ক্যাটেগরিঃ পাঠাগার

 

“একটি জাতিকে নিশ্চিহ্ন করার জন্য বোমা ব্যবহার করার দরকার নেই, তাদের ভাষা ধ্বংস করে দেয়াই যথেষ্ট।” (নোয়াম চমস্কি)

ভাষার মাস। বাংলা ভাষার দীনতা- অপ্রতুলতা, অশুদ্ধতা, অপব্যবহার- নিয়ে কপচানোর সময় এসেছে। সুধীজন থেকে বিজ্ঞজন, বিশেষজ্ঞ যাদের হাতে সময় আছে তারা সবাই অন্তত একটি নিবন্ধ হলেও রচনা করবেন, পড়া হবে, আলোচনা-সমালোচনা-মতামত হবে: অতঃপর, ‘লাউ’, ‘কদু’ তত্ত্ব। “পূজা শেষে বিসর্জনে মায়ের মূর্তির দফারফা হয়ে যায়। মায়ের ভাষারও ঠিক একই অবস্থা। একুশের গ্রন্থমেলা শেষ হলেই বাংলা ভাষার কথা আর কেউ ভাবে না” (‘সেকেলে ভাবনার একেলে জবাব’, প্রথম আলো, শিশির ভট্টাচার্য্য, ০৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৬)।  এ নিবন্ধের ভবিষ্যত নিয়েও ব্যতিক্রম কিছুর আশা করার যৌক্তিক কোনো কারণ দেখছি না। তবুও, ”অন্ধ হলে কি প্রলয় বন্ধ থাকে?” (‘উটপাখী’, সুধীন্দ্রনাথ দত্ত)

এ নিবন্ধের বিষয়বস্তু বাংলা ভাষায় অনুমিত অমার্জিত/ অশ্লীল  শব্দাবলী। ‘অনুমিত অমার্জিত / অশ্লীল’ কারণ বাংলা একাডেমীর ব্যবহারিক বাংলা অভিধানে এদেরকে অপপ্রয়োগ (অপ্র.), অশিষ্ট (অশি.) পর্যায়ভুক্ত করা না হলেও দৈনন্দিন জীবনে এ শব্দাবলীর ব্যবহার রুচিহীন ও শিষ্টতাবহির্ভূত হিসেবে বিবেচিত। কথাবার্তায়, কাজকর্মে যেকোনো পরিশীলিত পরিবেশে এসকল শব্দ ব্যবহারে আমরা কুণ্ঠাবোধ করি, লজ্জিত হই, অপমানজনক মনে করি। এই প্রবণতা শিক্ষিতদের মধ্যেই সর্বাধিক।

ফারসী থেকে আগত বাংলা ‘পায়খানা’ শব্দটি ‘মল’ বা ‘মলত্যাগের স্থান’ দুই অর্থেই অমার্জিত; আর ‘গ-এ-উ’ তো রীতিমত অশ্লীল। এদের সমার্থক বিশেষ্য হিসেবে ইংরেজি ‘টয়লেট’ (গ্রামীণ প্রয়োগে ‘ল্যাট্রিন’) ও ‘বাথরুম’ আর ক্রিয়ার্থে ‘টয়লেট করা’/ ‘বাথরুম করা’ শব্দসমূহ ব্যবহৃত হচ্ছে। খুবই সাধারণ প্রশ্ন- ‘টয়লেট’/‘বাথরুম’, ‘ইউরিন’ ‘স্টুল’ যদি আমরা মার্জিত শব্দ হিসেবে ব্যবহার করতে পারি, তবে তাদের বাংলা সমার্থকরূপে ‘পায়খানা’, ‘প্রস্রাব’ (সংস্কৃত ‘মূত্র’>বাংলা ‘মুত’), ‘গ-এ-উ’ ব্যবহারে অনীহা কেন? বাংলাদেশে ‘গুয়ে শালিক’ নামে যে সারিকা পাখি পাওয়া তাদেরকে কি এখন ‘টয়লেটিয় শালিক’ বলতে হবে? অথচ, গু-এর গুষ্টিতে কতশত চমৎকার শব্দ রয়েছে- গুরু, গুঞ্জন, গুজব, গুণ, গুম, গুলশান, গুলি, গুলিস্তান ইত্যাদি ইত্যাদি।

যৌন বিশেষজ্ঞের চেম্বার যেন বাংলাভাষার কসাইখানা! ঊর্ধ্বাঙ্গ থেকে নিন্মাঙ্গ, বক্ষ থেকে নিতম্ব, এখানে চিকিৎসাযোগ্য সকল অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের ক্ষেত্রে ইংরেজি ব্যবহৃত হয়। এসকল বাংলা শব্দ এতটাই ‘অশ্লীল’ বিবেচিত যে সভ্য সমাজে এদের দু’একটি মুখ ফসকে বের গেলে পুরুষ-নারী একে অপরের দিক থেকে চোখ ফিরিয়ে নেয়; অথচ, দেশের নামকরা পত্রিকাগুলোতে সেই সকল তথাকথিত ‘অশ্লীল’ শব্দ নির্দ্বিধায় ব্যবহৃত হচ্ছে- ‘…স্বামীর পুরুষাঙ্গ কর্তন, স্ত্রী আটক’ (যুগান্তর, ০৬ নভেম্বর, ২০১৫), ‘পুরুষাঙ্গ প্রতিস্থাপনে বিশ্বে প্রথম সফল অস্ত্রোপচার’ (প্রথম আলো, ১৪ মার্চ ২০১৪), ‘জরায়ু ক্যান্সার প্রতিরোধী টিকা’ (কালের কণ্ঠ, ১১ ডিসেম্বর ২০১৪), ‘…মধ্যবয়সে ত্বক, স্তন, অন্ত্র, জরায়ু… ক্যানসারে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বেশি’ (“দীর্ঘকায় নারীর জন্য ঝুঁকি”, প্রথম আলো, ২৯ জুলাই ২০১৩), ‘আসুন, মাসিক নিয়ে কথা বলি’ (“লজ্জা নয়, সচেতন হতে হবে”, প্রথম আলো, ১৮ মে ২০১৪)। ইংরেজিতে ‘ইউফেমিজম’ বলে একটা বিষয় আছে যার অর্থ ‘শ্রুতিকটু শব্দের কোমলতর প্রকাশ’। বাংলাতেও আমরা এমন করে থাকি, মৃত্যুকে আমরা ‘পরলোকগমন’, ‘ইন্তেকাল’ বলি। অপরিশীলিত বলে ধর্তব্য এমন অনেক বাংলা শব্দকে আমরা ইতোমধ্যে শ্রাব্য করে তুলেছি; যেমন- যোনি>জরায়ু, শিশ্ন>পুরুষাঙ্গ, যৌনমিলন>সহবাস, যুবতী>যুবা, বেশ্যা>পতিতা, স্তন>বক্ষ/বুক, ঋতুস্রাব>মাসিক, ন্যাংটা/ ল্যাংটা>উলঙ্গ>নগ্ন ইত্যাদি। এছাড়া, বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এসকল বিষয় বোঝাতে বিভিন্ন আঞ্চলিক শব্দসম্ভারও রয়েছে।  তথাপি, এ সকল শব্দাবলীর সবই আজ ভাষাতাত্ত্বিক অশ্লীলতা দোষে দুষ্ট,  বিলুপ্তির দ্বারপ্রান্তে; এ সকল শব্দের ইংরেজি সমার্থকসমূহ মার্জিত বিবেচনায় সামাজিকভাবে প্রচলিত, প্রতিষ্ঠিত।

আমাদের ক্রোধাত্মক ভাষাতেও অনেক পরিবর্তন এসেছে। ‘ধ্যাৎ’ (আঞ্চলিকভাবে ব-এ-আ সহযোগে …) বোঝাতে ‘শিট’ ব্যবহৃত হচ্ছে। ‘বোকা’, ‘বাচ্চা’ সহযোগে গালিগালাজ তো একেবারেই নিচুজাতের (শিক্ষিতজনের মতে) মানুষের কাছেই রয়ে গেছে। শিক্ষাের কল্যাণে এদের পরিবর্তে ‘মাদারে’র সাথে ‘ফক্কর’, ‘সানে’র সাথে ‘কুক্করী’র আবির্ভাব ঘটেছে। অর্থ বজায় আছে, তবে জোশ কমে গেছে।

‘অশ্লীল’ বাংলার পরে আসে ‘অভদ্র’ বাংলা। শিক্ষালাভের সাথে সাথে মানুষের মধ্যে ভাষাভিজাত্যের ছুতোয় বাংলার পরিবর্তে ইংরেজি ব্যবহারের প্রবণতাও বৃদ্ধি পেয়েছে। ইতোমধ্যে যে সকল শব্দাবলী আভিজাত্যের খাতা থেকে বাদ পড়েছে সেগুলো হলো- ‘শালা’, ‘আব্বা/বাবা’, ‘চাচা’, ‘চাচী’, ‘থালা’, ‘চামচ’, ’ছুরি’, ‘গোশত/গোস্ত’, ‘দোস্ত’, ‘তরকারি’ ‘আপা’ (সম্মানার্থে ‘ম্যাডাম’ বোঝাতে), ’বুবু’ ইত্যাদি ইত্যাদি। শিক্ষিত-সচেতন প্রতিটি ব্যক্তিই তাদের দৈনন্দিন জীবনযাপনে অত্যন্ত সুচিন্তিতভাবেই এগুলোকে পরিহার করে এদের সমার্থক ইংরেজিকে গ্রহন করছে, যে যত বেশী করছে সে তত বেশী ‘স্মার্ট’ হিসেবে নিজেকে প্রচার করছে। নাহ্, রেডিও জকি, চ্যাংড়া (উঠতি  বয়সের) উপস্থাপক/উপস্থাপিকাদের ব্যবহৃত শব্দাবলী নিয়ে কোনো কথা নয়, এগুলো বাংলা না ইংরেজি আমার সেটাই বুঝতে কষ্ট হয়। ওদের জন্য জন্য আব্দুল হাকিমের ‘বঙ্গবাণী’ থাকলো।

ভাষায় আগ্রাসন সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের বাহন। যে জাতি যে ভাষা বেশী ব্যবহার করবে সে জাতি সে ভাষার সংস্কৃতিতে তত বেশী প্রভাবিত হবে, আমাদেরও তাই হচ্ছে। বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে একসময় অবজ্ঞা প্রকাশ করা হতো। পাশ্চাত্যে ঠিক এর উল্টো, ধন্যবাদ জ্ঞাপনে বৃদ্ধাঙ্গুলি উত্থিত (thumbs-up) হয়। আমরা বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে এখন ধন্যবাদ জানাই; বিজয়ে (এমনকি ফাঁসিকাষ্ঠে যাওয়ার আগেও) তর্জনি-মধ্যমায় ‘ভি ফর ভিকট্রি’ দেখাই; আবার, রাগ হলে তর্জনিকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দিয়ে চেপে ধরেও দেখাই। একটা সময় ছিলো যখন মানুষ একটু বিষ্ময়াপন্ন হলে ‘হায় আল্লাহ’, ‘হা ভগবান’ বলতো; এখন বলে, ওএমজি (OMG-Oh My God)। কেতাদুরস্ত পরিবারে লুঙ্গি (‘স্ট্যান্ডার্ড’ হোক বা ‘আমানত শাহ্’) পড়াটা তো রীতিমত অমার্জনীয়। ভদ্র হতে হলে, আপনি আধুনিক সেটা বোঝাতে হলে আপনাকে ট্রাউজার পড়তে হবে। এ দেশে ভালো ইংরেজি জানলে চাকুরির নিশ্চয়তা আছে, ভালো বাংলা জানলে কেবল প্রশংসার পাল্লাটা ভারী হতে থাকে। “বাংলাদেশে ইংরেজি হচ্ছে ক্ষমতা, অর্থ, গৌরব ও সামাজিক সম্মানের ভাষা। বাংলা হচ্ছে শক্তিহীনতা, অগৌরব ও সামাজিক অসম্মানের ভাষা” (হুমায়ুন আজাদ)।

আমরা কেন মনে করছি ঐ সকল বাংলা শব্দ অশ্লীল, অমার্জিত, গাও-গেরামের সংস্কৃতি? আমরা কেন ভাবছি আধুনিক, ভদ্র, শিক্ষিতজনদের এসব বলতে নেই, করতে নেই? আমার মতে, এ সমস্যার কারন দুইটি, সমাধান একটি। এক. বাংলা ভাষায় শব্দের অপ্রতুলতা; দুই. ইংরেজি শিক্ষার আগ্রাসন। সমাধান, প্রতিটি ইংরেজি শব্দের জন্য যুগোপযোগী নতুন নতুন বাংলা শব্দ উদ্ভাবন ও সেগুলো পত্র-পত্রিকা, সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে বহুল প্রচার। মূলতঃ আমাদের দৈনন্দিন জীবনে ব্যবহৃত অনেক ইংরেজি শব্দের বাংলা (বা যথাযথভাবে প্রচলিত বাংলা) শব্দ নেই বলে চাইলেও ইংরেজির দুষ্টচক্র থেকে আমরা বের হতে পারছি না, পারবোও না। ১৯৮৭ সালের সর্বস্তরে বাংলাভাষার প্রচলন আইনটি তাই শুধু কাগজ-কলমেই রয়ে গেছে, এতদিনেও পূর্ণাঙ্গতা পায়নি। এর পরেও ভাল কথা, নতুন আয়কর আইন সহজবোধ্য বাংলায় প্রণয়নের তাগিদ দিয়েছেন আইনমন্ত্রী অ্যাডভোকেট আনিসুল হক। আমাদের চেষ্টা তো আছে, ‘ইন্টারনেট’ শব্দের সমার্থকে ‘অন্তর্জাল’, ‘সেলফোনে’র জন্য ‘মুঠোফোন’, ‘টেক্সট মেসেজ’র পরিবর্তে ‘ক্ষুদে বার্তা’, ফেইসবুকের বদলে ‘মুখপঞ্জি’,  এবং ‘হোমপেইজ’র স্থানে ‘নীড়পাতা’ (কাজী শহীদ শওকতের মন্তব্য থেকে গৃহীত)  বেশ প্রচলিত হয়েছে। তবে, এখনও শতশত ইংরেজি শব্দের সমার্থক বাংলা না থাকায় সেগুলি অনায়াসে বাংলায় আত্মস্থ হচ্ছে, সুধীজনের ভাষা হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। এমনটিই হয়, হবে। ভাষা নিজস্ব ধারায় গতিশীল; সে আমার, আপনার উপর নির্ভর করে বসে থাকবে না। “আজ বাংলা ভাষায় বন্যার জলের মতো যত ইংরেজি শব্দ ঢুকছে, সেগুলো বাংলা ধ্বনিতত্ত্বের নিয়ম মেনে অনতিবিলম্বে বাংলা হয়ে যাবে। এই শব্দগুলো বাংলা শব্দকোষকে সমৃদ্ধ করবে, যেমন একদিন আরবি-ফারসি-তুর্কি শব্দ বাংলা শব্দকোষকে পরিপুষ্ট করেছিল, অথবা যেমন করে বহু লাখ ফরাসি বিশেষ্য-বিশেষণ-ক্রিয়া সমৃদ্ধ করেছিল ইংরেজিকে” (‘সেকেলে ভাবনার একেলে জবাব’, প্রথম আলো, শিশির ভট্টাচার্য্য, ০৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৬)। শিশির ভট্টাচার্য্য সত্য বলেছেন, ফরাসি ভাষা নিয়ে ইংরেজি সমৃদ্ধ হয়েছে। তবে, তিনি যেটা বলেননি সেটা হলো, ফরাসির আগ্রাসনে ইংরেজির অস্তিত্ব কখনও হুমকির মুখে পড়েনি, বাংলা ভাষার মতো ‘অশ্লীল’ বা ‘অমার্জিত’ বলে মুখ থুবড়ে পড়েনি, সাংস্কৃতিক বিকলাঙ্গতা অনুভব করেনি। পারস্যে (বর্তমান ইরানে) আরব দখলদারিত্বের পরে আরবী ‘অগ্নিপুজকদের ভাষা’ ফার্সিকে বদলাতে পারেনি; পাকিস্তান শাসনামলে পাকিস্তানের উর্দু ‘হিন্দুদের ভাষা’ বাংলাকে বদলাতে পারেনি কারণ আরবির চেয়ে ফার্সি, উর্দুর চেয়ে বাংলা ভাষা ছিল সমৃদ্ধ (“ভাষা সাম্রাজ্যবাদ বনাম ভাষা জাতীয়তাবাদ”, যুগান্তর, আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী, ০৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৬ )। তবে, ইংরেজি পারছে কারণ বাংলা ইংরেজির চেয়ে সমৃদ্ধ হচ্ছে না, উদ্যোগটাও ততটা দৃশ্যমান নয়। বাংলা ভাষা আজ তাই নিজ ঘরে ‘পরবাসী’ উপবাসী , ইংরেজির আধিপত্য, হিন্দি বলে আমিও আসি!

“নিঃসন্দেহে ইংরেজি বাংলা ভাষার পরিপূরক হতে পারে, তবে প্রতিস্থাপক নয়” (‘একুশের এস্তেঞ্জায় এলাকাঁড়ি’, মো. আলাউদ্দীন ভুইয়া, প্রথম আলো, ২৬ ফেব্রুয়ারি, ২০১৫ )। আমরা চাই অন্যসব ভাষা যোগে-বিয়োগে বাংলা ভাষা সমৃদ্ধশালী হোক; তবে, তা নিঃসন্দেহে অশ্লীলতার দায় মাথায় নিয়ে অস্তিত্ত্ব বিসর্জনের বিনিময়ে নয় ।

===============

 ফেসবুকমোঃ আলাউদ্দীন ভুঁইয়া