ক্যাটেগরিঃ চিন্তা-দর্শন

বাংলার ‘বিষাক্ত’ বোঝাতে ইংরেজিতে সাধারণত দু’টি শব্দ ব্যবহৃত হয়- ‘পয়জনাস’ (poisonous) ও ‘ভেনামাস’ (venomous)।‘পয়জনাস’ হলো সেই সকল প্রাণি যাদেরকে ভক্ষণ করা হলে বা স্পর্শ করলে অন্য প্রাণির শরীরে বিষক্রিয়া শুরু হয়।সেজন্য কোন খাবার খেয়ে আমাদের বদহজম হলে আমরা তাকে ‘ফুড পয়জনিং’ বা খাদ্যে বিষক্রিয়া বলে থাকি।অন্যদিকে, ‘ভেনামাস’ সেই সকল প্রাণি যারা অন্য প্রাণির দেহে কামড়ে, হুল/কাঁটা ফুটিয়ে বিষ প্রবেশ করায়।প্রাণিকূলের মধ্যে কোনটি সবচেয়ে বিষাক্ত সেটি নিয়ে যথেষ্ট মতভেদ আছে।একেক গবেষণায় একে প্রাণিকে সবচে’ বিষাক্ত বলে নির্ধারণ করা হয়েছে।বিষের ভিত্তিতে সকল প্রাণির যৌথ কোন তালিকা সুনির্দিষ্ট না হলেও প্রাণির ধরণভেদে এ তালিকা করা যেতে পারে।

পয়জন ডার্ট ফ্রগ

পয়জন ডার্ট ফ্রগ

পাফার ফিস

পাফার ফিস

‘পয়জনাস’ প্রাণির মধ্যে সবচেয়ে শুরুতে যার নাম আছে তা হচ্ছে এক ধরণের ব্যাঙ। ‘পয়জন ডার্ট’ নামের এই ব্যাঙ পাওয়া যায় মধ্য ও দক্ষিণ আমেরিকায়। আমেরইনদিয়ানরা (দক্ষিণ আমেরিকার আদিবাসী) এই ব্যাঙের চামড়ার নীচে জমে থাকা বিষ দিয়ে বিষাক্ত তীর বা বাণ তৈরী করে বলে একে ‘পয়জন ডার্ট ফ্রগ’ বলে।এ তালিকার দ্বিতীয় নামটি হলো ‘ফুগু’ (Fugu) বা ‘পাফার’ (Puffer) মাছ।এটি আমাদের দেশের টেপা মাছের মতো।এদের শরীরে থাকা বিষের তীব্রতা সায়নাইডের চেয়েও কয়েক শ’ গুণ বেশী এবং একটি মাছের শরীরে যে পরিমাণ বিষ থাকে তা দিয়ে ত্রিশ জন পূর্ণ-বয়স্ক মানুষের মৃত্যু ঘটানো সম্ভব।

ইনল্যান্ড তাইপান

ইনল্যান্ড তাইপান

কিং কোবরা

কিং কোবরা

ব্ল্যাক মাম্বা

ব্ল্যাক মাম্বা

‘ভেনামাস’ প্রাণিকূলে সরীসৃপের মধ্যে সবচেয়ে বিষাক্ত হলো অস্ট্রেলিয়ার ‘ইনল্যান্ড তাইপান’ (Inland Taipan) সাপ। এদেরকে ‘ক্ষুদ্র-আঁশের সাপ’ও (small-scaled snake) বলে। অস্ট্রেলিয় আদিবাসীদের কাছে সাপটি ‘দানদারাবিল্লা’ (Dandarabilla) নামে পরিচিত। বলা হয়ে থাকে, এই সাপ এক দংশনে যে পরিমাণ বিষ নির্গত করে তাতে অনায়াসে শতাধিক পূর্ণ-বয়স্ক মানুষের মৃত্যু ঘটা সম্ভব। কোনরূপ প্রতিষেধক ব্যবস্থা না নিলে এই সাপে দঃশনের সময় থেকে মৃত্যুর দূরত্ব মাত্র ৪০-৪৫ মিনিট। এরা ঋতুর সাথে রঙ বদলায়- গ্রীষ্মে জলপাই রঙের আর শীতে ধূসর। আফিকার কালো ‘মাম্বা’ (Mamba) (নামে কালো হলেও এরা ধূসর রঙের হয়ে থাকে) বা দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার সুদীর্ঘ ‘কিং কোবরা’র মতো এরা ক্ষিপ্র ও আক্রমণাত্মক নয়। ভয়াবহ রকমের বিষাক্ত এই সাপ সচরাচর মানুষের সান্নিধ্যে আসতে চায় না, আক্রমণও করতে চায় না।

বক্স জেলিফিস

বক্স জেলিফিস

অমেরুদণ্ডী জলজের মধ্যে সবচে’ বিষাক্ত এক ধরণের জেলিফিস। মতান্তরে একে পৃথিবীর সবচেয়ে বিষাক্ত প্রাণি হিসেবে ধরা হয়ে থাকে। ‘নাইদারিয়া’ (Cnidaria) গোত্রভূক্ত এ প্রাণিটির নাম ‘বক্স জেলিফিস (Box Jellyfish)’। একে ‘সামুদ্রিক কাঁটা’ও বলা হয়। হারপুনের মতো ক্ষুদ্র এক ধরণের কাঁটা দিয়ে এরা অন্য প্রাণির দেহে হুল ফুটিয়ে বিষ নির্গত করে। অস্ট্রেলিয় উপকূলে এদের আধিক্য বেশী।

ব্রাজিলিয়ান ওয়ানডারিং স্পাইডার

ব্রাজিলিয়ান ওয়ানডারিং স্পাইডার

অস্ট্রেলিয়ান ফানেল-ওয়েব স্পাইডার

অস্ট্রেলিয়ান ফানেল-ওয়েব স্পাইডার

মাকড়াবর্গীয় কীটের মধ্যে সবচেয়ে বিষাক্ত হলো ব্রাজিলের ‘ওয়ানডারিং’ (wandering) বা যাযাবর মাকড়সা ও অস্ট্রেলিয়ার ‘ফানেল-ওয়েব’ (funnel-web) মাকড়সা। ‘ওয়ানডারিং’ মাকড়সা কলা গাছে বেশী বিচরণ করে বলে একে ‘কলা’ মাকড়সাও বলে। এর কামড় এতটাই বিষাক্ত যে এর ফলে মানুষ নির্বীজ হয়ে যেতে পারে। ‘ফানেল-ওয়েব’ (Funnel-web) মাকড়সা সাধারণভাবে শিশুদের বেশী আক্রমণ করে।

মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আমেরিকার মরুভূমির প্রাণি ‘ডেথ স্টকার’ (Death Stalker) বিষে বিছাকূল শিরোমণি । এর কামড়ে সুস্থ মানুষের মৃত্যুর আশঙ্কা কম হলেও শিশু, বয়স্কদের ক্ষেত্রে মৃত্যুর আশঙ্কা অনেক বেশী। ‘মার্বেলড কোন’ নামক এক ধরণের শামুকও (Marbled Cone) খুব বিষাক্ত। এর এক ফোঁটা বিষ ২০ জন মানুষের মৃত্যুর জন্য যথেষ্ট। তবে এরা আহার যোগাড়ের জন্য এই বিষ ব্যবহার করে, আক্রমণ করার জন্য নয়।

ডেথ স্টকার স্করপিয়ান

ডেথ স্টকার স্করপিয়ান

মার্বেলড কোন স্নেইল

মার্বেলড কোন স্নেইল

ব্লু-রিংড অক্টোপাস

ব্লু-রিংড অক্টোপাস

‘ছেফালোপদ’ (Cephalopod) বা শুঁড়/আকর্ষীওয়ালা প্রাণিদের মধ্যে সবচে’ বিষাক্ত প্রাণিটির নাম ‘ব্লু-রিংড’ (Blue-ringed) অক্টোপাস। জাপান ও অস্ট্রেলিয়ার কাছাকাছি প্রশান্ত মহাসাগরে এদেরকে পাওয়া যায়। এর বিষে ১ মিনিটেই যে কারো মৃত্যু সম্ভব। ‘স্টোনফিস’ বা পাথুরে মাছ মাছের মধ্যে সবচে’ বিষাক্ত। এটি লোহিত সাগর, ভারত মহাসাগর ও প্রশান্ত মহাসাগরে পাওয়া যায়।

স্টোন ফিশ

স্টোন ফিশ

উপর্যুক্ত সকল প্রাণিরই নিউরোটক্সিন নামক বিষ আছে, তাই ওরা সবাই বিষাক্ত। নিউরোটক্সিন না থাকলেও যে প্রাণিটি মাঝে মাঝে সবচে’ বেশী বিষাক্ত রূপে আত্মপ্রকাশ করে তার নাম মানুষ। প্রাণিদের দাঁতে, কাঁটায়, হুলে বা দেহের নির্দিষ্ট কোন স্থানে বিষ থাকে আর ওরা তা লুকায়ও না; কিন্তু মানুষের বিষ কোথায় থাকে সেটা জানার কোন উপায় নেই। বিভিন্ন মানুষের ভিন্ন ভিন্ন স্থানে বিষ থাকে- কথায়, চিন্তায়, দৃষ্টিতে, লেখনিতে, কর্মকাণ্ডে ইত্যাদি ইত্যাদি। মানুষ বিষ লুকিয়ে রাখে, ভালো মানুষির ভঙ ধরে থাকে।

সাপ ব্যতিত ঐ সকল প্রাণির কেউই নিজ গোত্রের কাউকে হত্যা করে না, মানুষ করে। শুধু যে হত্যা করে তা নয়, হত্যার পরে মাংশ বিক্রি করে, টুকরো টুকরো করে হাড়-মাংশ পর্যন্ত এক করে ফেলে, আবার কেউ পুড়িয়ে ফেলে। বিষাক্ত কোন প্রাণি বিপদাপন্ন না হলে অন্য কাউকে সাধারণত আক্রমণ করে না, মানুষ করে। বিষাক্ত প্রাণিরা খাবার যোগানোর মতো মৌলিক চাহিদার জন্য হত্যা করে, বেঁচে থাকার খাদ্যের জন্য হত্যা করে; কিন্তু মানুষ মৌলিক চাহিদা মেটানোর জন্য হত্যা করে না, শুধু খাদ্যের জন্য অন্য মানুষকে হত্যা না। স্বার্থের জন্য মানুষ মানুষকে হত্যা করে- টাকার জন্য, সম্পদের জন্য, ধর্মের জন্য আবার গাড়িচালকদের মতো কোন কারণ ছাড়াই হত্যা করে।প্রাণিরা কেবল বংশ রক্ষার জন্য পারস্পরিক মিলিত হয়; অন্যদিকে মানুষ জৈবিক চাহিদায় তুষ্ট হলেও অযাচিত যৌনাকাঙ্খা  চরিতার্থ করার জন্য ধর্ষণ করে- যোনি থাকলেই করে, তিন থেকে তেষট্টি কোন বিভেদ নেই।

বেঁচে থাকার জৈবিক ধর্ম ছাড়া প্রাণিদের আর কোন ধর্ম নেই, মানুষের আছে। মানুষের ঈশ্বর আছে, ধর্ম আছে, অবতার আছে, ধর্মগ্রন্থও আছে। তারপরেও ধর্মহীন ঐসব জীবের চেয়ে মানুষের জীবনাচরণ- ধর্মাচরণ অধিকতর নিকৃষ্টরূপে প্রকট হয়ে ওঠে। ধর্মহীন প্রাণিদের যা নেই ধর্মপ্রাণ মানুষের আছে- লোভ আছে, হিংসা আছে, অহংকার আছে। ওদের কারো মানুষের এতো বুদ্ধিমত্তা নেই, বিবেচনা শক্তি নেই, ভালো-মন্দের জ্ঞানও নেই। তাই ওরা ঘুষ নিতে শেখেনি, ঠকাতে শেখেনি, স্বজাতিকে পাচার করতেও শেখেনি। ওরা তাই চুরি-ডাকতি-ছিনতাই করে না, সম্পদ আত্মসাৎ করে না, জালিয়াতি করে না, খাবারে ভেজাল-ফরমালিন দেয় না, চোরাচালান করে না।কিন্তু ধর্ম, বুদ্ধিমত্তা, বিচার-বিবেচনা, নীতিবোধ সব থাকা সত্ত্বেও মানুষ সবই করে।পাশবিকতায় মানুষ মাঝে মাঝে বিষাক্ত ঐসব পশুদেরও লজ্জায় ফেলে দেয়।

‘মানুষ মানুষকে পণ্য করে, মানুষ মানুষকে জীবিকা করে’।

====================

(প্রকাশিত সকল ছবি ইন্টারনেট হতে সংগ্রহীত)