ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

খবর এবং পেছনের ঘটনা প্রায় ঠিকই থাকে শুধু পাল্টে যায় মানুষ, স্থান, সময় ।  হাহাকার আর আর্তচিৎকার ছড়িয়ে পড়ে ঘরে ঘরে। এভাবে ধারাবাহিক সড়ক দুর্ঘটনায় খবরের মালমশলা হচ্ছে অগনিত জীবন। আমরা একটু হতাশ, অনুশোচনা, আর দীর্ঘশ্বাস ফেলে আবার স্বার্থপর হয়ে সময়ের ঘোরে ভুলে যাই সব। হয় লাইক কমেন্টের আশায় না হয় হাল্কা সচেতনতার খাতিরে ফেইসবুকে দুর্ঘটনার বিবরণ অথবা একটু প্রতিবাদের ঢাক বাজিয়ে আবার অচেতন হয়ে পড়ি।

মারাত্মক সব ঘটনাকেও একসময় নিছক দুর্ঘটনা বলে নিজেদেন সান্তনা দেই, ভাবি মৃত্যু অবধারিত, যমদূত আসলে তাকে ফেরানোর সাধ্য কারো নেই। হ্যা! এটা ঠিক মৃত্যু কেউ ঠেকাতে পারবেনা। আমরা সবাই একদিন মুত্যুর স্বাদ নেব। দুর্ঘটনাও বলে কয়ে আসে না। কিন্তু তাই বলে কি অসেচতন হয়ে সড়কগুলোকে হতাশার কারখানা বানিয়ে দেব!

কারণ দুর্ঘটনা এক জিনিস, ঘটনা আরেক জিনিস । বেপরোয়া গাড়ি চলানো আর সড়কের অবকাঠামো ত্রুটির কারণে বর্তমানে যা ঘটছে তা দুর্ঘটনা নয়, আমাদের তৈরি ঘটনা। আচ্ছা কেউ কি চায় সড়ক দুর্ঘটনায় পড়ে নিজে পরিবারের বোঝা হোক? অথবা দিন গুণতে অনাগত মৃত্যুর? অথচ এটাই এখন মহামারি আকারে ঘটছে বাংলাদেশে। কে নেবে এর দায়ভার?

পত্রিকার পাতা খুললেই সড়ক দুর্ঘটনার মিছিল। মিডিয়া সড়ক দুর্ঘটনার সংবাদগুলো কাভারেজ করতে হিমশিম খাচ্ছে। তাই প্রায় সময় দেখা যায় পত্রিকার ভেতরের পাতায় বা টেলিভিশন স্ক্রলে সংবাদের শিরোনাম হয় সড়ক দুর্ঘটনায় আহত ‘এতো’, নিহত  ‘এতো’ আলাদা শিরোনাম করে এতো এতো খবর প্রকাশের ফুরসত নেই তাদের। অনেক খবর মিডিয়াতে অনেকসময় প্রকাশও পায়না। খুব অল্প কিছু খবর আলোচিত হয়, আর আলোচিত এ খবরগুলোর বর্ণনা এতোটাই লোমহর্ষক এবং হৃদয়বিদারক হয় যে তা পড়তে গিয়েই গা শিউরে ওঠে।

সর্বশেষ যে খবরগুলো পড়ে আমার মনের ভেতরটা অজান্তেই কেঁদে উঠছে, কিছু লেখার জন্য তাগদা দিচ্ছে শিউরে ওঠা গা, সেগুলোর মধ্যে উল্লোখযোগ্য ঘটনার একটি হলো ময়নসিংহের ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলার মগটুলা এলাকায় ছেলের সামনে বাস চাপায় মায়ের মৃত্যু।

দ্বিতীয় ঘটনাটি হলো দুই বাসের চাপে ঢাকার সরকারি তিতুমীর কলেজের স্নাতক (বাণিজ্য) দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র রাজীব হোসেনের (২১) হাত কাটা ও মৃত্যু।

তৃতীয় ঘটনাটি এ ঘটনারই পূনরাবৃত্তি। টুঙ্গিপাড়া এক্সপ্রেস পরিবহনে গোপালগঞ্জ যাওয়ার পথে বিপরীত বাসস্ট্যান্ড এলাকায় বিপরীত দিক থেকে আসা একটি ট্রাক বাস ঘেঁষে যাওয়ার সময় হৃদয় নামে একজনের ডান হাত কাটা পড়ে।

চতুর্থ এ ঘটনা আমার এলাকা সিলেটের জৈন্তাপুর উপজেলার শুক্রবারীবাজার নামক স্থানের । যাত্রী বাসে উঠতে না ‍ উঠতেই বাস টান দেওয়ায় তিনি ছিটকে পড়ে যান এবং মারা যান।

সর্বশেষ যে ঘটনাটি বলবো সেটি আমার ঘরের, মানে আমার দাদির কথা বলছি । কয়েকদিন পূর্বে জাফলংগামী গাড়িতে চড়ে যাচ্ছিলেন আত্মীয়ের বাড়ি। অপ্রাপ্ত বয়স্ক চালকের হাতে  স্টিয়ারিং। দ্রুতগামী গাড়িগুলোকে ওভারটেক করে সে ছুটে চলছে সামনে। আচমকা একটা মোটর সাইকেল সামনে পড়লে সে দ্রুত হার্ডব্রেক কষে। তবু রক্ষা হলোনা মোটরসাইকেলের, ধাক্কা খেয়ে ছিটকে পড়লো খাদে। দুই মোটারসাইকেল আরোহী আহত হয়ে সেখানে ছটফট করছে।

ভাগ্যক্রমে সে যাত্রায় বেঁচে যান আমার দাদিসহ অন্যান্য যাত্রীরা। সেই দুর্ঘটনায় তিনিসহ কয়েকজন যাত্রী গুরুতর আহত না হলেও সাথের যাত্রীদের গুরুতর আহতবস্থার দৃশ্য মনে পড়লে এখনো তিনি শিউরে ওঠেন।

এভাবে ভয়ঙ্কর সব অভিজ্ঞতা আর প্রিয়জন হারানোর ব্যাথা প্রতিনিয়ত ছুঁয়ে যাচ্ছে আমাদের। যত্রতত্র ভাঙ্গা সড়ক, সড়কের মাঝখানে পুকুর সমান গর্ত, ভরাট ড্রেনে সড়ক-ড্রেন একাকার । অপ্রাপ্ত বয়স্ক অদক্ষ চালক, ওভারটেকের অসুস্থ প্রতিযোগিতা প্রতিনিয়ত আমাদেরকে দিয়ে যাচ্ছে অগণিত দুঃসংবাদ। কে টেনে ধরবে এ লাগাম? 

চালকরা মানসিকতা পরিবর্তন করে ওভারটেকের অসুস্থ প্রতিযোগিতায় না গিয়ে ট্রাফিক আইন মেনে চললে, প্রাপ্তবয়স্ক প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত চালক ছাড়া গাড়ি চালানোর রীতি বন্ধ করতে পারলে আর সড়কগুলোর জীর্ণদশা ঘুচিয়ে উপযুক্ত মেরামত, মহাসড়কগুলোকে সরকার ঘোষিত বহু লেনে উন্নিত করার কার্যক্রম দ্রুত বাস্তবায়ন করা গেলে সড়ক দুর্ঘটনা অনেকাংশেই কমে আসবে।

কিন্তু কে শোনে কার কথা? রাস্তায় বেরুলেই দেখা যায় সেই চেনা দৃশ্য। প্লাস্টিক, অথবা পটেটো বলে ছোট গাড়িগুলোকে বড় গাড়ির অবহেলায় ঘা ঘেঁষে যাওয়া অথবা ছোট্ট টমটম বা সিএনজি নিয়ে দূরপাল্লার বিশাল ট্রাক বা বাসের সাথে বিপদজনক ওভারটেকের অহেতুক প্রতিযোগিতা। কোথাও ভাঙ্গা গর্তে গাড়ির ধাক্কা খেয়ে যাত্রীর মাজা যায় যায় অবস্থা অথবা ঝাঁকুনি খেয়ে প্রসূতি মা বা অসুস্থ রোগিদের ছটফটের করুণ দৃশ্য। এ যেন উদাসিনতার হাতে জিম্মি অগণিত জীবন!