ক্যাটেগরিঃ চিন্তা-দর্শন

জন্ম, মৃত‍্যু ও আমি

জীব হলো আত্মা, দেহ ও চেতনাবোধের সামষ্টিক প্রতিফলন। যার জন্ম আছে তার মৃত্যু আছে, যা সৃষ্টি হয় তা ধ্বংস হয়। আত্মার জন্ম নেই, মৃত্যুও নেই। আত্মা পরমাত্মার সৃষ্টি, কেবল তিনিই তা ধ্বংসের ক্ষমতা রাখেন। তবে পরকালতত্ত্ব আত্মাকে ধ্বংস থেকে রক্ষা করে কারণ পরকালে যদি আত্মাকে জবাবদিহিতা করতে হয় তবে তাকে অবশ‍্যই টিকে থাকতে হবে। সুতরাং, আত্মা কালহীন ও অবিনশ্বর। কালচক্রে কালহীন এ আত্মার যাত্রা পথে কোনো দেহ প্রাপ্তি ও তা ত্যাগের মধ্যবর্তীতে গণনাযোগ্য কালটুকুই আত্মার জীবনীকাল, দেহপ্রাপ্তির পূর্বের বা পরের কাল হলো আত্মার পরমকাল।

জৈবক্রিয়ায় জীবদেহে গঠিত ভ্রূণে আত্মা অনুপ্রবেশ করলে জীবের জীবনীকালের সূচনা হয়। দেহের উৎপত্তি ও আত্মার মিলনে জীবের চেতনাবোধ জন্ম নেয়। দেহ, আত্মা ও বোধের মিলনক্ষণই জীবের জন্মক্ষণ। আত্মালব্ধ দেহ শরীরবৃত্তীয় কার্যক্রমের মাধ্যমে স্ব স্ব জীবের গঠন কাঠামো লাভ করতে থাকে। এ গঠন প্রক্রিয়ায় অন্য সকল জীবের সাথে মানুষের বিশেষ দুটি পার্থক্য রয়েছে- শরীরবৃত্তির সাথে মানুষের মধ্যে অন‍্য জীবের তুলনায় অধিক মনোবৃত্তি ও চেতনাবোধের সাথে স্বকীয়তাবোধ পরিপুষ্ট হতে থাকে।

আমরা জীবের যে জন্ম দেখি, জন্মের যে সময়কাল নির্ধারণ করি তা সেই জীবের জন্মের তৃতীয় স্তর। প্রথম স্তরে জীবাত্মার সৃষ্টি হয়েছে যার সময়কাল নির্ধারণযাগ্য নয়, দ্বিতীয় স্তরে জীবাত্মা দেহলাভ করে আর তৃতীয় স্তরে জীব টিকে থাকার ন্যূনতম শারীরিক সক্ষমতা নিয়ে ধরাধামে আবির্ভূত হয়।

আত্মা দেহত্যাগ করলে জীবের চেতনাবোধ লুপ্ত হয়। এ অসাড়তাকে আমরা মৃত্যু বলি। কিন্তু, আত্মাহীন দেহে এরপরেও কিছু সময় শরীরবৃত্তীয় কার্যক্রম টিকে থাকে। তাই আমরা মৃত‍ দেহ থেকে বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সংগ্রহ করতে পারি, যা অন্য জীবদেহে সংযোজনও করা যায়। আত্মার দেহত্যাগে জীবের যদি সত্যিকারের মৃত্যু হতো তবে আত্মাহীন দেহের সকল অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সাথে সাথে অকেজো হয়ে যেত। আত্মার দেহত্যাগের সাথে সাথে জীবের মৃত্যু হয় না, মৃত্যুর প্রক্রিয়া শুরু হয়, জীবের দেহাবসানের মাধ্যমে যার পরিসমাপ্তি ঘটে।

তবে আত্মার অবমুক্তি, চেতনাবোধের অবলুপ্তি, দেহাবসানে আমার ‘আমি’র মৃত্যু ঘটে না। আমার ‘আমি’ হলো আমার আত্মা। আর আমার ‘আমিত্ব’ হলো আমার আত্মা, দেহ ও চেতনাবোধের সামষ্টিক প্রতিফলন। আত্মা আমার দেহ ত্যাগ করলে আমার ‘আমিত্ব’ মৃত্যু পথে ধাবিত হয়, কিন্তু আমার ‘আমি’ কখনো মৃত্যু বরণ করে না। আমার আত্মাই ‘আমি’, যতদিন এ আত্মা টিকে থাকবে ততদিন আমার ‘আমি’ টিকে থাকবে।

জীবের জন্ম ও মৃত্যু একটি অপূর্ণাঙ্গ সত্য। জীবাত্মার পরমকাল থেকে ইহকালে দেহধারণকে জন্ম এবং জীবনীকাল শেষে ইহকাল থেকে পুনরায় পরমকালে প্রত‍্যাবর্তনকে আমরা মৃত্যু বলি। কিন্তু এসব জীবের জন্ম বা মৃত্যু নয়, পরমকাল চক্রে অবিনশ্বর আত্মার ইহলৌকিক জীবনীকাল মাত্র।