ক্যাটেগরিঃ ভ্রমণ

অধিকাংশ মানুষের এ বাতিক আছে কিনা তা জানি না, তবে আমার আছে। এটা হলো হঠাৎ কোন কিছু নিয়ে অতিশয় ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়া আর তার কয়েকদিন পর সেই বিষয়ে দ্বিগুন অনুৎসাহ দেখানো। খুবই বিরল দু’-একটি উদাহরণ বাদ দিলে আমার সব আগ্রহের ধরণটাই এমন। মাস ছ’য়েক আগে শরীরবিদ্যা বিদ্যা নিয়ে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনায় বাসাটাকে একেবারে ব্যায়ামাগার বানিয়ে ফেললাম। তারপর, ওগুলোর দর্শকদের পাশাপাশি ওরা নিজেরাই এখন আমার ক্রমন্বয়ে অগ্রসরমাণ মেদভুঁড়িটার দিকে প্রায়শঃই কটাক্ষপাত করে। সে যাই হোক, এবারের উৎসাহটা একটু ভিন্ন ধরণের-রত্নপাথরবিদ্যা। এ বিষয়ে আমার বরাবরের অনীহা একটা বিশেষ কারণে। সেটা হলো আসল-নকলের জটিলতা। সেবার যখন সহকর্মীদের সাথে শ্রীলংকায় গিয়েছিলাম, রত্নপাথরের দোকানে সবাই যখন পাথরতত্ত্ব নিয়ে মশগুল তখন দোকানের বাইরে বসে আমি সিগারেটের ধোঁয়ার কুন্ডলীতে নিজের বিচক্ষণতা ও বুদ্ধিমত্তার প্রতিচ্ছবিও দেখেছিলাম। এরপর থেকে অনেকদিন ধরে রত্নপাথর ও এর ক্রেতা দুজনই আমার ভাবনার পরিতুষ্টিতে কুন্ডলীর প্রতিচ্ছবির বিপরীতধর্মী কোন এক গোত্রের।

ব্রাজিলের গোইয়াছ প্রদেশের ক্রিস্টালিনা রত্নপাথর বিকিকিনির অন্যতম একটি শহর। নামেই এর পরিচয়- ক্রিস্টাল থেকে ক্রিস্টালিনা। ব্রাসিলিয়ার খুব নিকটের (১২০ কিমি) এ শহরটাতে নিছক ভ্রমণের উদ্দেশ্যে যাবো স্থির করা হলো। ক্রিস্টালিনায় যাবো আর দু’-চারটি রত্নপাথরের নাম জানা থাকবে না এটা হতে পারে না। এ জন্যেই ইন্টারনেটে ক্রিস্টালিনায় অধিক পরিমাণে বিক্রিত কয়েকটি রত্নপাথরের নাম ও তাদের সঠিকতা নিরূপণের উপায় জানার চেষ্টা শুরু করলাম। একটু মনে করা করা চেষ্টা করলাম বাংলায় কয়টি পাথরের নাম আমার জানা আছে। হীরা, চুনি, পান্না, মণি, মুক্তা, নীলা- ব্যাস্, আমার দৌড় শেষ। মণি আসলে সকল রত্নপাথরের সাধারণ নাম। হীরাটা হলো ডায়মন্ড এবং মুক্তা পার্ল (pearl); কিন্তু চুনি আর পান্না কি? অভিধান খোঁজা যাক। চুনির ইংরেজি নাম রুবি (ruby), পান্না হলো এমারাল্ড (emerald), আর নীলা/নীলকানত্মমণি/নীলমণি স্যাফায়ার (sapphire) নামের এক ধরণের নীল রত্নপাথর। সহজেই অনুমেয় যে, গাঢ়নীল রঙের কারণে এ পাথরটিকে বাংলায় এমনই নাম দেয়া হয়েছে। অন্যদের নামকরণের বিষয়টি একটু ভেবে দেখলাম কোন শানে-নজুল বের করা যায় কিনা না। কোন লাভ হয়নি- বুঝলাম এটা আমার কর্ম্ম নয়। সুতরাং, এ পর্বের ইতি ঘটলো।

ক্রিস্টালিনায় গিয়ে জানলাম যে এখানে এসকল রত্নপাথরের আধিক্য রয়েছে- স্যাফায়ার (sapphire), রুবি (ruby), টোপাজ (topaz), ওপাল (opal), নিম্নমানের ডায়মন্ড, এমারাল্ড (emerald), গারনেট (garnet), জিরকন (zircon), এমবার (amber), টুরম্যালিন (tourmaline), টারকোয়েজ (turquoise), এমেথিস্ট (amethyst) ইত্যাদি অন্যতম। এবার একটু বিশদভাবে বলি- গ্রিক sappheiros থেকে আগত sapphire শব্দের অর্থ ‘নীল পাথর’। তবে বাস্তবতা হলো স্যাফায়ারকে বাংলায় ‘নীলা’ বললেও এটি নীল রঙের ছাড়াও কালো, সোনালী, সবুজ, ধূসর, কমলা, ফ্যাকাশে লাল, বেগুনী, সাদা, হলদে প্রভৃতি রঙেরও হয়ে থাকে। রুবি (বাংলায় চুনি) নামের সাথে এ রত্নপাথরের রঙের মিল রয়েছে। ল্যাটিন ruber হতে ruby নামের উৎপত্তি; যার অর্থ ‘লাল’। এটি ফ্যাকাশে লাল হতে রক্তলাল বর্ণের হয়। যত লাল তত দামী। টোপাজকে বাংলায় বলে ‘পোখরাজ/ পুষ্পরাগমণি’। রঙের বিভিন্নতায় এটি স্যাফারের চেয়ে কোন অংশে কম নয়। এটি নীল, সবুজ, ফ্যাকাশে লাল, রূপালী, আকাশী, সাদা, হলুদ প্রভৃতি বর্ণের হলেও নীল এবং হলুদ বর্ণের পোখরাজ বেশী সহজলভ্য। অস্ট্রেলিয়ার জাতীয় রত্নপাথর ওপালকে বাংলায় বলে ‘উপল’। এটি সাধারণত বর্ণহীন, সাদা, বাদামী, সবুজ, কমলা, লাল ও কালো রঙের হয়। এর মধ্যে লাল ও কালো উপল অত্যনত্ম দুষ্প্রাপ্য ও দামী। অন্যান্য রঙের উপল দামী হলেও সহজলভ্য। আমরা সচরাচর সাদারঙের ডায়ামন্ড দেখে অভ্যসত্ম কিন্তু এটি কালো রঙেরও হতে পারে। পান্না বা এমারাল্ড হলো গাঢ় সবুজ রঙের রত্নপাথর। ফরাসি উদ্ভূত এ শব্দের অর্থ হলো ‘সবুজ রত্ন’। এটি যত সবুজ ও স্বচ্ছ হবে তত এর দাম বাড়বে। গারনেট ও জিরকনের বাংলা নামদুটি বেশ মজার- ‘তামড়ি’ ও ‘গোমেদ-মণি’। প্রায় সব রঙের গারনেট পাওয়া গেলেও নীল গারনেট সবচে’ দুষ্প্রাপ্য। বর্ণহীন জিরকন অনেক সময় হীরার বিকল্প হিসেবে ব্যবহৃত হয়। একে বলে Matura diamond। লাল জিরকনকে বলা হয় hyacinth যা বাংলায় অর্থ করলে দাঁড়ায় ‘কচুরিপানা’।

এমবার, টুরম্যালিন, টারকোয়েজ, এমেথিস্ট- এ সকল রত্নপাথরের বাংলা প্রতিশব্দ পাওয়া দুষ্কর। গাছ হতে নিঃসরিত হাইড্রোকার্বনের জীবাশ্ম (fossilized tree resin) হলো এমবার। হলুদ বর্ণের এমবার সহজলভ্য এবং নীল রঙা অতি দুষ্প্রাপ্য। সিংহলি turmali হতে টুরম্যালিন শব্দের আবির্ভাব। সচরাচর কালো রঙের টুরম্যালিন পাওয়া গেলেও এটি বাদামী, বেগুনী, হলদে, কমলা, নীল, লাল, সবুজ, ফ্যাকাশে লাল, বর্ণহীন, দ্বি-রঙা বা ত্রি-রঙাও হতে পারে। গাঢ় নীল থেকে সবুজ রঙের অস্বচ্ছ পাথর হলো টারকোয়েজ। নামে বুৎপত্তিগত রূপ দেখে বোঝা যায় এ পাথরের আদিবাস তুর্কিতে। এমেথিস্ট মূলত বেগুনী বা রক্তবেগুনী রঙের পাথর। প্রাচীন গ্রীকদের এমনি বিশ্বাস ছিল যে, এ পাথর মানুষকে নেশাগ্রস্ত/মাতাল হওয়া রক্ষা করতে পারে। এজন্য তারা হাতে এ পাথর ধারণ করতো এবং এ পাথরের পাত্রে সূরা রেখে তা পান করতো। আমি এটা নিশ্চিতভাবে বলতে পারি যে, বিষয়টি একটি ডাহা মিথ্যা।

আর একটি রত্নপাথরের নাম না বলে শেষ করা ঠিক হবে না। এর নাম তানজানাইট (Tanzanite)। তানজানিয়ার মানইয়ারা (Manyara) অঞ্চলের মিরেরানি পাহাড় (Mererani Hills ) হতে উদ্ভূত বেগুনী-নীল রঙের এ পাথর বর্তমান বিশ্বের সবচে’ মূল্যবান পাথর। দেখা হয়নি এখনও, তবে ইচ্ছা আছে।

এতদূর এসে পাঠক যদি কোনভাবে মনে করে যে, আমি রত্ন পাথর ও এর সঠিকতা নির্ণয়ে এখন বেশ ওয়াকিবহাল, আপনি তাহলে বোকার স্বর্গে রয়েছেন। এখনও কতিপয় এসকল রত্নপাথরের মধ্যে একই রঙের এমেথিস্ট, টুরম্যালিন, গারনেট, স্যাফায়ার ও টোপাজকে আমার সামনে দিলে কোনভাবেই আমার পক্ষে তা আলাদা করা সম্ভব নয়। এদেরকে নির্ণয়ে একটি মাত্র মোক্ষম উপায় আছে- দোকানদারকে জিজ্ঞাসা করা। তবে, এসকল পাথরকে একত্রে মিলিয়ে দোকানীকে দিলে সেও পারবে কিনা তা কেবলই প্রমাণ সাপেক্ষ্য।

পরিশেষে, এতটুকু স্বীকার করতেই হবে, ক্রিস্টালিনা আমাকে রত্নপাথর সম্পর্কে যতটুকু জ্ঞান-গরিমা দিয়েছে তার থেকে বাঁশ দিয়েছে অনেক বেশী আর এ ঘটনার পুরোপরি ফায়দা লুটেছে আমার স্ত্রী-কন্যা। এখন নাকি সোনা কিনে ঐ বাশেঁর মাঁচাও বানাতে হবে।