ক্যাটেগরিঃ আন্তর্জাতিক

এ মুহূর্তে বিশ্বের সবচেয়ে আলোচিত বিষয় ‘ব্রেক্সিট’ (Brexit)।  ‘ব্রেক্সিট’ একটি পিণ্ডারিশব্দ (portmanteau word)। একাধিক  শব্দের ধ্বনি ও অর্থ সংযুক্ত করে যে শব্দ গঠিত হয় তাকে  পিণ্ডারিশব্দ বলে।  যেমন- বেকফাস্ট+লাঞ্চ= ব্রাঞ্চ (brunch); মোটর+হোটেল= মোটেল (motel); হরিবল+ট্রিমেনডাস= হরেনডাস (horrendous); স্কাই+পিয়ার-টু-পিয়ার= স্কাইপি (skype); মড‍্যুলেটর+ডিমড‍্যুলেটর= মডেম (modem); সিনেমা+কমপ্লেক্স= সিনেপ্লেক্স; ওয়েব+লগ= ব্লগ ইত‍্যাদি ইত‍্যাদি।

ব্রেক্সিট শব্দটির গঠন নিয়ে একটু মতভেদ আছে- কেউ বলছে ‘বৃটেন+এক্সিট=ব্রেক্সিট’। আবার কেউ বলছে ‘ব্রিটিশ+এক্সিট= ব্রেক্সিট’। ‘বৃটেন’ হোক বা ‘ব্রিটিশ’ হোক, ব্রেক্সিট বলতে যা বোঝানো হচ্ছে তা হলো, ইউরোপিয় ইউনিয়ন (ইইউ) থেকে ‘ইউনাইটেড কিংডম’ বা যুক্তরাজ‍্যের বিদায়। এ লক্ষ‍্যে যুক্তরাজ‍্যে দু’দিন আগে যে গণভোট হয়ে গেল তাকে বলা হল ‘ইউকে ইইউ মেম্বারশিপ রেফারেন্ডাম’ বা  যুক্তরাজ‍্যের সদস‍্যপদ বিষয়ক গণভোট’। সংক্ষেপে, ‘ব্রেক্সিট গণভোট’।

ব্রেক্সিট শব্দটির ব‍্যবহার নিয়মসিদ্ধ কি না তা বোঝার জন‍্য কয়েকটি বিষয় জানা প্রয়োজন- ‘বৃটেন’, ‘গ্রেট বৃটেন’, ‘যুক্তরাজ‍্য’ ও ‘ব্রিটিশ’।  বৃটেন বললে ইংল‍্যান্ড (রাজধানী লন্ডন) ও ওয়েলস রাজ‍্যকে (রাজধানী কার্ডিফ) বোঝায়; এদের সাথে স্কটল‍্যান্ড (রাজধানী এডিনবার্গ) যুক্ত হলে তাকে গ্রেট বৃটেন বলে।  কিন্তু, যুক্তরাজ‍্য বললে ‘ইউনাইটেড কিংডম অভ গ্রেট বৃটেন এন্ড নর্দার্ন আয়ারল‍্যান্ড’কে  বোঝায়; অর্থাৎ, ইংল‍্যান্ড, স্কটল‍্যান্ড, ওয়েলস ও উত্তর আয়ারল‍্যান্ডকে সমন্বিতভাবে বোঝায়।

Clq-EgiWEAEjxhv

                                                             কৃতজ্ঞতা স্বীকার- হেনরি উইলিয়ামস, ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল

 

এক কথায় যুক্তরাজ‍্যের নাগরিকদেরকে বৃটিশ বলে। বৃটিশ শব্দ সহযোগে গঠিত হলে এ অর্থে ব্রেক্সিট ‘রাজনৈতিক শুদ্ধ’ শব্দ। মূলতঃ বৃটেনের (ইংল‍্যান্ড ও ওয়েলসের) অধিবাসীদেরকে বৃটিশ বলে।  তবে ভাষা ও সংস্কৃতির বিচারে পৃথকভাবে ইংল‍্যান্ডের জনগণকে ‘ইংলিশ’ আর ওয়েলসবাসীকে ‘ওয়েলশ’ বলে।  অন‍্যদিকে, স্কটল‍্যান্ড ও উত্তর আয়াল‍্যান্ডের বাসিন্দারা যথাক্রমে ‘স্কটিশ’ ও ‘আইরিশ’।  সুতরাং, ব্রেক্সিট গণভোটের ‘বৃটিশ’ শব্দটি এখন ইংলিশ, ওয়েলশ, স্কটিশ ও আইরিশ জাতিসত্ত্বার প্রতিনিধিত্ব করছে।

ব্রেক্সিট গণভোটে ইইউ ছাড়ার পক্ষে মোট ভোট পড়েছে ৫১.৯% ও ইইউতে থাকার পক্ষে ভোট পড়েছে ৪৮.১%।  তবে অঞ্চলভেদে ভোটের হিসেব করলে একটু ভিন্ন চিত্র চোখে পড়ে।  ইংল‍্যান্ড ও ওয়েলসের জনগণ  ইইউ ছাড়ার পক্ষে বেশী ভোট দিলেও স্কটল‍্যান্ড এবং আয়ারল‍্যান্ড তাদের সাথে একমত নয়।  তারা ঠিকই যুক্তরাজ‍্যকে ইইউতে থাকার পক্ষে রায় দিয়েছে।

Picture1

অঞ্চলভেদে গণভোটের বিশ্লেষণ সেটাই প্রমাণ করে বৃটিশ শব্দের মারপ‍্যাঁচে ইংলিশ ও ওয়েলশদের ইচ্ছার বলীর পাঠা হচ্ছে স্কটিশ ও আইরিশরা।  বৃটিশ বলতে এখন যাদের সবাইকে বোঝানো হচ্ছে তারা সবাই তো ব্রেক্সিট সমর্থন করে না।  নাগরিকত্বের আড়ালের এ ঘটনা কি স্কটিশ ও আইরিশ জাতিসত্ত্বার অপমান নয়?

যুক্তরাজ‍্যের বিভক্তির সম্ভাবনা নিয়ে এখন প্রশ্ন উঠেছে।  বৃটিশরা কি পারবে স্কটল‍্যান্ড ও উত্তর আয়ারল‍্যান্ডকে ধরে রাখতে? ২০১৪ সালের সেপ্টেম্বরে “স্কটল‍্যান্ড স্বাধীন হওয়া উচিত কি?” প্রশ্নে স্কটল‍্যান্ডে যে গণভোট হয়েছিল সেখানে ‘না-ভোট’ (৫৫.৩০ শতাংশ) জয়লাভ করেছিল।  ইইউ ত‍্যাগের ঘটনাকে কেন্দ্র করে বিষয়টি আবার সামনে চলে এসেছে।  স্কটিশ সরকারের প্রধান নিকোলা স্টারজিওন তো বলেই দিয়েছেন স্কটল‍্যান্ডের স্বাধীনতার প্রশ্নে দ্বিতীয় গণভোট ‘যথেষ্ট সম্ভাবনা’ রয়েছে।

যুক্তরাজ‍্যের ইইউ ত‍্যাগ উত্তর আয়ারল‍্যান্ডের জাতীয়তাবাদী আন্দোলন উস্কে দিতে পারে। ২০০৯ সালের ‘অপিনিয়ন পোলে’ দেখা যায় ৬৯ শতাংশ আইরিশ যুক্তরাজ‍্যের সাথে একীভূত থাকার পক্ষে এবং ২১ শতাংশ আয়ারল‍্যান্ড প্রজাতন্ত্রের সাথে যুক্ত হওয়ার বিষয়ে মত প্রকাশ করেছিল। আয়ারল‍্যান্ড ইইউয়ের সদস‍্য। উত্তর আয়ারল‍্যান্ড যদি আয়ারল‍্যান্ডের সাথে যুক্ত হয় তবে তারাও ইইউয়ের সাথে যুক্ত থাকবে এমন ভাবনা সেখানকার ২১ শতাংশের জাতীয়তাবাদী ধ‍্যান-ধারণাকে বেগবান করতে পারে। উত্তর আয়ারল‍্যান্ড সরকারের উপ-প্রধান মার্টিন ম‍্যাকগিনেস ইতোমধ‍্যে সংযুক্ত আয়ারল‍্যান্ড গঠনে ‘সীমান্ত ভোটে’র দাবী তুলেছেন।

ব্রেক্সিট যদি ‘বৃটেন+এক্সিট’ হয় তবে তা কোনোভাবে স্কটল‍্যান্ড ও উত্তর আয়ারল‍্যান্ডের উপর প্রযোজ‍্য নয়; অন‍্যদিকে, ‘ব্রিটিশ’ যোগে ‘ব্রেক্সিট’ স্কটিশ ও আইরিশদের জন‍্য হতাশাজনক, গণভোটের ফলাফলের পরে সেটা অবমাননাকর তো বটেই।

====0====

 ফেসবুক- আলাউদ্দীন ভুঁইয়া