ক্যাটেগরিঃ ধর্ম বিষয়ক

রবীন্দ্রনাথের ‘আমাদের ছোট নদী’ কবিতাটি হয়তো অনেকের মনে আছে যার দ্বিতীয় পঙক্তিটি এমন ছিল- ‘বৈশাখ মাসে তার হাঁটুজল থাকে৷’ স্যার চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে ক্লাসে কবিতাটি পড়াতেন। এমনিতে সব ঠিকঠাক ছিল; শুধু দুটি বিষয়ে রবীন্দনাথের সাথে স্যারের বিরোধ ছিল-(এক) ২য় ও ১০ পঙক্তিতে তিনি “জল” শব্দ বদলে দিয়ে “পানি” দিয়ে পড়াতেন। যেমন- “বৈশাখ মাসে তার হাঁটুপানি থাকে”…“গামছায় পানি ভরি গায়ে তারা ঢালে”। স্যারের একটা ব্যাখ্যাও ছিল-হিন্দুরা পানিকে “জল” বলে; মুসলমানেরা “জল” বললে মুসলমানিত্ব চলে যাবে। (দুই) এটি ছিল স্যারের ব্যাখ্যামূলক পার্থক্য। কবিতাটির তৃতীয় প্যারার ১ম লাইন ছিল এ রকম- “তীরে তীরে ছেলেমেয়ে নাহিবার কালে…”। স্যার বলতেন, ‘নাহিবার কালে’ মানে ‘গোসলের সময়’। জেলেপাড়ার এক সহপাঠী হাত তুলে জিজ্ঞেস করেছিল, “স্যার, ‘সিনানের (স্নান) সুমায়’ বললি হবিনানে?” স্যারের গুরু-গম্ভীর উত্তর- “ওটা কেবল তোরাই বলিস।” এ তত্ত্বে বাংলা ভাষা থেকে এ সকল শব্দ হারিয়ে যায়নি, যাবেও না; কিন্তু, আমাদের অনেকের দৈনন্দিন ব্যবহার থেকে ‘জল’ ও ‘স্নান’ শব্দ দু’টি চিরনির্বাসন হয়ে গেছে। সময়ের সাথে সাথে এ লিস্টে আরো কিছু শব্দ যোগ হতে থাকে- দাদা-বৌদি (তবে পিতামহ অর্থে ‘দাদা’র ব্যবহার আছে), মাসী, পিসী, ঠাকুর পো-ঠাকুর ঝি, জলখাবার, সন্ন্যাসী ইত্যাদি ইত্যাদি। শব্দের ধর্মভেদ- আজব এক সংস্কৃতি!

সাহিত্যের বিচারে দু’টি অসাধারণ মহাকাব্য- ‘রামায়ণ’ ও ‘মহাভারত’ কখনো পড়ার সাহস করিনি কারণ এগুলোর সাহিত্যিক পরিচয়ের চেয়ে ধর্মীয় পরিচয় আমাদের কাছে মূখ্য হয়ে ধরা দিয়েছিল। এমনকি দোকানে গিয়ে এদের নাম বলতেও কুণ্ঠাবোধ হতো। অথচ, বাংলা ভাষার অগণিত শব্দ, বাগধারা, প্রবাদ-প্রবচনের সাথে রামায়ণ-মহাভারতের সরাসরি সংযোগ রয়েছে। আমরা এসবের অনেক কিছুই মুখস্ত করতাম কিন্তু বুঝতাম না, জানতাম না; অথবা, বলা যেতে পারে বোঝানো হতো না বা জানানো হতো না। যা আজ জানি তা আসলে সেদিনই জানা উচিত ছিল। গুটি কয়েক উদাহরণ দিচ্ছি।

‘হরিহর আত্মা’ দিয়ে শুরু করা যাক। ‘হরিহর’ হল হিন্দু দেবতা বিষ্ণু (হরি) ও শিবের (হর) মিলিত রূপ। ‘শিবস্য হৃদয়ং বিষ্ণুর্বিষ্ণোশ্চ হৃদয়ং শিবঃ’ অর্থাৎ, ‘শিব বিষ্ণুর হৃদয় ও একই ভাবে বিষ্ণু শিবের হৃদয়’। তাই ‘অতি অন্তরঙ্গ’ বোঝাতে ‘হরিহর আত্মা’ ব্যবহৃত হয়। মথুরার রাজা কংস ছিলেন শ্রীকৃষ্ণের মামা। কংসের বোন দেবকীর সঙ্গে বাসুদেবের বিবাহ হয়। বিবাহে উপস্থিত থাকা কালে তিনি দৈববাণী শুনতে পান যে দেবকীর অষ্টম সন্তান (শ্রীকৃষ্ণ) তাকে বধ করবে। তাই তিনি দেবকী ও বাসুদেবের পর পর ছয়টি সন্তানকে জন্মের সাথে সাথেই হত্যা করেন। তাঁর এই নির্মমতার উদাহরণ থেকে নির্মম আত্মীয়কে ‘কংস মামা’ বলে। মহাভারতে হস্তিনাপুরের রাজা শান্তনুর পুত্রের নাম ছিল ভীষ্ম। শান্তনু সত্যবতীর প্রেমে পড়ে তাঁকে বিবাহের প্রস্তাব দিলেন। সত্যবতীর বাবা ভাবলেন যেহেতু ভীষ্ম শান্তনুর প্রথম পুত্র তাই সত্যবতীর ছেলের কোনদিন রাজা হওয়ার সুযোগ আসবে না। সুতরাং, তিনি রাজা শান্তনুর এই প্রস্তাব প্রত্যাখান করেন। তখন ভীষ্ম প্রতিজ্ঞা করলেন যে তিনি কোনদিন রাজা হবেন না বা তাঁর কোন বংশধরও থাকবে না। তিনি আমৃত্যু এ প্রতিজ্ঞা বজায় রাখেন বলেই কঠিন, কঠোর কোন প্রতিজ্ঞা বোঝাতে ‘ভীষ্মের প্রতিজ্ঞা’ বলা হয়। এই সত্যবতীর প্রথম নাতি ধৃৎরাষ্ট্রের শ্যালক, গান্ধারীর ভাই এবং দূর্যোধনের কুচক্রী মামাই বাংলায় ‘শকুনি মামা’ নামে পরিচিত। দূর্যোধনের চাচাত ভাই, জ্যেষ্ঠ্য পাণ্ডব পুত্রের নাম যুধিষ্ঠির। পৌরাণিক কাহিনী অনুসারে পান্ডুর স্ত্রী কুন্তি ধর্মদেবের কৃপায় যুধিষ্ঠিরের জন্ম দেন। তিনি অত্যন্ত ন্যায়পরায়ন ছিলেন বলে এখনও ন্যায়পরায়ন যে কাউকে ‘ধর্মপুত্র যুধিষ্ঠির’ বলে। ত্রেতাযুগে বিষ্ণুর সপ্তম অবতার রাম ছিলেন অযোধ্যার রাজা। তাঁর শান্তিশৃঙ্খলাযুক্ত রাজত্বকালের জন্য শান্তিশৃঙ্খলার শাসনকে ‘রাম রাজত্ব’ বলে। এই রামের সেবা করার জন্য ব্যাধ-পত্নী শবরীর প্রতিক্ষার স্মৃতিতে ‘শবরীর প্রতীক্ষা’ বাগধারাটি ব্যবহৃত হয়। ঘুমকাতুরে যে কাউকে “কুম্ভকর্ণ” বলা হয়। কুম্ভকর্ণ ছিলেন রামায়ণ মহাকাব্যে বর্ণিত রাক্ষসরাজ রাবণের ভাই। কুম্ভকর্ণ একনাগাড়ে ছয় মাস ঘুমোতেন। মাঝে এক দিন আহার করার জন্য জাগতেন এবং আহার শেষ হলে পুনরায় ঘুমিয়ে পড়তেন। রাম-লক্ষণ-সুগ্রীব লঙ্কা আক্রমণ করলে রাবণ বহু অনুচর ও সহস্র হস্তী দ্বারা ধাক্কা দিয়ে কুম্ভকর্ণের ঘুম ভাঙিয়েছিলেন বা ‘অকাল বোধন’ করেছিলেন। হিন্দু পুরাণ মতে সপ্তর্ষির (মারীচি, অত্রি, অঙ্গিরস, পুলস্ত, পুলহ, ক্রতুজ, বশিষ্ঠ, প্রচেতস, ভৃগু ও নারদ) মধ্যে কলহসংঘটক হিসেবে খ্যাত ছিল নারদ। এই নারদ মুনির বাহন ছিল ঢেঁকি। তিনি ঢেঁকিতে চড়ে স্বর্গ ও মর্ত্যভূমে ঘুরে বেড়াতো। তাই ‘নারদের ঢেঁকি’র এর অর্থ হলো ‘বিবাদের বিষয়’। এমন আরো অনেক রয়েছে-‘গোবর গনেশ’, ‘নবমীর পাঠা’, ‘রাবনের চিতা’, ‘রাবনের গোষ্ঠী’, ‘ছাঁদনাতলা’ প্রভৃতি। বাংলা অভিধানে এমন হাজারো হাজারো শব্দে হিন্দু ধর্ম, পুরাণের ঐতিহ্য মিশে আছে। এ সবই সাহিত্যের সম্পদ, বাঙালী সংস্কৃতির অন্যতম উপাদান।

কেবল ভাষায় নয়, হিন্দু-মুসলমান সংস্কৃতির এই টানাপোড়নে আমরা বঞ্চিত হয়েছি ঔষধি গাছ তুলসী থেকে। সর্দ্দি, কাশি, ঠাণ্ডা লাগার প্রতিষেধক হিসেবে, কৃমিনাশক হিসেবে ঔষধ হিসাবে এই গাছের রস, পাতা এবং বীজ ব্যবহার করা হয়। তারপরেও বাড়ির আঙিনায় কোনদিনও একটা তুলসী লাগাতে পারিনি। শ্রদ্ধাঞ্জলি তৈরিতে আর সব ফুল থাকলেও রক্তজবার ব্যবহার ছিল নিষিদ্ধ কারণ কালীপূজায় রক্তজবা ব্যবহার করা হতো। এখানেই শেষ নয়- সংস্কৃতির এই টানাপোড়নে বাঙালি তার জাতীয় পোশাকের মধ্যে পাঞ্জাবি ধরে রাখতে পারলেও ধূতি খুলে লুঙ্গি পরতে বাধ্য হয়েছে।

ধর্ম ও সংস্কৃতি যখন পরস্পরকে লালন করে তখন তাকে আমরা ধর্মীয় সংস্কৃতি বলি। কোন বিশেষ ধর্ম পালনে যে সকল সংস্কৃতি জড়িত তা ঐ ধর্মের ধারক-বাহক হিসেবে বিবেচিত হতে পারে, তবে সে সকল সংস্কৃতি পালন করলেই ঐ ধর্ম পালন হয়ে যায় না। টুপি পরা ইসলামী সংস্কৃতি, অন্য ধর্মের কেউ টুপি মাথায় দিলেই সে মুসলমান হয়ে গেছে এমন ভাবার কোন যৌক্তিকতা নেই; তেমনিভাবে ‘নমস্কার’ শব্দের অর্থ ‘অভিবাদন’, কোন মুসলমান ‘নমস্কার’ বললে সে হিন্দু হয়ে যাবে এ তত্ত্ব গ্রহণযোগ্য নয়। ভাষা ধর্মীয় সংস্কৃতি প্রকাশের বাহন, ধর্মের পরিচায়ক নয়।