ক্যাটেগরিঃ কৃষি

url

প্রবাস জীবনে ছাত্রাবস্থায় আমার অনেক পাকিস্তানী এবং ভারতীয় সহপাঠী ছিলো। তারা আমাকে দেখলেই জিজ্ঞাস করতো, দাদা মাছ খাওয়াবেন কবে? ভারতের পশ্চিমবঙ্গ বাদে ভারত পাকিস্তানের কোথাও মাছ জনপ্রিয় খাবার নয়। এমন কি তারা অনেকেই জানে না মাছ কিভাবে রান্না করতে হয়!
এমনও হয়েছে মাছ কিনে আমাকে বা আমার বন্ধুকে তারা দাওয়াত দিয়ে নিয়ে গেছে তাদের বাসায় রান্না করে দেয়ার জন্য। বাঙ্গালী মানেই মাছ… ব্যাপারটা সবার কাছে জানা থাকলেও আমি তো দেখে গিয়েছি দেশে তখন সরকার প্রধানরা বলছেন, ডাল-ভাতে বাঙ্গালী, আবার জনসাধারণের অনেকেই ফাজলামো করে বলতেন “শাক-ভাতে বাঙ্গালী”। বিশ্বের অন্যান্য স্থানে লোকজন আর যাই জানুক, অন্ততঃ আমরা দেশে বসবাসকারী বাঙ্গালীরা জানতাম মাছের আকালের কথা।

আজকাল দেশের বাজারে মাছ পাওয়া যায়। বাঙ্গালীরা আবার তাদের হারানো “মাছে-ভাতে বাঙ্গালী” পরিচয় ফিরে পেয়েছে। ২০১১-১২সালে বাংলাদেশ দেশের বাইরে থেকে কোনো প্রকার চাল ক্রয় করেনি, এ বছর শুনছি রাশিয়াতে চাল রপ্তানি করবে বাংলাদেশ। ৭-৮কোটি মানুষের যে দেশে দুর্ভিক্ষ হয়, সেই দেশে ২০১৪সালে প্রায় ১৬-১৮কোটি মানুষ নিয়েও খাবার উদ্ধৃত হয় ব্যাপার বিস্ময়ের বৈকি।

মাছের কথায় ফেরত আসি। গতকাল (০৭-১১-২০১৪) দৈনিক প্রথমআলোতে চমৎকার একটি খবর পরিবেশন হয়েছে, “মাছ উৎপাদনে চতুর্থ বাংলাদেশ”। খবর পড়ে জানতে পারলাম, বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, ২০১৩-১৪ অর্থবছরে দেশে ৩৪ লাখ ৫৫ হাজার টন মাছ উৎপাদিত হয়েছে, যার মধ্যে চাষ করা মাছের উৎপাদন প্রায় ২০ লাখ টন। জাটকা নিধন বন্ধের ফলে ইলিশের বার্ষিক উৎপাদন ৫২ হাজার মেট্রিক টন বেড়ে হয়েছে সাড়ে তিন লাখ মেট্রিক টন। ১০ বছরে বাংলাদেশি মানুষের মাছ খাওয়ার পরিমাণ দ্বিগুণ হওয়ার পাশাপাশি রপ্তানি বেড়েছে ১৩৫ গুণ। মৎস্য খাতের এই সাফল্যের পেছনে সংশ্লিষ্ট সবার অবদান আছে। পূর্বাপর সরকারগুলোর ধারাবাহিক সহায়ক নীতি এবং মৎস্যবিজ্ঞানীদের নতুন নতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবন দেশের মৎস্যভান্ডার সমৃদ্ধ করেছে। তবে সবচেয়ে বেশি অবদান রেখেছেন মাছচাষিরা। আশির দশকে বাংলাদেশের মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের বিজ্ঞানীদের উদ্ভাবিত উন্নত জাতের পাঙাশ, রুই, কাতল, তেলাপিয়া চাষ তুমুল জনপ্রিয়তা পায়। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে উন্নত জাতের কই, শিং, মাগুর, শোল মাছের চাষ ব্যাপক হারে বেড়েছে। ১৯৯০ সালে দেশে মোট চাষকৃত মাছ উৎপাদিত হয়েছিল এক লাখ ৯৩ হাজার টন। ২০০০ সালে তা বেড়ে ছয় লাখ ৫৭ হাজার এবং ২০১৪ সালে এসে তা ১০ লাখ টন ছুঁইছুঁই করছে। উৎপাদনে বর্তমান বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান চতুর্থ । প্রথম তিনটি দেশ হলো যথাক্রমে চীন, ভারত ও মিয়ানমার। আয়তনে বহুগুণে বড় চীন ও ভারতের পর বাংলাদেশের চতুর্থ অবস্থান চলে আসা বিস্ময়কর ঘটনা।
ইন্টারন্যাশনাল ফুড পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (ইফপ্রি) বাংলাদেশের প্রধান নির্বাহী আখতার আহমদ যথার্থই বলেছেন, “সরকারের মহাপরিকল্পনা ছাড়াই এই সাফল্যের পেছনে মাছচাষিদের সাহস ও সৃজনশীলতা সক্রিয় ভূমিকা রেখেছে। হিমাগারসহ অবকাঠামোগত সুবিধা পেলে মাছের উৎপাদন আরও বাড়বে। বাংলাদেশে অনেক বিশেষায়িত ব্যাংক আছে। সে ক্ষেত্রে মৎস্যজীবীদের জন্যও ঋণসুবিধাসহ প্রয়োজন বিশেষ প্রণোদনা।”

মাছের কথা বলতেই বিটিভিতে দেখা সুজা খন্দকারের একটি বিজ্ঞাপনের কথা মনে পড়ে গেলো। ঐ বিজ্ঞাপনের পর সুজা খন্দকারের নামই পড়ে গিয়েছিলো “সাদেক আলী”। ইলিশ জাটকা সংক্রান্ত তার করা নাটিকাটি সকল মহলে খুবই আলোচিত হয়েছিলো। সেখানে তার সাথে সালেহ আহমেদ অভিনয় করেছিলেন। সেখানে সুজার ছান্দিক ডায়লগ থ্রোয়িং যেকোন শ্রোতা দর্শকের মাথায় গেঁথে যাওয়ার মতো। ঝাটকা নিধন বন্ধে ব্যবহৃত এই চমৎকার নাটিকার ডায়লগ গুলি ছিলো এমন
–মাছের গুষ্ঠি দেখাও ফাল, লগে আনছি কারেন্ট জাল
কপালের ফের কী আর করা, আন্ডা বাচ্চা সহ পড়বা ধরা।
ঝাঁকে ঝাঁকে জাটকা, কারেন্ট জালে আটকা
ইলিশ মাছের পোনারে, টাকার খবর সোনারে।
(তখন পাঞ্জাবি পায়জামা পরিহিত সালেহ আহমেদ-এর আসেন )
— আরে সাদেক আলী। তুমি কারেন্ট জালে মাছ ধরতাসো। তুমি জান না কারেন্ট জালে মাছ ধরা নিষেধ। মৎস্য আইনে তোমার পাঁচশত টাকা জরিমানা অথবা ছ-মাসের জেল হয়ে যাবে। জাটকা মাছ ধরা আইনত নিষেধ আছে।
–মাছ ধরমু তাতেও আইন, যা শুনাইলেন স্যার সত্যিই ফাইন।
ঐ বোকারাম বৎস, নিশ্চিন্তে শিকার কর মৎস্য, মৎস্য মারিব খাইবো সুখে… কী আনন্দ লাগছে বুকে।
— (সালেহ আহমদ রাগ্বত স্বরে) সাদেক আলী । তুমি দেশের ক্ষতি করতাসো।
— মাছ ধরলে দেশের ক্ষতি, ঠিক আছে তো মতিগতি।
— তুমি কি জানো জাটকা মাছ বড় হয়ে ইলিশ হয়।
(পরের দৃশ্য সালেহ আহমেদ একজনকে ডাকেন। বড় ইলিশ দেখিয়ে বুঝান যখন তা ছোট ছিলো তখন জাটকা। এখন ইলিশ। বড় হইছে।)
— জানি, আমি স্যার মোটামুটি জ্ঞানী, এইটা জানি।
–জাইনা শুইনা তুমি এমন কাজ করো। তোমার মতো লোভী মানুষদের জন্য বাংলাদেশ প্রতিবছর সোয়া এক লাখ টনেরও বেশি মাছ থেকে বঞ্চিত হয়।
— এত ইলিশ , সোয়া এক লাখ টন!! কী কন!!!
— শোন মিয়া, মৎস্য আইনে পোনা মাছ ধরা নিষেধ ডিম ওয়লা মাছ ধরা নিষেধ জাটকা মাছ ধরা নিষেধ। একটা কথা মনে রাইখো। মাছের পোনা দেশের সোনা।
–বাহ বাহ বাহ। কী সুন্দর কথা শুনাইলেন স্যার।
মাছের পোনা দেশের সোনা, আজ যে পোনা, কাল সে বড়, ঐইই মিয়ারা সবুর করো।
মাছের পোনা মারুম না, জেল খাটতে পারুম না। ধরুম না আর জাটকা, ইলিশ খামু টাটকা।
যেই ব্যাটারা জাটকা ধরে আটকা ওদের আটকা।

সুজা খন্দকার আমাদের মাঝে নেই, কিন্তু আজও আমি যখনই ইলিশ মাছ খাই… তখন তাঁর কথা মনে পড়ে। ধন্যবাদ সুজা ভাই, আমরা এখন টাটকা ইলিশ খাই।