফতার করতাম। মধ্যখানে ইফতারের তেলে ভাজা মচমচে মজার কোনো আইটেম কিংবা রসগুল্লা সামনে আসলে, রোজাটাকে কিছু সময়ের জন্য বোতল বা কলসিতে আটকে রেখে, পেটপুরে খেয়ে আবার হা করে উপরের দিকে শ্বাস টেনে রোজা পুনরায় নিজের মাঝে নিয়ে নিতাম ।

বোতল আর কলসির ব্যাপারটা খুব ছোটবেলা তেমন একটা কাজে লাগাতাম না । তবে একটু বুঝ হওয়ার পর পুরোপুরি কাজে লাগাতাম। কিছু খেতে মন চাইলে রোজাকে বোতল বন্দি করতাম। কলসিতে তেমন একটা রাখতামনা। কারণ অন্যান্যরা একে অপরের রোজা ভেঙ্গে দেওয়ার জন্য থাকতো সদা প্রস্তুত। বলতে গেলে কে কার রোজা ভাঙতে পারে এ নিয়ে একটা গোপন প্রতিযোগীতাই ছিল। যদি কেউ কলসির মুখ খুলে ফেলে তবে তো দিনটিই বৃথা। তাই বোতলেই আস্থা ছিল বেশি। তাই বোতলের মুখ ভাল করে লাগিয়ে কাছে কাছে রাখতাম।

সন্ধ্যার আকাশ হাল্কা কালো হয়ে আসলে লুকিয়ে আযান দিতাম। আর আযান শেষে দৌড়ে গিয়ে যে কারো ঘরে উঁকি মেরে দেখতাম কেউ ইফতার করতে বসলো কি না। কিন্তু বিধি বাম শত চেষ্টায় একজনকেও রোজা ভাঙ্গাতে পারিনি।

দিনে একটার উপরে রোজা রাখা যায় না যখন এই জ্ঞান অর্জন হয়ে গেলো তখন তো ভীষন বিপাকে পড়ে গেলাম। তখন অবশ্য হিসেবটা ছিল আরো মজার। এ বছর তুই কয়টা রোজা রাখছিসরে আমি কিন্তু পাঁচটা। তখন এ খবর অন্যজন পেয়ে অন্তত ছয়টা রোজা রেখে আমাকে পেছনে ফেলার জন্য মরিয়া হয়ে উঠতো । কেউ কেউ আবার ঈদের আগে কাউকে বলতো না কে কয়টা রোজা রাখছে। যদি অন্যজন জেনে যায় তবে তো এর চেয়ে বেশি রোজা রাখার জন্য মরিয়া হয়ে উঠবে।

গ্রামের সবকটি মসজিদে অন্তত একদিন করে হলেও গিয়ে তারাবির নামাজ পড়ে আসতাম। শুধু কি মসজিদ? যে সব বাড়িতে মহিলাদের নামাজ পড়ানো হয় সেখানে তো মূল সারিতে আমরাই থাকতাম। কারণ মসজিদে বড়রা এলে পিছনে সরিয়ে দিত, আর মহিলাদের এখানে আমরাই তো একমাত্র বাচ্চা পুরুষ, তাই সে টেনশন ছিল না।

মা-চাচির ইফতারি এলে সেটা প্রতিবেশিদের ঘরে গিয়ে বিলিয়ে দেওয়ার গুরুদায়িত্ব পড়তো আমাদের উপরেই। আমরা মহানন্দে কাঁধে তুলে নিতাম সে দায়িত্বভার।

ঈদের আট দশদিন আগ থেকেই হিসাব নিকাশ শুরু করে দিতাম কে কার আগে উঠে গোসল করবে। কোন পুকুরে গোসল করবে। গোসল শেষে আগুন পোহানোর জন্য সবাই মিলে খড় জোগাড়েরর কাজও শুরু হয়ে যেত। আর ঈদের কাপড় নিয়ে ছিল সেতো এক মহাকাণ্ড। কেউ দেখে ফেললে ঈদ হবে না এই ভয়ে নতুন জুতা জামা লুকিয়ে রাখতাম, জুতাতে ময়লা লাগার ভয়ে হাটতাম বিছানায় ।

ঈদের চাঁদ উঠলেই শুরু হয়ে যেত হুলুস্থুল কাণ্ড। ঈদেরর চাঁদ বলে স্লোগান হতো, স্লোগান বলতে চিল্লাফাল্লা আরকি। এই বাড়ি ঐ বাড়ি ঘুরে ঘুরে ঈদের দাওয়াত দিয়ে আসতাম। সারা রাত ঘুম হতো না। সবার আগে গোসল করার টার্গেট নিয়ে পুকুর ঘাটে গিয়ে দেখতাম ইতোমধ্যে দুই একজন গোসল সেরে ফেলেছে । অবশ্য পরের ঈদের জন্য সেটা চ্যালেঞ্জ হয়ে থাকতো। যে আগামিতে আমার বা আমাদের আগে কেউ গোসল করতে পারবে না।

মোবাইল তখন একেবারে নতুন। ফেইসবুকও প্রচলিত হয়নি। তখন মিসডকলই ছিল একধরনের বিনোদন। একজন আরেকজনকে মিসডকল দিয়ে ঘুম থেকে জাগিয়ে তুলতাম। অপর প্রান্ত থেকে ফিরতি মিসডকল এলে নিশ্চিত হতাম সে ঘুম থেক উঠেছে।

এরকম নানান সব আনন্দে ভরপুর ছিল আমাদের শৈশব। যার অনেকটাই এখন কেবলই ইতিহাস। যখন থেকে নিজের উপর রোজা ফরজ হয়ে গেল তখন থেকে কখনো রোজা ভেঙ্গেছি বলে মনে হয়না। চেষ্টা করে চলছি রোজার পাশাপাশি অন্যান্য ইবাদতও যেন ঠিকঠাক পালন করতে পারি। আল্লাহর কাছে সর্বদা প্রার্থনা করি হে আল্লাহ আমাদেরকে সঠিক ভাবে ইবাদত করার তৌফিক দান করুন, কবুল করুন ইবাদত সমূহ। আমিন।