ক্যাটেগরিঃ কৃষি

 

প্রথম যখন উপজেলায় পোস্টিং হয়, সকালে কর্মস্থলে যাওয়ার সময় দেখতাম প্রতিদিন সকাল ট্রাক ভরে ভরে উপজেলার বাজারে শাক-সবজি, মাছ-মাংশ এবং নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদির চালান নিয়ে আসা হয়েছে। জিজ্ঞেস করে জেনেছি এইসব আমদানী হচ্ছে শহর থেকে।
গ্রামের বাজারে শাক-সবজি মাছ চাল ডাল সহ সবকিছু আসছে শহর থেকে!!!

প্রতিবছরের মতো এ বছরের শুরুতে Field Side Training Program -এ ছাত্রছাত্রীদের নিয়ে প্রায় ১মাস যাবৎ সিলেটের জৈন্তাপুর এবং বিয়ানীবাজার উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে ঘুরে ৩৫৭টি বাড়িতে তাদের স্বাস্থ্য, পরিবার, জন্মনিয়ন্ত্রন, শিশু স্বাস্থ্য, সামাজিক এবং অর্থনৈতিক অবস্থার একটি জরীপ চালাই আমাদের ডিপার্টমেন্ট থেকে। জরীপ শেষে প্রেজেন্টেশনের মাধ্যমে ছাত্রছাত্রীরা বাংলাদেশের গ্রামীন স্বাস্থ্য ব্যবস্থা, জীবনযাত্রাসহ রোগ এবং এর প্রতিকার কি হতে পারে তা নিয়ে পর্যালোচনা করে। পুরো প্রোগাম নিয়ে আলোচনা করলে লেখা অনেক বড় হবে এবং অনেকের বিরক্তির কারন হবে। জরীপের একটি অংশে ছিলো Kitchen Garden বা বাড়ির আঙ্গিনায় শাকসবজির চাষ বিষয়ক প্রশ্ন। ছাত্রছাত্রীরা যে চিত্র তুলে এনেছে তা ছিলো আমার চোখে ভয়াবহ। যেমনঃ

*গ্রামের ঐসব এলাকার প্রদর্শনকৃত ৩৫৭টি বাড়ির মধ্যে মাত্র ৬৬টি বাড়িতে শাকসবজির চাষ হয়। বাদ বাকি ৩৫৭-৬৬= “২৯১” বাড়ি শাকসবজিসহ প্রোটিন সাপ্লিমেন্টের জন্য পুরোপুরি বাজারের উপর নির্ভরশীল।
*২৯১টি বাড়ির আঙ্গিনায়, চালে বা রান্নাঘরের সাথে কোনো বাগান নেই!!
*মাত্র ৫৭টি পরিবার হাস বা মুরগী পালন করে।
*৪২টি পরিবার গরু-ছাগল পালন করে।
*৭৮টি বাড়ি লাগোয়া ছোট-বড় পুকুর বা ডোবা জাতীয় জলাধার আছে, ২০টি পরিবার সেখানে মাছ চাষ করে।
*২৯১টি বাড়ি এইসব কাজকে আজকাল ঝামেলা মনে করে, এবং বাজারে সহজে পাওয়া যায় তাই ঘরের আঙ্গিনায় এই ক্ষুদ্র চাষাবাদে আগ্রহী নয়।

আসুন একটু বিশ্লেষন করি,
২৯১টি বাড়ি বাজার থেকে তাদের নিত্য প্রয়োজনীয় মাছ, মাংস, দুধ, ডিম, শাকসবজি কিনে আনছে। গ্রামের বাজারে এই চাহিদার চালান আসছে শহর থেকে। আর শহরে তা আসছে দেশের বিভিন্ন উৎপাদনশীল এলাকা থেকে। প্রতিদিন যদি একটি বাড়িতে ৫০টাকার শাক-সবজি এবং প্রোটিন সামগ্রী লাগে, তাহলে প্রতিদিন ২৯১টি বাড়ির ১৪৫৫০টাকার খাদ্য সামগ্রী লাগছে, যার চালান আসছে শহর থেকে!!! যা কিনা ঘরের আশপাশেই উৎপাদন সম্ভব ছিলো। এইরকম লক্ষ লক্ষ বাড়ি তাদের দৈনিক চাহিদার জন্য বাজারের উপর পুরো নির্ভরশীল, এতে করে জাতীয় বাজারের উপর চাপ পড়ছে, উৎপাদনশীল এলাকা দ্রুত কমতে থাকায় চাহিদা পূরন করতে না পেরে খাদ্য দ্রব্যের লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে।

শহরে বাড়ির আঙ্গিনায় সবজি বাগান বা হাসমুরগী পালন সম্ভব নয়। কিন্তু গ্রামে একটি বাড়ির টিনের চালে একটি শিম গাছ, একটি লাউ গাছ, ঘরের লাগোয়া পাশের ছোট্ট জায়গায় কয়েকটি মরিচগাছ, টমেটো সহ যেকোনো সবজি গাছ সারাবছরের নিত্য প্রয়োজনীয় রান্না ঘরের চাহিদা ৫০-৬০%মিটাতে পারে। এই বাড়ি তার উদৃত উৎপাদন বাজারে বিক্রি না করুক, সে অন্তত বাজারের উপর নির্ভর করবে না। এই ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র প্রয়াস, ব্যক্তিগত উদ্যোগ জাতীয় বাজারে তথা “জাতীয় বাজেটে” নিয়ে আসতো একটি বিরাট সস্তি।

ঘরের লাগোয়া ছোট্ট হাস-মুরগীর, ২-৩টি হাস-মুরুগী, সারা বছর ডিম তথা প্রোটিন সাপ্লিমেনটেশনের নিশ্চয়তা দেয়। উপরন্তু বাজারের উপর চাপ কমে।
আজকের প্রথমআলোয় পড়লাম ডিমের হালি ৪০টাকা ছাড়িয়েছে!!
উৎপাদন আর চাহিদার বিরাট ফারাক থাকায় ৮-১০টাকা ডিমের হালি আমরা কিনছি ৪০টাকা দিয়ে!!
সবার হয়তো গরু-ছাগল পালনের ক্ষমতা নেই। কিন্তু যাদের আছে তারাও গরু-ছাগল পালনে উৎসাহী না।

আগের দিনে দেখেছি আমাদের মা-চাচিরা শখ করে বাড়ির আঙ্গিনায় লাউ-কুমড়া, শিম-পটল, টমেটো, মরিচ সহ কতো রকমের শাকসবজি লাগাতেন। প্রতি বাড়িতেই থাকতো ২-৪টি হাসমুরগী।
বাড়ির পাশের ডোবা বা পুকুরে মাছের চাষ হতো। অবসরে পুকুরের পাশে বসে বরশি দিয়ে পুঁটি মাছ ধরার মতো আনন্দ আমরা প্রায় ভুলতে বসেছি!!
এইসব ক্ষুদ্র চেষ্টা প্রয়াসের কারনেই হয়তো একসময় পুকুর ভরা মাছ ছিলো, গোলা ভরা ধান ছিলো, আমরা ছিলাম সমৃদ্ধশালী এক জাতি।
উৎপাদন বিমূখতা আমাদের নিয়ে যাচ্ছে বাজার নির্ভর একটি অনিশ্চয়তার ভবিষ্যতে।
কিনে খাবেন? উৎপাদন করবেন না? তাও সস্তায় খাবেন?? একি সম্ভব।

এইসব ক্ষুদ্র প্রয়াস দেশের জন্য বয়ে আনতো সমৃদ্ধি, আমরা হতাম খাদ্যশষ্যে নির্ভরশীল একটি জাতি।

এই স্বপ্ন বাস্তব করা কি খুব কঠিন?

টিকাঃ বিয়ানীবাজার এবং জিন্তাপুর এলাকার জরিপের ক্ষুদ্র চিত্র, তা পুরো বাংলাদেশ অন্যান্য অঞ্চলকে রিপ্রেজেন্ট করে না। কিন্তু পুরো ব্যাপারটি ভেবে দেখার মতো।
ছবিঃ নেট