ক্যাটেগরিঃ দিবস প্রসঙ্গ

 

maa-o-chand

মা দিবস প্রচলনের পেছনে যে মার্কিন মহিলার অবদান অনস্বীকার্য, সেই আনা জার্ভিস নিজে কোনদিন মা ছিলেন না। আনা ছিলেন সমাজকর্মী অ্যান রেভেস জার্ভিসের দশম সন্তান। মায়ের নারী সেবামূলক কর্মকাণ্ডের জন্য সে বরাবরই অ্যানের অনুরক্ত ছিলেন। অসুস্থ হয়ে পড়লে আনা নিবিড়ভাবে মায়ের সেবা-শশ্রূষা শুরু করেন। মায়ের মৃত্যুর তিন বছর পরে ১৯০৮ সালে অনানুষ্ঠানিকভাবে আমেরিকার ভার্জিনিয়াতে তিনি তাঁর মায়ের স্মরণসভার আয়োজন করেন। তাঁর উদ্যোগে এ বছরই মার্কিন কংগ্রেসে ঐ দিবসটিকে ‘মা দিবসে’র মর্যাদা দিয়ে সরকারি ছুটির দিন হিসেবে গ্রহণ করার জন্য প্রস্তাব তোলা হয়। তবে মার্কিন কংগ্রেস তা প্রত্যাখান করে। আনা থেমে থাকেননি, হালও ছাড়েননি। অবশেষে ১৯১৪ সালে মার্কিন রাষ্ট্রপতি উড্রো উইলসন এক ঢিলে দুই পাখি মারলেন। তিনি মে মাসের দ্বিতীয় রবিবারকে মা দিবসের মর্যাদা দিয়ে বাড়তি একদিন সরকারি ছুটিও রক্ষা করলেন। সরাসরিভাবে না হলেও তাৎপর্যের আঙ্গিকে এ দিবসটির পেছনে গ্রিক দেবী ‘সিবেলে’র উদ্দেশ্যে পালিত আচার-অনুষ্ঠান, রোমানদের ‘হিলারিয়া’ উৎসব এবং খ্রিস্টানদের ‘মাদারিং সানডে’ অনুষ্ঠানেরও প্রভাব রয়েছে। পরবর্তীকালে ক্রমে ক্রমে সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে মা দিবসের মহাবার্তা। দিবসটির মূলমন্ত্র হলো মা, মাতৃত্ব, মাতৃত্বের বন্ধন এবং পরিবার ও সমাজে মায়ের অবদানের স্বীকৃতি ও সম্মান প্রদর্শন। পাশ্চাত্য সংস্কৃতি থেকে বাঙালি সংস্কৃতিতে আত্তীকৃত ‘ভালোবাসা দিবস’ নিয়ে আশাতীত বিতর্কের সৃষ্টি হলেও মায়ের আর্শীবাদে পুরোপুরিভাবে খ্রিস্টান প্রবর্তিত মা দিবস নিয়ে আমাদের সমাজে আশানুরূপ কোন বিতর্কের অবতারণা ঘটেনি, এটাই একটি ব্যতিক্রম।

১৯২০ সাল পার হতে না হতেই মা দিবস ‘হলমার্ক হলিডে’ বা ‘বাণিজ্যিক দিবস’ বনে যায়। শুরু হয় এ দিবসকে ঘিরে কার্ড, চকলেট ও উপহার সামগ্রী বাণিজ্য। জার্ভিস নিজেই এহেন কর্মকাণ্ড নিয়ে খুবই অসন্তুষ্ট ছিলেন। তাই তিনি দুঃখ করে একদিন বলেছিলেন-
“A printed card means nothing except that you are too lazy to write to the woman who has done more for you than anyone in the world. And candy! You take a box to Mother—and then eat most of it yourself. A pretty sentiment.” পাশ্চাত্য সমাজে মা দিবসের গুরুত্ব অপরিসীম। কারণ ওদের পারিবারিক বন্ধন অত্যন্ত শিথিল, বয়োঃপ্রাপ্ত সন্তানেরা পিতামাতাকে নির্বাসন দিয়ে স্ব স্ব পারিবারিক জীবন গড়ে তুলতে ভালোবাসে। প্রয়োজন ছাড়া ওদের দেখা-সাক্ষাৎ হয় না বললেই চলে। তাই, পিতামাতার সান্নিধ্যে আসার জন্য, তাদের সাথে একদিন সময় কাটানোর জন্য ওদের পিতা দিবস, মাতা দিবস বা সন্তান দিবসের আবশ্যকতা অনুভূত হয়। সারা বছর বাবা-মাকে কিছু দিতে না পারলে, কিছু না দিলে এই দিনে ওরা মাকে উপহার দেয়, মায়ের সাথে দিন কাটায়, গাড়ির লাইসেন্স যেভাবে ফি-বছর নবায়ন করা হয় সেভাবে ভগ্নপ্রায় পারিবারিক সম্পর্ককে এ রকম কয়েকটি দিনের ছুতোয় তারা নবায়ন করে নেয়।

আমাদের দেশে অবশ্য ভগ্নপ্রায় পারিবারিক সম্পর্কের নবায়নের জন্য মা দিবসের প্রসার ঘটেনি, প্রসার ঘটেছে এ দিবসটিকে বাণিজ্যিকীকরণের সূত্র ধরে। এ দিবসকে ঘিরে বাণিজ্যে সবচে’ এগিয়ে আছে মোবাইল ফোন কোম্পানিগুলো। দিবসটি আসতে না আসতেই এরা মায়ের প্রতি আমাদের ভালোবাসাকে পুঁজি করে নানা ধরণের ইমোশনাল ব্ল্যাকমেইলিং টাইপের বিজ্ঞাপনচিত্র নির্মাণ করে। আমরা সেগুলো পছন্দ করিও বটে। কেননা, সন্তান হিসেবে মাকে তার প্রাপ্য সম্মান আমরা কতটুকু দিচ্ছি, দিতে পারছি বা দেয়া উচিত সেটা নিয়ে আমাদের মধ্যে যুক্তি- তর্কের অবকাশ থাকলেও, মা শব্দটা কানে আসলে আর মায়ের প্রতি ভালোবাসা দেখিয়ে সুড়সুড়িমূলক বিজ্ঞাপনচিত্র দেখলেই আমাদের সবার নাড়ীর ভেতরে যে টানটা অনুভূত হয় তা কোনভাবেই অস্বীকার করার উপায় নেই। আর আমাদের মাতৃভক্তির ঐ নাড়ীটি টেনে টেনে ফোন কোম্পানিগুলো তড়তড় করে সাফল্যের শিখরে পৌঁছে গেছে।

মা দিবসের কী প্রভাব আছে আমাদের জীবনে? যে যুগে মা দিবস ছিল না তখন বায়েজিদ বোস্তামি অসুস্থ ঘুমন্ত মায়ের শিয়রে গ্লাস ভর্তি পানি নিয়ে দাঁড়িয়ে থেকে রাত কাটিয়েছেন। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর মায়ের চিঠি পেয়ে খরস্রোতা নদী পার হয়েছেন সাঁতার কেটে। হযরত ওয়ায়েজ কুরনী মাকে গলায় ঝুলিয়ে বহন করেছেন দীর্ঘদিন। হিন্দু ধর্মে শ্রবণ কুমার অন্ধ মা-বাবাকে কাঁধে বহন করে গয়া-কাশির উদ্দেশে গিয়েছিলেন। মা দিবস সম্পর্কে বিন্দুমাত্র না জেনে বাগেরহাট জেলার মোড়েলগঞ্জ উপজেলার চণ্ডিপুর গ্রামের বীরেন্দ্রনাথ মজুমদার শতবর্ষী অসুস্থ মা উষা রানী মজুমদারকে মাথায় বহন করে ১০ কি.মি হেঁটে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যেতেন। অন্যদিকে, আধুনিক সভ্যতায় মা দিবসের প্রসারের সাথে সাথে বৃদ্ধাশ্রমের প্রচলন হয়েছে, সন্তানের হাতে পিতা-মাতা নৃশংসভাবে খুন হয়েছে, হচ্ছে, হয়তো আরো হবে। সন্তান হয়ে দিনের পর দিন ধরে বাবা-মাকে হত্যার পরিকল্পনা করেছিল ঐশী। পরিশেষে একদিন বেশি করে কফির সাথে চেতনানাশক খাইয়ে পরিকল্পনা মাফিক হত্যা করে তার জন্মদাতা মা-বাবাকে। মা দিবস নিয়ে রমরমা ব্যবসার এই যুগে এটাই তো আমাদের প্রাপ্তি! তাই নয় কি?

আমরা মা দিবস চাই না, ফেসবুকে, টুইটারে মায়ের ভালোবাসা দেখতে চাই না, দেখাতেও চাই না। মাকে ভালোবাসতে চাই, মায়ের কোলে মা রেখে ঘুমুতে চাই, সকাল-রাতে মায়ের পা ছুঁয়ে আর্শীবাদ নিতে চাই। রোগে মাকে চাই, শোকে মাকে চাই; সুখে মাকে চাই, আনন্দে মাকে চাই- মায়ের ভালোবাসা চাই। ব্রদ্ধাশ্রমে নয়, আত্মাশ্রমে মাকে চাই। যে মায়ের কোলে চড়ে পৃথিবীতে এসেছি, হাসতে শিখেছি, কাঁদতে শিখেছি, বাঁচতে শিখেছি, সেই মায়ের কোলেই থাকতে চাই। মাকে নিয়েই থাকতে চাই।

মা, তুমি কোথায়? মা, তোমাকে ভালোবাসার জন্য একটি দিন নির্ধারণ করেছি, তুমি আমাদের ক্ষমা করো।