ক্যাটেগরিঃ গণমাধ্যম

 

অবিশাস্য হলেও সত্যি, বাংলাদেশের টিভি চ্যানেলগুলোতে প্রচারিত বিজ্ঞাপনের মাত্র ১৭ শতাংশ দেশি কোম্পানির বিজ্ঞাপন। বর্তমানে দেশি কোম্পানিগুলোর মধ্যে যারা বেশি বিজ্ঞাপন প্রদান করছে তাদের মধ্যে শীর্ষে রয়েছে প্রাণ-আরএফএল গ্রুপ (PRAN-RFL) ও ওয়াল্টন গ্রুপ (Walton)। অন্যান্যদের মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশ স্টিল রি-রোলিং মিলস (BSRM), বসুন্ধরা গ্রুপ (Bashundhara), এডভান্সড ক্যামিকেল ইন্ডাস্ট্রিজ (ACI), স্কয়ার গ্রুপ (Square), ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনস, বায়েজিড স্টিল ইন্ডাস্ট্রিজ লিঃ (Baizid Steel), শরীফ মেলামাইন ইন্ডাস্ট্রিজ লিঃ ইত্যাদি।

বাকী ৮৩ শতাংশ বিজ্ঞাপনের প্রায় পুরোটাই আসে মাত্র দশটি বহুজাতিক কোম্পানি থেকে। এদের বিজ্ঞাপন বাংলাদেশের সকল টিভি চ্যানেলে একচেটিয়াভাবে আধিপত্য বিস্তার করে আছে। এরা হলো: ইউনিলিভার বাংলাদেশ লিঃ (Unilever), রেকিট বেঙ্কিযার বাংলাদেশ লিঃ (Reckitt Benckiser), গ্লাক্সো স্মিথক্লাইন (gsk), নেসলে বাংলাদেশ লিঃ (Nestlé), প্রক্টর এন্ড গ্যাম্বল বাংলাদেশ প্রাঃ লিঃ (P&G), মারিকো বাংলাদেশ লিঃ (Marico), টেলিনর গ্রুপ (Grameenphone), এয়ারটেল বাংলাদেশ লিঃ (Airtel), টেলিকম ভেনচারস লিঃ. (banglalink) এবং রবি এক্সিয়াটা লিঃ (Robi)। আবার, এ দশটি কোম্পানির বিজ্ঞাপনের মধ্যে সিংহভাগের যোগানদাতা একাই ইউনিলিভার। সেলুলার কোম্পানিগুলোর মধ্যে বিজ্ঞাপনে শীর্ষে আছে গ্রামীণফোন ও রবি।

এই দশটি কোম্পানির মাত্র ছয়টি কোম্পানির সর্বাধিক বিজ্ঞাপিত পণ্যতালিকা হাতে নিয়ে বাংলাদেশের যে কোন টিভি চ্যানেলের সামনে বসলে খুব সহজে এদের আধিপত্য বোঝা যায়। বর্তমানে ইউনিলিভার যে সকল পণ্যের বিজ্ঞাপন বেশি প্রচার করছে তা হলো: ‘ফেয়ার এন্ড লাভলী’, ‘ফেয়ার এন্ড হ্যান্ডসাম’, ‘রিন পাওয়ার হোয়াইট‘, ‘ক্লোজ-আপ‘, ‘লাক্স‘, ‘ভ্যাসলিন‘, ‘হুইল‘, ‘লাইফবয়‘, ‘পেপসোডেন্ট‘, ‘সার্ফ এক্সেল‘, ‘ক্লিয়ার‘, ‘ডাভ‘, ‘পন্ড’স‘, ‘সানসিল্ক‘, ‘ভিম‘, ‘নর‘ (Knorr), ‘পিউরইট’ প্রভৃতি। রেকিট বেঙ্কিযারের বিজ্ঞাপনগুলোর মধ্যে আছে ‘ভিট‘, ‘ডেটল‘, ‘হারপিক‘ ও ‘মরটিন‘। গ্লাক্সো স্মিথক্লাইনের বহুল প্রচারিত পণ্য ‘হরলিকস‘ ও ‘সেনসোডাইন‘। নেসলের প্রধান বিজ্ঞাপিত পণ্য ‘ম্যাগি‘। ‘প্যানটিন‘, ‘জিলেট‘, ‘প্যামপারস‘, ‘হেড এন্ড শোল্ডার‘ ও ‘হুইসপার আলট্রা’র বিজ্ঞাপন দিচ্ছে প্রক্টর এন্ড গ্যাম্বল। মারিকোর প্রধান প্রচলিত বিজ্ঞাপন ‘প্যারাস্যুট নারকেল তেল’ ও ‘হেয়ারকোড’।  যেকোনো চ্যানেলে একটানা একশোটি বিজ্ঞাপন দেখুন, আশিভাগেরও বেশী বিজ্ঞাপনে এ সকল নামই দেখতে পাবেন।

সবচেয়ে দুঃখজনক হলো উপর্যুক্ত পণ্যতালিকার ৯৯ শতাংশই অন্য একটি দেশের বিজ্ঞাপন বা বিজ্ঞাপনের বাংলা ডাবিং। এই নিবন্ধটি লেখাকালে ঐ সকল পণ্যের বিজ্ঞাপনের মাত্র একটিতে মডেল নোবেলকে ‘হারপিক’ হাতে অন্যের বাথরুমে দেখা গেছে। মনে হয়, বাংলাদেশে ঐ সকল পণ্যের মানসম্মত বিজ্ঞাপন তৈরীর নির্মাতা নেই, মডেল নেই; চ্যানেলগুলোর মালিকদের কাছে  বাংলা ভাষা-শিল্প-সংস্কৃতির কোনো মূল্য নেই; যারা এসব দেখছে তাদের কোনো অনুভূতি নেই ; কর্তৃপক্ষের যা থাকা উচিৎ ছিল তা নেই।

নির্লজ্জতারও একটা সীমা থাকে, চ্যানেলগুলোর বোধকরি সেটাও নেই। একদিকে টিভি স্ক্রিনে একের পর এক ডাবিংকৃত ভিনদেশি বিজ্ঞাপন প্রচারিত হচ্ছে আর সেইসাথে চ্যানেলের লোগোতে ভাসছে- “হৃদয়ে বাংলাদেশ” (চ্যানেল আই); ”অবিরাম বাংলার মুখ” (এটিএন); “মুক্তিযুদ্ধের চেতনায়” (বৈশাখী); “দৃষ্টি জুড়ে দেশ” (বাংলা ভিশন)। সেদিন এটিএন নিউজের একটি অনুষ্ঠান দেখছিলাম-”মর্নিং আওয়ার”। সেখানে ইয়োগার টিপসে দেখানো হলো শিল্পা শেঠীর তারুণ্য উদ্দীপক অঙ্গভঙ্গী। তখনও বুঝিনি, চরম বিষ্ময় এখনো অপেক্ষা করছে। অনুষ্ঠানের শেষের দিকে ’ওল্ড ইজ গোল্ড’ পর্বে একটি গান দেখানো হলো, বাংলা নয়, হিন্দি- ”ও মেহেবুবা, তেরে দিল কি পাস হি…”। মজার ব্যাপার হলো, এ চ্যানেলেরও লোগোতে লেখা- “বাংলার ২৪ঘণ্টা”।

বুঝতে পারছি না, যা তুলে ধরলাম তা কি আসলেই আলোচনার যোগ্য? অসত্য হোক বা অন্যায়ই হোক, প্রতিনিয়ত ঘটতে থাকলে সবকিছুই এক সময় জায়েয হয়ে যায়। ভিনদেশী এসব বিজ্ঞাপন কি আমাদের গা-সওয়া হয়ে গেছে, নাকি  এখন এটাই নিয়ম? আইনের অভাব, আইনের ফাঁক, না আইনকে বুড়ো আঙুল- রহস্যাটা কি?

সামনে ভাষার মাস- সব চ্যানেলের স্ক্রিনে বড় বড় ‘অ’, ‘আ’, ‘ক’, ‘খ’ ঝুলতে থাকবে আর তার নিচে দেখা যাবে- শাহরুখের হাতে ক্রিম (‘ফেয়ার এন্ড হ্যান্ডসাম’); সালমানের ‘গোলাপ’ ড্রিম (‘হুইল‘); আনুশকার চুল দোলে (‘প্যানটিন‘); কারিনা সাইফের কোলে (‘হেড এন্ড শোল্ডার‘); দিপীকার প্রেম ট্রিক্স (’লাক্স’), দুধের সাথে হরলিক্স।