ক্যাটেগরিঃ শিল্প-সংস্কৃতি

 

পহেলা বৈশাখ উদযাপন আসলে প্রতি বছরই বিপরীতমূখী দু’টি মতভেদ প্রকট হয়ে ওঠে- প্রগতিশীল ও রক্ষণশীল মতবাদ। প্রগতিশীলরা মূলত উৎসব উদযাপনে বিশ্বাসী। তারা এ বছর রমনায় গিয়ে পান্তা-ইলিশ খাবে, আগামি বছরে বোটানিক্যাল গার্ডেনে গিয়ে যদি বিরিয়ানি পায় তাও খাবে; যাওয়া-খাওয়ার আনন্দটাই এদের কাছে মূখ্য। এরা সংস্কৃতিকে বহন করে, ধারণ করে না। রক্ষণশীল মতবাদের আবার দুটি ধারা রয়েছে- সংস্কৃতির বিবর্তনরোধী ও সংস্কৃতির বিস্তাররোধী। বিবর্তনরোধীরা মূলধারাকে ধরে রাখতে চায়। তারা পান্তার সাথে দামী ইলিশের সম্পর্ককে গর্হিত মনে করে; অশত্থমূলকে তারা বটমূলকে বলতে রাজী নয়। এরা ইট-পাথরের চারদেয়ালে সংস্কৃতিকে ধারণ করে, রাস্তায় রাস্তায় বহন করে না। বিস্তাররোধীরা ধারকও নয়, বাহকও নয়। যতোবার ওরা বাঙালি সংস্কৃতিকে ধ্বংস করবে ততোবারই কোটি কোটি বাঙালির প্রাণরসে বোমার ভষ্ম থেকে ফিনিস্ক পাখির মতো পুনর্জন্ম নেবে এ সংস্কৃতি।

আমাজনে বৃহৎ দুটি নদী একত্রে বয়ে চলে- কালো পানির ‘রিও নেগ্রো’ ও কর্দমাক্ত পানির ‘রিও সলিমোয়েস’। তীব্রতা, ঘনত্ব ও তাপমাত্রার তারতম্যের কারণে কালো নদীর পানি কখনও সলিমোয়েসের ঘোলা পানির সাথে মেশে না, তবুও দুটি স্রোত পাশাপাশি নিরন্তর বয়ে চলেছে । পহেলা বৈশাখ উদযাপনের সাথে আমাজনের এই দুটি নদীর মিলিত স্রোতের অর্ন্তমিল রয়েছে। ভিন্নধর্মী দুটি স্রোতের পাশাপাশি এ অবস্থান শুধু নদীকে অনিন্দ্য সৌন্দর্য দিয়েছে তা নয় বরং বৃদ্ধি করেছে নদীর পানি প্রবাহ ও তাদের সঙ্গমে গড়ে তুলেছে আমাজনের বৃহত্তম মৎস্য প্রজনন ক্ষেত্র। একইভাবে পহেলা বৈশাখ উদযাপনে ভিন্ন ভিন্ন মতবাদের অভিন্ন এ অবস্থান পক্ষান্তরে এই উৎসবকেই সার্বজনীন করে তুলেছে, বৃদ্ধি করেছে এর কলেবর। কালে কালে এ উৎসব উদযাপনের প্রসার আজ তারই সাক্ষ্য বহন করে।

তৎকালে বাঙালি বলতে প্রান্তিক জনগোষ্ঠিকে বোঝানো হতো। এদের মধ্যে ভুমিহীন কৃষক থেকে জোতদার গৃহস্থ পর্যন্ত সবাই অন্তর্ভূক্ত ছিল। পহেলা বৈশাখের ইতিহাস সেই সকল বাঙালিদের দায়মুক্তির ইতিহাস- প্রথমদিকে জমিদারের খাজনা, পরবর্তীতে মাড়োয়ারি-মহাজনদের সুদ-ঋণ পরিশোধ। তাই তাদের জন্য হালখাতার মিষ্টি-মণ্ডার উৎসবে দাওয়াত ছিল একরকম সমনেরই মতো। ফসল বিক্রি করে ঋণ-খাজনা পরিশোধের পরে যেটুকু অবশিষ্ট থাকতো তাকে ঘিরেই গড়ে ওঠে রেশমি চুড়ি, লাল ফিতা, নাগরদোলার বৈশাখি মেলা। কালে কালে জমিদারী ও মহাজনী প্রথার বিলুপ্তি ঘটেছে, সেইসাথে পহেলা বৈশাখের ঐতিহ্যও। জমিদার- মহাজনদের জায়গা নিয়েছে কর্পোরেট বাণিজ্য, নিচুজাতের বাঙালির ভূমিকায় মধ্যবিত্ত বাঙালিরা আর দায়মুক্তির বোধ মিশে গেছে বাঙালিয়ানায় । সেকালের অসহায় বাঙালিত্বকে যদি বাঙালিয়ানার পরাকাষ্ঠা বলে মেনে নিতে পারি, তবে আজকের কর্পোরেট বাণিজ্যের সাথে হালফ্যাশানের উচ্চবিত্তের বাঙালিপনা মেনে নিতে দোষ কী!

সেকালে মাদুর বিছিয়ে ঘরে বসে ঘি-মাখা গরম ভাত, আলু ভর্তা, ভাজা, রুই বা শোল বেগুন ভাজা ছিল অবস্থাসম্পন্ন বাঙালিদের সকালের খাবার আর দরিদ্রদের জন্য ছিল পানি দিয়ে সংরক্ষণ করা বাসি লঙ্কামাখা ভাতের সাথে শুটকি ভর্তা, পুঁটি মাছ ভাজা, পাট বা কলমির মতো সস্তা শাক ইত্যাদি ইত্যাদি। কালচক্রে সেই খাবারেও পরিবর্তন এসেছে- গরম ভাতে পানি ঢেলে পান্তার প্রচলন, রুই/শোল/পুঁটির জায়গায় ইলিশের আবির্ভাব আর মাদুরের জায়গা নিয়েছে বটতলার চেয়ার বা অভিজাত রেস্টুরেন্টের নরম গদি। যারা পহেলা বৈশাখ পালন করে, যারা এটিকে রক্ষণ করে বা যারা এর বিরোধীতা করে তাদের সবার সকালের খাদ্যাভাসে পরিবর্তন এসেছে, সকালের খাবারে ভাতের বদলে রুটি-পরাটা-পাউরুটি যোগ হয়েছে, ভর্তার বদলে ভাজি, আর ঘিয়ের বদলে জ্যাম-জেলি। যাদের জীবনে পান্তার সাথে বৈশাখ কোন কালেই ইলিশ যোগ করেনি, যাদের জীবনে কখনো কোন বৈশাখী রঙ লাগেনি, পহেলা বৈশাখ নিয়ে তাঁদের কোনদিনও কোন মাথাব্যথা ছিল না, আজও নেই। সুতরাং, ঢঙ করে রমনায় পান্তা খেয়ে যেমন বাঙালিয়ানা ফুটানো যায় না, তেমনি দাঁতে দাঁত চেপে পরাটা ছিঁড়তে ছিঁড়তে ‘জাত গেলো, জাত গেলো’ বলে চিৎকারে করেও কোন ফায়দা নেই।

পহেলা বৈশাখের ঐতিহ্যবাহী পোশাকের মধ্যে ছিল ছেলেদের ধুতি, পাঞ্জাবি ও মেয়েদের জমকালো রঙের শাড়ি। মেয়েদের সাজগোজের মধ্যে ছিল কাজলের টিপ, সিঁদুর, বাজুবন্ধ, রেশমী চুড়ি, লাক্ষারস (পরবর্তীতে আলতা), ফুল ও ফুলের মালা; প্রসাধনী হিসেবে ছিল চন্দনের গুড়া ও কস্তুরী, সুগন্ধি তেল ইত্যাদি ইত্যাদি। ধর্মের লুঙ্গী অনেক আগেই বাঙালিয়ানার ধূতি খুলে নিয়েছে, পরে লুঙ্গী কেড়ে নিয়েছে জিন্স ও চুড়িদার পায়জামা আর বিনিময়ে পাঞ্জাবির সাথে গলায় জড়িয়ে দিয়েছে ওড়না। পহেলা বৈশাখ, পূজা বা ঈদ- উৎসব সাংস্কৃতিক বা ধর্মীয় যাই হোক না কেন ছেলেদের এ হাল পোশাকে কোন ভিন্নতা নেই- দূর্গাপূজার পাঞ্জাবি বা ঈদের পাঞ্জাবির রঙ বা ডিজাইনে কোন পার্থক্য নেই। ছেলেদের সাথে মেয়েদের পোশাক ও সাজসজ্জায় স্বাভাবিকভাবেই পরিবর্তন এসেছে, আসাটাই স্বাভাবিক। শাড়ীতে লাল-সাদা রঙের প্রাধান্য এসেছে, পারফিউম বদলে দিয়েছে চন্দন, কস্তুরীর প্রাকৃতিক সুগন্ধ। যে কোন উৎসবেই জবরজং জমকালো সজ্জায় উদ্দীপনার নামে উদ্যামতা, উল্লাসের নামে উল্লম্ফন, মুক্তির নামে উন্মুক্ততা, আনন্দের নামে বেলেল্লাপনা কখনোই কাম্য নয়, হতে পারে না তা সে হোক না পহেলা বৈশাখ, দূর্গা পূজা বা ঈদ উৎসব। আজকাল পার্কে-রেস্তোরায়-রাস্তাঘাটে কতকিছুতেই যখন আমাদের অভ্যেস হয়ে গেছে, মেনে নিতে হয়েছে, মেনে নিয়েছি, তখন পহেলা বৈশাখকে তকমা দিয়ে আর লাভ কী! বেহায়াপনার কোন জাত-ধর্ম নেই, এটি কোন উৎসবের কার্যকারণ সম্পর্ক মেনে চলে না। তাই বদলাতে হলে জীবনের অনুশাসনকে বদলাতে হবে, উৎসবকে নয়।

পহেলা বৈশাখে বর্ষবরণ একটি অসাম্প্রদায়িক সাংস্কৃতিক উৎসব। শুধু বাংলাদেশে নয়, মধ্য এপ্রিলে একই সাথে এশিয়ার সাতটি দেশে নববর্ষ পালিত হয়। ভারতের উত্তর (পাঞ্জাব), দক্ষিণ (তামিল নাড়ু, কেরালা, উড়িষ্যা) ও দক্ষিণ-পূর্বের রাজ্যসমূহ (পশ্চিম বাংলা, আসাম) থেকে শ্রীলংকা, নেপাল, বাংলাদেশ, মায়ানমার, থাইল্যান্ড, লাওস, ভিয়েতনাম ও চিনের ইউনান প্রদেশ পর্যন্ত পায়ই একই সাথে নববর্ষ উৎসব পালিত হয়। বাঙালিরা যখন পহেলা বৈশাখ পালন করে, তখন পাঞ্জাবিরা ‘বৈশাখি’, তামিলরা ‘পুথানডু’, মালায়ালামরা ‘বিশু’, উড়িয়ারা ‘মাঘে সংক্রান্তি’, অসমিয়ারা ‘বোহাগ বিহু’, সিংহলিরা ‘আলুথ আভুরুদ্দা’, নেপালিরা ‘বিক্রম সম্বাত’, মৈথিলিরা ‘জুড়ি শীতল’, বর্মিরা ‘থিংইয়ান’, থাইরা ‘সংক্রান’, লাওরা ‘পি মাই লাও’, খেমাররা ‘চৌল ছনাম থমে’ এবং ইউনান প্রদেশের ‘দাই’রা ‘ওয়াটার ফেস্টিভাল’ নামে একই ধরণের উৎসব উদযাপন করে। বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠির ভিন্ন ভিন্ন সাংস্কৃতিক উপাদান অঙ্গীভূতকরণের মাধ্যমেই অপরাপর সংস্কৃতির সমৃদ্ধি ও বিকাশ ঘটে। সাংস্কৃতিক বিশ্বায়নের যুগে ধর্মীয় হোক বা জাতিগতই হোক নিখাঁদ সংস্কৃতি বলে কোনকিছু খুঁজে পাবার জো নেই। তাই সমসাময়িকভাবে বিভিন্ন ভাষাভাষী ও জাতিগোষ্ঠির এ বর্ষবরণ উৎসবও একে অপরকে যুগপৎভাবে জারণ-বিজারণ করেছে- স্বকীয়তা কেড়ে নিয়ে যেমন বহুমূখী করেছে, তেমনিভাবে ঐতিহ্য কেড়ে একে রূপান্তর করেছে এক অনন্যসাধারণ উৎসব হিসেবে।

আমাদের মতো খুব কম দেশেই রাষ্ট্রের প্রতিনিধিত্বকারী সকল ধর্মের সকল প্রধান উৎসব জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে উদযাপিত হয়। এখানে বৌদ্ধ পূর্ণিমা, শ্রীকৃষ্ণের জন্মাষ্টমি, দূর্গাপূজা, যিশুখ্রিস্ট্রের জন্মদিন, রমজান, ঈদুল ফিতর-আজহা সকলই সমমর্যাদায় নির্বিঘ্নে পালিত হয়। বাঙালি হিসেবে আমাদের গর্ব আমরা পৃথিবীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ অসাম্প্রদায়িক জাতি। সংস্কৃতির মূল ধারক তার ভাষা, কোন সংস্কৃতির বিস্তার মানে সেই ভাষারও বিস্তার লাভ। বাংলা ভাষাকে বিশ্ব দরবারে সুপ্রতিষ্ঠিত করার সর্বোৎকৃষ্ট বাহন বাঙালি সংস্কৃতির প্রসার- বিশ্বব্যাপী মাতৃভাষা দিবস ও পহেলা বৈশাখ উদযাপন হতে পারে বাঙালি সংস্কৃতি প্রসারের সর্বশ্রেষ্ঠ মাধ্যম। বাংলাদেশী হিসেবে আমাদের রাষ্ট্রীয় সীমাবদ্ধতা থাকলেও বাঙালি হিসেবে সেই প্রতিবন্ধকতা নেই। বাংলাদেশী হিসেবে আমি ষোল কোটি বাংলাদেশীর একজন, বাঙালি হিসেবে আমি বাইশ কোটি বাঙালির একজন- বাঙালির আকাশ বাংলাদেশীর আকাশ থেকে অনেক অনেক বড় ও বিস্তৃত।

বিশ্বের ইতিহাসে নিয়ন্ত্রিত কোন সংস্কৃতির উদাহরণ নেই। পৃথিবীর প্রতিটি সংস্কৃতিই কালান্তরে পরিবর্তিত হয়েছে, রূপান্তরিত হয়েছে, পরিবর্ধিত হয়েছে- যুগের সাথে সংস্কৃতির এ পরিবর্তন সংস্কৃতিকেই যুগ-যুগান্তরে সমৃদ্ধশালী ও আবেদনময়ী করে তুলেছে। পুরাতনকে আঁকড়ে ধরে থাকাটা কুসংস্কার, পরিবর্তনকে মেনে নেয়া উদারবাদ আর পরিবর্তনের সাথে নিজেকে খাপ খাওয়ানোর নাম আধুনিকতা। কেবল প্রচার-প্রসার করলে বা বিবর্তনের লাগাম টেনে ধরলেই যেমন সংস্কৃতির উৎকর্ষ আসে না, তেমনি বিস্তার রোধ করে সংস্কৃতির বিকাশকে কখনো রুখে দেয়া যায় না; বরং নদীর মতো এ সবকিছুকেই বুকে ধারণ করে কালান্তরে সংস্কৃতির বিবর্ধন ঘটে। সবাইকে নববর্ষের শুভেচ্ছা- শুভ নববর্ষ ১৪২২।