ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

 

1444827751
একটা সমাজ নারী-পুরুষের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় এগিয়ে যায়। নারী ও পুরুষ একে অপরের পরিপূরক ইত্যাদি কথাগুলো সেই ছোটবেলা থেকেই কানে বাজছে। নারীর অধিকার নিশ্চিত করতে হবে, নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে, নিরাপদ কর্মক্ষেত্র নিশ্চিত করতে হবে ইত্যাদি নারীর পক্ষে বিভিন্ন স্লোগান। নারীর প্রতি পাশবিক নির্যাতন, অপহরণ, হত্যা, ধর্ষণ ইত্যাদি বন্ধে সম্মিলিত অান্দোলন হয়েছে, পত্র-পত্রিকায় লেখালেখি হয়েছে। এদেশে অাইন অাছে, অাইন মোতাবেক অপরাধীদের শাস্তি দাবি করা হয়েছে, নারীদের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে এদেশের প্রতিটি মানুষ। কিন্তু, অাইনের প্রয়োগ যা হচ্ছে তা সন্তোষজনক নয়। কাজেই, নারীদের নির্যাতিত ও ধর্ষিত হওয়ার মাত্রা ক্রমাগত বাড়ছেই!

নারী নির্যাতন প্রতিরোধে এদেশের নামকরা কলামিস্টরা লিখে যাচ্ছেন। অামরা পড়ছি, পড়েই বুঝি দায়িত্ব শেষ! অাজকাল, নিজ পরিবারেই নারীদের নির্যাতিত হতে দেখা যায়! বাহিরে নারী নির্যাতনের ঘটনা তো প্রতিদিনকার খবর! কি স্কুল, কি মাদ্রাসা, কি কলেজ, কি বিশ্ববিদ্যালয়, কি কর্মক্ষেত্র, কি যানবাহনে, কি রাস্তা-ঘাটে কোনো জায়গায়-ই নারীরা নিরাপদ নয়! তাহলে কি নারীকে পড়াশোনা অার চাকুরী বাদ দিয়ে চার দেয়ালে থাকতে হবে? তা অসম্ভব, কারণ অাজকের দিনে অামরা সবাই জানি যে- “নারীরা পুরুষের অর্ধাঙ্গী”। অর্থাৎ পুরুষের সাফল্য মানেই নারীর সহযোগী অবস্থান!

নারী জাগরণের অগ্রদূত নবাব ফয়জুন্নেসা চৌধুরাণী, বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত প্রমুখরা নারীদেরকে অনেকটাই জাগিয়েছেন, সমাজের প্রয়োজনে নারীকে পুরুষের পাশে দাঁড় করিয়েছেন। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, রাজা রামমোহন রায় প্রমুখরা নারীদেরকে নির্যাতন ও হত্যামূলক ধর্মীয় কুসংস্কার থেকে মুক্ত করেছেন। নারীরা যে সমাজে ভালো অবস্থানে ছিলো না বা নেই, তা প্রতিটি সমাজেই দেখা যায়।

অামাদের সমাজে কেমন অাছে নারীরা? অন্তত অামার পরিবারের নারীরা কি অবস্থায় অাছে? অামার বাড়ির নারীরা, পাশের বাড়ির, সমাজের, দেশের নারীরা সবাই কি ভালো অাছে? পড়তে গিয়ে, চলতে গিয়ে, বলতে গিয়ে, চাকুরীতে গিয়ে নারীরা কি নিরাপদে অাছে? এইসব বিষয় জানার দায়িত্ব প্রত্যেকের; কি শিক্ষিত, কি অশিক্ষিত, কি মালিক, কি শ্রমিক, কি চালক, কি বালক, কি বৃদ্ধ, কি মৌলভী, কি পুরোহিত সবার জানা উচিত। অামার বোন যদি অাপনার কোম্পানীর চাকুরীতে গিয়ে ধর্ষিত হয়, অার অামি যেখানে পড়াই সেখানে যদি অাপনার বোনটি ধর্ষিত হয়! কথাটা শুনতে খারাপ লাগলেও বাস্তবে কিন্তু তা-ই হচ্ছে! যে মেয়েটা টিউশন করে বাসায় ফেরার পথে ধর্ষণের শিকার হচ্ছে, অার যে মেয়েটা গার্মেন্টসে যাওয়ার পথে ধর্ষিত হচ্ছে, তাতে কি তফাৎ অাছে কোনো? দুজনেই সমাজের চোখে সমান ঘৃণার পাত্র হয়ে যায়।

অাজকাল নির্যাতিত হওয়ার দায় নারীর ঘাড়েই চাপানো হয়। যদি প্রেমিক ছেলের দ্বারা নারী ধর্ষণের শিকার হয়, বলা হয়- “সব দোষ নারীর! সে যদি ছেলের কাছে না যেত, সে কি ধর্ষিত হতো!” অামি অাপনি পুরুষ, পুরুষ বলেই কি অামরা ‘পাপে নিষ্পাপ’ থাকি। যাকে অাপনি প্রেম নামক একটা বিশ্বাস দেখিয়েছিলেন, অাপনাকে বিশ্বাস করা কি নারীর পাপ ছিল? যদি সে নারী পাপীই ছিল, তবে কেন অাপনি তাকে ধর্ষণ করলেন? অাপনি তো নিষ্পাপ! অাপনার চোখে কি ধর্ষণ পাপ নয়? যদি না হবে, তাহলে অাপনার পরিবারের নারীদের ধর্ষণের খবরে অাপনি বিচলিত হবেন না। যদি চলার পথে অাপনি কোনো নারীকে ইভটিজিং করেন, মনে রাখুন – অাপনার নারীরাও ইভটিজিংয়ের শিকার হবে। কথাগুলো মনে হতে পারে ‘সিনেমার সস্তা ডায়লগ’; মনে হওয়া স্বাভাবিক, অামরা সবাই যা দেখি, শুনি, বলি সব সিনেমাই মনে হয়। যখন নির্যাতিত নারী অামাদের অাপনজন হয় তখন অামরা বাস্তবতায় ফিরে অাসি।

নারী নির্যাতন বর্তমানে একটা ট্রেন্ড হয়ে গিয়েছে, একজন শুরু করেছে তো অন্যরা চর্চা করে চলছে। সুযোগ পেলেই ‘নিষ্পাপ’ পুরুষেরা নারীদের হেনস্থা করে। একসময় মনে হতো, শিক্ষিতরা অার যা-ই করুক অন্তত নারী নির্যাতনের মতো পাপটা করে না। কিন্তু এখন, শিক্ষিত এমনকি শিক্ষকের বিরুদ্ধেও নারী নির্যাতনের অভিযোগ অহরহ দেখা যাচ্ছে। অার যারা অশিক্ষিত, তারা তো জাস্ট ফলোয়ার। কারণ, যে দেশে নারী নির্যাতনের বিচার দীর্ঘসূত্রিতা অার ঢিলেমিতে পূর্ণ, কখনও কখনও তো বিচারই হয় না; সে দেশে কি শিক্ষিত কি অশিক্ষিত সবাই সমান, মন ভরে অন্যায় করতে বাঁধা কোথায়?

পত্রিকায় কলাম লিখা যাবে, অাইনের প্রয়োগ নিয়ে গলাবাজী করা হবে, নারীদের পক্ষে অান্দোলন করে দেশব্যাপী উত্তাপ ছড়ানো যাবে। এর সবই বৃথা হবে, যদি না নিজ নিজ হৃদয়ে নির্যাতনের বিরুদ্ধে উত্তাপ ছড়ানো যায়। চলুন শপথ নেই- “নারী নির্যাতন করব না, নারীদের নির্যাতিত হতে দিবো না।”