ক্যাটেগরিঃ স্বাস্থ্য

কয়েকদিন আগে আমেরিকার কলোরাডোতে রবার্ট  লুইস ডেয়ার নামে এক ব্যক্তি ‘প্লানড  পেরেন্টহুড’ নামের একটি প্রতিষ্ঠানে ঢুকে তিন জনকে গুলি করে হত্যা করে। খুব স্পষ্ট না হলেও বলা যায় যে লোকটি গর্ভপাতবিরোধী খ্রিস্টমতাদর্শে বিশ্বাসীদের কেউ একজন। গর্ভপাতসেবা প্রদানকারীদের বিরুদ্ধে হামলায় ১৯৭৭ সাল থেকে এ পর্যন্ত আমেরিকায় ০৮ জনের প্রাণহানি, ১৭ জনকে হত্যার চেষ্টা, ৪২টি বোমানিক্ষেপ ও ১৮৬টি অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে।

আমেরিকায় প্রজনন স্বাস্থ্য পরিসেবার অন্যতম প্রধান প্রতিষ্ঠান ‘প্লানড  পেরেন্টহুড’। এদের পরিষেবার অন্তর্ভূক্ত রয়েছে প্রজনন স্বাস্থ্য, যৌনরোগ ও জন্মনিয়ন্ত্রণ সংক্রান্ত চিকিৎসাসেবা ও সচেতনতা বৃদ্ধি। তবে বেসরকারি এ প্রতিষ্ঠানটির সবচে’ বিতর্কিত সেবার নাম গর্ভপাতসেবা। ২০১২ সালে আমেরিকার প্রায় সাত লক্ষ গর্ভপাতের অর্ধেকের (৩,২৬,১৬৬) অংশীদারিত্ব নিয়ে ইতোমধ্যে আমেরিকার বৃহত্তম গর্ভপাতসেবা প্রদানকারীর খেতাব অর্জনকারী এ প্রতিষ্ঠান বর্তমানে গর্ভপাতবিরোধীদের তোপের মুখে পড়েছে।

আমেরিকায় গর্ভপাতের সংখ্যা কমানোর জন্য গর্ভপাতবিরোধীদের অন্যতম দাবি ‘প্লানড  পেরেন্টহুড’কে সরকারি অনুদান (মোট খরচের ৪০%) বন্ধ করে দেয়া। তাদের মতে এ প্রতিষ্ঠানের সেবাদানকারী অঙ্গসংগঠন কমে গেলে, সেবার পরিমাণ কমে গেলে, আমেরিকান মহিলারা এ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সহজ গর্ভপাতের সুবিধা না পেলে গর্ভপাতের সংখ্যা কমে যাবে।

সুধীন্দ্রনাথ দত্ত ‘উটপাখি’ কবিতায় বলেছিলেন- ‘অন্ধ হলে কি প্রলয় বন্ধ থাকে?’: গর্ভপাত নিষিদ্ধ হলে, সহজলভ্য না হলে অজাচার-ব্যাভিচারে অবৈধ গর্ভধারণ; ধর্ষণে অযাচিত গর্ভধারণ; যৌনকর্মীদের পেশাদারী গর্ভধারণ বা নির্বোধ দম্পতির অপরিকল্পিত গর্ভধারণ কী বন্ধ হয়ে যায়! না, তা হয়নি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য মতে, সারা বিশ্বে প্রতিবছর ২৬ মিলিয়ন বৈধ ও ২০ মিলিয়ন অবৈধ গর্ভপাতের ঘটনা ঘটে।  গর্ভধারিণীর জীবন রক্ষায় গর্ভপাত বৈধ বলে উল্লেখ করা হলেও বাংলাদেশের পেনাল কোডে গর্ভপাত অবৈধ, এমনকি ধষর্ণের মাধ্যমে গর্ভধারণও। প্লানড পেরেন্টহুডের মতো কোন প্রতিষ্ঠানও এদেশে গর্ভপাতসেবা প্রদান করে না। তারপরেও রাজধানী থেকে মফস্বলের শহরগুলোতে মাশরুমের মতো গজিয়ে ক্লিনিকগুলোর অন্যতম আয়ের উৎস এই গর্ভপাতকরণ। আমেরিকায় গর্ভপাতের হিসেব রাখা সম্ভব হলেও আমাদের দেশে এ সংখ্যা নির্ণয় প্রায়ই দুঃসাধ্য পর্যায়ে পড়েছে। তাই, ‘বেসরকারী হিসেব মতে আমাদের এই অতি প্রিয় ঢাকা শহরে প্রায় ৫০০ নার্সিং হোমে/ক্লিনিকে প্রতিদিন গড়ে অন্ততঃ ৩০০ গর্ভপাত হয়’; স্বাস্থ্য বিষয়ক আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থা গাটমেচারের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রতিবছর প্রায় ৬ লাখের বেশি গর্ভপাতের ঘটনা ঘটে; আবার, বাংলাদেশ মানবধিকার নেটওয়ার্কের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রতিবছর ৭৮ হাজার অবৈধ গর্ভপাতের ঘটনা ঘটে। সংখ্যার বিবেচনায় যতই কম-বেশী হোক না কেন, বাংলাদেশে প্রতিদিন-প্রতিমাস-প্রতিবছরে একটি বড় অঙ্কের গর্ভপাত যে ঘটছে না সেটা অস্বীকার করার জো নেই।

গর্ভধারণ না হলে গর্ভপাত সম্ভব নয়: অবৈধ, অনাকাঙ্খিত বা অপরিকল্পিত গর্ভধারণ না হলে সে সম্ভাবনা প্রায় শুন্যের কোঠায় গিয়ে পৌঁছাবে। আমেরিকা বা বাংলাদেশ, দেশ যেটাই হোক গর্ভধারণের কলাকৌশলে কোনো পার্থক্য নেই। তাই, এ ধরণের গর্ভধারণরোধের কার্যাবলীতেও কোনো রকমফের নেই। সুতরাং, সকল গর্ভপাতবিরোধী আন্দোলনের মূল লক্ষই হোক সেই সকল গর্ভধারণের বিরুদ্ধে যার জন্মই আজন্ম পাপ।

=