ক্যাটেগরিঃ স্বাস্থ্য

ব্যক্তিগতভাবে খুব বেশি আগে আমি ইয়াবার নাম শুনিনি। প্রায় বছর দুই-তিনেক আগে ঢাকার এক ঘনিষ্ঠ বন্ধুর সঙ্গে ফোনে কথা বলছিলাম। (ইয়ার্কি ঠাট্টা করা যায় অনায়াসে তাঁর সাথে)। আলাপের ফাঁকে কথার ছলে ঠাট্টা করে সে বলছিল যে, তুমি আমেরিকাতে ইয়াবা খাও না? উত্তরে বললাম- না। উলটো জিজ্ঞেস করলাম তাঁকে যে, ইয়াবা জিনিষটা কি? উত্তর না দিয়ে টেলিফোনের অপরপ্রান্ত থেকে বরং সে বন্ধু এমনভাবে হাসতে লাগলো যে, আমি একেবারে বেয়াকুবই হয়ে গেলাম (আমি ইয়াবার নাম শুনিনাই বলে)। এবার পাল্টা প্রশ্ন করলো সে আমাকে যে- ভায়াগ্রাও খাও না? এবারো বললাম- না।

(তবে এবার একটু আঁচ করতে পারলাম যে, ইয়াবা ভায়াগ্রার মতোই কিছু একটা হবে হয়তো। তাঁকে বলেছিলাম যে, ভায়াগ্রা কি জিনিষ তা বোঝার জন্য ভায়াগ্রা সেবনের তো কোনো প্রয়োজন নাই। ভায়াগ্রা সম্পর্কে অনেকেরই এখন জানা যে, এটি পুরুষদের জন্য যৌন উত্তেজক একটি ট্যাবলেট মাত্র। ফাইজার এই ড্রাগটি প্রস্তুত ও বাজারজাত করে থাকে, ডাক্তারের পরামর্শ ও প্রেসক্রিপশন ব্যতীত এই ড্রাগটি কেনা বা বেচা আমেরিকাতে করা যায় না, তবে ভায়াগ্রা ড্রাগটির চাহিদা রয়েছে কেবল আমেরিকাতেই নয়, প্রায় সব দেশেই।  কারণ এই ড্রাগের বাৎসরিক বিক্রির রেভিনিউই তা বলে দেয়। ২০০৮ সালের পর থেকে ফাইজার প্রতি বছর কেবল এই ভায়াগ্রা বিক্রি করেই আয় করে থাকে প্রায় ২ বিলিয়ন ডলার। যাইহোক, এসব বলার পর তাঁকে জিজ্ঞেস করলাম, এবার বল- ইয়াবা জিনিষটা কি? উত্তর তো সে দিলই না আমাকে বরং কালবিলম্ব না করে সে বলে ফেলল যে, আমেরিকাতে এতদিন হলো থাক তুমি- অথচ ইয়াবা খাও না, ভায়াগ্রাও খাও না, তাহলে আমেরিকাতে থেকে তুমি করোটা কি? খাও কি সেখানে?…ইত্যাদি? যাক, কথা আর বাড়ালাম না এ নিয়ে)।

 

বুঝতে পারলাম যে, এ প্রশ্নগুলো তাঁর পাগলামি ছাড়া আর কিছুই নয়। কথাগুলো শুনে না হেসে আর পারলামও না। বলা বাহুল্য যে, সে আমার খুব ভাল একজন বন্ধুই কেবল নয়, বাংলাদেশের একজন শিক্ষিত সচেতন নাগরিকও বটে। তাঁর কাছেই জানতে পাড়লাম সেদিন- ঢাকাসহ বাংলাদেশে ইয়াবার উপদ্রবের কথা। দুঃখ প্রকাশ করে সে জানালো যে, উঠতি বয়সের ছেলেমেয়েরাই যে শুধু বিপথে যাচ্ছে এই ড্রাগের প্রতি আসক্ত হয়ে তা নয়, নানান বয়সী লোকের হাতেও খুব সহজেই ইয়াবা পৌঁছে যায়। প্রথমে শখের বসতো নেয় তা, পড়ে আর শখ থাকে না, হয়ে যায় নেশা, চরম নেশা। ঢাকার কিছু মডেলদের কাছে এ ড্রাগ যেমন নেশা, তেমনি কলেজ ও ইউনিভার্সিটির অনেক ছেলেমেয়েদের কাছেও ইয়াবা এখন দুধভাত মাত্র। অন্য নানান নেশাখোরদের হাতে ইয়াবা তো আছেই। ভয়াবহ অবস্থা। শুনে খুব খারাপ লাগলো।

 

যাইহোক, আমার কাছে অপরিচিত থাকলেও ইয়াবা এখন অনেকের কাছেই একটি পরিচিত সর্বনাশী নাম। নেশাজাতিয় এই ড্রাগটিকে একেক দেশের মানুষ একেক নামে ডাকে। ভারতে ইয়াবার আরেক নাম হল “ভুল-ভুলিয়া”, থাইল্যান্ডে “চোকালি”, ফিলিপাইন ও ইন্দোনেশিয়াতে “সাবু”। আবার কেউ কেউ বলে থাকে “পাগলা ঔষধ” বা ক্রেজি ড্রাগ। এর অন্য নামও আছে- হিটলার ড্রাগ বা নাজি স্পিড। যে নামেই ডাকা হউক না কেন, মূল উপাদান বা উপকরণ এই ড্রাগের একই। অর্থাৎ মেথঅ্যামফিট্যামিন ও ক্যাফেইনের মিশ্রনই হচ্ছে ইয়াবা। ড্রাগটি ট্যাবলেট আকারে থাকলেও তা গুঁড়া করে অ্যালুমিনিয়াম ফয়েলের উপরে রেখে পুড়িয়ে ধোঁয়ার মাধ্যমে (ভেপার) সেবনকারীরা তা সেবন করে থাকে। এভাবে নিলে এর নেশাজাতিয় ইফেক্ট থাকে প্রায় ১-৩ ঘণ্টা। সেবনকারীরা মাত্রা না জেনে একনাগাড়ে বার বার তা নিয়ে থাকে। মাত্রাতিরিক্ত নেওয়ার ফলে নেশাকারীদের সাধারণত ঘুমের ব্যাঘাত তো ঘটেই, খাওয়ার প্রতিও চরম অনীহা গড়ে উঠে। এমনও জানা যায় যে, কেউ কেউ ২৪ ঘণ্টা বা তাঁর অধিক সময়ও ঘুমাতে পারেন না। ফলে তারা অতিরিক্ত খিটখিটে মেজাজের হয়, সহজেই রেগে যায়, অসস্থিবোধ করে, বড় ধরণের কোনো দুর্ঘটনা ঘটাতেও এদের অনেকে দ্বিধা করেন না। প্রসঙ্গক্রমে এসে যায় যে, ঢাকা শহরে কিছুদিন আগে জোড়া খুন হয়েছিল।  মিডিয়াতে সে হত্যার ঘটনাটি আলোড়িত হয়েছিল ব্যাপকভাবে। কারণ ঘটনাটি ছিল সামাজিক অবক্ষয়ের এক চরম রূপ। যা জেনে সারাদেশের মানুষ প্রায় স্তম্ভিত হয়ে গিয়েছিল। সে ঘটনার মাধ্যমে মানুষ জেনেছিল যে সামাজিক অবক্ষয় শুধু ঘরের বাইরে নয়, তা ঘরের দুয়ারে এসেও হানা দিতে শুরু করেছে। তা ছিল “ঐশী” নামে অল্পবয়স্ক একজন মেয়ে তাঁর পিতামাতা দুজনকেই একসঙ্গে হত্যা করে ফেলেছিল। পরে জানা গিয়েছিল যে, মেয়েটি ইয়াবাসেবী ছিল।

 

কেন ইয়াবাকে পাগলা ড্রাগ বলা হয়ে থাকে? সংক্ষেপে, সায়েন্টিফিক দিক থেকে বিবেচনা করলে দেখা যায় যে, ইয়াবার মেথঅ্যামফিট্যামিন উপাদানটি শরীরের ব্রেইনের মধ্যের নিউরোট্রান্সমিটার ডোপামিনকে নিঃসৃত করে। ব্রেনে ডোপামিনের অনেক ফাঙ্কশন রয়েছে। তাঁদের মধ্যে একটি ফাঙ্কশন হচ্ছে- আনন্দের উদ্রেক সৃষ্টি করা। ফলে মেথঅ্যামফিট্যামিনকে ক্যাফেইনের সঙ্গে মিশিয়ে মাদক হিসাবে ব্যবহার করা হয়ে থাকে। ক্যাফেইন মেথঅ্যামফিট্যামিনের মতোই সেন্ট্রাল নার্ভাস সিস্টেমে স্টিমুলেনট হিসাবে কাজ করে এবং দীর্ঘক্ষণ জেগে থাকতে ভূমিকা রাখে। এই দুয়ের সমন্বয়েই হয় নেশা বা মাদক বা যাকে অনেকেই বলে থাকেন “পাগলা ড্রাগ” বা ইয়াবা।

 

আরো জানা জেনে রাখা ভাল যে, ইয়াবার মধ্যের যে মেথঅ্যামফিট্যামিন উপাদানটি থাকে তাঁর কিছু মারাত্মক সাইড ইফেক্টও রয়েছে। অত্যধিক মাত্রায় যারা ইয়াবায় আসক্ত হয়ে পড়েন, তাঁরা মেথঅ্যামফিট্যামিনের ইফেক্টের কারণে উচ্চ রক্তচাপ, হার্টের সমস্যা, স্ট্রোকের ঝুঁকি এড়াতে পারেন না। ওভারডোজের কারণে শরীরের তাপমাত্রা মারাত্মকভাবে বেড়ে যায় (হাইপারথারমিয়া), পরিণতিতে মারাও যান তাঁরা। তাছাড়া একত্রে ইয়াবা সেবনকারী ছেলেমেয়েদের হিতাহিত জ্ঞান যেহেতু কিছুটা লোপ থাকে, ফলে অসতর্ক ফিজিক্যাল রিলেশনে এইচআইভির সমুহ সম্ভাবনা থেকে যায়।

 

কোথা থেকে আসে এই ইয়াবা? একসময় হিরোইন ড্রাগ ব্যবসার ক্ষেত্রে “গোল্ডেন ট্রাই-এঙ্গেল” নামে যে তিনটি দেশের নাম পরিচিত ছিল তা হচ্ছে মিয়ানমার, থাইল্যান্ড ও লাওস। এখনো সে ক্যু-নাম রয়েছে তাঁদের। ইয়াবার ক্ষেত্রেও হয়েছে তাই। ড্রাগটি সবচেয়ে বেশি পরিমাণে উৎপন্ন হয়ে থাকে মিয়ানমারে। দীর্ঘসময় সামরিক জান্তার শাসনের কারণে ড্রাগের ব্যবসা বরাবরই সেখানে জমজমাট ছিল। খুব সহজেই তা চলে আসে থাইল্যান্ডে।তবে থাইল্যান্ডের কিছু অঞ্চলেও ইয়াবা উৎপন্ন হয়ে থাকে। ব্যাংকক হচ্ছে রাতের শহর। ইয়াবার চাহিদা তাই এখানে বেশি। ইয়াবার কারণে এই শহরে স্ট্রীট সেক্স ইন্ডাস্ট্রি গড়ে উঠেছে বলে অপবাদ আছে। এসব দেশের এই খারাপ সংস্কৃতিগুলো ইয়াবার আকারে ধাবিত হচ্ছে বাংলাদেশেও। এর বিরুদ্ধে প্রতিকার আশু প্রয়োজন। সরকারী প্রশাসনের কঠোরতা ও নিজের ঘরকে নিজে সামলানোর জন্য জোর সামাজিক সচেতনতা ব্যতীত তা রুখে দেওয়া সম্ভব কি?