ক্যাটেগরিঃ ক্যাম্পাস

 

হাডুডু বা কাবাডি খেলার মূল কৌশল হলো অন্যের পা ধরে কুপোকাৎ করা। এক দলের কোন খেলোয়াড় ‘কাবাডি, কাবাডি’ বলতে বলতে চড়াই লাইন পার হয়ে বিপক্ষের কোল লাইনে ঢুকে যে পা ধরার জন্য প্রতিপক্ষকে প্রলুব্ধ করে ওঁৎ পেতে থাকা বিপক্ষ দলের খেলোয়াড়রাও ঐ পা ধরেই তখন তাকে ধরাশায়ী করে । পা ধরতে উদ্বুদ্ধ করা বা পা-ধরা এখানে লজ্জার নয়, অপমানের নয়, ক্ষমা প্রার্থনারও নয়-প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার রণকৌশল মাত্র।
কয়েকটি পত্রিকার ভাষ্যমতে, ৯ এপ্রিল ভান্ডারিয়া সরকারি কলেজ কেন্দ্রে এইচএসসি পরীক্ষা চলার সময় পরীক্ষাকেন্দ্র পরিদর্শন করতে যান এক নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট। এ সময় একটি কক্ষের এক বেঞ্চে দুই পরীক্ষার্থী পাশাপাশি বসে কথা বলাবলি করে পরীক্ষা দিচ্ছিল। পরিচয় প্রদান না করে তিনি ওই কক্ষে গিয়ে কক্ষ পরিদর্শক সহকারী অধ্যাপককে (প্রধান প্রত্যবেক্ষক) ওই পরীক্ষার্থীদের সরিয়ে দিতে বলেন। এ সময় তিনি ম্যাজিস্ট্রেটের নির্দেশ অনুযায়ী ব্যবস্থা না নেওয়ায় দু’জন বাগ্বিতণ্ডায় জড়িয়ে পড়েন। পরীক্ষার্থীদের সামনে উত্তেজিত এ দু’জন তরুণ সরকারী কর্মকর্তাই ক্ষমতা প্রদর্শনের দ্বন্দ্বে পারস্পরিক দুর্ব্যবহার শুরু করেন। এর রেশ অবশেষে অধ্যক্ষর কক্ষে পৌঁছায়। ততক্ষণে ইউওনও, শিক্ষক সমিতির নেতৃবৃন্দ এবং স্থানীয় কয়েকজন সাংবাদিকসহ সেখানে উপস্থিত হন। সেখানে পারস্পরিক দোষখণ্ডনের এক পর্যায়ে প্রধান প্রত্যবেক্ষকের বিরুদ্ধে ভ্রাম্যমাণ আদালতের আওতায় আইনী ব্যবস্থা নেবার জন্যে নির্বাহী ম্যাজিষ্ট্রেট ভান্ডারিয়া থানা থেকে পুলিশী সহায়তায়ও চেয়েছিলেন । উপস্থিত শিক্ষকেরা সমস্বরে এ বিরোধীতা করে ও আইনি জটিলতা এড়াতে নিজেদের মধ্যে বিষয়টিতে সমঝোতায় পৌঁছানোর চেষ্টাও করছিলেন। এরই কোন এক ক্রান্তিলগ্নে প্রধান প্রত্যবেক্ষক স্বপ্রণোদিত ভয়ে বা অনন্যোপায় হয়ে নির্বাহী ম্যাজিষ্ট্রটের পা ছুঁয়ে ক্ষমা প্রার্থনার চেষ্টা করেন। অনাকাঙ্খিত এ মুহূর্তটি তৎক্ষণাৎ ক্যামেরা বন্দি হয়ে যায়। আশ্চর্যের হলেও ছবিটি কিছুটা কালবিলম্বে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও পত্রিকায় প্রকাশিত হলে ঘটনাটি সবার নজরে আসে। পরবর্তীকালে ১৯ এপ্রিল উক্ত ম্যাজিস্ট্রেটের বিরুদ্ধে অবিলম্বে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেয়ার দাবি জানিয়ে মন্ত্রিপরিষদ সচিব, জনপ্রশাসন সচিব ও শিক্ষা সচিবের কাছে স্মারকলিপিও দেন বিসিএস সাধারণ শিক্ষা সমিতির সভাপতি ও মহাসচিব। তাঁরা আগামী ২৬ এপ্রিল সারাদেশের সরকারি কলেজে মানববন্ধন ও কর্মবিরতি পালনেরও ঘোষণা দিয়েছেন। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে কুরুবংশের কৌরব ও পাণ্ডবরা হস্তিনাপুর রাজ্য জয়ে যেভাবে ভাইয়ের বিরুদ্ধে ভাই অস্ত্র তুলে নিয়েছিল এ বিষয়টি নিয়েও তেমনিভাবে প্রশাসন ও শিক্ষা ক্যাডারগণ এক অপরের বিরুদ্ধে স্ব-স্ব পক্ষাবলম্বন করে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নেমেছেন। ঐ ধর্মযুদ্ধে রাজ্য জয়ের উদ্দেশ্য ছিল, এখানে জয়ের লক্ষ্যটা কী- ক্ষমতা প্রদর্শনের, না কি অস্তিত্ব রক্ষার?
পরীক্ষার হলে কথাবার্তা বলা, দেখাদেখি করার মতো অনৈতিক কর্মকাণ্ড অনাকাঙ্খিত হলেও অপরিচিত নয়। আমি, আপনি, ঐ ম্যাজিস্ট্রেট বা ঐ সহকারী অধ্যাপক- আমরা কেউই তো আর ধর্মপুত্র যুধিষ্ঠির নই। আমাদের সবারই কমবেশি এমন অভিজ্ঞতা রয়েছে। তাই সহজে অনুমেয় ঘটনার সূত্রপাত ঘটে কর্তব্যরত সহকারী অধ্যাপকের কর্তব্যের অবহেলা থেকে যা বিতর্কের পর্যায়ে পৌঁছায় সিনেম্যাটিকভাবে পরিচয় প্রকাশ না করে তাকে দিয়ে কোন নির্দেশনা পালনে বাধ্য করার প্রচেষ্টা থেকে। সে সময় দু’জনে ক্ষমতার বিতর্কে না জড়িয়ে যদি বিষয়টি তাৎক্ষনিকভাবে অধ্যক্ষ মহোদয়ের গোচরে আনতেন তবে আজ হয়তো এমন অবস্থার সৃষ্টিও হতো না। এদের একজন ইউএনওকে জানিয়েছেন আর একজন অন্য শিক্ষকদেরকে, অথচ অধ্যক্ষ মহোদয়ের কথা কারো মনে এলো না। পা ছুঁয়ে ক্ষমা প্রার্থনার এমন চেষ্টা, ভণিতা যাই বলি না কেন এ ঘটনার পেছনে রয়েছে ভ্রাম্যমাণ আদালতের শমন ও আইনি হুমকি-ধামকি। যেহেতু সহকারী অধ্যাপক তাঁর কর্তব্যে অবহেলার বিষয়ে নিশ্চিত ছিলেন, তাই ইউএনও-ম্যাজিস্ট্রেটের আইনি হুমকি-ধামকিতে ঘাবড়ে গিয়েই হয়তো তিনি পা ছোঁয়ার মতো হীন ক্ষমা প্রার্থনার পথ বেছে নেন। ব্যক্তিত্ব সম্পন্ন কোন সহকারী কর্মকর্তাকে দিয়ে এ কাজে বাধ্য করানো ওতটা সহজ নয়। যে ব্যক্তি শ্রেণিকক্ষে ছাত্রছাত্রীদের সম্মুখে অপমানবোধ থেকে এমন লঙ্কাকাণ্ড করতে পারেন সে আর যাই করুক, আদেশের বলে কারো পা স্পর্শ করবেন তা আমার বিশ্বাস্য নয়, কাম্যও নয়। উনি এ কাজ করেছেন অপরাধবোধ থেকে, দায়িত্বে অবহেলার দায়ভার এড়ানোর জন্য। আর এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে আইন রক্ষাকারী কর্মকর্তাগণের ক্ষমতা প্রদর্শনের অহমিকা থেকে। শ্রেণিকক্ষে শিক্ষকদের সম্মান প্রজাবেষ্টিত রাজসভায় রাজার মতো, ক্ষমতার অযাচিত ব্যবহার করাই ক্ষমতাবানদের মূল অক্ষমতা।

পা-ছোঁয়া বা ছোঁয়ার চেষ্টার সেই আলোচিত ছবি

পা-ছোঁয়া বা ছোঁয়ার চেষ্টার সেই আলোচিত ছবি

পা-ছোঁয়ার চেষ্টা করার এ ছবিটা অনাকাঙ্খিতভাবে তোলা হলেও নিঃসন্দেহে পূর্বপরিকল্পিত নয়। সেরকম হলে আরো অনেক রঙে-ঢঙে ছবিটা তোলা যেত, আরো অনেকগুলো ক্লিপস থাকতো। ঐ দিন অধ্যক্ষর কক্ষে সবাই মিলে চা-নাশতা খেয়ে ঘটনাটার একটা আপাত সমাধান হয়েছিল। তবে কে, কারা বা কী উদ্দেশ্যে বেশ ক’দিন পরে সামাজিক মাধ্যমগুলোসহ পত্র পত্রিকায় এমন ন্যাক্কারজনকভাবে, উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে ঘটনাটি প্রচার করালো। ছাই-চাপা এ তুষের আগুনকে সহানুভূতির হাওয়া দিয়ে কেন উস্কে দেয়া হলো, প্রকট করা হলো শিক্ষা এবং প্রশাসন ক্যাডার পারস্পরিক সম্পর্কের সুপ্ত, সূক্ষ্ণ দূর্বলতাকে?
আন্তঃক্যাডার সম্পর্ক আত্মীয়ের সম্পর্কের মতো। আর সেই আত্মীয়ের সম্পর্ক একটা মালার মতো। প্রতিটি ক্যাডার মালাতে এক একটা ফুলের মতো। মালাতে যেমন প্রত্যেক ফুল আলাদা আলাদা হয় তেমনিভাবে ক্যাডারের মধ্যেও প্রত্যেক ক্যাডার আলাদা আলাদা হয়ে থাকে। পাঁকানো সুতো যেমন ফুলগুলোকে জুড়ে রেখে দেয়, ঠিক তেমনিভাবে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের সুতো ক্যাডারেরদেরও জুড়ে রেখে দেয়। মালাতে প্রত্যেক ফুলের রঙ আলাদা হতেই পারে, প্রত্যেক ফুলের সুগন্ধ আলাদা হতেই পারে। ঠিক যদি এমনই হয় তবে মালার সৌন্দর্য বেড়ে যায়। কিন্তু, রঙের সঙ্গে রঙের, সুগন্ধের সঙ্গে সুগন্ধের বিরোধ হওয়া উচিৎ নয়। এ কথা আন্তঃক্যাডার সম্পর্কের জন্যেও প্রযোজ্য।
আবারো হাডুডু খেলার সেই পা টানাটানির রণকৌশলে ফিরে আসি যেখানে হাত দিয়ে পা চেপে ধরেই প্রতিপক্ষকে নাজেহাল করা হয়। ভাণ্ডারিয়া কলেজে সহকারী অধ্যাপক হাত দিয়ে ম্যাজিস্ট্রেটকে ল্যাং মেরে ফেলে দিলেন, পরাজিত করলেন। সহানুভূতির মাপকাঠিতে তিনি বিজয়ী হলেও ক্ষমতার মানদণ্ডে বিজিত হলেন ম্যাজিস্ট্রেট। কেবলই ভূলণ্ঠিত হলো একজন বিসিএস ক্যাডারের সামাজিক মর্যাদা, উভয়েরই স্বীয় শিক্ষা, ব্যক্তিত্ব ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ। বর্তমান ও ভবিষ্যত প্রজন্মের সরকারী কর্মকর্তাদের জন্য উভয়ই এক নিন্দনীয় দৃষ্টান্ত রেখে গেলেন। আশা করি এবার তারা নিজেরা থামবেন, অন্যদেরকেও থামাবেন। নিজেদেরকে সাধারণের কাছে আর হাস্যোদ্দীপক করবেন না, কাউকে ঘোলা পানিতে মাছ শিকারে সুযোগ দিবেন না। ভবিষ্যতেও না।