ক্যাটেগরিঃ জনজীবন

 

আমাদের প্রতিদিনই একটি মৃত্যুর দিন। পেট্রোল বোমায় মরি, লঞ্চ ডুবে মরি, ‘বন্দুকযুদ্ধে’ মরি, সড়ক দুর্ঘটনায় মরি, ‘ক্রসফায়ার’এ মরি, চাপাতির কোপে মরি, কারখানা ধ্বসে মরি, কারখানায় পুড়ে মরি, দলাদলিতে মরি, ভাগাভাগিতে মরি, হানাহানিতে মরি। স্বৈরতন্ত্রের নিপাতে মরি, গণতন্ত্র বাঁচাতে মরি আবার গণতন্ত্রের জন্যও মরি। কার জন্য মরছি, কেন মরছি? নূর হোসেন, হুমায়ুন আজাদ, ফেলানি, সাগর-রুনী, তারেক মাসুদ, মিশুক মুনির, রাজীব, অভিজিৎ…কেন মরছে? মরে কী পেয়েছে, কী দিয়েছে, কাকে দিয়েছে, কেন দিয়েছে?

পোড়া দগদগে লাল ঘায়ে মাছি ভনভন করে। পচা ফোলা লাশ ভাসে নদীর কিনারে শেওলার তলে। গুলিবিদ্ধ ঘাড়ভাঙা মরদেহ পড়ে থাকে ভাগাড়ে। ছাদের রড বুকের পাজঁর ফুটো করে ওপাশ দিয়ে বেরিয়ে থাকে। পোড়া পলিথিনের মতো কুণ্ডলী পাকিয়ে যায় সাধের মানব দেহ। পিচঢালা পথে, ফুটপাতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকে মগজ। মগজ নাকি স্বপ্ন, স্বপ্ন নাকি দুঃস্বপ্ন, দুঃস্বপ্ন নাকি অবজ্ঞা!

কতো লাশের স্তুপের উপড় দাড়ায় একটি সভ্যতা? কতশত গ্যালন রক্তে শুদ্ধ হয় একটি জাতির কলঙ্ক? এসবের হিসেব আমার জানা নেই। জানার স্পৃহাও নেই। যে পতাকার দিকে তাকিয়ে একদিন সালাম জানাতাম, দেখি সেই পতাকার খুঁটিতে ঝুলে পতপত করে উড়ছে আমাদেরই নিথর দেহ। যে জাতিয় সঙ্গীতের সুরে দেশপ্রেমে কানায় কানায় ভরে উঠতো শতকোটি হৃদয়, সে সঙ্গীত জুড়ে আজ কেবলই আছে পোড়া মানুষের আত্মচিৎকার। এমন পতাকা আর সঙ্গীত কি আমরা চেয়েছিলাম?

আমরা মরি, তবুও জানি না কেন মরি। যে মরে যে জানে না সে কেন মরে আর যে বেঁচে আছে সেও জানে না যে সে এখন কেন মরেনি। কী অদ্ভূত সমীকরণ! পোড়া দেহ, কবন্ধ, চাকায় পিষ্ট মাংশপিণ্ড, গলিত মরদেহ, ছিন্নভিন্ন মস্তক, ছোপ ছোপ রক্তের দাগ, ধ্বংসস্তুপ থেকে বের হয়ে থাকা পা, জমাট রক্তের গন্ধ আমার মুখে কাপড় দিতে পারে কিন্তু মনঃপীড়া দিতে পারে না, লজ্জা দিতে পারে না, মানবতার মুখে অবজ্ঞার থু থু দিতে পারে না।

আমরা- রিকসাওয়ালা, বাস-ট্রাকের চালক, পুলিশ, কোলের শিশু, স্কুলগামী নাবালক, কুলি-দিনমজুর, কর্মী, যাত্রী সবাই মরি, এরাও মরে না, ওরাও মরে না। তবুও আমরা মরি কেন?