ক্যাটেগরিঃ প্রযুক্তি কথা

 

রবীন্দ্রযুগে ইন্টারনেট ছিল না, তবুও তিনি লিখেছিলেন,

               “কত অজানারে জানাইলে তুমি,

                           কত ঘরে দিলে ঠাঁই-

                দূরকে করিলে নিকট, বন্ধু,

                         পরকে করিলে ভাই।”

সত্যিই, আধুনিকত্তোর যুগের অন্যতম শ্রেষ্ঠ আবিস্কার ইন্টারনেট, যা আমাদের দিয়েছে বেগ, নিয়েছে আবেগ।

জাতিসংঘের হিসেব মতে, ২০০৫ সালে যেখানে বিশ্বের ৫০০ মিলিয়ন মানুষ ইন্টারনেটের সুবিধা ভোগ করতো সেখানে ২০১৪ সালের শেষ নাগাদ ৪০ শতাংশ (৩ বিলিয়ন) মানুষ ইন্টারনেটের আওতায় আছে। তবুও এ সুবিধার বাইরে এখনও রয়েছে ৪.২ বিলিয়ন। বর্তমানে ইউরোপিয়রা সবচেয়ে বেশী (৭৫ শতাংশ) এবং আফ্রিকানরা সবচেয়ে কম (২০ শতাংশ) ইন্টারনেটের সুবিধা ভোগ করছে।

তবে, বিশ্ব ইন্টারনেট পরিসংখ্যানের হিসেবে বিশ্বের মোট ইন্টারনেটের অর্ধেক ব্যবহার করে এশীয়রা। দুই আমেরিকায় ব্যবহৃত হয় ১৯.৫ শতাংশ, ইউরোপে ১৮ শতাংশ ও আফ্রিকায় ৯.৮ শতাংশ। এখান আসা যাক, ইন্টারনেটে কি করছি সে প্রসঙ্গে। আলেক্সা একটি ক্যালিফোর্নিয়া ভিত্তিক কোম্পানী যারা ওয়েব ট্রাফিক তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে।  অ্যালেক্সার হিসেবে বিশ্বের দশটি ওয়েবসাইট সবচেয়ে বেশী লোক ভিজিট করে সেগুলো হলো গুগল, ফেসবুক, ইউটিউব, বাইদু, ইয়াহু,  আমাজন, উইকিপিডিয়া, কিউকিউ, লিঙ্কডইন ও টুইটার। এ সব ওয়েব সাইটের মধ্যে তিনটি সার্চ ইঞ্জিন (গুগল,ইয়াহু ও বাইদু), একটি ই-কমার্স, একটি বিশ্বকোষ আর বাকী পাঁচটি, অর্থাৎ, অর্ধেকই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম- ফেসবুক, ইউটিউব, কিউকিউ, লিঙ্কডইন, টুইটার। স্মাটফোনের বদৌলতে শীঘ্রই সেরা দশে আরও যোগ হবে স্কাইপ, ভাইবার ও হোয়াটসঅ্যাপ ইত্যাদি।

Screenshot 2016-03-14 14.42.19

                               চার্ট-১ঃ বিশ্ব ইন্টারনেট ব্যবহারের শতকরা হার

ইন্টারনেট গবেষণা প্রতিষ্ঠান পিউরিসার্চসেন্টারের মতে, ফেব্রুয়ারি, ২০০৫ সালে বিশ্বের ৮ শতাংশ মানুষ সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং করতো। পরবর্তী নয় বছরে সেই সংখ্যা বহুগুণে বৃদ্ধি পেয়েছে। এখন ইন্টারনেট ব্যবহারকারীদের মধ্যে ৭৪ শতাংশ সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং করেছে। এদের মধ্যে ১৮-২৯ বছর বয়সসীমায় এ ব্যবহার সবচেয়ে বেশী (৮৯ শতাংশ) এবং ৬৫ ঊর্ধ্বদের ব্যবহার সর্বাপেক্ষা কম (৪৯ শতাংশ)। অন্য আরেক গবেষণা মতে, ২০১৫ সালে সোশ্যাল নেটওয়ার্কিংয়ের আওতায় রয়েছে ১.৯৬ বিলিয়ন মানুষ যা ২০১৮ সালে বৃদ্ধি পেয়ে ২.৪৪ বিলিয়ন হবে। সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং সাইটের মধ্যে সবচে’ এগিয়ে আছে ফেসবুক ও ইউটিউব। এখন ফেসবুক ব্যবহারকারীর সংখ্যা ১.৪৪ বিলিয়ন এবং জনপ্রতি প্রতিদিন ফেসবুকে ব্যয় করছে ২০ মিনিটের বেশী সময় যা মোট ইন্টারনেট ব্যবহারের ২০ শতাংশ। জুকারবার্গের মতে, আমেরিকানরা ফেসবুকে প্রতিদিন গড়ে ৪০ মিনিট ব্যয় করে। ইউটিউব ব্যবহারকারীর সংখ্যা এক বিলিয়নের বেশী, মোট ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর তিন ভাগের এক ভাগ এবং  ব্যয়িত সময় মোট ইন্টারনেট ব্যবহারের ৬০ ভাগ।

গ্লোবালওয়েবইনডেক্সের (GWI) রিপোর্ট অনুসারে একজন মানুষ ইন্টারনেট ব্যবহারের এক-চতুর্থাংশ (২৮ শতাংশ, প্রতিদিন গড়ে ১.৭২ ঘণ্টা) সময় ব্যয় করে সোশ্যাল নেটওয়ার্কিংয়ে এবং এই ব্যবহারের এক-তৃতীয়াংশই মোবাইল ফোনের মাধ্যমে।  অর্থাৎ, একজন মানুষ এ হিসেবে বছরে ২৬ দিন সোশ্যাল নেটওয়ার্কিংয়ের পিছনে ব্যবহার করছে। অন্য আরেক গবেষণায় পাওয়া যায়, ২০০৯ সালে একজন মানুষ সোশ্যাল নেটওয়ার্কিংয়ের জন্য গড়ে ব্যয় করতো ৯৬ মিনিট, মাত্র ছয় বছরে সে সময় বৃদ্ধি পেয়ে এখন ১০৬.২ মিনিট।

মোবাইল ফোন ও ইন্টারনেট ব্যবহারে আসক্তি নিয়ে ইতোমধ্যে বিভিন্ন উন্নত দেশে গবেষণা শুরু হয়েছে। ইন্টারনেট ট্রেন্ডস (২০১৩) থেকে জানা যায় যে, আমরা গড়ে প্রতিদিন ১৫০ বার আমাদের ফোন চেক করি। দেশভেদে এ সংখ্যায় তারতম্য রয়েছে, যেমন আমেরিকানরা প্রতিদিন গড়ে মোবাইল চেক করে ১৬৮ বার। আমেরিকার বেলর বিশ্ববিদ্যালয়ের (Baylor University) এক গবেষণায় এসেছে যে একজন কলেজ ছাত্রী প্রতিদিন গড়ে ১০ ঘণ্টা ও ছাত্র প্রায় ৮ ঘণ্টা মোবাইলের পিছনে ব্যয় করে। আমেরিকায় কিশোররা প্রতিদিন ৯ ঘন্টা, ৮-১২ বয়সীরা ৬ ঘণ্টা সোশ্যাল নেটওয়ার্কিংয়ে এবং ৪.৭ ঘণ্টা স্মার্টফোনে ব্যয় করে। বৃটেনে ১৬ থেকে ২৪ বছর বয়সের ছেলেমেয়েরা এখন প্রতি সপ্তাহে গড়ে ২৭ ঘন্টার বেশী সময় ইন্টারনেটে ব্যয় করে। অথচ দশ বছর আগেও তারা ব্যয় করতো ১০ ঘ. ২৪ মি.। বয়স্করা কর্মক্ষেত্রে সপ্তাহে ইন্টারনেট করে ব্যবহার ২০ ঘণ্টা, রাস্তায় ব্যয় করে ২.৫ ঘণ্টা। ব্রিটেনে একজন গড়ে ইলেকট্রনিক্স যন্ত্রের (কম্পিউটার, মোবাইল ইত্যাদি) পিছনে প্রতিদিন ব্যয় করে ৮ ঘণ্টা ৪১ মি. যা সাধারণ একজন মানুষের দৈনন্দিন ঘুমের সময় থেকে ২০ মি. বেশী।

সোশ্যাল নেটওয়ার্কিংয়ের পরে যে ওয়েবসাইটগুলো ইন্টারনেটে মানুষকে আসক্ত করে তুলেছে তা পর্নোগ্রাফি। বিশ্বের মোট ওয়েবসাইটের ১২ শতাংশ (৪.২ মিলিয়ন) পর্নোসাইট। অ্যালেক্সার মতে, নেট ব্যবহারকারীদের ৬৫.৫ শতাংশ লোক পর্নো দেখে এবং চারশ মিলিয়ন ওয়েবসাইটের উপর করা জরিপে মানুষের প্রতি আটটি ক্লিকের একটি যৌন সাইট। গবেষণায় আরো পাওয়া যায়, পর্নাসক্তির কোনো বয়সসীমা নেই, কিশোর থেকে শুরু করে বয়স্ক পর্যন্ত সবাই এতে আসক্ত, যার মধ্যে পুরুষের তুলনায় নারীদের সংখ্যা বেশী। ওয়েবসাইটের চেয়ে মোবাইলে পর্নোসাইট ভিজিট আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে, শুধু ২০১৫ সালে মোবাইল পর্নো থেকে ২.৮ বি.মা.ড. আয়ের সম্ভাবনা রয়েছে। সংখ্যায় পর্নোসাইট ভিজিট করা দেশগুলোর শীর্ষে আমেরিকা (৪০ মিলিয়ন, যাদের প্রতি তিন জনের একজন মহিলা), দ্বিতীয় ব্রাজিল, তৃতীয় পাকিস্তান এবং চতুর্থ চীন। শতকরা হিসেবে সবচে’ বেশী পর্নো ভিজিটকারী দেশ পোল্যান্ড (প্রতি ১০,০০০ লোকের মধ্যে ৮৫ শতাংশ) ও মিশর। ভারতীয়দের মধ্যে ৪৭.৫ শতাংশ ডেস্কটপ, ৪৯.৯ শতাংশ মোবাইল ফোন এবং ২.৬ শতাংশ ট্যাবলেটের মাধ্যমে পর্নোসাইটে প্রবেশ করে। ”পর্নহাব.কম” নামক ওয়েবসাইট তাদের পরিসংখ্যানে বলেছে ২০১৫ সালে তাদের ওয়েবসাইট ভিজিট হয়েছে ২১.২ বি. বার-প্রতি মিনিটে  ৪০,০০০ ভিজিট বা প্রতিঘণ্টায় ২.৪ মিলিয়ন বার। ঐ সাইটে ঐ সালে সবচেয়ে বেশী ভিজিট করেছে আমেরিকা, বৃটেন ও ভারত। দেশী-বিদেশী পর্নোর বাংলাদেশে পসার যে খুব ভাল নয় তা বলা যায় না। বাসসে’র প্রকাশিত এক রিপোর্টে (জুলাই, ২০১৩) বলা হয়েছে ঢাকার বিভিন্ন সাইবার ক্যাফেতে প্রতি মাসে যে পরিমাণ পর্নো ডাউনলোড করা হয় তার আর্থিক মূল্য ৩ কোটি টাকা। এ সকল পর্নোর ৭৭ শতাংশ দর্শকই স্কুল-কলেজ পড়ুয়ারা।

গত অর্ধ-যুগে বাংলাদেশে তথ্যপ্রযুক্তির বিপ্লব ঘটেছে, বিশেষ করে জনসংখ্যার অনুপাতে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর শতকরা হার ও মোবাইলের ব্যবহার ঈর্ষাজনকভাবে বেড়েছে। বিশ্বব্যাংকের তথ্য মতে, ২০১১ সালে  বাংলাদেশের জনসংখ্যার ৪.৫ শতাংশ মানুষ ইন্টারনেট ব্যবহার করতো। ২০১৪ সাল নাগাদ সেই নেট ব্যবহারের হার দ্বিগুণের বেশী বৃদ্ধি পেয়ে দাড়িয়েছে ৯.৫ শতাংশে। জনসংখ্যার হিসেবে নেট ব্যবহারকারীর সংখ্যাও বেড়েছে দ্রুত গতিতে। আইএমএফের মতে, ২০১১ সালে বাংলাদেশে নেট ব্যবহার করতো মাত্র ৫৫ লক্ষ মানুষ কিন্তু ২০১৫ সালে এ সংখ্যা দাড়িয়েছে ৫ কোটি ৪০ লক্ষের উপরে, যা মোট জনসংখ্যার ৩১.৯ শতাংশ।

Screenshot 2016-03-14 14.47.53

                                        চার্ট-২ঃ দক্ষিণ এশিয়ার পাঁচটি দেশে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর শতকরা হার

বাংলাদেশে ইন্টারনেট ব্যবহারকারী সংখ্যা বৃদ্ধির অন্যতম রহস্য হলো মোবাইল সাবস্ক্রাইবারের সংখ্যা মোবাইল সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর নেটওয়ার্ক কাভারেজ বৃদ্ধি। বিটিআরসির তথ্য মতে, দেশে মোট মোবাইল ব্যবহারকারীর সংখ্যা প্রায় ১৩২ মি. এবং মোবাইল ইন্টারনেট সাবস্ক্রাইবারের সংখ্যা ৫৩.৪৩১ মি. (জানুয়ারি ২০১৬)। সুতরাং, মোবাইল ব্যবহারকারীদেশ ৪১ শতাংশ এবং নেট ব্যবহারকারীর ৯৫.১২ শতাংশ মোবাইল ইন্টারনেট সাবস্ক্রাইবার। এ কারণে ফেসবুকসহ অন্যান্য সকল সোশ্যাল মিডিয়াতে আমাদের বিচরণ করার সম্ভাবনা অনেক বেশী।

Screenshot 2016-03-14 14.49.07

                                                       চার্ট-৩ঃ বাংলাদেশে ইন্টারনেট ও মোবাইল ব্যবহার

অ্যালেক্স বলছে, বাংলাদেশ থেকে যে দশটি সাইটে সবচে বেশী ভিজিট করা হয় তার মধ্যে রয়েছে- গুগল, ফেসবুক, ইউটিউব, গুগল.কম.বিডি, প্রথম আলো, ইয়াহু, ব্লগস্পট.কম,  উইকিপিডিয়া, বিডিনিউজ২৪.কম, বাংলানিউজ২৪.কম। তবে আসল বিষয় হচ্ছে তালিকায় যে তিনটি সংবাদপত্র ও ইউটিউবের নাম রয়েছে সেখানে অধিকাংশ মানুষ সরাসরি ভিজিট করছে না, ফেসবুক থেকে এসব নিউজ বা ভিডিও লিঙ্কে ক্লিক করে প্রবেশ করছে; অর্থাৎ, বাংলাদেশী ইন্টারনেট ব্যবহারকারীদের সিংহভাগ সময় কাটছে ফেসবুকের পাতায় পাতায়। গ্রামীণ ফোনের এক রিপোর্টে বলা হয়, বাংলাদেশ নিয়মিত ইন্টারনেট ব্যবহারকারীদের ৮০ শতাংশ মানুষ ফেসবুক ব্যবহার করে।

ডিজিটাল ডিজওর্ডার হলো (অতিরিক্ত) ইন্টারনেট আসক্তি, এক মনোব্যক্তিগত ব্যাধি। বিশ্বজুড়ে স্মার্ট ফোন, কম্পিউটার, ইন্টারনেটে আসক্তি এখন কোন মিথ নয়, সহজ সরল এক বাস্তবতা। ‘মানসিক ব্যাধির ডায়াগনস্টিক এবং পরিসংখ্যান ম্যানুয়াল’ (DSM) অনুযায়ী কম্পিউটার গেম ও ইন্টারনেটে আসক্তি এখন যথারীতি মানসিক রোগের অন্তর্ভূক্ত। একটিকে বলা হচ্ছে ‘ইন্টারনেট গেমিং ডিজঅর্ডার’ (IGD) আর অন্যটি হলো ‘ইন্টারনেট এডিকশন ডিজঅর্ডার’ (IAD),   বা ‘আইডিজঅর্ডার’ (iDisorder)। ইউরোপ ও পূর্ব এশিয়ার অনেক দেশে ইন্টারনেট আসক্তির কুফল, নিরাময় ইত্যাদি নিয়ে এখন রীতিমত গবেষণা চলছে।

ইন্টারনেট আসক্তিতে মনোব্যক্তিগত ঝুঁকির আশঙ্কা সবচেয়ে বেশী। এ ঝুঁকি তিন ধরণের হতে পারে-মানসিক, নৈতিক এবং শারীরিক। মানসিক ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে নিঃসঙ্গতা, অসহনীলতা, উদ্বিগ্নতা, বিষণ্ণতা, বৈরীভাবাপন্নতা, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা ও আত্মবিশ্বাসহীনতা। ইন্টারনেট আসক্তি ফলে ব্যক্তির বাস্তব জীবনে সম্পর্কগুলো গৌণ হয়ে পড়ছে, বাস্তব জীবনের মানুষের সাথে মানুষের দূরত্ব ক্রমান্বয়ে বাড়ছে। ফলে বাড়ছে নিঃসঙ্গতা, নিঃসঙ্গতার সাথে সাথে কমে যাচ্ছে পারস্পরিক বিশ্বাস, মানুষ অসহনশীল হয়ে পড়ছে। ইন্টারনেটের গতি একটু কমে গেলে, কোনো পেজ লোড হতে একটু দেরী হলেই আমরা অধৈর্য হয়ে পড়ছি, মোবাইল ফোন ছুড়ে ফেলতে ইচ্ছা করছে, কী-বোর্ড ভেঙ্গে ফেলতে মন চাইছে। আমাদের অসহনশীলতাকে পুঁজি করে ইন্টারনেট সরবরাহকারীরাও নতুন নতুন ফাঁদ তৈরী করছে- মেগা বাইট স্পিডের ফাঁদ। এ অস্থিরতা, অসহিষ্ণুতায় বাড়ছে উদ্বিগ্নতা। উদ্বিগ্নতা থেকে বৈরীভাবাপন্নতা। প্রতিদিনই সেই একই কেচ্ছা, গুগল-ফেসবুক-ইউটিউব-?, ইউটিউব-ফেসবুক-গুগল-?; জীবন হয়ে পড়ছে একঘেয়েমি আর মানুষগুলো অতিমাত্রায় ব্যক্তিকেন্দ্রিক। এছাড়া, ইন্টারনেট আসক্ত মানুষেরা অনেক সময় আত্মবিশ্বাসহীনতায় ভোগে। ফলে দেখা যায় অনেকে নিজের পরিচয় গোপন করে ভুয়া তথ্য, ছবি দিয়ে প্রোফাইল তৈরী করে, নিজেকে অন্য কোনো খ্যাত ব্যক্তির আদলে প্রচার করে, অন্য কেউ হওয়ার ভান করে। বিষয়টি একদিকে যেমন ব্যক্তিকে বিষণ্ণ করে তোলে, ব্যক্তিত্বকে হুমকির মুখে টেনে আনে, তেমনি সামাজিক অনাচার, অপরাধ সংগঠনে সহায়তা করে।

নৈতিক অবক্ষয়ের অন্যতম প্রধান কারণ পর্নোসক্তি বা সাইবারসেক্সুয়াল আসক্তি। ফলাফল, যৌনাচরণের বিকৃতি ও যৌন নির্যাতনের হার বৃদ্ধি। ২০১৫ সালে দেশে ৩৬২টি যৌন নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে যা আগের বছরের চেয়ে ২৪ শতাংশ বেশি। পর্নোগ্রাফির মাধ্যমে নারী ও শিশু নির্যাতন, ব্ল্যাকমেইলও বাড়ছে। ২০১৫ সালে ৪৯টি পর্নোগ্রাফির ঘটনা গণমাধ্যমে এসেছে। আত্মঘাতি হয়েছে অনেক তারুণ্য, যাদের অধিকাংশই নারী।

শারীরিক ঝুঁকির মধ্যে অন্যতম হলো নেশাগ্রস্ত হওয়ার সম্ভাবনা বৃদ্ধি। রাত জেগে নেটে থাকতে গিয়ে মানুষ অতিরিক্ত ধূমপান করছে, ইয়াবা সেবন করছে। পর্যাপ্ত ঘুমের ব্যাঘাত ঘটায় তীব্র মাথাব্যাথা, খিটখিটে মেজাজ, আহারে অনিয়ম, বদহজম আমাদেরকে ব্যতিব্যস্ত করে তুলছে। ফলে পরবর্তী দিনের একাডেমিক, পেশাগত জীবনে আসছে বিশৃঙ্খলা। দীর্ঘ সময় একনাগাড়ে বসে থাকার কারণে শরীরে মেদ জমছে, পিঠে ব্যাথা বাড়ছে ও কর্মস্পৃহা কমছে। অনেকক্ষণ স্ক্রিনে তাকিয়ে থাকায় আমাদের চোখের দৃষ্টিক্ষমতার উপরে বিরূপ প্রভাব পড়ছে ।

পারিবারিক ও সামাজিক সমস্যাগুলোর অন্যতম আত্মকেন্দ্রিকতা ও অবৈধ শারীরিক সম্পর্কের প্রবণতা। নেটে আসক্ত ব্যক্তিরা সারাক্ষণ মোবাইল, ডেস্কটপ, ল্যাপটপ নিয়ে ব্যস্ত থাকে। দূরত্ব বাড়তে থাকে স্বামী/স্ত্রী, সন্তান, পিতা-মাতা ও অন্যান্য আত্মীয়-পরিজনের সাথে। সম্পর্কগুলো ধীরে ধীরে নিয়ম রক্ষার খাদের কিনারে গিয়ে ঠেকে, কখনও স্বাভাবিকতায় ফিরে আসে, কখনও সেখানেই ঝুলতে থাকে। কোনো কোনো সম্পর্ক কখনও আর ফিরতে পারে না, ঘটে বিচ্ছেদ- মানসিক বা পারিবারিক সম্পর্কের ছেদ। অন্যান্য ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে অবৈধ্য সম্পর্ক ও পরকীয়া প্রবণতা যা বর্তমানে মহামারীর মতো ছড়িয়ে পড়েছে। বাংলাদেশের সমাজে এ ধরনের সম্পর্ক এতটা সর্বগ্রাসী আগে কখনই ছিল না। কিন্তু, এখন নীতি-নৈতিকতা বিসর্জন দিয়ে নারী-পুরুষ উভয়ই অবৈধ্য প্রেমের সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ছেন।  ইতোমধ্যে অনেক নারী, পুরুষ, সন্তান পরকীয়াতে বলি হয়েছে; সবচে বেশী নিহত হয়েছে নিষ্পাপ শিশুরা। বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরামের হিসেবে ২০১২ থেকে জুলাই ২০১৫ পর্যন্ত সাড়ে তিন বছরে দেশে ৯৬৮টি (২০৯, ২১৮, ৩১৫ ও ১৯১) শিশুকে নির্যাতন করে হত্যা করা হয়েছে। এ বিপুল সংখ্যার শিশু হত্যার অধিকাংশের পেছনে কেনো না কোনো ভাবে পরকীয়া সম্পর্কের প্রভাব রয়েছে। ‘নকিয়া’, আর ‘পরিকীয়া’ শব্দদ্বয়ের ছন্দোবদ্ধ মিলের বাইরেও একটি শ্লেষাত্মক বাস্তবতা রয়েছে।

ইন্টারনেট আসক্তির ফলে বিভিন্ন দেশে সে সকল অপরাধ ও অপমৃত্যু হয়েছে তার মূলে রয়েছে  ভার্চুয়াল গেম আসক্তি। ইন্টারনেট ব্যবহারকারী অন্যতম দেশ দক্ষিণ কোরিয়া। ২০০৫ সালে এখানে একটানা পঞ্চাশ ঘণ্টা কম্পিটারে গেম খেলার কারণে এক ব্যক্তি হার্ট অ্যাটাকে মারা যায়। এ ঘটনার পাঁচ বছর পরে এক দম্পতির তিন মাস বয়সী কন্যাকে রাতে একা বাসায় রেখে সাইবার ক্যাফেতে কম্পিউটার গেমস খেলতে গিয়েছিল। গেমের নেশায় তাঁরা বেমালুম ভুলে যায় অভুক্ত বাচ্চাটির কথা। টানা বারো ঘণ্টা গেম খেলে যখন তারা বাসায় ফিরে আসে ততক্ষণে বাচ্চাটির ওপারে চলে গেছে। দেশটির ৮৪.৩৩ শতাংশ লোক ইন্টারনেট ব্যবহার করে যার মধ্যে ২৯ শতাংশ তরুণরা স্মার্টফোনে আসক্ত। এ আসক্তদের ১২.৫ শতাংশের আসক্তি মনস্তাত্ত্বিক রোগের পর্যায়ে পৌঁছেছে।  টানা তিন দিন গেম খেলে গত বছর তাইওয়ানে সেইহ (Hsieh) মারা যায়, একইভাবে চল্লিশ ঘণ্টা গেম খেলে মারা গেছে চুয়াং (Chuang), গেম খেলা বন্ধ করতে বলার কারণে হুসেহ জুন-চেন (Hsueh Jun-Chen) গায়ে আগুন লাগিয়ে আত্মহত্যা করেছে।  ইন্টারনেট আসক্তিতে চীনে মারা যায় ঝ্যাং (Zhang), আত্মহত্যা করে জিয়াও (Xiao Yi)। গেম আসক্তিতে আমেরিকায়ও অপরাধ কম হয়নি- গেম খেলে হতাশ হয়ে আত্মহত্যা করেছে শন উলে (Shawn Woolley), ‘Grant Theft Auto: Vice City’ গেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে ডেভিন মুর  (Devin Moore) গাড়ি চুরি করতে গিয়ে ধরা পড়ে, গেম সরিয়ে রাখাতে ক্রুদ্ধ হয়ে ড্যানিয়েল প্যাট্রিক (Daniel Petric) তাঁর পিতামাতাকে হত্যা করে। ব্রাজিলে হাঁটার সময় ইন্টারনেটে চালাতে গিয়ে গ্যাব্রিয়েল বাসে চাপায় মারা যায়। গেম খেলতে নিষেধ করার জন্য ফিলিপাইনে দাদীকে হত্যা করেছিল সতের বছরের এক কিশোর।

উন্নত অনেক দেশই ইন্টারনেট আসক্তি নিরাময় কেন্দ্র চালু করেছে। যে সকল দেশ ইতোমধ্যে ইন্টারনেট আসক্তি নিরাময় কেন্দ্র খুলেছে তাদের মধ্যে রয়েছে দক্ষিণ কোরিয়া, চীন, নেদারল্যাল্ডস, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, তাইওয়ান ও আমেরিকা।

বাংলাদেশে ইন্টারনেট আসক্তিকে এখন পর্যন্ত রোগের তালিকায় যোগ করা হয়েছে কি না তা আমার জানা নেই। বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের প্রেক্ষিতে (যেমন, ঐশি, সামিউল, রাজন, মৌমি ও তায়িবা, জুনায়েদ ইত্যাদি) সামাজিক অবক্ষয়কে তুলে ধরতে গিয়ে বিচ্ছিন্নভাবে ইন্টারনেট, সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং ও পর্নাসক্তির বিষয়টি আলোচনায় উদ্ধৃত হয়েছে। তবে হলফ করে বলা যায়, ইন্টারনেট আসক্তি ব্যাধি হিসেবে এখন পর্যন্ত সামাজিক আলোচনা-পর্যালোচনায় অন্তর্ভূক্ত হয়নি। রানা প্লাজা ট্রাজেডির পরবর্তী সময়ে গার্মেন্টস শিল্পে যে ব্যাপক সতকর্তামূলক পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে তা সহস্রাধিক প্রাণের বিনিময়ে না হলেই হয়তো ভালো হতো। যে শিশু-কিশোর-তরুণের হাতে আমরা ঢাক-ঢোল পিটিয়ে আজ ইন্টারনেট তুলে দিয়েছি, কাল তাদের সেই হাতে পতাকা তুলে ধরার শক্তি থাকবে কি না সেটা ভেবে দেখার দায়িত্বটাও আমাদের।

ডিজিটাল জয়ের রথে ছোপ ছোপ লাল রঙ বিজয়ের প্রতিক হতে পারে, তবে এক পলকে দেখে নিও সে আল্পনা যেন রক্তে আঁকা না হয়। যে বাঁশি সুর তুলে আমাদের মোহিত করে তা যদি না হয় বাঁশের বাঁশি, সেটি তবে বিষের বাঁশি।

======0=======

ফেসবুক পেজ- মোঃ আলাউদ্দীন ভুঁইয়া