ক্যাটেগরিঃ স্বাধিকার চেতনা

সিলেটের পুরোনো এবং প্রিয় জনতা লাইব্রেরিতে বই কিনতে গেছি, অনেকক্ষণ যাবৎ বই খুঁজাখুঁজি করছি তখন বিক্রেতা ভাই আমাকে একে খন্দকারের “১৯৭১: ভেতরে বাইরে” বইটি হাতে দিয়ে বলেন “পড়েছেন?”

বিনয়ের সাথে বললাম, না ভাই পড়িনি, পড়তেও চাই না।

আমি বই খুলে ২য় সংস্করণে সংশোধনী তাকে দেখালাম। তাতে লিখা, বইয়ের ৩২ পৃষ্টায় দ্বিতীয় স্তবকে আমি লিখেছিলাম এই ভাষণের শেষ শব্দ ছিল “জয় পাকিস্তান”। আসলে এই ভাষণের শেষ শব্দগুলো ছিল “জয় বাংলা, জয় পাকিস্থান”।

অথচ প্রথম সংস্করণে তিনি লিখেছেন শুধু “জয় পাকিস্তান”। যে লোক প্রথম সংস্করণ থেকে দ্বিতীয় সংস্করণের মাঝে মাত্র কিছু দিনের ব্যবধানে তার কথা বদলে ফেলে তার বিশ্বাসযোগ্যতা আমার কাছে নেই। যে সত্যের সাথে মিথ্যের ককটেইল বানিয়ে সত্যকে কলুষিত করে সে মিথ্যেবাদী থেকেও জঘন্য।
এক্ষেত্রে হুমায়ুন আজাদ স্যারের কালজয়ী একটি মন্তব্য মনে পড়ে যায়, “একবার রাজাকার মানে চিরকাল রাজাকার;কিন্তু একবার মুক্তিযোদ্ধা মানে চিরকাল মুক্তিযোদ্ধা নয়!”।

দেশ স্বাধীন হওয়ার ৪৩ বছর পরেও স্বাধীনতার প্রতিষ্ঠিত ইতিহাস নিয়ে বিতর্ক দুঃখজনক। প্রতিষ্ঠিত সত্যকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে নব্য ইতিহাসবিদগণ আর ফরমায়েশি লিখকের চাপিয়ে দেয়া বানোয়াট কাহিনী নিয়ে যত বেশি আলোচনা, তর্ক-বিতর্ক হবে তত বেশি সেই মিথ্যে প্রাধান্য পাবে। খন্দকার সাহেবের কথা যদি সত্যই হয় তবে ৪৩বৎসর যাবৎ তিনি কেনো যে মুখে কুলুপ এঁটে ছিলেন সেটাই বিস্ময়। আর ৪৩ বৎসর পর কেনো হঠাৎ ইতিহাসবিদ হওয়ার সাধ জাগলো সেটাতো রীতিমতো গবেষণার বিষয়।
বাংলাদেশের ইতিহাসে স্থিতাবস্থা নেই, কোনো কালে ছিলোও না। রাজনৈতিক এবং দলীয় কারণে যেভাবে ইতিহাস নিয়মিত লিখিত এবং পূনঃলিখিত হচ্ছে তাতে মনে হচ্ছে ভবিষ্যতে বাংলাদেশের ইতিহাস নিয়ে দেশের কারোও কোনো আগ্রহ থাকবে না, কিন্তু সারা পৃথিবী জুড়ে এই দেশের ইতিহাস নিয়ে গবেষণা হবে।

এই দেশে যেকোনো বিষয়ে নিরপেক্ষ বিশ্লেষণের বড়ই অভাব। সত্যকে চাপিয়ে অসত্য নিয়ত প্রতিষ্ঠা পায়। টক-শোতে তর্কের নামে শব্দ দূষণ হয়। এদেশের ইতিহাস নিয়ে রাষ্ট্র, সমাজ, দল, গোষ্ঠী এমন কি ব্যক্তিগত পর্যায়ে বিভ্রান্তি ছড়িয়ে পড়েছে। মানুষের মাঝে নিয়ত জন্ম নিচ্ছে বিতৃষ্ণা। আর এই বিভ্রান্তি, বিতর্ক সবকিছু হচ্ছে পরিকল্পনা-মাফিক দেশের স্বাধীনতা ইতিহাস নিয়ে, মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে। বুঝে না বুঝে আমরাও এই পরিকল্পনায় শরিক হচ্ছি। বিরাট এজেন্ডা নিয়ে ‘তারা’ ৪৩ বৎসর যাবৎ কাজ করে যাচ্ছে, এবং তারা সফল। আমরা যত বিভক্ত হবো তারা ততই সফল হবে। দেশ মাতৃকার স্বাধীনতা সার্বভৌমত্বের প্রয়োজনে দলমত নির্বিশেষে ব্যাপারটা আমাদের উপলব্ধি করা উচিত।