ক্যাটেগরিঃ ফিচার পোস্ট আর্কাইভ, মানবাধিকার

4793403751927

ছবি: গে-প্যারেডে এক গের সাথে

সমকামিতা নিয়ে তিনটি জোরালো বির্তক রয়েছে- (ক) সমকামিতা কি শারীরিক বা মানসিক রোগ? (খ) সমকামীতা-প্রকৃতিবিরুদ্ধ, না স্বাভাবিক? এবং (গ) সমকামীতা বা সমকামী সম্পর্ক/ বিবাহের বৈধতাদান কতটুকু যৌক্তিক?

মোটাদাগে যৌনকামিরা তিন ধরণের- বিষমকামি (বা ‘স্ট্রেইট’), সমকামি ও উভকামি। এদের মধ্যে সমকামিরা আবার দুই ভাগে বিভক্ত- ‘গে’ (পুরুষে যৌনাসক্ত পুরুষ) ও ‘লেসবিয়ান’ (নারীতে যৌনাসক্ত নারী)। অন্যদিকে, উভকামিরা নারী-পুরুষ উভয়েই আসক্ত। যেহেতু মনুষ্য জীবন স্বাভাবিকভাবে বিষমকামিতে পরিচিত ও অভ্যস্ত, সেহেতু সমকামিদের যৌনাসক্তিকে খুব সহজেই ‘অস্বাভাবিক যৌনাচার’ হিসেবে পরিগণিত করা হয়ে থাকে।

চিকিৎসা বিজ্ঞানের মতে জন্মগতভাবে ব্যক্তির জিন বা হরমোনের বৈষম্যই (নেতিবাচক অর্থে ‘ত্রুটি’) সমকামিতার পিছনে দায়ী (বিস্তারিত জানার জন্য ক্লিক করুন)। যারা একে রোগ বলতে নারাজ তাদের প্রধানতম যুক্তি হলো এটি প্রাকৃতিক এবং জন্মগতভাবে কোনো ব্যক্তি এ বৈষম্যের শিকার। অন্য দলের যুক্তিও আছে- প্রাকৃতিক বা জন্মগত কোনো ত্রুটিকে রোগ না বলার কোনো কারণ নেই; যেমন কেউ শারীরিক প্রতিবন্ধীতা নিয়ে, কেউ বুদ্ধি প্রতিবন্ধীতা নিয়ে জন্মালে আমরা তাকে ‘প্রতিবন্ধী’ হিসেবে চিহ্নিত করি- আর প্রতিবন্ধীতা একটি রোগ বলে বিবেচিত, তাই এ অর্থে সমকামিরা ‘যৌন প্রতিবন্ধী’ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

প্রথম দলের মতে, রোগের স্বাভাবিক সংজ্ঞা অনুসারে যা কোনো মানুষকে শারীরিক বা মানসিকভাবে কষ্ট দেয় তাই যদি রোগ হয়, তবে সমকামিতা কোনো রোগ নয়, কারণ এতে কোনো ব্যক্তি শারীরিক বা মানসিক কষ্ট পায় না। এটি কোন ধরণের জেনেটিক বিকৃতি নয়, জেনেটিক রোগও নয়। তাই বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ১৯৯০ সালে মানসিক রোগের তালিকা থেকে সমকামিতাকে বাদ দিয়ে দিয়েছে।

দ্বিতীয় দলের একটি অংশ মনে করে, সমকামিতা জেনেটিক নয়, মানসিক বিকারগ্রস্ততা; অপর অংশ একে রোগ মনে করে কারণ সমকামিদের বিশেষ দুটি বিষয়ে মানসিক যন্ত্রণা রয়েছে- (১) বিষমকামিদের যৌনকাম সমকামিদের মধ্যে হীনমন্যতা ও মানসিক বিকারগ্রস্ততার জন্ম দেয় যার ফলে অনেক সমকামি ধীরে ধীরে শিশুকামিতা, পায়ুকামিতা, পশ্বাচার (পশুর সাথে যৌনসঙ্গম), ধর্ষকামীতার মতো অবাধ ও উন্মত্ত যৌনাচারী হিসেবে গড়ে ওঠে; (২) সমকামিদের অতৃপ্ত পিতৃত্ব ও মাতৃত্বের অবদমিত বাসনা এক সময় এতটাই প্রবল হয়ে উঠতে পারে যে তারা যে কোন সময়ে পিতৃহন্তারক বা মাতৃহন্তারকও হতে পারে। ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণার রিপোর্ট থেকে জানা যায়, বিষমকামি মহিলাদের চেয়ে সমকামি মহিলাদের মানসিক সমস্যা (বিষন্নতা, উদ্বিগ্নতা, ফোবিয়া বা ভীতি, আত্মহত্যা প্রবণতা, মাদকাসক্তি ইত্যাদি) দ্বিগুণ ও উভকামি মহিলাদের সমস্যা তিনগুণেরও বেশী। সুতরাং, তাদের মতে প্রকৃতির স্বভাববিরুদ্ধ কোনো কিছুকে কখনোই রোগ না বলাটা যৌক্তিকতার ঊর্ধ্বে উঠতে পারে না। তবে, সমকামিতা-উভকামিতা রোগ হোক বা না হোক এটি অনস্বীকার্য যে, সমকামি-উভকামিদের এ বৈষম্য/ত্রুটি এ যাবৎকালে পরিবর্তন/নিরাময়যোগ্য হিসেবে স্বীকৃত হয়নি।

সমকামিতা আদৌও ‘প্রকৃতি-বিরুদ্ধ’ কি না তা নিয়েও যথেষ্ট বাক-বিতণ্ডা রয়েছে। ১৯৯৪ সালে ‘মার্কিন মনোবিদ্যা সমিতি’ ‘স্টেটমেন্ট অন হোমোসেক্সুয়ালিটি’ বিবৃতিতে এবং ‘মার্কিন চিকিৎসা সমিতি’ তাদের একটি রিপোর্টে সমকামীতাকে “স্বাভাবিক যৌনপ্রবৃত্তি” হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। পরবর্তীকালে ১৯৯৯ সালে ‘মার্কিন শিশুচিকিৎসাবিদ্যা আকাদেমি’, ‘মার্কিন মনোচিকিৎসক সমিতি’, ‘মার্কিন স্কুল স্বাস্থ্য সংঘ’, ‘ন্যাশনাল এসোসিয়েশন অব স্কুল সাইকোলজিস্ট’, এবং ‘ন্যাশনাল এডুকেশন এসোসিয়েশন’ তাদের একটি যৌথ বিবৃতিতেও সমাকামিতাকে একটি “স্বাভাবিক প্রবৃত্তি” হিসেবে উল্লেখ করা হয়। (এই লিঙ্কে ক্লিক করে “স্বাভাবিক প্রবৃত্তি” হিসেবে সমকামিতার যৌক্তিকতা নিয়ে একটি তার্কিক উপস্থাপনা পড়া যেতে পারে।) সমকামিতাকে “স্বাভাবিক প্রবৃত্তি” হিসেবে বিশ্বাসীদের এ বিশ্বাসকে আরোও মজবুত করেছেন জীববিজ্ঞানী ব্রুস ব্যাগমিল। তিনি তাঁর ‘বায়োলজিকাল এক্সুবারেন্স : অ্যানিমাল হোমোসেক্সুয়ালিটি অ্যান্ড ন্যাচারাল ডাইভার্সিটি’ বইয়ে প্রায় পাঁচশ’ প্রজাতিতে সমকামিতার অস্তিত্বের উদাহরণ লিপিবদ্ধ করেছেন। তাঁর মতে, সামগ্রিকভাবে জীবজগতে ১৫০০রও বেশী প্রজাতিতে সমকামিতার অস্তিত্ব প্রমাণিত। তালিকায় স্তন্যপায়ী প্রাণী থেকে শুরু করে পাখি, মাছ, সরীসৃপ, উভচর, কীটপতঙ্গ ইত্যাদি সকল প্রাণী বিদ্যমান। অন্যদিকে, যারা ধরে নিয়েছে চুম্বকের বিপরীত মেরু সর্বদাই পরস্পরকে আকর্ষণ করবে, যারা বিশ্বাস করে যে “a key can’t fit in another key, where is the lock?” বা যারা মনে করে “a plug can only fit in a socket, not any other of the same”, তারাই মূলত সমকামিতাকে ‘প্রকৃতি-বিরুদ্ধ’ বলে বিবেচনা করে। মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি এমনই যে যা সে দেখে অভ্যস্ত, যার সাথে তার পরিচয় আছে তাকে সে ‘স্বাভাবিক’ আর যাতে সে অভ্যস্ত/পরিচিত নয় তাকে সে ‘অস্বাভাবিক’ মনে করবে এটাই স্বাভাবিক। ধরা যাক একটি মানুষের দু’টি চোখ/হাত/পা নিয়ে জন্মলাভ করাটাকে আমরা স্বাভাবিক মনে করি, তাই যদি এই সংখ্যায় কোনো বাড়তি বা ঘাটতি দেখা যায় তবে সেটাকে মানুষ ‘অস্বাভাবিক’ মনে করে- সমকামের ক্ষেত্রে এ ভাবনার বিশেষ ব্যতিক্রম নেই, থাকার কথাও নয়। যদি এ তথ্য সত্য হয় যে বর্তমানে বিশ্বে ৫-১০% মানুষ সমকামি ও উভকামী, তবে খুব বেশি দিন সমকামিতাকে ‘প্রকৃতি-বিরুদ্ধ’ ঘটনা বলা যাবে কি না সেটা এখন ভেবে দেখার সময় এসেছে।

lgbt-holding-hands

সমকামিদের স্বর্গরাজ্য হলো নেদারল্যান্ডসের আমস্টারড্যাম। সেখান থেকেই ২০০১ সালে সমকামি সম্পর্ক/ বিবাহের বৈধতার যাত্রা শুরু। এর পরে একে একে আরো ২১ টি দেশে – বেলজিয়াম (২০০৩), স্পেন (২০০৫), কানাডা (২০০৫), সাউথ আফ্রিকা (২০০৬), নরওয়ে (২০০৯), সুইডেন (২০০৯), পর্তুগাল (২০১০), মেক্সিকো (২০১০) আইসল্যান্ড (২০১০), আর্জেন্টিনা (২০১০), ডেনমার্ক (২০১২), ব্রাজিল (২০১৩), ফ্রান্স (২০১৩), উরুগুয়ে (২০১৩), নিউজিল্যান্ড (২০১৩), ব্রিটেন (২০১৪), লুক্সেমবুর্গ (২০১৫) যুক্তরাজ্য (২০১৫), স্লোভেনিয়া (২০১৫), আয়ারল্যান্ড (২০১৫) ও ফিনল্যান্ড (২০১৭ হতে)- ক্ষুদ্র বা বৃহত্তর পরিসরে সমলিঙ্গ সম্পর্ক/ বিবাহ আইনি বৈধতা লাভ করেছে। এ তালিকায় এ যাবৎ এশিয়া ও দক্ষিণ আফ্রিকা বাদে আফ্রিকার কোনো দেশ নাম না লেখালেও গত এক দশক ধরে ভারত, বাংলাদেশের মতো এ দুই মহাদেশের অনেক দেশেই এ প্রথাকে প্রচলিতকরণ, বলবৎকরণ, স্বীকৃতিপ্রদান ও সর্বোপরি আইনি বৈধতা আদায়ে যথেষ্ট প্রয়াস লক্ষ্যণীয় যার পেছনে ইন্ধন হিসেবে ব্যাপক অর্থের যোগসাজেশও রয়েছে বলে অনেকে অনুমান করেন।

সমকামিতার ইতিহাস মানব ইতিহাসের মতো প্রাচীন। ২৪০০ খ্রিঃ পূর্বে মিশরের খ্‌নুমহোটেপ ও নিয়াঙ্খ্‌নুম-কে ইতিহাসে নথিভুক্ত প্রথম সমকামি যুগল বলে গণ্য করা হয়। স্যার নিওনার্ড ওলঙ্গ- এর দেয়া তথ্য হতে জানা যায় ইরাক ও ফিলিস্তিনের মধ্যবর্তী এক স্থানে লুত নামে এক জাতি বসবাস করতো। পবিত্র কুরআনে বর্ণিত রয়েছে, এ জাতির মধ্যে সমকামিতা ছিল বলে মহান আল্লাহতা’লা এ জাতির উপরে আসমানী গযব নাযিল করেছিলেন এবং তাদেরকে ধ্বংস করে দিয়েছিলেন। হিন্দু ধর্মের পৌরাণিক ইতিহাসেও সমকামিতার উপস্থিতি দেখতে পাওয়া যায়। দেবতা বিষ্ণু ও মহাদেব শিবের হরিহর রুপে মিলন এর সবচেয়ে প্রচলিত উদাহরণ। দেবতা বিষ্ণু মোহিনী বেশ ধারণ করে শিবকে আকৃষ্ট ও কামাতুর করে এবং চুড়ান্ত ফলস্বরুপ তাদের দৈহিক মিলন ও যৌনসঙ্গম ঘটে। ফলশ্রুতিতে রোহিনী বেশধারী বিষ্ণু গর্ভবতী হন এবং অয়াপ্পান নামে একটি পুত্রসন্তান জন্ম দেন। এছাড়া, ইতিহাস বিখ্যাত ব্যক্তিদের মধ্যে সক্রেটিস, প্লেটো, জুলিয়াস সিজার, চিনের হান রাজবংশের সম্রাট গোয়াজু, লর্ড বায়রন, লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চি, মাইকেলেঞ্জেলো, মুঘল সম্রাট বাবর, সিমোন দ্য বেভোয়ার, স্যামুয়েল বাটলার, ই. এম. ফস্টার, মিশেল ফুকো, উইলিয়াম সমারসেট মম, জর্জ মাইকেল, গজনির সুলতান মাহমুদ, রিকি মার্টিন, অস্কার ওয়াইল্ড, ১১ জন মার্কিন রাষ্ট্রপতি (জর্জ ওয়াশিংটন, আব্রাহাম লিঙ্কন, কেনেডি, বিল ক্লিনটন, বারাক ওবামা …) প্রভৃতি নাম সমকামি বা উভয়কামিদের কাতারে সন্নিবেশিত রয়েছে বলে অনুমিত।

খ্রিষ্টধর্ম, হিন্দুধর্ম ও ইসলামধর্মে সমলিঙ্গীয় যৌনআচরণকে পাপ বলে গণ্য করা হয়। পবিত্র বাইবেল অনুসারে সমকামিতা পাপ (আদি পুস্তক ১৯:১-১৩; লেবীয় ১৮:২২; রোমীয় ১:২৬-২৭; ১ করিন্থীয় ৬:৯) এবং লোকেরা পাপের কারণে সমকামি হয় (রোমীয় ১:২৪-২৭)। হিন্দুধর্মের মনুসংহিতার অষ্টম অধ্যায়ের ৩৬৯ (‘যদি দুই কুমারীর মধ্যে সমকামিতার সম্পর্ক স্থাপিত হয়, তাহলে তাদের শাস্তি ছিলো দুইশত মূদ্রা জরিমানা এবং দশটি বেত্রাঘাত’), ৩৭০ (‘যদি কোন বয়স্কা নারী অপেক্ষাকৃত কম বয়সী নারীর (কুমারীর) সঙ্গে দৈহিক সম্পর্ক স্থাপন করে, তাহলে বয়স্কা নারীর মস্তক মুণ্ডন করে দুটি আঙ্গুল কেটে গাধার পিঠে চড়িয়ে ঘোরানো হবে’), একাদশ অধ্যায়ের ৬৮ (‘দু’জন পুরুষ অপ্রকৃতিক কার্যে প্রবৃত্ত হলে তাদেরকে জাতিচ্যুত করা হবে’) ও ১৭৫ (‘…এবং জামা পরে তাকে জলে ডুব দিতে হবে’) নং ছত্রে সমকামিতার শাস্তির উল্লেখ আছে। ইসলাম কেবল স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে অর্থাৎ বৈধভাবে নারী এবং পুরুষের মধ্যে যৌনসঙ্গম অনুমোদন করে। একারণে ব্যভিচার ও পরকীয়ার মতো সমকামি যৌনাচার ইসলামে নিষিদ্ধ (সকল প্রাণীদের মাঝে কেবল তোমরাই কি পুরূষদের সাথে কুকর্ম কর? এবং তোমাদের পালনকর্তা তোমাদের জন্যে যে স্ত্রীগণকে সৃষ্টি করেছেন, তাদেরকে বর্জন কর? বরং তোমরা সীমালঙ্ঘনকারী সম্প্রদায়’, সূরা আশ-শো’আরা, ১৬৫-১৬৬)। এছাড়া মহানবী মুহাম্মদ (সাঃ) সমকামিদের (পায়ুকামিদের) অভিসম্পাতও করেছেন (হাদিস আবু দাউদ ৪৪৪৮)।

বাংলাদেশের আইন সমকামিতাকে এখনো প্রকৃতি বিরুদ্ধ মনে করে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের শাস্তি প্রদান করে। বাংলাদেশ দণ্ডবিধির ৩৭৭ ধারায় বলা হয়েছে যে, যে ব্যক্তি স্বেচ্ছাকৃতভাবে কোনো পুরুষ, নারী বা জন্তুর সাথে প্রকৃতিক নিয়মের বিরুদ্ধে যৌন সহবাস করেন, সেই ব্যক্তি যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে বা দশ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ডে দণ্ডিত হবেন এবং তদুপরি অর্থদণ্ডেও দণ্ডিত হবেন। এ ধারায় বর্ণিত অপরাধীরূপে গণ্য হবার জন্য যৌন সহবাসের নিমিত্তে অনুপ্রবেশই যথেষ্ট বিবেচিত হবে। আইনের ব্যাখ্যায় পায়ুকাম এবং পশ্বাচারকেই ‘প্রকৃতি বিরুদ্ধ’ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে।

মানব ইতিহাসের মতো প্রাচীন হলেও পৃথিবীর ১৯৫টি (তাইওয়ানসহ) রাষ্ট্রের মধ্যে মাত্র ২২টি রাষ্ট্রে সমকামিতা আইনি বৈধতা পেয়েছে, সেটাও মাত্র ১৫ বছরের ইতিহাস। এটা মনে করার কোনো কারণ নেই যে ঐ সকল দেশে সমকামিদেরকে নিয়ে সবাই ধেই ধেই করে নেচে বেড়াচ্ছে। আইনি স্বীকৃতি পেলেও এ দেশগুলোতেও (নেদারল্যান্ডস, বেলজিয়াম, আর্জেন্টিনা, ব্রাজিল ও ফ্রান্সে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাসহ) সমকামিতা উল্লেখযোগ্য সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা পায়নি। এ সকল দেশেও এদেরকে অনেকে এড়িয়ে চলে, ঘৃণা করে, আর সুযোগ পেলে হেয় প্রতিপন্ন করতেও ছাড়েন না। তাই অনেক সমকামিরা একসাথে থাকলেও তারা একসাথে বাইরে চলাফেরা করে না বা নিজেদের সম্পর্ককে জনসম্মুখে লজ্জায় প্রকাশ করে না। ব্রাজিলে গত তিন বছর ধরে আমি যে সেলুনে চুল কাটাই সেখানকার দু’জন পুরুষই যে একে অপরের যৌনসঙ্গী (‘গে ’ পার্টনার) সেটা তারা আমার কাছে প্রকাশ করেছিল প্রায় দুই বছর পরে। এখানে ব্যক্তিগতভাবে এ রকম বেশ কিছু গে/লেসবিয়ানের সাথে আমার পরিচয় আছে যাদের কেউই সহজে নিজেদের সম্পর্ককে অন্যের কাছে প্রকাশ করে না। এখানে একমাত্র গে-প্যারেডের সময় সমকামীরা বেশী আত্মপ্রকাশ করে। অবশ্য সে প্যারেডে আমার মতো অনেককে দেখে ভুল ধারণা করার কোনো কারণ নেই।

পৃথিবীর সব দেশেই সমকামি আছে, এমনকি বাংলাদেশেও। এটা ভেবে নেবার কোনো যৌক্তিকতা নেই যে সমকামিদের বিয়ের অধিকার দিলে, সামাজিক এবং মানবিক অধিকার দিলে গণহারে সবাই সমকামি হয়ে যায়; যেটা হয় সেটা হলো লুকিয়ে থাকা কিছু সমকামি মানুষ তাদের খোলস ভেঙে বেরিয়ে আসে। আমাদের দেশে অনেকেই ‘সমকামি’ ও ‘পায়ুকামি’ মানুষদেরকে এক কাতারে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। কিন্তু, এদের মধ্যে একটি সূক্ষ্ণ রেখায় পার্থক্য রয়েছে। সমকামিরা যৌন চাহিদা মেটাতে পায়ুকাম করে, তবে এই পায়ুকামের চাহিদা তাদেরকে সমকামি করে তোলে না, সমকামিতার পিছনে জিনগত বৈষম্য কাজ করে যা সর্বজনস্বীকৃত। অন্যদিকে, সমকামি না হয়েও অনেকে যৌন হয়রানির স্বীকার হয়ে, অবদমিত মানসিক বা যৌন বিকলাঙ্গতা থেকে পায়ুকামি হতে পারে আর এদের স্বীকার মূলত শিশুরা, মোটেও বয়স্করা নয়। আমাদের দেশে ছেলে শিশুদের এ হেন যৌন হয়রানির সংখ্যা একেবারে কম নয় এবং এ কাজে সমাজের একটি বিশেষ গোষ্ঠীর নামটা বরাবরই উঠে আসে, যাদের যৌন-সামাজিক জীবন নিয়ে গবেষণা করলে এই পায়ুকামের মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ পাওয়া সম্ভব।এই পায়ুকামিতা মানসিক ব্যাধি এবং চিকিৎসায় নিরাময়ও সম্ভব। এক কথায়, সমকামিতা জিনগত বৈষম্য, শুধু পায়ুকামিতা যৌনবিকারগ্রস্ততাঃ একজন গে অবশ্যই পায়ুকামি, কিন্তু সকল পায়ুকামি সমকামি নয়। বাংলাদেশের সামাজিক ও ধর্মীয় প্রেক্ষাপট এমনই যে যদিও কোনদিন এদেশে সমকামিতা আইনি স্বীকৃতি পায় (আমার মতে, আগামি ৫০ বছরেও সে সম্ভাবনা নেই) তবুও বাঙালিরা (অবশ্য যারা বিশেষ প্রচারের আশায়, বিশেষ বিশেষ সমকামি দেশের নাগরিকত্বের লোভে পাড়ি দেবার নেশায় মত্ত রয়েছে তারা ব্যতিত) সেই বৈধতাদানের কমপক্ষে পরবর্তী ২৫ বছর পর্যন্ত হয়তো কখনোই নিজেকে সমকামি/উভকামি হিসেবে নিজেকে পরিচয় দিতে, বৈবাহিক সম্পর্কে আবদ্ধ হতে কুণ্ঠা বোধ করবে ।

সেদিন ০৯ বছরের মেয়ে আমার কাছে এসে বললো যে আমার মোবাইল আছে, তাই তাকেও একটা মোবাইল কিনে দিতে হবে। তাকে বললাম পাশের ঘর থেকে আমার শার্টটি নিয়ে আসতে, নিয়ে এল। বললাম গায়ে দাও, হেসে বললো এটা আমার গায়ে তো ফিট করবে না, উত্তর দিলাম সেদিন ফিট করবে সেদিন মোবাইল কিনে দেবো। … ভারতীয় চলচ্চিত্রাভিনেত্রীরা যে পোশাকে নান্দনিকতা প্রকাশ করে, আমাদের ওরা সেটাতে অশ্লীল যৌনসুখের যোগান দেয়; পাশ্চাত্যের আধুনিক লোকেরা হরহামেশাই বিবাহ বহির্ভূতভাবে পরিবার গড়ে তোলে, সন্তানের জন্ম দেয় (আমার প্রতিবেশীর ১৫ বছরের সংসার, ৩ বাচ্চা, এখনো তাদের আনুষ্ঠানিক বিয়ে হয় নাই), তাহলে এই প্রথা ধার করে এমন আধুনিক সাজতে আমাদের কি ভালো লাগবে? পাশ্চাত্যের রাস্তায়-হাঁটে-মাঠে-ঘাটে বালকে-বালকে, বালিকা-বালিকা, বালক-বালিকা, যুবক-যুবতী, যুবক-যুবক, যুবতী-যুবতী ঠোঁটে ঠোঁট সেঁটে (বা লিপলক করে) দাঁড়িয়ে থাকে (মাঝে মাঝে নিজের মেয়েকে নিয়ে বেড়াতে বের হলে বড়ই বিব্রত হতে হয়), তাই বলে ঐ কাতারে শামিল হলে আমাদের কি পুলকিত বোধ হবে? নিজেকে ওভাবে কল্পনা করে পুলকিত হলেও নিজের মাকে, বোনকে, মেয়েকে সেভাবে দেখে হয়তো হবো না, তা সে আমি যতই আধুনিক হই না কেন। পাশ্চাত্যের ঐ সকল দেশসহ বিশ্বের ১০৩টি দেশে যেকোনো ধরণের অপরাধের জন্য মৃত্যুদণ্ড রহিত করা হয়েছে, তাই বলে ঐ আইন এ দেশে আমদানি করে যুদ্ধোপরাধীদের মৃত্যুদণ্ড থেকে রেহাই দেবার আন্দোলন করাটা আমাদের জন্য কতটা যৌক্তিক বলে বিবেচিত হতে পারে? সাধু! সাধু!

কথায় আছে- যার কাজ তারে সাজে, অন্য লোকে লাঠি বাজে। সমাজের যেকোনো প্রকারের সংখ্যা লঘুদের যথাযোগ্য সম্মান-অধিকার প্রদান স্ব-স্ব দেশের সাংবিধানিক, প্রশাসনিক, রাজনৈতিক, সামাজিক স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। একটি দেশে কোনো আইন/প্রথা বাস্তবায়িত/প্রচলিত হলে সেটা নিজের দেশেও আবশ্যিকভাবে প্রচলন করতে হবে এটা নিয়ে মাতম করাটা কি রীতিমত বাড়াবাড়ি নয়? আমি কখনোই ঐ সকল দেশে (বা যদি কোনোদিন আমাদের দেশেও এটি প্রচলনের প্রয়োজন হয়) সমকামি বিবাহের/সম্পর্কের বৈধতা প্রদানের বিরুদ্ধে নই, তবে আমার দেশে এখনি এমন বৈধতা প্রদান করা নিয়ে মাতম করা উচিত কি না, এসব কেচ্ছা-কাহিনী সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচার-প্রচারণা করে সাধারণের মন বিষিয়ে তোলা উচিত কি না, নিজের মনাকাশে রামধনু এঁকে আশেপাশের মানুষের মনে ভীতি-সঞ্চার করা উচিত কি না… আমি এইসব সন্দেহের পক্ষে। পশুপাখিদের মধ্যেও সমকামিতা আছে তাই সমকামিতা ‘প্রাকৃতিক’, ভালো কথা-মেনে নিলাম। কিন্তু, কাল যদি আপনাকে পশুপাখিদের মতো স্থান-কাল-পাত্র নির্বিশেষে জনসম্মুখে প্রাকৃতিকতা জাহির করতে দেখি তাহলে কিভাবে মেনে নিব সেটাই ভাবছি। বাংলাদেশে শর্ত সাপেক্ষে বহুবিবাহ আইন সিদ্ধ, পতিতাবৃত্তিও (সংশোধনীঃ দেশে স্বীকৃত পতিতালয় থাকলেও তা আ্ইনিভাবে বৈধ নয় কারণ সংবিধানের ১৮(২) অনুযায়ি রাষ্ট্র জুয়া ও পতিতাবৃত্তি প্রতিরোধের জন্য কার্যকরী ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। বিষয়টি লেখকের নজরে আনার জন্য রাজ্জাক ভাইয়ের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি), তাই বলে আমরা সবাই বহুবিবাহকে কি সামাজিক স্বীকৃতি দিয়েছি, পতিতাদেরকে কি ঘরের বউ হিসেবে মর্যাদা দিতে প্রস্তুত আছি? আইনি বৈধতার পরেও কথা থাকে, আর সেটা হলো ধর্মীয় ও সামাজিক স্বীকৃতি যা আইন মেনে চলে না, রাষ্ট্রের রক্তচক্ষুকে ভয় পায় না। এটাই সমকামিদের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ, এটাই আজও তাদের কাছে অধরা হয়ে আছে।

… ঐ যা বলছিলাম, আমার শার্টটি যেদিন আমার মেয়ের গায়ে ফিট করবে আমি সেদিন প্রয়োজন থাকলে তাকে একটি মোবাইল কিনে দিতে চাই, আজকে নয়।

ফেসবুক পেজ- আলা্উদ্দীন ভুঁইয়া