ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

 

ক’দিন আগে পত্রিকার একটি শিরোনাম চোখে পড়ে। ‘পুলিশ না ফেরেস্তা’- এস. আই আবেদ নামে তরুণ এক পুলিশ অফিসারের কর্তব্যনিষ্ঠা ও তার চেয়ে বড় কথা জরুরি রক্ত প্রয়োজন হওয়ায় অনন্যোপায় হয়ে তিনি নিজে রক্তদান থেকে শুরু করে রোগীর জরুরি ঔষুধপত্রের খরচও যোগান দিয়েছেন।(১) পুলিশি কর্তব্য পালনের পাশাপাশি তিনি একজন মানুষের দায়িত্বও পালন করেছেন। তিনি কোন ফেরেস্তা নন, শুধু পুলিশ নন, একজন মানুষও বটে। পুলিশ নূরের তৈরি ফেরেস্তা নয়, আগুনের তৈরি শয়তান নয়; মাটির তৈরী রক্তমাংশের মানুষ। আমাদের মতই মানুষ যাদের মানুষের মতই ভুল থাকবে, ভালো থাকবে, দোষ-ত্রুটি থাকবে আবার সততা-সাহসিকতাও থাকবে। ফেরেস্তাদের কাছে আমরা ভুল আশা করি না, শয়তানের কাছে আমরা ভালো আশা করি না; ভুল আর ভালো মিলেমিশে মানুষ যার সবকিছু আমরা মেনে নিতে প্রস্তুত থাকি। পুলিশকে মানুষ ভাবলেই তাদের দোষ-গুণ সবকিছু আমরা মানবীয় আঙ্গিকে বিচার-বিবেচনা করতে পারবো।এটাই করণীয়, এটাই কাম্য।

পুলিশের এমন মহৎ কাজের সংখ্যা নেহাত কম নয়। সিলেট মহানগর ট্রাফিক পুলিশের পরিদর্শক বদিউল আমিন চৌধুরী রাস্তায় কুড়িয়ে পাওয়া টাকার বাণ্ডিল মালিককে ফেরত দেবার জন্য উদ্যোগ নিয়েছিলেন। চট্টগ্রাম মহানগরীর খুলশী থানার এসআই শামসুর রহমান জাকির হোসেন রোডে কুড়িয়ে পাওয়া চৌষট্টি হাজার টাকার দুটি চেক ফেরত দেন। ৩য় আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের (এপিবিএন) নায়েক মো. নুরুন্নবী এবং ৫ম এপিবিএন এর হাবিলদার সোলায়মান কুড়িয়ে পাওয়া টাকা ভর্তি মানিব্যাগের মালিককে খোঁজ করে তা ফিরিয়ে দেন। নিরলস পরিশ্রম করে মাদকের স্বর্গরাজ্যের কুখ্যাতি থেকে সিএমপির বাকলিয়া থানাকে মুক্ত করেছিলেন ওসি মোহাম্মদ মহসিন, পিপিএম। এক কোটি টাকার ঘুষের প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়ে প্রায় ২০ কোটি টাকা মূল্যের স্বর্ণ উদ্ধার করে ব্যতিক্রমী এক উদাহরণ সৃষ্টি করেন চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের সদরঘাট থানার এসআই আনোয়ার হোসেন। সাত হাজার ডলার পাউন্ডের (প্রায় ১০ লাখ) লোভ স্পর্শ করতে পারেনি হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের এপিবিএনের কনস্টেবল শাকিল আহমেদকে। পাউন্ড ভর্তি একটি মানিব্যাগ কুড়িয়ে পেয়েও তিনি তা না লুকিয়ে মালিককে খুঁজে ফিরিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করেন।
সততার পাশাপাশি বীরত্বপূর্ণ কাজ, দক্ষতা, কর্তব্যনিষ্ঠায় পুলিশের অবদানও কম নয়। অনেকে দায়িত্বপালনের জন্য গুরুতর আহত হয়েছেন, পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন, এমনকি নিজের জীবন উৎসর্গও করেছেন। ঝিনাইদহের কোটচাঁদপুর থানার আজম মাহমুদ সেই সাহসী পুলিশ অফিসার যাকে সন্ত্রাসীরা ইট দিয়ে মাথা থেঁতলে দেয়ার পর মৃত ভেবে বালির বস্তার মত কোটচাঁদপুরের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া কপোতাক্ষ নদে ছুড়ে ফেলেছিল। তারপর তাঁকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নেয়ার পর চিকিৎসকরা জীবিত বলে ঘোষণা দেন। নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লায় এসআই ফরিদা আক্তার একাই জাপটে ধরে আটক করেন পেট্রোল বোমাসহ দুই পিকেটারকে। বিদ্যুতের ট্রান্সফরমার চোরদের ঢাকা থেকে ধাওয়া করে মুন্সীগঞ্জের গজারিয়া থানা এলাকায় আটক করার পরে চোরদের রডের আঘাতে মৃত্যুবরণ করেন ডিবি পুলিশের উপ-পরিদর্শক শরীফুল ইসলাম খান। লালমনিরহাট থানার এসআই আসাদুজ্জামান মিলন নরসিংদী বস্ত্রালয় হতে চুরি হওয়া কাপড়ের গাইড বাঁচাতে গেলে দুর্বৃত্তরা তাঁকে আঘাত করে চলন্ত গাড়ি থেকে সড়কে ছুড়ে ফেলে দেয়। হাসপাতালে নয়দিন মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ে অবশেষে তিনি হেরে যান। মাঝরাতে টহলরত অবস্থায় ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাড়কের সীতাকুণ্ডেসড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হন পুলিশ সার্জেন্ট কবির হোসেন।

কক্সবাজার উখিয়া থানার এক নির্ভিক ও সাহসী পুলিশ কনষ্টেবল মোহাম্মদ বোরহান ঐ থানায় যোগদানের পর থেকে বেশ কয়েকজন কুখ্যাত ডাকাত গ্রেপ্তার, অবৈধ অস্ত্র ও গুলি উদ্ধার, দাগী ও দীর্ঘ দিনের সাজাপ্রাপ্ত আসামী গ্রেপ্তারে ভুমিকা রেখে পুলিশ বিভাগকে যারপরনাই প্রশংসীত করেন। অন্যান্যদের মধ্যে অর্পিত স্বীয় দায়িত্ব-কর্তব্য পালনে নিহত হন নারী কনস্টেবল আকলিমা বেগম ও মামুনী খাতুন, অগ্নিদগ্ধ হয়েছেন কনস্টেবল মোর্শেদ আলম, গুরুতর আহত হন সার্জেন্ট গোলাম মাওলা, নারী কনস্টেবল শাহানাজ পারভীন, জিয়াসমিন, লিজা আক্তার, আলফা সুলতানা, সালমা আক্তার, সীমা, ফরিদা খাতুন, মনিকা আক্তার, কাবিরী নন্দী ও কনস্টেবল এশারুল প্রমুখ। নারায়ণগঞ্জের উপনির্বাচনে আইনশৃংখলা রক্ষার দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে মদনপুর ও ধামকুর ইউনিয়নের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা এএসপি বসিরউদ্দিন নানামূখী প্রতিকূলতার মাঝেও তাঁর কর্তব্যনিষ্ঠার পরিচয় দিয়েছিলেন। পুলিশ শুধু দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা রক্ষা, অপরাধ দমনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও প্রশংসনীয় ভূমিকা রেখে যাচ্ছে তা নয় দেশের সীমানা পেরিয়ে আজ বিশ্বের বিভিন্ন যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশে শান্তি প্রতিষ্ঠায় জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে এ বাহিনীর সদস্যগণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করছে।

অন্যান্য অনেক সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারিদের মতো পুলিশের কর্মকাণ্ডও বিতর্কের উর্দ্ধে নয়। এটি কাম্যও নয় কারণ পুলিশ ন্যায় করলেও সেই ন্যায়ের একটি প্রতিপক্ষ থাকবে যারা নিজেদেরকে নির্দোষ দাবী করবে এবং এই ন্যায়ের বিরুদ্ধে ভ্রান্তিমূলক নেতিবাচক প্রচারণা করবে। রূঢ় বাস্তবতায় এটাই স্বাভাবিক। ভাগ্য খারাপ হলে যে মানুষ ঈশ্বরকেও দোষারূপ করতে ছাড়ে না নিজের লোকসান সেই মানুষ পুলিশকে ছাড় দেবে এটা ভাবার কোন কারণ নেই। পুলিশের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ কম হলেও ঢালাওভাবে অভিযোগ অনেক। এদের বিরুদ্ধে যাই বলা হোক না কেন সমাজে তার একটা বিশ্বাসযোগ্যতা আছে। এমন অবস্থা যেমন একদিনে তৈরি হয় হয়নি তেমনি রাতারাতি তা বদলানো যাবেও না, আশা করাও ঠিক না। ঢাকা মহানগর পুলিশ কমিশনার বেনজীর আহমেদ বলেছিলেন, পুলিশ কোন গ্রহের অধিবাসী নয়, তাঁরা এ সমাজেরই অংশ। সমাজের শতভাগ মানুষ যেদিন সৎ হবে কেবল সেদিনই শতভাগ সৎ পুলিশ পাওয়া যাবে।আমার অবশ্য এখানে একটু ভিন্নমত আছে- শতভাগ মানুষ সৎ হলে সৎ-অসৎ কোন পুলিশেরই আর প্রয়োজন হবে না। তবে দুভার্গ্যজনক হলে সত্য যে পুলিশের কর্মকাণ্ড নিয়ে যত বিতর্ক হয়, বিতর্ক সৃষ্টির কারণ নিয়ে, কারণের ব্যাখ্যা নিয়ে, সমাধান নিয়ে ততটা বিতর্ক হয় না।

পুলিশের ভাবমূর্তি বদলাচ্ছে, বদলাতেই হবে কারণ বদলানোর উপায় আমাদের সবারই জানা আছে। ‘স্যালুট টু পুলিশ’ আয়োজিত ‘কথামালা, আইন মান্যতার সংস্কৃতি এবং আমাদের স্বপ্নের পুলিশ’ শীর্ষক এক সেমিনারে যোগাযোগমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের সেই জানারই প্রতিধ্বনি করলেন- রাজনীতিবিদ ভালো হলেই দেশ ভালো হয়ে যাবে, পুলিশও ভালো হবে। স্বপ্নের পুলিশ পেতে হলে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন সৎ ও যোগ্য রাজনীতিবিদ। কারণ, রাজনীতিবিদেরাই দেশের সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করেন।(২)
======
১। ‘পুলিশ না ফেরেস্তা!’, সময়ের কণ্ঠস্বর, ০৩ মে ২০১৫
২। ‘রাজনীতিবিদ ভালো হলেই পুলিশ ভালো হবে’, দৈনিক প্রথম আলো, অক্টোবর ০৬, ২০১৩