ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

 

পহেলা বৈশাখে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি এলাকায় ‘সংঘবদ্ধ একদল যুবক’ কয়েকজন নারীর ‘শ্লীলতাহানির’ চেষ্টা করেছে- সংবাদটা এই রকমই ছিল। তারপর ভিন্ন ভিন্ন পত্রিকায়, ব্লগে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলিতে এটিকে তকমা-রঙ-লেবাস-লেজুড় যার যেটা যোগ করলে সুবিধা হয় সে তাতে কমতি করছেন বলে ঠাওর হচ্ছে না। দু’চার জনের লেখা পড়লে মনে হয় যে তারা যেন এরকম একটা কিছুই আশা করছিলেন; ‘উগ্র পোশাক’, ‘অযাচিত ঢলাঢলি’, ‘অশালীনতা’ জাতীয় শব্দের বরণডালা সাজিয়ে বসে ছিলেন। মানসিক বিকারগ্রস্ত এমন অসভ্য আচরণ এদেরকে কোনভাবেই আত্মবিহ্বল করলো, আশ্চার্যান্বিত করলো না; কুণ্ঠিত করলো, লজ্জিত করলো না; আহত করলো, ধিক্কৃত করলো না। অপমানবোধে যখন জাতি নতজানু, আমি মূক আপনি বিমর্ষ, তখন ওরা গর্বিত-“হুম…, বলেছিলাম, বৈশাখী মেলায় এমন একটা কিছু ঘটবেই”।

‘উগ্র পোশাক’ পরে এসব মেলায় গেলে এমন ঘটতেই পারে, কেন ঘটবে না? অকাট্য যুক্তি! আমিও একমত কারণ দেশের সবচে’ ‘উগ্র’ পোশাক পরে শিশুরা আর সবচেয়ে বেশী বৈশাখী মেলা বসে স্কুল-মাদ্রাসায়। সিরাজগঞ্জের কামারখন্দ উপজেলার চৌবাড়ি ইউসুফিয়া কওমি ক্যাডেট মাদ্রাসার শিক্ষকের বিরুদ্ধে এক শিশুকে (০৮) ধর্ষণের অভিযোগ উঠেছিল;১ চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলার জামেয়া মিল্লিয়া আজিজিয়া কাশেমুল উলুম মাদ্রাসার শিশু কন্যাকে (০৪) ধর্ষণ মামলায় এক মাদ্রাসা শিক্ষককে ৭ বছরের কারাদণ্ড ও ২৫ হাজার টাকা জরিমানার আদেশ দিয়েছিল আদালত; ২ এক শিক্ষার্থীকে (০৮) বলাৎকারের অভিযোগে মিরপুর শেওড়াপাড়ার মোহাম্মদীয়া হাফেজিয়া মাদ্রাসার শিক্ষক গ্রেপ্তার হয়েছিল;৩ ময়মনসিংহের গফরগাঁওয়ে ২৩ মাস বয়েসী এক শিশু ধর্ষিত হয়েছিল।৪ কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলার কোনাখালী ইউনিয়নের একটি নূরানী মাদ্রাসায় পড়তে গিয়ে শিক্ষক কর্তৃক ধর্ষিত হয়েছে এক শিশু (০৯)। ৫ বর্ষবরণে ‘শ্লীলতাহানি’ শীর্ষক সংবাদটি যাদের অবচেতন মনে বৈশাখী পাখার লোলুপ বাতাস দিয়েছে তারা গুগলে ‘শিশু ধর্ষণ’ লিখে সন্ধান করে দেখতে পারেন- আরো অনেক সুড়সুড়ি অপেক্ষা করছে। প্রশ্ন একটাই- আমার ৯ বছরের মেয়ে এখন স্কুল-মাদ্রাসায় যাবে নাকি ২২ বছরের বোন বৈশাখী মেলায় যাবে? মেলা না মাদ্রাসা, কে কোথায় নিরাপদ?

অভিযোগের দ্বিতীয় তীর পুলিশ-প্রশাসনের দিকে। বৈশাখী মেলায় আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায় পুলিশ ও সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের টহল-সাজসরঞ্জাম কোনকিছুরই অভাব ছিল বলে মনে হয় না। খবরে প্রকাশ, আসন্ন বাংলা নববর্ষ ১৪২২ আনন্দ ও উৎসবমুখর পরিবেশে নিরাপদ ও নির্বিঘ্নে উদযাপনের লক্ষ্যে বাংলাদেশ পুলিশের ব্যাপক নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা গ্রহণের কথা জানিয়েছিলেন আইজিপি মহোদয়।৬ রমনা বটমূল ও সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে নিরাপত্তার জন্য র‌্যাবের স্থাপিত কড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থা, ওয়াচ টাওয়ার, সিসি ক্যামেরা, সাদা পোশাকধারী গোয়েন্দা, সোয়াত টিম, ফুট পেট্রোল টিম, বোমা ডিসপোজাল ইউনিট, ডগ স্কোয়াড, হেলিকপ্টার, এবং মেডিকেল দল সবই প্রস্তুত থাকবে বলে জানিয়েছিলেন র‌্যাবের মহাপরিচালক।৭ অনুষ্ঠানস্থলে প্রবেশ ও বের হওয়ার পথে আর্চওয়ে, তল্লাশি, প্রভৃতি নিরাপত্তাব্যবস্থা সক্রিয় থাকবে। নিরাপত্তার স্বার্থে অনুষ্ঠানস্থলে কোনো ব্যাগ, সন্দেহজনক বস্তু, অস্ত্র, ছুরি, নেলকাটার, লাইটার নিয়ে কেউ প্রবেশ করতে পারবেন না বলেও জানান ডিএমপি কমিশনার।৮ এ সবকিছুই যথার্থ ছিল বলে ওখানে বা দেশের অন্য কোথাও ২০০১ সালের সেই নারকীয় পৈশাচিক ঘটনার কোন পুনরাবৃত্তি ঘটেনি। স্বীকার করছি ওদের ব্যর্থতা একটাই- ‘শ্লীলতাহানির’ চেষ্টা রোধ করতে পারেনি; এদের বর্বরোচিত পাশবিক রুচি, বিবেক স্ক্যান করার মতো কোন আর্চওয়ে বা নিরাপত্তা তল্লাশি ব্যবস্থার প্রচলন করতে পারেনি বাংলাদেশ পুলিশ।

তৃতীয়টি হলো বায়বীয় অভিযোগ- ক্ষয়িষ্ণু (ধর্মীয়) মূল্যবোধের অধোগতি। বিষয়টা সত্য, তবে জিজ্ঞেস হলো কার মূল্যবোধে অপচয় ধরেছে- যে নারী বৈশাখী শাড়ি পরে, সাজসজ্জা করে মেলায় গেছে নাকি যে নরখাদক সেটা ধরে টানাটানি করেছে? সিলেট থেকে জাফলং যাওয়ার পথে শ্রীপুর চা-বাগানে কালো বোরকা পরা একটি মেয়েকে ধর্ষণ করে ৫ জন স্থানীয় যুবক। ৯ আফগানিস্তানে নারীদের মধ্যে বোরকা পরার প্রচলন আছে, তাতেও খুব একটা সুফল পাওয়া যাচ্ছে না। এমনকি নীল নাইলনের তৈরী বিশেষ এক ধরনের পোশাক পরেও নিস্তার মিলছে না নারীদের। আফগানিস্তানের নারীদের প্রতি এ যৌন নিপীড়নের প্রতিবাদস্বরূপ কুবরা খাদেমি নামে এক আফগান নারী লৌহ নির্মিত অন্তর্বাস পরিধান করে রাস্তায় নেমে প্রতিবাদও জানিয়েছেন; কিন্তু কোন লাভ হয়নি। ১০ দীক্ষা পাঠক ও অঞ্জলি শ্রীবাস্তব নামে দুই কলেজছাত্রী ভারতে ধর্ষণ প্রতিরোধে বিশেষ ধরনের ‘অ্যান্টি-রেপ’ জিন্সের প্যান্ট তৈরি করে। এই প্যান্টে ছোট বোতাম সহ একটি ডিজিটাল ডিভাইস থাকবে। এই জিন্স পরিহিত অবস্থায় কোনো মেয়ে যৌন হয়রানির স্বীকার হলে সে যদি বোতামে চাপ দেয় তাহলে এটি কাছাকাছি থানায় সিগন্যাল পাঠিয়ে দেবে আর এ সিগন্যাল দেখে পুলিশ বুঝে নেবে যে কোনো নারী যৌন নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন। এর পর তারা সিগন্যাল ট্র্যাক করে ঘটনাস্থলে পৌঁছে যেতে পারবেন।১১ তারপরেও ভারতে প্রতি ২২ মিনিটে একজন নারী ধর্ষিত হচ্ছে।১২ বোরকাপরা নারীর শ্লীলতাহানির ঘটনা স্বল্প হলেও বিরল নয়। লম্বা-ঢিলা কাপড় পরা সত্ত্বেও মুসলিম দেশগুলোতে ধর্ষণ ও যৌন-উৎপীড়নের হার পাশ্চাত্যের তুলনায় বেশী। মিশরীয়রা বোরকায় অভ্যস্থ, তারপরেও সেখানে ৮০%-এর বেশী মেয়েরা জীবনে একবার হলেও যৌন-আক্রমণের শিকার হয়। অন্যদিকে আমাদের ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর অনেক নারী ঊর্ধ্বাঙ্গে স্বল্পবসনা হলেও তাঁদের সমাজে ধর্ষণের মচ্ছব নেই। বর্তমানে মাদকদ্রব্য চোরাচালান, জাল টাকা পাচার, জালিয়াতি, অপকর্ম-দুষ্কর্ম ইত্যাদির ঢাল হিসেবে বোরকার ব্যবহার বেড়ে যাওয়ায় বোরকা পরিহিতারা নরপিশাচদের চর্মচক্ষুর ধর্ষণ কতটা এড়াতে পারছে তা জানি না তবে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সন্দেহ যে এড়াতে পারছে না একথা নিঃসন্দেহে বলা যায়। অবশ্যই কিছু বোরকাপরা বোনের আচরণের জন্য বোরকাকে দায়ী করা যাবে না। হিজাব করা আল্লাহর নির্দেশ, হিজাব ও হিজাবকারী উভয়কেই শ্রদ্ধা করি, তবে পুরুষের কুনজর থেকে রক্ষা পেতে, ধর্ষণ থেকে বাঁচতে, সতীত্ব বাঁচাতে নারীকে হিজাব করতে হবে, লজেন্সের মতো প্যাকেটে ঢুকতে হবে, কলার মতো চোকলার ভিতরে থাকতে হবে এই তত্ত্বে কখনোই বিশ্বাসী নই।

চর্মচক্ষুর ধর্ষণ, শ্লীলতাহানি বা ধর্ষণ সবই মনোসামাজিক ব্যাধি- পুরুষতন্ত্রের দণ্ড, ঝাণ্ডা। তাই নারী-পুরুষের পারস্পরিক সম্পর্কের স্বাভাবিকতা, পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ ও দায়িত্ববোধ, ধর্মীয় অনুশাসন, পারিবারিক বন্ধন-রীতিনীতি-আচার-আচরণ ও সর্বোপরি ইসলামে চর্চিত সর্বোচ্চ সংযম সাধনার মৌলিক শিক্ষা গ্রহণই এ মনোসামাজিক ব্যাধির বিরুদ্ধে কার্যকর হাতিয়ার।
=======
সূত্রসমূহঃ
১। বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম, ১৪ অক্টোবর ২০১৪
২। দৈনিক ভোরের কাগজ, ০৯ নভেম্বর ২০১১
৩। বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম, ২১ জুন ২০১৪
৪। ঢাকা প্রতিদিন
৫। শ্যামল বাংলা, ২৯ অক্টোবর ২০১৪
৬। বাংলার খবর, ০৫ এপ্রিল ২০১৫
৭। বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম, ১২ এপ্রিল ২০১৫
৮। দৈনিক নয়া দিগন্ত, ১২ এপ্রিল ২০১৫
৯। বাংলাদেশ প্রেস.কম, ১৭ আগস্ট ২০১৪
১০। সিলেটভিউ টুয়েন্টিফোর ডটকম, ১৫ মার্চ ২০১৫
১১। দৈনিক কালের কণ্ঠ, ২৭ জুন ২০১৪
১২। দৈনিক আমার দেশ, ২২ মে ২০১৪