ক্যাটেগরিঃ পাঠাগার

গল্পের নায়ক এমন একটি শহরে বাস করে যেখানে বহুতলের আকাশচুম্বি কাঁচ বেষ্টিত বাসভবন, দ্রুতগামী ইলেক্ট্রিক ট্রেইন, গ্যাস চালিত গাড়ি, মূহুর্তে হিসেব কষার জন্য ক্যালকুলেটর এবং এমন একটি যোগাযোগ ব্যবস্থা বা নেটওয়ার্ক যা সারা পৃথিবীকে গেথেছে একসুতোয়। এমন একটি সভ্যতা গড়ে উঠেছে যেখানে কলকব্জার যান্ত্রিক জীবন মানুষকে শিল্প-সংস্কৃতি থেকে নিয়ে গেছে অনেক দূরে। শত আরামে বাস করেও গল্পের নায়ক জীবনের মানে খোজে পায় না।

আমি যদি বলি গল্পটি কল্পবিজ্ঞান, আপনারা মুচকি হাসবেন। কারণ কল্পবিজ্ঞানের গল্প তাই যা বর্তমান বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে সম্ভব হয়ে উঠেনি। উপরে বর্নিত সবইতো বর্তমান বিজ্ঞানের আলোয় হাতের মুটোয়।

কিন্তু আমি যদি বলি উপরের গল্পটির প্লট আজ থেকে প্রায় দেড়শ বছর পূর্বে লিখা যখন একটি সাধারণ রেডিও ছিলো কল্পবিজ্ঞান, তখন একটু ভ্যাবাচ্যাকা খাবেন বৈকি। হ্যা, উপরের গল্পটিতে যেসব ব্যবস্থার কথা বলা হয়েছে তা জুল ভার্ন Jules Verne ১৮৬৩সালে তাঁর একটি কল্পবিজ্ঞান গ্রন্থ Paris in the Twentieth Century এ বর্ননা করেছিলেন। গ্রন্থটি তিনি যখন প্রকাশে জন্য Pierre-Jules Hetzel এর কাছে নিয়ে যান তখন প্রকাশক মনে করেছিলেন এই গল্পটি নিতান্তই গাজাখুরি এবং তা প্রকাশ করলে জুল ভার্নের লেখনী দূর্নাম কুড়াবে, আকাশ ছোয়া খ্যাতি প্রাপ্ত জুল ভার্নের ক্যারিয়ারের জন্য তা হুমকি সরুপ। তাই Pierre-Jules Hetzel জুল ভার্নকে পরামর্শ দেন অন্ততঃ ২০বছর পরে গ্রন্থটি প্রকাশের জন্য।
জুল ভার্ন সেই গল্পের পান্ডুলিপি ঘরে অযত্নে ফেলে রাখেন, এবং একসময় সম্পূর্ন ভুলে যান।

দীর্ঘ সময় পরে তাঁরই বংশের এক দৌহিত্র পান্ডুলিপি খোজে পায় ১৯৮৯ সালে। বইটি প্রকাশ হয় ১৯৯৪সালে, এবং যথারীতি বেস্টসেলার। দেড়শ বছর আগে বর্তমান সময়ের অনেক প্রযুক্তির কথা নিখুঁত ভাবে বর্ননায় কল্পবিজ্ঞানের সমালোচকেরা নির্বাক হয়ে যান।

জুল ভার্ন একজন কল্পবিজ্ঞান সাহিত্যের লেখক। তার অসংখ্য বই আমাদের ছোটবেলার সঙ্গী। আজও এইসব বই পড়লে আলাদা মজা পাওয়া যায়। আশি দিনে বিশ্ব ভ্রমন, এ জার্নি টু দ্য সেন্টার অব দি আর্থ বা পৃথিবীর অভ্যন্তরে, সাগর তলে ষাঠ হাজার মাইল ,চাঁদে প্রথম মানুষ ,রহস্যের দ্বীপ এই সব আমাদের অন্যরকম স্মৃতির কথা মনে করিয়ে দেয়।

জুল ভার্নের আরও কিছু কল্পবিজ্ঞানের প্রযুক্তির কথা বলবো যা ছিলো দেড়শ বছর আগের কল্পবিজ্ঞান আর বর্তমান সময়ের বাস্তব। ভেবে দেখুন একজন লেখকের কল্পনা শক্তি কতো প্রবল হতে পারে।

ইলেকট্রিক সাবমেরিনঃ
জুল ভার্ন তাঁর Twenty Thousand Leagues Under the Sea গ্রন্থে এসিড ব্যাটারিতে পানির নিচে চলা একটি জাহাজের কথা লিখেছিলেন যাতে করে ক্যাপ্টেন নিমো সাগর তলে ঘুরে বেড়াতেন, যা ছিলো শক্তিশালী এবং দ্রুতগামী।

ইস জুল ভার্ন আজ বেঁচে নেই, থাকলে আজ তিনি এ যুগের সাবমেরিন দেখে যেতেন।

সরাসরি খবর সম্প্রচারঃ
১৮৮৯ সালে জুল ভার্ন ২৮৮৯ সালের খবরের কাগজের কথা লিখেছিলেন, খবর কাগজে ছাপা হবে না, প্রতিদিন সকালে একজন প্রতিনিধি খবর পাঠ করবেন, এবং বিশ্বের যে কেউ চাইলেই তা শুনতে এবং দেখতে পারবে।

১৯২০ সাল পর্যন্ত তা সম্ভব ছিলো না। জুল ভার্ন তাঁর কাল্পনিক বর্ননা দেয়া প্রায় ৩০বছর পর প্রথম টেলিভিশন তৈরী হয় এবং ১৯৭৪সালে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সনের পদত্যাগের লক্ষ কোটি লোক লাইভ দেখতে পায়।

সৌর সেল চালিত মহাকাশ যানঃ
১৮৬৫সালে From the Earth to the Moon গ্রন্থে জুল ভার্ন সোলার সেল আছে এবং সৌর শক্তি চালিত কাল্পনিক মহাকাশযানের কথা লিখেছিলেন। আজ নাসা প্রেরিত সৌর শক্তি চালিত অনেক যান পৃথিবীর কক্ষপথে ঘুরছে এবং ভিন গ্রহে পাড়ি জমিয়েছে প্রানের সন্ধানে।

লুনার মডিউলস (Lunar Modules)ঃ

From the Earth to the Moon গল্পে জুল ভার্ন একটি যন্ত্রের কথা লিখেছিলেন যা চন্দ্রে যাত্রী বহনে ব্যবহৃত হবে যা বর্তমান লুনার মডিউলের সাথে পুরোপুরি মিলে যায়।

আকাশ লিখনঃ ২৮৮৯সালে আকাশে ধূয়ার/গ্যাসের সাহায্যে লিখন দ্বারা বিভিন্ন বিজ্ঞাপন আকাশে লিখা থাকবে যা হবে “atmospheric advertisements”। মেঘের মতো ভেসে বেড়ানো সেই অক্ষর/বাক্যগুলো দৃষ্টি গোচর হবে সবার। জুল ভার্নের কল্পনার সেই মেঘের লিখা আজ অতি সহজে ছোট এয়ার ক্রাফটের মাধ্যমে আকাশে লিখা যায়।

ভিডিও কনফারেন্সঃ জুল ভার্ন তার গল্পে (In the Year 2889) ২৮৮৯সালে দূর-ছবি-কথোপকথনের এক প্রযুক্তির কথা উল্লেখ করেন, যেখানে এক বা একাধিক ব্যক্তি পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তে বসে অন্য ব্যক্তির সাথে ছবি দেখে লাইভ কথা বলতে পারে যা বর্তমানে ইন্টারনেটের যুগে অতি সহজলভ্য ভিডিওকনফারেন্স নামে পরিচিত, স্কাইপ তো আমাদের সবার মাঝে জনপ্রিয়। ভেবে দেখুন দেড়শ বছর আগে স্কাইপের কথা কল্পনা করেছিলেন জুল ভার্ন যা তাঁর বইয়ে “phonotelephote” নামে বর্নিত।

Taser: জুল ভার্ন তার Twenty Thousand Leagues Under the Sea গল্পে একটি অস্ত্রের কথা লিখেছিলেন যাতে বুলেটের পরিবর্তে বৈদ্যুতিক শক বের হবে এবং শত্রুকে ঘায়েল করবে, যা আজকের Taser,

স্পেইসশিপ থেকে প্যারাসুটের মাধ্যমে সমুদ্রে অবতরনঃ From the Earth to the Moon গল্পে জুল ভার্ন চাঁদে ভ্রমন শেষে ফেরত যান পৃথিবীতে প্যারাসুটের মাধ্যমে সমুদ্রে অবতরন করবে এবং ভাসবে বলে কল্পনা করেন যা চিত্রে দেখানো বর্তমানের Mercury capsule, চন্দ্র ফেরত ক্যাপসুল যা প্যারাসুটের মাধ্যমে সমূদ্রে অবতরন করে এবং সেখানেই ভাসে।

আমি ছোটবেলা থেকেই সায়েন্সফিকশন ভালোবাসি। অনেককেই দেখি সায়েন্সফিকশন সম্পর্কে বিদ্রুপাত্মক মন্তব্য করতে। তাদের বলতে ইচ্ছে করে এই মাত্র একশ বছর আগেও রেডিও নামক যন্ত্রও সাইন্সফিকশন ছিলো। আমাদের জানতে হবে, Today’s science fiction, tomorrow’s way of life!