ক্যাটেগরিঃ খেলাধূলা, ফিচার পোস্ট আর্কাইভ

01

সেদিনের পর থেকে বছর ২৩ পার হয়ে গেল। ঐ বছরও অস্ট্রেলিয়া- নিউজিল্যান্ডে ক্রিকেটের ৫ম বিশ্বকাপের আয়োজন করা হয়েছিলো। তখন সবেমাত্র ক্লাস এইটে উঠেছি। ২১শে ফেব্রুয়ারিতে শহীদ মিনারে ফুল দিয়ে ফেরার পথে আনিস নামের এক সহপাঠী পরেরদিন আমাকে ওর বাসায় যেতে বললো। ও নাকি আমাকে ক্রিকেট খেলা দেখাবে। নিউজিল্যান্ড ও অস্ট্রেলিয়ার খেলা। যাওয়া হয়নি কারণ ক্রিকেট নামের এই সভ্য খেলাটির সঙ্গে তখনও ভালোভাবে পরিচয় ঘটেনি আমাদের মতো অজপাড়াগাঁয়ের মানুষদের। খেলা বলতে কেবল ফুটবল, ডাংগুলি, গোল্লাছুট এসবই বুঝতাম। পরের দিন সে আমার বাসায় এসে হাজির। আজ নাকি তাঁর দলের খেলা। আমাকে যেতেই হবে। সেদিনও এই মেলবোর্নে ছিল পাকিস্তান ও ওয়েস্ট ইন্ডিজের খেলা। এ খেলার নিয়মকানুন শেখার হাতেখড়ি আনিসের কাছেই- রান, উইকেট, এলবিডব্লুউ, ওভার, কটবিহান্ড, সেঞ্চুরি ইত্যাদি ইত্যাদি। মনে পড়ে, ৮৮ রান করার পর ওয়াসিম আকরামের এক ইয়র্কারে পায়ের আঙুলে আঘাত পেয়ে সাজঘরে ফিরে গেলেন ব্রায়ান লারা; পাকিস্তান ১০ উইকেটে হেরেছিল ওয়েস্ট ইন্ডিজের কাছে। বন্ধুর হতাশা দেখে পাকিস্তানের জন্য আমারও খুব মায়া লেগেছিল। হেরে যাওয়া মানুষকে সহানুভূতি দেখানোর মধ্যে কেমন যেন একটা বড়মানুষি ভাব আছে। সেটা ঐদিন না বুঝলেও আজ বুঝি।

সেবার পাকিস্তান বিশ্বকাপ জিতেছিল। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ফাইনালে ইমরান খানের অপরাজিত ৭২ রান আর ওয়াসিম আকরামের ৩ উইকেট- দু’জনই আমার স্বপ্নে মানুষ বনে গেলেন। তারপর থেকে বনবাদাড়ে টেনিস বল আর হাতে বানানো কাঠের ব্যাট নিয়ে দৌড়ানো শুরু – ক্রিকেটার হবার স্বপ্ন। স্থানীয় দলের হয়ে টেপ টেনিস খেলা থেকে থানা পর্যায়ে, স্থানীয় লিগে, থার্ড ডিভিশনে কাঠের বলে খেলার সুযোগ পেতে আমাকে খুব বেশী দেরী করতে হয়নি। সবচে উপভোগ্য ছিল হায়ারে (ভাড়ায়) বিভিন্ন দলের হয়ে খেলার জন্য ব্যাট হাতে ভ্যানে বা বাসে করে দূর-দূরান্তে যাওয়া, দুপুরে ভূরিভোজন, জিতে গেলে পারিশ্রমিক হিসেবে ১০০-১৫০ টাকার সাথে গ্রাম-গঞ্জের মানুষের সহজ-সরল উল্লাস, হেরে গেলে টাকা না পাওয়া আর মাঝে মধ্যে সমর্থকদের ধাওয়া খাওয়া– সবমিলিয়ে অনভূতিটাই ছিল অন্যরকম।

এপ্রিল, ১৯৯৭। মালয়েশিয়াতে বাংলাদেশ তখন আইসিসি ট্রফিতে বিশ্বকাপের বাছাই পর্বে খেলছে। হংকং, নেদারল্যান্ডস ও স্কটল্যান্ডের সাথে জয়ের পর ফাইনালে বাংলাদেশের প্রতিপক্ষ কেনিয়া। ওদের স্টিভ টিকোলের ১৪৭ রানের ইনিংসের ফলে দলীয় সংগ্রহ দাঁড়ায় ২৪১। বৃষ্টির ফলে ডাকওর্থ-লুইস পদ্ধতিতে বাংলাদেশের টার্গেট দেয়া হয়েছিল ২৫ ওভাবে ১৬৬। সেদিন বল হাতে ৩ উইকেট নেয়া রফিক ব্যাট হাতেও ঝলসে্ উঠেছিলেন- ১৫ বলে ২৬ রান। পরবর্তীতে অন্যান্যদের সাথে বুলবুলের ৩৭ আর পাইলটের ৭ বলে ১৫ রানের সুবাদে ৮ উইকেটে বাংলাদেশ পৌঁছে যায় বিশ্বজয়ের স্বপ্নে আঙ্গিনায়। পথে পথে রঙমাখা সেই উল্লাস আর ‘ইত্যাদি’তে প্রচারিত এই গান- “যুদ্ধ করেছি জয়, আমরা যুদ্ধ করেছি জয়, জেগেছে বাংলাদেশ, নেই আর কোন ভয়”- এখনও কান পাতলে শুনতে পাই। বিশ্ব ক্রিকেট অঙ্গনে বাংলাদেশের টাইগারদের সদর্প পথাচলা শুরু হলো। ১৯৯৯ সালের বিশ্বকাপে ১ম বড় জয় আসে নর্দাম্পটনে আমার সেই পাকিস্তানের বিরুদ্ধে, সেই ওয়াসিম আকরামের বিরুদ্ধে। আকরাম খানের ৪২ রানের ইনিংস সত্ত্বেও তিন তিনটা রান আউট করে সেদিনও জয়ের নায়ক বনেছিলেন খালেদ মাসুদ পাইলট। আমার খুব পছন্দের একজন খেলোয়ার এই পাইলট- হয়তো খুব বড় মানের ক্রিকেটার তিনি নন তবে, যখন তাকে দলের প্রয়োজন হতো তখনই সে দায়িত্বটা কাঁধে তুলে নিতেন।
ঐ সময়ে যে দু’একজন বড় মানের খেলোয়াড়ের বিপক্ষে খেলার সৌভাগ্য হয়েছিল তারা হলেন নড়াইল এক্সপ্রেস মাশরাফি, হাসানুজ্জামান ঝড়ু এবং হান্নান সরকার (পরের দু’জন খুব সামান্য সময়ের জন্য জাতীয় দলে ঢুকেছিল)। মাশরাফির তখন কী দুর্দান্ত বলের গতি! এর পরপরই আমার ক্রিকেট জীবনের ক্রান্তিলগ্ন আসে- দু’হাঁটুর লিগামেন্টই বেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। স্থানীয় পর্যায়ের চিকিৎসায় পায়ে চিরতরে কোন ক্রুটি না ঘটলেও ক্রিকেট অঙ্গন থেকে আমাকে মুখ ফিরিয়ে নিতে হয়- ক্রিকেটার হবার স্বপ্নও উবে যায়। এরপরে খুব প্রফেশনালি আর খেলা হয়নি, কোনভাবে এটা চালিয়ে যাবার চেষ্টা করেও সফল হইনি বলে নিজের অজান্তেই স্বপ্নের সবটুকু দায়িত্বই তুলে দিয়েছিলাম।

নিয়মিতভাবে জিম্বাবুয়ে, কেনিয়া আর স্কটল্যান্ডকে হারানোর পাশাপাশি ২০০৪ সালে ব্যাট হাতে ৩১ রান আর বল হাতে ২ উইকেট নিয়ে ঘরের মাঠে ভারতকে ১৫ রানে হারিয়ে বিশ্বকে আবারো বাঘের গর্জন শোনান মাশরাফি। ঐ সময় একটি পত্রিকায় শিরোনামও এমন ছিল- “Tigers from underdogs” । এরপরে আরো দু’বার ভারতকে পরাজয়ের স্বাদ উপহার দিয়েছে বাংলাদেশ- ২০০৭ বিশ্বকাপে গ্রুপ পর্বে পোর্ট অব স্পেনে আমাদের হাত থেকেই ওরা বিমানের টিকিট নিয়েছে আর শেষবার ধরা খেয়েছে ২০১২ এশিয়া কাপে। উভয় ম্যাচেই ভারত ৫ উইকেটে টাইগারদের সামনে ভূ-লুণ্ঠিত হয়েছে। বিশ্বকাপ থেকে ভারতের বিদায়কালে সংবাদ শিরোনাম ছিল- “Tigers 1, Lambs 0”। তখন রাহুল দ্রাবিড়ও বলতে বাধ্য হয়েছিল- ‘Our backs are up against the wall’। আর সেই দ্রাবিড় গতকাল মেলবোর্নে ধারাভাষ্যে বলে “I could hardly remember that accident “।

ক্রিকেটের মোড়ল বলে যারা নিজেদেরকে দাবী করেন, তাদের মধ্যে এমন কেউ নেই যে বাংলাদেশের কাছে পরাজয়ের স্বাদ পায়নি। ন্যাটওয়েস্ট সিরিজে কার্ডিফে অস্ট্রেলিয়া (২০০৫) আর প্রভিডেনসে সুপার এইটের খেলায় দক্ষিণ আফ্রিকা (বিশ্বকাপ ২০০৭) আমাদের কাছে পরাজিত হয়। ২০১০ ও ২০১১ সালে পরপর দু’বার ইংল্যান্ড পরাজিত হয়- যথাক্রমে ব্রিস্টলে ৫ উইকেটে ও চট্টগ্রামে ২ উইকেটে। চট্টগ্রামে খেলা পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে সে সময়ের ইংল্যান্ড দলনেতা এন্ডু স্ট্রস (বর্তমান বিশ্বকাপের ম্যাচ বিরতির আলোচক) বলেছিল “ dew made is extremely difficult for the bowlers to grip the ball on a wicket that was slow and low”। তাঁর মুখে ঝামা ঘসে দিয়ে এবার বাংলার দামাল ছেলেরা এডিলেডের মতো ফাস্ট উইকেটেও ওদেরকে দেখিয়েছে কেবল ‘slow and low’ উইকেটে নয়, যে পারে সে সবখানেরই পারে।

শ্রীলংকার বিরুদ্ধে বাংলাদেশ জয়ের ধারাবাহিকতা রয়েছে- বগুড়ায় ৮ উইকেটে (২০০৬), ঢাকায় ৫ উইকেটে (২০০৮), ২০১২ এশিয়া কাপে ৫ উইকেটে এবং সর্বশেষ শ্রিলংকাতে ৩ উইকেটে (২০১৩)। খুব উঁচু দরের সিরিজ না জিতলেও পরিসংখ্যানে বাংলাদেশের সিরিজ সাফল্য একেবারে কম নয়। তবে দেশের মাটিতে সিরিজ জয়ের সংখ্যা বেশী টাইগারদের। জিম্বাবুয়ের বিরুদ্ধে জিতেছে সর্বাধিক ৮টি সিরিজ। এর মধ্যে ৬টিই দেশের মাটিতে যার ২টি পূর্ণ বাংলাওয়াশ। ইতোমধ্যে নিউজিল্যান্ড ও কেনিয়াকে ২ বার, আয়ারল্যান্ড, ওয়েস্ট ইন্ডিজ ও স্কটল্যান্ডকে ১ বার করে হোয়াইটওয়াশ করেছে বাংলাদেশ।

টেস্ট ও টি-টোয়েন্টি ম্যাচে বাংলাদেশের সাফল্য একদিনের ক্রিকেটের মতো অতটা উজ্জ্বল নয়। ২৬ জুন ২০০০ এ বাংলাদেশ টেস্ট স্ট্যাটাস পেয়ে আইসিসির পূর্ণ সদস্যপদ লাভ করে। তবে, টেস্টে ১ম জয়ের স্বাদ পেতে আমরা পাঁচ বছর অপেক্ষা করেছি। জিম্বাবুয়ে ও ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে টেস্ট জয় ছাড়াও আমরা ভারত, নিউজিল্যান্ড ও শ্রিলংকার সাথে টেস্ট ড্র করেছি। ওয়েস্ট ইন্ডিজ বাদে তেমন কোন বড় দলগুলোর বিপক্ষে টি-টোয়েনটিতে আমাদের জয় না আসলেও এদের কারো সাথে আমরা তেমন লজ্জাজনকভাবে হারিনি।

২০১৫ সালে ক্রিকেট বিশ্বকে নতুন করে আবার কাঁপিয়েছে টাইগাররা। গ্রুপ পর্বে ইংল্যান্ড, আফগানিস্তান, স্কটল্যান্ডকে হারিয়ে রাজকীয় চালে পৌঁছে গেল শেষ আটেও । ব্যর্থ স্বপ্নগুলো সত্যি হবার নেশায় পরম্পরায় সংক্রামিত হয়। মাশরাফি, মেলবোর্ন আর আমি। ২৩ বছর আগে যে মেলবোর্নকে ঘিরে আমার ক্রিকেট জীবনের স্বপ্নরা ডানা মেলেছিল, স্বপ্নঘেরা ঐ মেলবোর্নে মাশরাফিদের, না, আমাদের ভারত বধের স্বপ্ন। আমি, মাশরাফি, আমরা- আমাদের মতো কোটি কোটি বাঙালির কতশত কোটি স্বপ্ন মাঠটিকে ঘিরেছিল গতকাল। স্বপ্ন টুটে গেছে, ভেঙে গেছে- না, ওরা আমাদের স্বপ্নকে গলাটিপে হত্যা করেছে। ইংল্যান্ডের আগুনে আর পাকিস্তানের রোষানলে নিষ্ঠুরভাবে, নির্মমভাবে, অন্যায়ভাবে পুড়েছে সে স্বপ্ন। মাশরাফির এবিডব্লিউর আবেদন নাকোচ, নো-বল ডেকে আউট রহিত করা আর ছয়কে আউটে রুপান্তর করে সারা বিশ্বকেই ওরা চমকে দিয়েছে। লজ্জা দিয়েছে নিজের দেশকে, অবজ্ঞা করেছে ক্রিকেট সভ্যতাকে, ধিক্কার জানিয়েছে ক্রিকেটের বিশ্ব প্রশাসনকে। শুধু আমরা না; ভিলিয়ার্স, লক্ষণ, শোয়েব আখতারও এসবের নিন্দাবাদ করেছে। তবুও কী শরম করে না?  না করে না, অবশ্যই করে না।

তবুও আমরা পেয়েছি, নিজেদেরকে নিজেরাই নতুন করে বিশ্বকাপ প্রত্যাশী হিসেবে আবিস্কার করেছি, বিশ্ব সেরাদের স্বীকৃতি মিলেছে, গড়ে উঠেছে প্রচণ্ড রকমের এক আত্মবিশ্বাস- আমরাও পারি, আমরাও পারবো, একদিন, খুব বেশী দূরে নয়; বাঘের থাবায় শোভা পাবে বিশ্বকাপ।