ক্যাটেগরিঃ প্রশাসনিক

 

দৈব হোক বা সৃষ্টই হোক, একটা দুর্ঘটনা হবার পরে সেটা নিয়ে আলোচনা করা, তদন্ত কমিটি গঠন করা এবং তারপর ভুলে যাওয়াএ সবই আমাদের গাসওয়া হয়ে গেছে। প্রকৃতির নিয়মে ঘটনার পরে ঘটনা আবর্তিত হতে থাকে, হবেই। শাহবাগে নারীর শ্লীলতাহানি আজ যেমন ভুমিকম্পের নিচে চাপা পড়ে গেছে, কাল ভূমিকম্পও তেমনিভাবে হয়তো নির্বাচনে জয়পরাজয়ের ডামাডোলে হারিয়ে যাবে। ভালো, জীবন এভাবেই এগিয়ে চলছে। চোখের সামনে নিয়ত ঘটমান সড়ক দূর্ঘটনা, লঞ্চ ডুবি, ভবনধ্বস, অগ্নিকাণ্ডে মৃত্যুকেই যখন আমরা ঠেকাতে পারছি না, তখন সামুদ্রিক জলোচ্ছাস, ঘূর্ণিঝড়, ভূমিকম্পের মতো এতবড় দৈব দুর্বিপাক নিয়ে এতটা উদ্বিগ্ন হওয়া, মায়াকান্না দেখানোকোন অধিকার আমাদের নেই। 

দেশে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রায় প্রতিদিন মানুষ মরে, গরু-ছাগল-হাঁস-মুরগীর মতো মরে। এসব মৃত্যু আর আমাদের কষ্ট দেয় না। অনুভূতিগুলো ভোঁতা হয়ে গেছে। আগে তবুও সড়ক দুর্ঘটনায় বড় অঙ্কের লোক মরলে একটু-আধটু নড়াচড়া হতো, এখন অবশ্য হোমরা-চোমরা টাইপের কেউ না মরলে তেমন কোন আওয়াজ হয় না। সাবেক অর্থমন্ত্রী সাইফুর রহমান, চলচ্চিত্র নির্মাতা তারেক মাসুদ, গণমাধ্যমকর্মী মিশুক মুনীরের মতো রথী-মহারথীদের মৃত্যুর  আগে ও পরে অনেক আমজনতা রাস্তায় মুখ থুবড়ে, রাস্তার সাথে চ্যাপ্টা হয়ে, পিষ্ট হয়ে মাংসপিণ্ডের মতো পড়ে ছিল, এখনও থাকে। ভবিষ্যতটা তো আপনারা ভালো বলতে পারবেন, বলার কোন প্রয়োজন নেই। কৈ আমরা চিরপরিচিত এ অপমৃত্যুকে তো সামলাতে পারছি না। ২০১৪ সালে প্রতি ঘণ্টায় একজন করে মানুষ সড়ক দুর্ঘটনায় মারা গেছে। ঐ বছরে দুর্ঘটনার সংখ্যা ৫,৯২৮ যাতে স্বল্প-গুরুতর আহত বাদে শুধু মৃত্যুর সংখ্যা ৮,৫৮৯ (১)। এটি নেপালের ৭.৯ মাত্রার এই ভূমিকম্পে অদ্যাবধি মৃত্যুর সংখ্যার (প্রায় ২,৩০০; তবে এ সংখ্যা আরো বৃদ্ধি পাবে) তিন গুণেরও বেশী। যে দেশে এভাবে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রতিদিন পথে-ঘাটে  লোক মরে পড়ে থাকে, সেখানে ভূমিকম্পের মৃত্যু নিয়ে এত উদ্বিগ্ন হওয়াটা আমাদের সাজে না।

লঞ্চডুবি এদেশে কোন দুর্ঘটনা নয়, বরং মৌসুমি  ঘটনা, ঈদ-পূজা পার্বণের মতো বছরে দু’একটা করে ঘটবেই। চোখের সামনে ঘটছে, জেনে-শুনে ঘটছে, বলে-কয়ে ঘটছে। ফি-বছর ঘটছেই। ২০১১ সালে এমভি বিপাশা, এমভি মদিনার আলো, ২০১২ সালে এমভি শরীয়তপুর-১, ২০১৩ সালে এমএল সারস, ২০১৪ এমভি মেরাজ-০৪, এমভি শাতিল-০১,  গত বছর পিনাক-৬ আর এবছর এমভি মোস্তফা ডুবেছে। বিআইডব্লিউটিএর প্রতিবেদন অনুসারে, ২০০১ থেকে ২০১৪ সালের ১৫ মে পর্যন্ত সারা দেশে ৪৪১টি লঞ্চডুবির ঘটনা ঘটেছে যাতে নিহতের সংখ্যা ২,৫৪৫ (২)। আমরা এসবের ছবি তুলেছি, ভিডিও করেছি, শতশত তদন্ত কমিটি হয়েছে, ফেরিঘাটে তদন্ত কমিটির নাটকীয় গণশুনানি হয়েছে, তদন্ত কমিটির রিপোর্ট হয়েছে, তারপর কী হয়েছে? আবারও লঞ্চডুবি হয়েছে। ভবিষ্যতেও, তবুও এমন কামনা করি না। এ মৃত্যুর সংখ্যা নেপালে ভূমিকম্পে মৃত্যুর চেয়ে তো কম নয়।

আমাদের ভবনগুলো দীর্ঘদিন দাড়িয়ে থাকতে চায় না। তাই মাঝে মাঝে এক পায়ে ভর দিয়ে কাত হয়ে দাঁড়ায়, বসে পড়ে। এদের কোনটা আবার বেশ আত্মমর্যাদা সম্পন্ন, কেউ ‘নাড়া দিলে’ কাত হতে চায় না, বসে বসতে চায় না, ধ্বসে পড়ে। ২০১৩ সালে ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জ কলেজের তিনতলা ভবনের নিচে মাটি সরে গিয়ে দেবে গিয়েছিলো, এবছরও রামপুরায় ভবন দেবে গেছে।সাতক্ষীরার ভোমরা স্থলবন্দর এলাকায় প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পরিত্যক্ত ভবনের দেয়াল ধসে ও টিনের চাল পড়ে দুইজন নিহত হয় এবং ১০ জন আহত হয়েছেন। মংলা শিল্প এলাকায় নির্মাণাধীন একটি ভবনের ছাদ ধসে ছয়জন শ্রমিক নিহত হয়েছেন। স্পেকট্রাম ভবন ধ্বসে মৃত্যু হয় ৮০ জন শ্রমিকের। তারপরেও সাভারে রানা প্লাজা ধ্বসে প্রাণ হারায় ১১৩২ জন, আহত  ২,৫০০ জনেরও বেশি আর নিখোঁজ ৯৯৬। এই নিখোঁজ লোকগুলো কখনো মৃত্যুর সংখ্যার সাথে যোগ করা হয় না কারণ তারা মরে না, বিনা পুলসিরাতে স্বর্গারোহন করে।  গত দু’দিনের ভূমিকম্পের চুমোতে যে সকল ভবন রাম নাম জপ করছে তারা যেকোন দিন ভবনধ্বসে মৃত্যুর সংখ্যাকে আরো অনেক বেশী বাড়িয়ে দিতে পারে। এরপরেও কী আমরা বুকে হাত দিয়ে বলতে পারি যমদূত প্রসন্ন হয়েছেন, তিনি ভবনধ্বসে আর কোন বলি চাইবেন না।

অগ্নিদেব আমাদের প্রতি বরাবরই রুষ্ট, অসন্তুষ্ট। ক’দিন পরপর তারই প্রমাণ মেলে। পুরান ঢাকার নবাব কাটরার নিমতলি নামীয় মহল্লায় সেই নিমতলি ট্র্যাজেডির (২০১০) কথা আমাদের সবার মনে আছে। আজও গা শিউরে ওঠে। ভবনসংলগ্ন একটি বৈদ্যুতিক ট্রান্সফর্মার বিস্ফোরিত হলে সেখান থেকে আশেপাশের ভবনগুলোতে আগুন ছড়িয়ে পড়েছিল। আশেপাশের দোকানগুলোতে থাকা রাসায়নিক দ্রব্যাদি ও দাহ্য পদার্থের সংস্পর্শে আগুন আরো দ্রুত বিস্তৃত হয়। ১১৯ টি পোড়া লাশ, বিকৃত, কালো, কোকড়ানো। পলিথিনের মধ্যে দুমড়ে মুচড়ে কুঞ্চিত হয়ে যাওয়া মানব দেহ। ঝলসানো সেই ক্ষত শুকাতে না শুকাতে ঘটে তাজরীন ফ্যাশনস অগ্নিকাণ্ড (২০১২)-  ১১৭ জন পোষাকশ্রমিক নিহত। ১৯৯০ সাল থেকে এ পর্যন্ত ২৫ বছরে কেবল গার্মেন্টস কারখানায় দুই শতাধিক বিভিন্ন দুর্ঘটনায় সর্বমোট নিহতের সংখ্যাদুই হাজারেরও বেশী যাদের মধ্যে সাত শতাধিকই মারা গেছেন আগুনে দগ্ধ হয়ে। তবুও থামছেন না অগ্নিদেব। রাজধানী ঢাকার মাটির নিচ দিয়ে যেভাবে গ্যাস সঞ্চালন লাইন গেছে তা অত্যন্ত বিপজ্জনক। যেকোনো সময় দুর্ঘটনা ঘটলে এই গ্যাসলাইন থেকেই ভয়াবহ বিপর্যয় হতে পারে। তার ওপর রয়েছে বিদ্যুৎ সঞ্চালন ব্যবস্থা। তারের জঞ্জালে আবৃত ঢাকা শহর। বড় ধরনের বিপর্যয় মোকাবিলায় আমাদের দক্ষতা নিয়ে এখনো প্রশ্ন রয়ে গেছে। স্বাভাবিকভাবেই ঘিঞ্জি এলাকায় বিপর্যয় নেমে এলে কী হবে তা প্রশ্নসাপেক্ষ।

সড়ক দুর্ঘটনা, লঞ্চডুবি, ভবনধ্বস বা অগ্নিকাণ্ডে মৃত্যুর সাথে ভূমিকম্পের মৃত্যুর সাথে একটা পার্থক্য তো আছেই। সড়ক দুর্ঘটনা, লঞ্চডুবি, ভবনধ্বস বা অগ্নিকাণ্ডে মৃত্যু কেবল অপমৃত্যুই নয়, হত্যাকাণ্ডও বটে। ভূমিকম্পে মৃত্যুকে খুব সহজে উপরের দিকে তাকিয়ে ‘আল্লার মাল’ বলে চালিয়ে দেয়া যায়; বাকীগুলোতে অন্তত তদন্ত কমিটির রিপোর্ট পর্যন্ত যেতে হবে। মহাভারতেকর্ণ বা রাধেয় ছিলেন একজন মহাযোদ্ধা। তিনি গুরু পরশুরামের নিকটে ব্রহ্মাস্ত্র ত্যাগ ও অস্ত্র সংবরণ করার পদ্ধতি শেখেন। তবে, মিথ্যাচারের কারণে তাঁর গুরু তাকে এই অভিশাপও দেন যে সংকটকালে দিব্যাস্ত্র ত্যাগের কৌশল তাঁর মাথায় আসবে না। মাথার উপর ভূমিকম্পের খড়্গ নিয়ে আমরা মহান আল্লাহতা’লার অশেষ রহমতে আজও রক্ষিত আছি; কিন্তু প্রতিনিয়ত নিরপরাধ ঐ সকল মানুষকে হত্যার অভিশাপে ভূমিকম্পের সময় আমাদের করণীয়সমূহ মাথায় আসবে কি না সেটাই বিবেচনার বিষয়।

ঢাকার শহর ঈশ্বরের পায়ে দাঁড়িয়ে আছে বলেই দাঁড়িয়ে আছে। দাঁড়িয়ে থাকার কথা নয় তবুও দাঁড়িয়ে আছে। দালানের সাথে দালান ঘেঁষাঘেঁষি করে দাড়িয়ে আছে। একতাই বল, তাই ফাটল নিয়েও দাড়িয়ে আছে। ওদের দাঁড়িয়ে থাকতে দিন। নাড়া দেবেন না। সামাজিক জীবনে, রাজনৈতিক জীবনে এমন অনেক ছোটবড় ফাটল নিয়ে স্বয়ং বাংলাদেশই মাথা উঁচু করে দাড়িয়ে আছে । বিশ্বের বিষ্ময়, এগিয়েও যাচ্ছে। 

=====

(১) ঢাকা ট্রিবিউন, ০৩ এপ্রিল ২০১৫ (‘Study: Road accidents killed one per hour in 2014’)

(২) আমাদের সময়, ০৫ আগস্ট ২০১৪ (‘১৩ বছরের লঞ্চডুবিতে ২৫শ প্রাণহানি’)