ক্যাটেগরিঃ প্রযুক্তি কথা

বিশ্ব ‘জ্ঞান বিতরক অর্থনীতি’র (knowledge economy) মূল চালিকা শক্তি হলো ইন্টারনেট। বিশ্ব জনসংখ্যার ৮০-৯০ শতাংশ মানুষ টুজি, থ্রিজি বা ফোরজি নেটওয়ার্কের আওতায় বসবাস করলেও মাত্র এক-তৃতীয়াংশের সামান্য বেশি (২.৭ বিলিয়ন) মানুষ বর্তমানে ইন্টারনেট সুবিধার আওতাধীন। এ সংখ্যা বৃদ্ধির বাৎসরিক হার মাত্র ৯ শতাংশ, যা মোটেও আশাব্যঞ্জক নয়। বিশ্বব্যাপী ইন্টারনেট সুবিধা প্রসারের মাধ্যমে অন্যান্য সুবিধা ব্যতিরেকে বিশ্বে আরও ১৪০ মিলিয়ন নতুন চাকুরির সুবিধা তৈরি করা সম্ভব, সম্ভব ১৬০ মিলিয়ন মানুষকে দারিদ্র থেকে উত্তরণ ঘটানো। এ লক্ষ্যেই ফেসবুক চালিত ইন্টারনেট.ওআরজি (internet.org) নামক একটি ‘অলাভজনক’ প্রতিষ্ঠান কাজ করে যাচ্ছে। প্রাথমিকভাবে বিশ্বের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কাছে বিনামূল্যে ন্যূনতম ইন্টারনেট সেবা পৌঁছাতে তাঁরা অঙ্গীকারাবদ্ধ। ইতোমধ্যে আফ্রিকা, দক্ষিণ আমেরিকা ও এশিয়ার ফিলিপাইনস, ভারত ও বাংলাদেশে তাঁদের কার্যক্রম বিস্তৃত হয়েছে।

বাংলাদেশের স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছর পূর্তিতে ডিজিটাল যন্ত্রপাতি এবং তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি, অর্থাৎ আইসিটির বহুল ব্যবহারের মাধ্যমে বাংলাদেশকে ২০২১ সালে সমৃদ্ধশালী রাষ্ট্রে পরিণত করা বর্তমান সরকারের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। এ লক্ষ্যে গত কয়েক বছরে টেলিকমিউনিকেশন ও তথ্য-প্রযুক্তি খাতে বাংলাদেশের অগ্রযাত্রা ধারণাতীত। ২০০৯ সালের ৩০ শতাংশ টেলিডেনসিটি বৃদ্ধি পেয়ে ২০১৪ সালে ৭৮ শতাংশে দাড়িয়েছে যা ২০২১ সাল নাগাদ ৯০ শতাংশে এ উন্নীত হবার লক্ষ্যে এগিয়ে যাচ্ছে। সরকারী তথ্য মতে, ২০০৯ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা ৩.২ শতাংশ থেকে ১২ শতাংশে উন্নীত হয়। বর্তমানে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা ৪ কোটি ৪০ লাখ যা মোট জনসংখ্যার ২৭ শতাংশ (অবশ্য মার্ক জুকারবার্গ ফেসবুকে সম্প্রতি তাঁর এক পোস্টে বলেছেন বাংলাদেশে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা জনসংখ্যার ১০ শতাংশের কম)। ক্রমান্বয়ে অগ্রসরমান টেলিডেনসিটি ও ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা আমাদের জিডিপি প্রবৃদ্ধি, রপ্তানি ও কর্মসংস্থানের উপর সরাসরি ইতিবাচক প্রভাব রাখছে। সাধারণভাবে উন্নয়নশীল দেশে টেলিডেনসিটি ১০ শতাংশ বৃদ্ধি পেলে জিডিপি ০.৬ শতাংশ বৃদ্ধি পায় এবং ইন্টারনেট ব্যবহারকারী সংখ্যা ১ শতাংশ বৃদ্ধি পেলে রপ্তানি ৪.৩ শতাংশ বৃদ্ধি পায়। আশা করা যায় যে, এ অগ্রগতি অব্যহত থাকলে ২০২১ সাল নাগাদ বাংলাদেশের জিডিপি ২.৬ শতাংশ বৃদ্ধি পাবে। এছাড়া, ৪ লক্ষ নতুন ব্যবসা এবং ১ লক্ষ ২৯ হাজার নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে।

বাংলাদেশের আপামর জনসাধারণকে বিশেষভাবে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে তথ্য-প্রযুক্তির বলয়ে অঙ্গীভূত করার জন্য বাংলাদেশ সরকার ও ফেসবুক চালিত ইন্টারনেট.ওআরজি এদেশে সীমিতাকারে বিনামূল্যে ইন্টারনেট সেবা চালু করেছে। এই সেবা কার্যক্রম মোবাইল অপারেটরের উপর নির্ভরশীল বিধায় ইন্টারনেট.ওআরজির সাথে রবি আজিয়াটা লিমিটেড বা সংক্ষেপে ‘রবি’ চুক্তিবদ্ধ হয়ে একযোগে কাজ করছে। সেই অর্থে এই সেবার নাম ‘রবির সিমে বিনামূল্যে সীমিত ইন্টারনেট সেবা’ বলতে অত্ত্যুক্তি হবে না। বিটিআরসির তথ্য মতে, বাংলাদেশের ছয়টি মোবাইল অপারেটরের মধ্যে গ্রাহক সংখ্যার তালিকায় সর্বোচ্চ গ্রামীণ ফোন, তৃতীয় রবি এবং সর্বনিম্ন হলো আমাদের ফোন টেলিটক। গ্রাহক সংখ্যায় গ্রামীণ ফোন রবির দ্বিগুণ এবং টেলিটকের ১৩ গুণ। এ হিসাব-নিকাশে এ কার্যক্রমে গ্রামীণ ফোনকে সংযুক্ত করা গেলে বা সকল অপারেটরকে একত্র করা গেলে এ সেবার উদ্দেশ্য সাধন অনেকটাই সহজসাধ্য হয়ে যেত। বর্তমান অবস্থার প্রেক্ষিতে এ সেবার সাফল্য নির্ভর করছে সেই সংখ্যার উপর যে সংখ্যা বর্তমানে রবির গ্রাহক সংখ্যা প্লাস যে সংখ্যক লোক ভবিষ্যতে অন্য অপারেটরের গ্রাহক সিম বদলিয়ে রবির গ্রাহক হবে বা অন্য সিমের পাশাপাশি রবির সিম ব্যবহার করবে। যদি এমনটা হতো যে রবির পরিবর্তে টেলিটক এই চুক্তিবদ্ধ হতো তবে আমাদের ফোন মূমুর্ষূ টেলিটক তার বর্তমান দূর্দশা কাটিয়ে ওটার একটি পথ খুঁজে পেত। পাশাপাশি বৃদ্ধি পেত জাতীয় রাজস্ব আয়।

বিনামূল্যে ইন্টারনেট সেবা এ্যানড্রয়েড অ্যাপ প্রযুক্তি নির্ভর, অর্থাৎ এ সেবা গ্রহণের জন্য একটি স্মার্ট ফোন আবশ্যক। এ কথা নিঃসন্দেহে বলা যায় যাদেরকে লক্ষ্য করে এ সেবা চালু করা হয়েছে সেই দরিদ্র প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কাছে এ সেবা পৌঁছানোর পথে স্মার্ট ফোন একটি বাঁধা হয়ে দাড়ানোর আশঙ্কা রয়েছে। যতদিন না তাঁরা একটি মোটামুটি মানের স্মার্ট ফোন হাতে পাচ্ছেন না ততদিন তাঁরা এ সেবা থেকে বরাবরের মতোই বঞ্চিত থাকবেন। এ বিষয়ে আমাদের যৌক্তিক সমাধান খুঁজে বের করার প্রয়োজনীয়তাকে কোনভাবেই অস্বীকার করার জো নেই।

বিনামূল্যে ইন্টারনেট সেবার আওতায় রবির গ্রাহকরা বর্তমানে ২৫টি ওয়েবসাইট ব্রাউজ করতে পারবেন। মহামতি ফেসবুক ছাড়াও এ তালিকায় রয়েছে বহুল প্রচারিত কতক পত্রিকা, সরকারি তথ্যাবলি, চাকরির খোঁজ-খবর, ই-কমার্স, অনলাইন মার্কেটপ্লেস, শিক্ষা সম্পর্কিত তথ্য, নারী স্বাস্থ্য, জরুরি নম্বর, ও আবহাওয়া বার্তার ওয়েবসাইট। ফাইল পাঠানো সুবিধাসহ জিমেইল, ইয়াহু থাকলে বোধহয় আরও একটু ভালো হতো। বলা বাহুল্য, যে দেশে ‘জন্মহারের চেয়েও’ দ্রুত গতিতে ‘প্রতি ১২ সেকেন্ডে একজন ফেইসবুকে প্রোফাইল খুলছে’ সে দেশে এ সেবার সিংহভাগটাও ফেসবুক দখল করে নেবে এটাই স্বাভাবিক। ফেসবুকের এই অবৈধ পরিমাণ ব্যবহারের একটা কুফল যেমনিভাবে আমাদের কোমলমতি ছাত্রছাত্রীদের দিকে ধেয়ে আসতে পারে, তেমনিভাবে তা রাষ্ট্রীয় সংবেদনশীল ইস্যুতে নেতিবাচক ভূমিকা নেবার ক্ষমতা রাখে। ডিজুস ও জয়ের প্যাকেজ বন্ধ করে দেওয়ার কথা আমাদের মনে আছে আবার মাঝে মধ্যে ফেসবুক বন্ধ করার নজিরও আমরা ভুলিনি।

বিনামূল্যে ইন্টারনেট সেবায় ফেসবুকে অবাধ প্রবেশই হতে পারে শুভঙ্করের ফাঁকির নামান্তর। ফেসবুকের মূল চটক হলো ছবি আপলোড, শেয়ার, ভিডিও কনটেন্ট, অডিও কনটেন্ট, ও বিভিন্ন লিঙ্কের রমরমা উপস্থিতি। এসব রঙ-বেরঙের লিঙ্ক শিক্ষিত মানুষের চেয়ে অশিক্ষিত, স্বল্প-শিক্ষিত এবং স্কুল পড়ুয়া যারা এ সেবায় নতুন অন্তর্ভূক্ত হবেন, যারা এ সেবার মূল লক্ষ্য তাদেরকেই বেশী আকর্ষণ করবে। তারা ভুলে যাবেন সেই ফ্রি লিস্ট, ভুলে যাবেন যে (যদি ডাটা প্যাক না থাকে) তাদেরকে প্রতিটি ক্লিকের সাথে সাথে ‘পে-পার-ইউজে’র (প্রতি কিলোবাইট দেড় পয়সা অর্থাৎ ১ মেগাবাইট ১৫ টাকা) ভিত্তিতে চার্জ গুণতে হচ্ছে। কিলোবাইটের হিসেবে যদি কেউ রবি থেকে এক হাজার মেগাবাইট (১ জিবি) ব্যবহার করেন তবে তাকে খরচ করতে হবে ১৫ হাজার টাকা, অথচ রবির নির্ধারিত ইন্টারনেট প্যাকেজে এক জিবির বর্তমান মূল্য মাত্র ২৭৫ টাকা। ব্যবসার চেয়ে দেখি ফ্রি সেবার ব্যবসাই ভালো। বন্ধুর সিগারেটে ফ্রি টান দিতে দিতে মানুষ যেভাবে সিগারেটে আসক্ত হয়, বিনামূল্যের ইন্টারনেট সেবায় তারাও ফেসবুকে আসক্ত হবেন। তারপর ঘন ঘন রবির সিম রিচার্জ করবেন আর রবির ডাটা প্যাক কিনবেন। ফলাফলটা এমন হতে পারে যে, যে দিন ইন্টারনেটের এ সেবা ফ্রি ছিল না মোবাইল বাবদ তাদের সেদিনকার খরচের চেয়ে বিনামূল্যে ইন্টারনেট সেবার যুগে তাদের খরচ আগের তুলনায় অনেক গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। কারণ তারা রবির সিম কিনবে, স্মার্ট ফোন কিনবে, ফোনের সাথে সুদৃশ্য কাভারও কিনবে, ঘন ঘন রবির সিম রিচার্জ করবে, রবির ডাটা প্যাক কিনবে…আরও কত কী! আশঙ্কা এই যে, খরচের অঙ্ক যতই উপরের দিকে যাবে সরকারের বিনামূল্যের ইন্টারনেট সেবার এ মহতী উদ্যোগের উদ্দেশ্য ও লক্ষ্যের প্রতি মানুষের আস্থা ও বিশ্বাস ততটাই নিচের দিকে নামতে থাকবে। এমন দিন যেন কখনোই না আসে যে দিন খরচ বৃদ্ধির কারণে বিনা খরচের ইন্টারনেট সেবার এ মহতী উদ্যোগ ভেস্তে যায়। রবি কর্তৃপক্ষের জন্যও চ্যালেঞ্জ রয়েছে। তাদের বর্তমান ডাটা প্যাক ব্যবহারকারীগণ এই বিনামূল্যে সেবার চক্করে পড়ে তাদের কাঙ্ক্ষিত ইন্টারনেট গতি হারাতে পারেন। এমন না হয় যে তারা স্বীয় গ্রাহকগণকেই হারাতে শুরু করেছেন।

বিনামূল্যে ইন্টারনেট সেবাকে আরো ফলপ্রসূ করতে কিছু পরিপূরক ভাবনা অবশ্যই থাকতে পারে। রবির সিমে বিনামূল্যে সীমিত ইন্টারনেট সেবা প্রদানের পাশাপাশি আমরা ইন্টারনেট ব্যবহারের ক্ষেত্রে ১৫ শতাংশ ভ্যাট প্রত্যাহার নিয়ে ভাবতে পারি, ব্রডব্যান্ডের কাভারেজ, গতি বাড়াতে পারি, ভাবতে পারি ইন্টারনেট ব্যবহারের খরচ সর্বনিম্ন পর্যায়ে রাখার ব্যবস্থা নিয়েও। প্রয়োজনীয় জনগুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলিকে ফ্রি ওয়াই-ফাই সেবার আওতায় এনে ইন্টারনেট সেবাকে আরো অধিকতর সহজলভ্য করা যেতে পারে।

বর্তমানই অনাগত ভবিষ্যৎ শঙ্কা নিয়ে চিন্তা করার শ্রেষ্ঠ সময়- সেবা যেন কখনও শোষনের রূপ গ্রহণ না করে, এটাই আমাদের একান্ত কাম্য।

=========

সংযোজনী- তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের প্রতিমন্ত্রী জুনায়েদ আহমেদ পলকের অনুরোধে রবির সাথে বিনামূল্যের ইন্টারনেট সুবিধা চালু করার ঘোষণা দিয়েছে গ্রামীণফোন এবং টেলিটক। ( দৈনিক যুগান্তর, ১৮ মে ২০১৫)

 লেখকের ফেসবুক পেইজ- https://www.facebook.com/VuianAlauddin