ক্যাটেগরিঃ দিনলিপি

সিয়াম সাধনার একটি মাস শেষ হলো। একাগ্রতা ইবাদত আর আধ্যাত্মিকতায় মিলে মিশে একাকার একটি মাস। তারপরও একটু বিশ্লেষণের প্রয়োজন থেকে যায়। কতটুকু সংযম আর কতটুকু সাধনা করলাম?? নিজেই নিজেকে প্রশ্ন করি, আর ভাবনার দর্পনে দেখি বিপরীতমুখি স্রোতের প্রতিবিম্ব।
চলুন আলাদা আলাদাভাবে একটু বিশ্লেষনের চেষ্টা করিঃ

নামাজঃ রমজান মাসকে কেন্দ্র করে এবাদত বন্দেগী বেড়ে গিয়েছিলো স্বাভাবিকভাবেই। যাদের সারাবছর মসজিদে দেখিনি তাদের দেখেছি তারাবির নামাজে, রমজান মাসের প্রথমদিকে তো মসজিদে জায়গা পাওয়া মুস্কিল হয়ে যেতো, শেষের দিকেও ছিলো তাই। নামাজ শুধুমাত্র রমজান মাসে পড়তে হয় আর বাকি ১১মাস কি খোদা মাফ করে দেবেন?

যাকাতঃ অনেককেই দিতে দেখলাম, ঢাকঢোল পিঠিয়ে, সবাইকে জানিয়ে। আর অনেককেই দেখলাম যাকাত দেয়ার সামর্থ থাকার পরও চুপ মেরে যেতে, যেনো যাকাত ব্যাপারটা ঠিক মতো বুঝেন না। কেউ বললেন আগামীবার দেবো!!! আমার এক আত্মীয়ের কোটি টাকার উপর ব্যাংকে এফডিআর করা, অথচ তিনি যাকাত দিয়েছেন শুধুমাত্র তার স্ত্রীর ১৫ভরি সোনার!!! যেনো যাকাত একটি নিজস্ব তৈরী নিয়ম, স্বীয়-মতবাদ!!!

হজ্বঃ পাড়াপ্রতিবেশি অনেকেই দেখলাম হজ্বে গেলেন, অনেকে ৯ম কিনবা ১০ম বারের মতো। যাওয়ার সময় বললেন “হজ্বে যাওয়ার নেশায় পেয়ে বসেছে রে…খালি আল্লাহর বাড়ী দেখতে ইচ্ছা করে, আর অনেকেই বিস্তর টাকা পয়সা থাকার পরও অপেক্ষা করলেন আরও একটু বুড়া হয়ে তারপর যাওয়ার জন্য।

খাবারঃ বছরের যেকোনো মাস থেকে এই মাসে ২০-৩০% খাবার বেশি লেগেছে। খাবার খরচও বেশি ছিলো, সেহরী থেকে ইফতার অবধি কোনো মতে সহ্য করে মাগরিবের আজান পড়ামাত্র যেনো ঝাপিয়ে পড়ি খাবারের উপর। ইফতারের টেবিলে খাবারের বাহার দেখে মনে হয়নি এটা সংযম আর সিয়াম সাধনার মাস।

বাজারঃ ভেজাল খাবার, ভেজাল দ্রব্যাদি রমজান মাসে বাজারে সবচেয়ে বেশি আসলো। নিরুপায় হয়ে আমরাও তাই কিনলাম। ঈদশপিং-এ আমরাও “রিসনেবল প্রাইস-রিসনেবল প্রাইস” বলে বাজার করতে থাকলাম। ভাবতে ভাল লাগে ১৫০০টাকায় মোটামোটি ভাল ধরনের সান্ডেল মিলছে “রিসনেবল প্রাইসে” আমার জন্য। স্ত্রীর শাড়ির কথা নাইবা বললাম…

ওজনঃ বাসার কাজের মেয়ে থেকে শুরু করে মা-বাবা আমার স্ত্রী সবার ওজন এই মাসে বেড়েছে, যদিও শুধু বাবা তা স্বীকার করেছেন। আমার ওজন বেড়েছে দেড় কেজি মতো, আপনার ওজন কতো বেড়েছে?

ঘুমঃ রমজান মাসকে অনেকে বেছে নিয়েছিলেন ঘুমের মাস হিসেবে। মহিলাদের ক্ষেত্রে ছিলো রীতিমতো ঘুমানোর প্রতিযোগীতা করে ভরদুপুর পর্যন্ত। সেহরী খেয়ে দুপুর ১টা-২টার সময় ঘুম থেকে উঠলে কতোটা সময় বাকি থাকতো ইফতারের? (অনেককে আমি ৩টা পর্যন্ত ঘুমাতে দেখেছি) আশ্চর্য সিয়াম আর চমৎকার সাধনা।

অফিসঃ রমজান মাসকে আক্ষরিক অর্থে অনেকেই ছুটির মাস হিসেবেই ধরে নিয়েছিলাম। কিছু সরকারী অফিসে সারামাসই ছিলো ছুটির আমেজ। অনেকে অফিস করেছেন ঘন্টাখানেক তাও জোহরের নামাজের পর। প্রাইভেট ব্যাংকে থাকা ভাইয়েরা রমজান মাসের শেষের দিকে বুঝতে পেরেছেন কাজ কতো প্রকারও কিকি…

বিনোদনঃ অবসর পেলেই টিভি রিমোট হাতে বসেছি চ্যানেল পাল্টাতে, শীলা-মুন্নী কাউকেই ছাড় দেইনি। আরে ভাই রোজা তো না খেয়ে থাকার ব্যাপার, টিভিতে *** দেখতে সমস্যা কোথায়!!!

ঘুষ, দুর্নীতি, চাদাবাজীঃ ঈদকে সামনে রেখে রীতিমতো প্রতিযোগীতা চলছে, সরবে-নিরবে। এইসব ব্যাপার আজকাল আর অপরাধের পর্যায়ে পড়ে না, এগুলো রীতিমতো অধিকার হয়ে গেছে। দিতেই হবে…

অভিজ্ঞতাঃ
এইবার রমজানে একটি অভিজাত রেস্টুরেন্টে ইফতারের দাওয়াত ছিলো। ঠিক মাগরিবের আজানের পূর্বে যখন অপেক্ষা করছি, তখন অনেক টেবিলেই চলছিলো অভিজাত শ্রেণীর খাওয়ার ধূম। ওরা খেতে লজ্জা পাচ্ছিলো না কিন্তু আমার দেখতে লজ্জা লাগছিলো।

গতদিন ঈদের উপহার একটি বস্তিতে নিয়ে উপস্থিত হলাম দুপুরে। নির্বিকার ভঙ্গিতে ঐখানেও চলছিলো আহার-উৎসব। পার্টটাইম রিক্সাওয়ালা হোসেন উত্তরে বলেছিলো, “অতো রোজা রাখিয়া পারা যায় না”

(পার্টটাইম কারন সে শুধু ঈদে শপিং-এ যাওয়া মহিলা যাত্রীর অপেক্ষা করতো)

সালতামামি লম্বা করে বিরক্তির উৎপাদন করতে চাই না। চমৎকার একটি রমজান মাস কাটিয়ে ঈদ সন্নিকটে। কাল ঈদ।
সবাইকে ইদ মোবারক।