ক্যাটেগরিঃ খেলাধূলা

 

গতকালের পরাজয়ের পর হতাশার প্রতিফলন হিসেবে বিভিন্ন পত্রিকার বেশ কিছু সংবাদ শিরোনাম ও তার নিচে ভক্তদের (?) মন্তব্য পড়েছি। ফেসবুকে অসংখ্য ক্রিকেট বোদ্ধাদের (!) অজস্র শ্লেষাত্মক ছবি, কুরুচিপূর্ণ মন্তব্যও দেখেছি। তাই ভাবছি, বাংলাদেশের পক্ষে লাল-সবুজের জার্সি গায়ে গ্রিক দেবতারা  মাঠে নামলে কেমন হতো!

ক্রিকেটারদের পেছনে যেমন দাড়িয়ে থাকে কোচ চন্দ্রিকা হাথুরুসিংহে, তেমনি দেবতাদের ক্রিকেট দলের পিছনে দাড়িয়ে থাকতো দেবকারিগর, প্রযুক্তি বিষয়ক (বিশেষভাবে কামার, ভাস্কর্য, ধাতু) এবং আগুন দেবতা হেফেস্টাস

ব্যাটিংয়ে ইনিংস শুরু করতে তামিমসৌম্যের পরিবর্তে মাঠে নামতো দেবতা এবং মর্তের বীর সাহসী হারকিউলিস ও নর্স পুরাণের বজ্রবিদ্যুৎ, ঝড়, আরোগ্য ও উর্বরতার হাতুড়ি-ধারী দেবতা থর। তারপরে লিটন দাস বা মাহমুদুল্লাহ রিয়াদের হয়ে নামতো বারো অলিম্পিয়ানদের মধ্যে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দেবতা অ্যাপোলো। পাতালপুরীর শক্তিশালী দেবতা হেডিস মুশফিক হয়ে এবং মহামারী, ওর‌্যাকল, আকাশ ও বজ্রের দেবতা দেবরাজ জিউস নামতো সাকিবের স্থানে। পরবর্তী দু’জন ব্যাটসম্যান সাব্বিরনাসিরের স্থানে যথাক্রমে খেলতো সুরা দেবতা ডায়োনিসাস বা ব্যক্কাস এবং রণদেবতা অ্যারিস

বোলিংয়ে মাশরাফির হয়ে সমুদ্র, ঝড় ও ভূমিকম্পের দেবতা পসেইডন ইনিংস শুর করতো। মোস্তাফিজের মতো তাকে সঙ্গ দিতো মানুষের জন্য সূর্যের কাছ থেকে এনে মানুষকে আগুন উপহার দেয়া টাইটান দেবতা প্রমিথিউস। পরিবর্তিত বোলার হিসেবে রুবেলের জায়গায় আসতো রোমান পুরাণের কামদেবতা কিউপিড (গ্রিক নাম ইরস) এবং তাসকিনের বদলে বল করতো পাতালের অন্যতম পথপদর্শক ক্রীড়াবিদ দেবতা হার্মিসআরাফাত সানি, সোহাগ গাজী বা রাজ্জাকের মতো অন্যান্য বোলারের মধ্যে থাকতো অন্যতম দেবতা পার্সিয়াস

দেবতারা খেলোয়ারের রূপে থাকতে পারলে দর্শক হিসেবে গ্রিক দেবতা-অর্ধদেবতা-বীরেরাও তো থাকবে। দর্শকদের মধ্যে থাকবে পরস্ত্রীকাতর ট্রয় রাজপুত্র, গ্রিক স্পার্টার রাজা মেনিলাউসের স্ত্রী হেলেনকে হননকারী প্যারিস। থাকবে ট্রজান হেক্টর ও গ্রিক অ্যাকিলিসের মতো বীর যাদের একজন ছোট ভাই প্যারিসের কামুকতায় যুদ্ধনীতি ভঙ্গ করে মেনিলাউসসহ শত শত গ্রিকদের আর অন্যজন নিজের বন্ধু প্যাট্রোক্লুসের হত্যার প্রতিশোধ নিতে হেক্টরসহ শত-সহস্র ট্রোজানকে হত্যা করেছিল। এছাড়া হার্মেস ও সৌন্দর্য, প্রেম ও যৌনতার দেবী আফ্রোদিতির ভালবাসার সন্তান হার্মাফ্রোডিটাসের মতো কিছু ফেসবুকারও থাকবে।

দেবতারা আমাদের হয়ে ক্রিকেট খেললে অনেক মজা হতো! আমরা কোনো ম্যাচেই হারতাম না, সবাইকেই ধবলধোলাই করে দিতাম, বিশ্বকাপটা এনে ঘরে রেখে কেবল আনুষ্ঠানিকতার জন্য খেলতে যেতাম। তেমনটি হলে তামিমকে নিয়ে ম্যাগি রান্নার অপমানজনক বিজ্ঞাপন তৈরি হতো না, তাঁর সহধর্মিনী ফোনে লাঞ্চিত হতো না, বোনের সাথে ছবি তুলে নাসির কুৎসিত মন্তব্য হজম করতো না, ভক্তদের অবাধ-অনৈতিক মন্তব্যে মাশরাফি হতাশ হয়ে ফেসবুক বন্ধ করতো না, হিন্দু সহ-খেলোয়াড়ের সাথে ইফতারির ছবি পোস্ট করে মুশফিক ধর্মদ্বেষীদের অপমানের শিকার হতো না, মোস্তাফিজের অজান্তেই তাঁর নামে ৬-৭ শত ফেসবুক পেজ তৈরি হতো না, ‘হ্যাপি’কে নিয়ে সারা জাতি ঐভাবে হ্যাপিম্যানিয়াক হতে পারতো না, সর্বোপরি আর কোনো খেলোয়াড়ের ব্যক্তিজীবন জনসম্মুখে হাসি-ঠাট্টার সামগ্রী হতো না। খেলার স্বাভাবিক নিয়মে বাংলাদেশ কখনো হেরে গেলে পত্র-পত্রিকায় তাদের নিয়ে নেতিবাচক সংবাদ প্রচার হতো না, সংবাদের নীচে ভক্তরা (!) জঘন্য-কুৎসিত মন্তব্য করতো না, ফেসবুকে ন্যাক্কারজনক ছবি-মন্তব্য দিতো পারতো না। আমাদের কখনোই ভুলে যেতো হতো না ওরা আমাদের মত সুস্থ (?) স্বাভাবিক রক্ত-মাংশের মানুষ, ওদেরও মা-বাবা-স্ত্রী-পরিজন নিয়ে ছোট্ট সুখের পরিবার আছে যেখানে কোনরূপ হস্তক্ষেপ করার বিন্দুমাত্র অধিকার আমাদের নেই, কোনোদিনও ছিল না। তবুও আমরা সেটা লঙ্ঘন করেছি, করছি, হয়তো আবার কোনো পরাজয়ের পর পুনঃবার …

এমন যদি হতো

মোদের ক্রিকেটাররা হতো

দেবতাদের মতো!

প্রতি খেলায় জয়ের পরে

মাতাল হতাম আনন্দ করে

খেয়াল মতো স্তবকীর্তনে

দেশপ্রেমিক সাজতাম কতো।

…………………………

এমন হবে কি ?

একটি লাফে হঠাৎ আমরা

অজেয় হয়েছি !

ধীরে ধীরে খেলবো ভালো

করবো জয়, ছড়াবো আলো

জগৎ জুড়ে জানবে সবাই

জয়ী হতে এসেছি।

(সুকুমার রায়ের ‘এমন যদি হত’ ছড়া অবলম্বনে)

বিশ্বকাপে ভারতের সাথে বাংলাদেশের অবাঞ্চিত পরাজয়ে একটি ব্লগলেখা– স্বপ্ন ভেঙে যায় তবু ভালোবাসা ফুরায় না

ফেসবুক পেজ- আলাউদ্দীন ভুঁইয়া